বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরমাণু জ্বালানীর ভূমিকা

মার্কিন বিজ্ঞানী টমাস এডিসন ১৮৭৯ সালে বৈদ্যুতিক বাতি আবিস্কার করার পর বিদ্যুতের চাহিদা পুরণের বিষয়টি সামনে আসে। বৈদ্যুতিক বাতিসহ ক্রমান্বয়ে আরও অনেক বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আবিস্কৃত হতে থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন উপায় ও তা ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রথমে জ্বালানী হিসেবে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়। এরপর যেসব দেশে স্রোতস্বীনি নদী ছিলো, সেখানে পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হতে থাকে। তবে খনিজ বা জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহারই হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এরপর বিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা অপর এক জ্বালানীর বিশাল উৎসের সন্ধান পায়। যার নাম পরমাণু জ্বালানী। পরমাণুকে ভেঙ্গে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হবার পর যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধ্বংসাত্মক পরমাণু বোমা তৈরী করে এবং ১৯৪৫ সালে পরমাণু বোমার সাহায্যে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরমাণু প্রযুক্তিকে ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহারের একটি প্রথম ঘটনা।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিজ্ঞানীরা পরমাণু প্রযুক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এর ফলে ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে ১৯৭০ এর দশকে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক দেশই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝোকে পড়ে। কিন্তু পরবর্তীতে তেলের দাম হ্রাস পাওয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের থ্রী মাইল আইল্যান্ড ও ইউক্রেনের চেরনোবিলের পরমাণু কেন্দ্রে দুর্ঘটনার পর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের তৎপরতায় কিছুটা ভাটা পড়ে। গত কয়েক বছর ধরে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও দুর্ঘটনা এড়ানোর মতো নতুন নতুন কৌশল আবিস্কৃত হয়েছে। কাজেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন পুণরায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরমাণু জ্বালানী ব্যবহারের একটি বড় কারণ হলো, এটি সম্পূর্ণ ভাবে নির্মল ও পরিবেশ বান্ধব। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও কয়লার যথেচ্ছ ব্যবহার প্রাকৃতিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে খনিজ জ্বালানীর ব্যবহার অব্যাহত থাকলে পরিবেশ দুষন রোধের পদক্ষেপগুলোর সাফল্যের সম্ভাবনাও আরো হ্রাস পাবে। কাজেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্মল জ্বালানীর ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। পানি, বায়ু ও সৌর শক্তি ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং তা পরিবেশবান্ধব। কিন্তু এসব প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য স্রোতস্বিনী নদী ও বিশেষ ভৌগলিক অবস্থান জরুরি। বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যেও এমন এলাকার প্রয়োজন হয়, যেখানে সব সময় বাতাসের সর্বনিম্ন তীব্রতা বিদ্যমান থাকে। এছাড়া, সৌর বিদ্যুৎও এখন পর্যন্ত সব এলাকার জন্য ব্যবহার উপযোগী নয়।

কাজেই পরমাণু জ্বালানীর সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্ব এখন অনস্বীকার্য। বিশ্বে বর্তমানে বিদ্যুতের ১৫ শতাংশই উৎপাদিত হয় পরমাণু জ্বালানী ব্যবহারের মাধ্যমে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যদি শুধুই জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহার করা হতো তাহলে প্রতি বছর আরও ৮ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে গিয়ে মিশতো। পরমাণু জ্বালানী ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন যত বাড়বে পরিবেশ দূষণরোধের প্রচেষ্টা ততটাই সফল হবে।

খনিজ জ্বালানীর উৎস সীমিত এবং একটা পর্যায়ে এই জ্বালানী নিঃশেষ হয়ে যাবে। এ কারণে বিশ্বের সর্বত্রই যত দ্রুত সম্ভব বিকল্প জ্বালানীর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষকরে খনিজ তেল একটি মূল্যবান উপাদান এবং এর মাধ্যমে নানা মূল্যবান পন্য তৈরী করা সম্ভব। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর ব্যবহার অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তিসঙ্গত নয়। এছাড়া, খনিজ তেল ও এই তেল থেকে উৎপাদিত পন্যের দাম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খনিজ তেলের মজুদ হ্রাস পাওয়ায় এর মূল্য আরও বাড়বে। ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, মাটির তলদেশে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে এবং তা বহু বছর ধরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরুদ্ধেও অনেকে যুক্তি তুলে ধরে থাকেন। অনেকেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তাদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ অনেক বেশি এবং পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে যাতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে না পারে সে জন্য জটিল প্রক্রিয়া অনুসরন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ খরচ যেমন অনেক বেশি তেমনি এর উৎপাদন ক্ষমতাও অনেক গুন বেশি। অনেকে চেরনোবিল ও থ্রীমাইল আইল্যান্ডে পারমাণবিক দুর্ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, অন্যান্য প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও নানা সমস্যা ও সীমাবন্ধতা রয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যের বিষয়টিও অনেকে উত্থাপন করে থাকেন। কিন্তু স্বল্প পরিমাণের এই বর্জ্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাটির গভীরে পুতে ফেলা হলে আর কোন বিপদের আশংকা থাকেনা। পরমাণু প্রযুক্তি গত কয়েক দশকে অনেক খানি এগিয়েছে। অতীতে এই প্রযুক্তি নিয়ে যেসব আশংকা ছিলো এখন সেগুলো অনেকটাই কেটে গেছে।

পারমাণবিক বিদ্যুতের নানা ইতিবাচক দিক বিবেচনা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ৩২ টি দেশে ৪৩৯ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে ১০৪ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এসব কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ পুরণ করে থাকে। ফ্রান্সের রয়েছে ৫৯ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার ৮০ শতাংশই পুরণ করে এসব কেন্দ্র। জাপানের বিদ্যুৎ চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসব দেশ আরও নতুন নতুন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। চীন,ভারত ও ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদনের পরিমাণ দ্বিগুন হবে বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানী সংস্থা জানিয়েছে।

ইসলামী ইরানও টেকসই উন্নয়নে পারমাণবিক জ্বালানীর গুরুত্ব এবং খনিজ বা জীবাশ্ম জ্বালানীর সীমাবদ্ধতা ও ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ইরানের বুশাহরে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পারমাণবিক কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইরানের এই প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া সহযোগিতা করছে। আরও কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানের সংসদ আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দেশের জাতীয় গ্রিডে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি বিল অনুমোদন করেছে। ইরান এ পর্যন্ত পরমাণু ক্ষেত্রে অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানী বিজ্ঞানীরা পরমাণু প্রযুক্তি পুরোপুরি আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণ লক্ষ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী দেশগুলোকে এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা দিতে ইরান নিজের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। 

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.5 (2টি রেটিং)

আশরাফ ভাইকে ধন্যবাদ তথ্যবহুল পোষ্টের জন্য। পাঁচ তারা হাঁকলাম।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

ধন্যবাদ। পাঁচতারা সাদরে গ্রহণ করলাম।

''পরমাণু প্রযুক্তি সবার জন্য, পরমাণু বোমা কারো জন্য নয়''- এটা বাস্তবায়ন না হতে পারলে বিশ্বে শান্তি আসবে না।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.5 (2টি রেটিং)