ঈদ পূনর্মিলনী: আনন্দ যেখানে দ্বিগুণ হয়ে ধরা দেয়

“ঈদ পূনর্মিলনী” -শব্দ দু’টির সাথে যেন রাশি রাশি আনন্দ মিশে আছে। একে তো ঈদ মানেই আনন্দ, তদুপরি বন্ধু-সুধী-প্রিয়জনদের সাথে পুনরায় মিলিত হবার অতিরিক্ত আনন্দ; এ যেন ঈদের ছুটির পর শুক্রবারের ছুটি। বিষয়টি উপস্থিতির জন্য যতটা আনন্দের, আয়োজকদের জন্য ঠিক যেন ততটাই পেরেশানীর হয়। তবুও এই পেরেশানীতে লুকিয়ে থাকে দ্বিগুণ আনন্দ। একে তো আমিও একজন উপস্থিতি, দ্বিতীয়তে আমি একজন মেজবানও। তাই কষ্টের পরতে পরতে ঘামের মতই যেন খুশী ঝরে হৃদয়ের কার্ণিশে। পরিশেষে শরীরময় ক্লান্তি নিয়ে যখন অনুষ্ঠানের ইতি টানতে যাই, তখন মনে হয় হৃদয় আজ পূর্ণ হলো।

প্রতিবারের মত এবারো আয়োজন করা হলো ঈদ পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানের। আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্বভারে যখন রমাদ্বানের শেষদিনগুলোতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। তখনো দু’দুটো জায়গা থেকে নাটিকাযুক্ত মেইলের অপ্রাপ্তি আমাদের অন্তরকে ঘামিয়ে তুললো। সহযোগীদের সাথে আলাপ সালাপ করতেও ইতস্ততঃ হতো, উল্টা ধমক খাওয়ার সম্ভাবনা যে থেকে যায়। কারণ, দূরের এক বন্ধুর কাছে নাটিকা চাইতেই জানালো যে, ফকীরের কাছে ভিক্ষা চাইতেছেন ভাই…। আমি হাঁ.. না… ইয়ে… বলে কোনমতে নিজের ব্যস্ততা দেখিয়ে অযোগ্যতাগুলো ঢাকতে চেষ্টা করলাম। তবুও টেনেটুনে ‘আরবে বাংলাদেশীর নবাগমণ’ বিষয়কে সামনে রেখে একটা দাঁড় করালাম। আর বিনাতারে ব্যস্ত সমস্ত ব্যবসায়ী তারকাদেরকে হাঁক ডাক দিতে থাকলাম যে, রমাদ্বানে ছুটি দিলাম কিন্তু ঈদের দিন থেকে টানা চর্চা চালিয়ে যেতে হবে অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত।

আর যাই হোক, পরিচালকের ‘হাঁ’-এর সাথে ‘না’ যুক্ত সাধারণতঃ কেউই করে না। তবুও শংকা নিয়েই কাটিয়ে দিলাম কল্যাণের শেষ দশক। জানিনা ‘লাইলাতুল ক্কদর’ কর্মকিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন কিনা মহামহিম, তবুও পূর্ণ আকাংখার চাদর বিছিয়ে রেখেছিলাম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। প্রার্থনা করি পাঠকদের কিতাবেও যেন তা লিপিবদ্ধ থাকে; যার প্রতিদান শেষ দিবসে দেখতে পাবো আল্লাহর দয়ায়। ঈদের দিনটি সাধারণতঃ আমরা প্রবাসীরা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেই। কেননা, রাত্রিময় দু’চোখ খোলা রেখে খোৎবা শুনতেও যেন বুঁজে আসে পাতা দু’টি, তারপরও ন’টার পর আর কিভাবে খোলা রাখি? বিকেলে আসর ধরেই শুরু করে দিলাম লম্প-জম্প। কে কোথায় আছিস্, ছুটে আয়, ফোন, রিং, ল্যাপটপ, প্রজেক্টর ইত্যাদি….।

সময়-অসময় মেলাতে মেলাতে বাজিয়ে দিলাম রাতের প্রায় আড়াইটা। অনুষ্ঠানের কাঠামোটাকে আরো সুনিশ্চিত করা হলো, কিছু সংযোজন-বিয়োজন, কিছু দায়িত্ব বন্টিত হলো। পাশাপাশি রিহার্সালের মাঝে মাঝে চললো ঈদের আনন্দ। হৃদয়ের তশতরীতে প্রবাসের হালুয়া-মিঠাই পুরে নিয়ে যে যার বিছানার পানে, ঘরের পানে, রাস্তায় রাস্তায় বিভক্ত হয়ে গেলাম। ঈদের দিনটি এভাবেই ফুরিয়ে গেল আমাদের।

পূর্ণমিলনী ঈদের পরের দিন, সময়টা নির্ধারিত ছিল এশার পর। উঁচু মঞ্চ তৈরীর পরিকল্পনা থাকলেও যথাযথ উপকরণ প্রাপ্তি পিছিয়ে যাওয়ায় তা বাতিল হলো। অবশেষে সমতলে সাদা চাদরের কারুকাজে সাজিয়ে নিলাম অনুষ্ঠানের মঞ্চ। আলোক সজ্জাও ছিল সাধাসিধা তবে যথেষ্ট। এবারের আয়োজনে সাদামাটা হলেও তৈরীকৃত মঞ্চটা অনুষ্ঠানকে বেশ উপভোগ্য করে তুলেছে উপস্থিতির নিকট। অনুষ্ঠানসূচীতে মোটামুটি যা ছিল তা নিম্নরূপ-

কুরআন তিলাওয়াত ছিল অনুবাদসহ একটি যৌথ উপস্থাপনা। হামদ ছিল ও না’তে রাসূল (স) ছিল ভিন্ন আঙ্গিকে। অন্তরাল থেকে স্পীকারে রেকর্ড বেজেছিল আর মঞ্চে সে আলোকে অভিনয় করে করে না’তের কথাগুলোর ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন একজন অভিনয় শিল্পী। ঈদের গান হিসেবে ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি ঈদের গানের কোরাস। আরো ছিল কৌতুক অভিনয়, কৌতুক বলা। ছিল বাংলাদেশের গান। মূল আকর্ষণ ছিল টক শো’। এতে রমাদ্বান, ঈদ, তাকওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন উঠে এসেছে। এছাড়াও ছিল কমেডী টক শো’, এতে দেশের বর্তমান ও বিগত বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের বাস্তবতাকে রূপক চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেশ ক’টি কবিতার আবৃত্তি দর্শক-শ্রোতাদের রক্তে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। প্যারোডী গানের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতারা সংস্কৃতির অধঃপতনের চিত্র দেখতে পেলো। ছিল মাকে নিয়ে গান এবং সর্বশেষ একটি ছোট্ট নাটিকা। মজার ব্যাপার হলো মাত্র ঘন্টা খানেকের রিহার্সালে বেশ চমৎকার মঞ্চস্থ করতে পেরেছিলেন আমাদের অভিনেতারা। সব মিলিয়ে এবারের ঈদ আয়োজনে যে ফিডব্যাক পেলাম, তাতে এটুকু পরিস্কার হলো যে, বিগত দিনের চেয়ে এবারের ঈদের চাঁদ ছিল অনেক পরিচ্ছন্ন, অনেক উজ্জ্বল এবং অনেক আনন্দের।

বি.দ্র.: লেখাটির ভিত্তি বিগত ঈদুল ফিতর ১৪৩৪ হিজরী মোতাবেক ২০১৩ সালে মদীনায় আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (3টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (3টি রেটিং)