তলা‘আল বাদরু ‘আলাইনা: জ্ঞানের ধারক ও বিদায়ের স্মারক

৬//২ জুলাই ২০০৬                             শিক্ষাজীবনটা আজ বিকেলে খুব বেশী কড়া নাড়ছে স্মৃতির দুয়ারে। আসরের সালাতান্তে একটা ট্যাক্সি নিয়ে, কথা রাখতে এবং দু’চোখ জুড়াতে ও এ মন ভরাতে চলে গেলাম পূর্বকথামত মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রধান ফটকের সামনেই নামিয়ে দিল ট্যাক্সি, তারপর ধীরে ধীরে এগুলাম জ্ঞানের রাজ্যের এ অনন্য অভ্যন্তরে। সেদিনের দেয়া কাগজে লেখা ভবন, তলা ও কামরা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলো না তেমন। দেখলাম কত সাধারণ সহাবস্থান বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন সংস্কৃতির, বিভিন্ন মাতৃভাষার ছাত্রদের মাঝে। একই কামরাকে চাদর টাঙিয়ে কয়েকজন মিলে ভাগ করে প্রত্যেকেই বানিয়ে নিল নিজস্ব পরিমণ্ডল। এভাবেই চলছে তাদের শান্ত-নিরব জ্ঞানচর্চা। যেহেতু এখানে নেই আমাদের দেশের মত ঘৃণ্য রাজনীতির কালো থাবা, নেই হল দখলের উন্মাদনা, নেই এমনকি রাজতন্ত্রেরও তেমন কোন প্রভাব, সেহেতু এখানে বাকী আছে শুধুই শিক্ষা-জ্ঞান-আলো।

ছাত্র বড়ভাই আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন বিভিন্ন ভবনগুলো, বিকেল ছিল বলে ছাত্ররা সবাই হারামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রতিদিনই আসরের পরে ভার্সিটির বাসে করে ছাত্ররা চলে আসে হারামে, এখানে এসে মসজিদুন্‌ নববীতে সালাত আদায় এবং মসজিদে অবস্থিত দু’টি গ্রন্থাগার থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় অধ্যয়ন ও নোট সেরে নেয়। মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখাটা খুব বেশী স্থায়ীত্ব পেল না, বাসের সময় হওয়াতে চলে আসতে হলো যদিও পথটা খুব একটা বেশী নয় মসজিদুল নববী থেকে। পথে নানা কথায় একজন আলেমের আচরণে মুগ্ধ হচ্ছিলাম, যিনি এখন মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে কর্মরত আছেন। (বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে পরে বিস্তারিত লিখবো ইনশাআল্লাহ্‌)

আজ আর কোথাও বেরুইনি, মাগরিব ও এশা পড়ে হৃদয়ের স্পন্দনসম রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় মসজিদ, জান্নাতের বাগান, রাসূলের মিম্বার, মেহ্‌রাব, কবর, সাহাবাদের ‘আসহাবে সুফ্‌ফা’ বাবুস্‌ সালাম, বর্তমান মেহ্‌রাবসহ আভ্যন্তরটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর মনে মনে ব্যথিত হচ্ছিলাম; আগামী কালই আমার মদীনার শেষ দিন, জানিনা আবার কবে কখন ফিরে আসতে পারবো। অশ্রুগুলো দু’চোখের বাঁধ ভাঙ্গতে চায় বারে বারে, চাপা কষ্টে রুখে দেই, ইনশাআল্লাহ্‌ আমি মদীনায় ফিরে আসবোই। কতই তো মনে মনে স্বপ্ন এঁকেছি এ ক’দিনে, এখানে ওখানে বলেছিও অনেক- যদি একটা কাজ পেতাম মদীনায়। অল্প বয়স, তদুপরি অপরিচিত পরিবেশ, অথচ এক মহাবিশ্ব আবেগ নিয়ে মাঝে মাঝে খুবই অসহায় লাগছিল নিজেকে। নিমগ্ন জলের ভেতর থেকে ক্ষীণ বুদবুদগুলো আর কতটাই বা দৃষ্টি কাড়ে দর্শকের, হারিয়ে যায় মৃদুমন্দ বাতাসে।

বাসায় ফিরে এলাম যখন তখন রাতের অনেকটা পেরিয়ে গেছে, নিরবে বিছানা নিলাম, ঘুম গুলো যেন সব অশ্রু হয়ে গেছে আজ রাতে। নিরবেই উঠে তুলে নিলাম কাগজ-কলম। লিখলাম ছোট্ট একটা চিরকুট, এখানেই রেখে যাব উষ্ণ আবেগগুলো, যদি এ আবেগের বীজ থেকে কখনো জন্ম নেয় আমার স্বপ্নের চারা, যদি হয়ে যায় আমার মদীনায় বসবাসের কোন সুব্যবস্থা। আরো নিরবে প্রভূকে বলেছিলাম- ‘হে প্রভূ! বেঁচে থাকার জন্য তো পৃথিবীর কোথাও না কোথাও আমাকে থাকতেই হবে, যেহেতু জন্মভূমি থেকে বের করে এতদূর নিয়ে এসেছেন তবে কেন থাকতে দিবেন না আপনার প্রিয় হাবীবের শহর মদীনায়?’ (মনের ভাষায়) বেদনায়, ক্লান্তিতে, আবেগে একসময় হারিয়ে গেলাম স্বপ্নের রঙীন জগতে, যেখানে পৃথিবীর বস্তুদের কোন স্থান নেই, শুধুই অপার্থিবতায় ভরপুর। (চলবে)

পর্বগুলো:

 

তলা‘আল
বাদরু ‘আলাইনা: পূর্ণিমার আলোকে আলোকিত হৃদয়

তলা‘আল
বাদরু ‘আলাইনা: প্রথম সফর

তলা'আল
বাদরু 'আলাইনা: দু'টি প্রহর এবং একটি ভোর

তলা'আল বাদরু 'আলাইনা: প্রথম জুম‘আ ও স্বদেশীর ভিড়ে

তলা'আল বাদরু 'আলাইনা: জান্নাতের বাগান এবং পথ দর্শনে

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

পাঁচ তারা।

-

"এই হলো মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।" [আলে-ইমরান: ১৩৮]

জাযাকুমুল্লাহ্ খাইরান।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

চলতে থাকুক।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)