আর একটি বিচার এবং একটি নেশার বিনাশ.......

বাজার, পত্রিকা, অফিস আদালত, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়ের আড্ডা গুলোয় এখন তমুল আলোচনা সমালোচনার সাইক্লোন বইছে। মানুষ বুঝে হোক আর না বুঝে হোক মুখে মুখে কথার খই ফুটিয়ে চলেছে, বিষয় একটাই ..........যুদ্ধপরাধীর বিচার।
খুবই ভালো কথা।   দেশের কলংক মোচন হবে, স্বাধিনতা অর্থবহ হবে। বিচার হতেই হবে। কেন হতে হবে, সে বিষয়ে একটু পরে আসছি।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হয়েছে, হয়ত ভবিষ্যতেও হবে, তবে আমাদের দেশে হতে বাধা কোথায় ??
যে বা যারা অপরাধ করেছে, গোপনেই হোক আর প্রকাশ্যেই হোক, তার প্রাপ্য শাস্তি তাকে পেতেই হবে। এইটাই দুনিয়ার রীতি। এইটাই আইনের শাসন। 
বাংলাদেশের সেই দু:সময়ের কালবাসীরা( অর্থাত ঐ সময়ের মানুষ) এর জলন্ত সাক্ষী, মানবতার বিরুদ্ধে কি ভয়ংকর অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল, লক্ষাধিক বাড়ি-ঘর জালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, হাযার হাযার মা-বোনের( ইচ্ছে করেই লক্ষ-লক্ষ শব্দটা ইউজ করলাম না, কারন বর্তমানে একশ্রেনীর পরজীবি লেখক যে অংকটা ব্যবহার করেন, তাতে আমার আপনার মা-বোন কিন্ত কেউই নিরাপদ থাকেন না। আমি জানি আমার মা-খালা-চাচি-ফুপু সহ পরিবারের অর্ধশতাধিক মহিলাকে যারা কেউই ঐ রুপ বর্বরতার শিকার হন নাই। কিন্তু অংকটা স্বীকার করলে কিন্তু তারা গানিতিক হিসেবে আর নিরাপদ থাকেন না । কাজেই আমি জেনে বুঝে তাদের উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ কড়তে পারি না । অবশ্য কমেন্ট কারী গন আমার সাথে দ্বীমত পোষন করতে পারেন তাদের নিজ নিজ পরিবার গত উপাত্তের ভিত্তিতে, সে অধিকার তাদের আছে)  ইজ্জত হরন করা হয়েছিল, অযুত-কোটি টাকার পরিমান লুটপাট চলেছিল ইত্যাদি ইত্যাদি।

যারা ঐ সব অপরাধ করেছিল তাদের যেমন অনেকেই জীবিত আছে, তেমনি যারা ঐ সবের শিকার তাদেরও অনেকেই জীবিত আছেন। আছে অনেক প্রামান্য সাক্ষ্য। আছে দেশ বিদেশের পত্র পত্রিকার রিপোর্ট। তাহলে বিচার করতে হলে সেই সব সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে যারা অপরাধি, খুব সহজেই সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ ভাবে তাদের  বিচার করা যায়, এ কথায় কোন সন্দেহ নাই। কাজেই যারা বলেন যে এত বছর পরে সুষ্ঠ বিচার করা যাবে না তাদের সাথে আমি কোন ভাবেই একমত নই। কোন ভাবেই না। 
কিন্তু নিরপেক্ষতা ??
সন্দেহটা আর দশ-বিশ জনের মত আমারও হয়। বিষেশ করে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কার্যকলাপ এবং তার মন্ত্রী আমত্যবর্গের বক্তব্য বিবৃতি থেকে।
দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, একজন আইনের ছাত্র হিসেবে খুব সচেতন ভাবেই এবং খুবই আগ্রহ নিয়ে খবরের রিপোর্ট গুলো পড়ে থাকি। বিচার পক্রিয়া এবং এর সংশ্লিষ্ট সব কিছুই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ি, বোঝার চেষ্টা করি। আর তখনই সন্দেহটা দানা বেধে উঠে।
বিচার টা কি নিরপেক্ষ হবে??? ( সন্দেহটা  কিন্তু নিরপেক্ষ ভাবে করা যাবে কিনা, সেটা নয়। বরং নিরপেক্ষ হবে কিনা, সেটাতে।)

গত কয়দিন আগে আইন মন্ত্রী মহোদয় আইনজীবি প্যানেল, বিচারক এবং তদন্তকারী সংস্থার নাম ঘোষনা করেছেন। সে হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিচার পক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তদন্তকারী সংস্থা এবার তদন্ত শুরু করবে, সাক্ষ-প্রমান সংগ্রহ করবে তারপর আদালতে সেগুলো হাজির করবে, আদালত সেই সাক্ষ-প্রমানের ভিত্তিতে রায় দেবেন, এই ভাবেই বিচার শেষ হবে।
কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থার নিয়োগের অনেক আগে থেকেই একটি পরজীবি টাইপ স্বখেতাবী সংগঠন কোন রকম বেবেক বুদ্ধির ধার না ধেরে, নুন্যতম কান্ডগ্যানের তোয়াক্কা না করে নিজেদের খায়েশ( এবং তা অবশ্যই রাজনৈতিক) মত বিপক্ষ মতের কিছু মানুষের নামের একটা তালিকা ছাপিয়ে দিলেন। আর সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী আমত্যবর্গ ও কোন রুপ নীতি নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে সেই লিষ্টের লোকদের একেবারে ফাসি পর্যণ্ত দিয়ে ফেললেন।

তো, তদন্তের আগেই অপারাধীর লিষ্ট, বিচারের আগেই তার ফলাফল ঘোষনা (তাও আবার সাধারন মানুষেরা নয়, খোদ  মন্ত্রী মিনিষ্টার কতৃক) হলে আর ঐ সব আনুষ্ঠানিকতার কি দরকার ছিল??

আবার সরকারের একেক জন একেক সময় একেক রকম কথা বলে বিষয়টিকে আরো বেশি সন্দেহযুক্ত করে তুলেছে। এক মন্ত্রী বলেন যে যুদ্ধপরাধীর বিচার হবে, তো আরেক মন্ত্রী বলেন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার, তো আবার প্রধানমন্ত্রী বলেন যুদ্ধপরাধীর বিচার........আবার আইনমন্ত্রী ..........মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার.......আবার আরেক মন্ত্রী বলেন জামাত শিবিরের বিচার.......ইত্যকার কথা বার্তায় সরকার যে কি করবে বা করতে চায় তাই পরিষ্কার নয়।

[এ প্রসংগে একটি কথা, সরকার যদি আসলে জামাত শিবির কে সায়েস্তা করতে চায়, তাদের সমুলে বিনাষ করতে চায় তাহলে তাদের সে কথাটা পরিষ্কার করে বলা উচিত। এতো রাখঢাকের কি আছে। যে সরকারের পিছনে দেশের ৮৫% এর বেশী( সংসদের আসন হিসেবে)  জনগনের সমর্থন আছে তাদের এত কিসের ভয়?? মাত্র ০.৬% সমর্থন ধারীদের ধংস করতে কেন এত ভনিতা?? আর জামাত- শিবির কে উতখাত করবেন এই কথাটা ইশতেহারে কেন রাখলেন না ?? কেন নির্বাচনের আগে জনগনের কাছে এর ম্যান্ডেট চাইলেন না???  ]

এবার আসি লিষ্টের প্রসংগে।
লিষ্টের অন্তত ৮/১০ জনের বয়স ১২ বছরের নিচে, ২/১ জনের তো ৩-৪ বছর। এখন প্রশ্ন হলো একজন ১০ বারো( ৩-৪ বছর!!) বছরের ছেলে কিভাবে অগনিত নারী ধর্ষন, ঘরবাড়ি জ্বলাতে পারলো সেটা কি কেউ ভেবে দেখেছেন?? অথবা নিজে না হয় নাই করলো, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় বয়সের রাজাকারদের সে ওর্ডার করলো আর তারা ৩-৪ বছরের একটা বাচ্চার নির্দেশ মত খুন ধর্সন শুরু করে দিল। কোন সুস্থ মানুষের মাথা কি এ ধরনের কথা চিন্তাও করতে পারে ???

লিষ্টে যাদের নাম এসেছে তাদের প্রায় সবাই জামাত-শিবিরের সাথে জড়িত আর না হয় বি এন পি'র সাথে। প্রশ্ন হলো দেশের মানুষ কি এইটা বিশ্বাষ করে যে আওয়ামিলীগে একটাও যুধপরাধী নাই??( যেখানে মুজিবের আমলে, তারই আইনে, তারই সময়ে অপরাধী প্রমান হওয়া ২/১ জন সরকারের মন্ত্রী সভাতেও স্থান পেয়েছে বা পেয়েছিল??)

এবার আসুন নিয়োগ কৃত বিচারক, কর্মকর্তাদের বিসয়ে।

দেশে কি এমন ১০ জনও নিরপেক্ষ বা সবার কাছে গ্রহন যোগ্য আইন জীবি খুজে পাওয়া যাই নাই ??? দেশে কি প্রথিতযশা আইন জীবির এতই অভাব পরে গেল যে দলের নির্লজ্জ চাটুকার দিয়ে আইনজীবি প্যানেল বানাতে হবে???
বিচারক দের ব্যাপারেও সেই একই কথা?? দলের চুরান্ত  আস্থাভাজন লোক ছাড়া কি দেশে কোন নিরপেক্ষ বা সবার কাছে গ্রহন যোগ্য বিচার পতি ছিল না বা নাই ???

সরকারের কাছে প্রশ্ন, তাহলে কেন তাদের খুজে পেলেন না ??? নাকি তাতে ভয় আছে, রিস্ক আছে??? কিসের সেই ভয় ?? ভ্য় কি এটাই, যদি বিচার আইনের শাষন মত হয়?? রিস্ক কি এটাই, না জানি বিচারটা সত্যিই  নিরপেক্ষ হয়ে যায় ???
আর সে জন্যই এমন লোকগুলোকে রিক্রট করেছেন যারা বিচার করবে আইনের পাতা থেকে নয়, বরং অদৃশ্যের অংগুলী হেলনে??  এমন লোক নিয়োগ দিয়েছেন যারা শুনবে শুধু বাদীর কথা, বিবাদীর নয়। যারা বিচারকের আসনে বসে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার  চেষ্টা করবে না বরং করবে দলের ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত ??

যদি তাই না হবে, তবে জবাব কি দেবেন সরকার ???

কোন কোন  কারন বা যুক্তির বলে বলবেন এ সব সত্তেও নিরপেক্ষ বিচার হবে ??? আর খোড়া যুক্তি দিয়ে, গোজামিল দিয়ে বিরোধীদের ধংস করে বলবেন নিরপেক্ষ বিচার করলাম, আর জনগন সেটাই মেনে নেবে এটাই বা আপনাদের কে বলেছে???
২৬০ টা আসন পেয়ে ( যদিও তা ব্যাপক প্রশ্নবোধক) যদি মনে করেন ৮৫% মানুষ আপনাদের পিছে আছে, তাহলে মনে হয় বড়ই ভুল হিসেব কষেছেন।  আর মানুষ কিন্ত আপনাদের নির্বাচনী ইশতেহারের সব গুলো কথা ইতিমধ্যয়েই ভুলে যায়নি, আর আগামি ৪ বছরেও রে ভুলে যাবে তেমন আশা করাও কিন্তু বোকার সর্গে বাস কারার মতই হবে ।

এবার শেষ করব সেই কথা দিয়ে যেটা শুরুতেই বলেছিলাম, কেন বিচার টা জরুরী।

এই একটা মাত্র ইস্যু যা নিয়ে এখন আমাদের রাজনৈতিক অংগনে ব্যাপক লাভজনক বানিজ্য চলছে। মানুসের অযুত-কোটি সমস্যা, দু:ক্ষ বেদনা, হতাশা কে এই একটা ঘুমের বড়ি (নেশা) খাইয়ে  ভুলিয়ে রাখা হয়েছে। দেশের সব অপকর্ম, সমস্যা, ব্যর্থতার পিছনে এই একটি ইস্যুকেই মলম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বাধীনতার প্রতি মহান ভালবাসা আর আবেগ কে পুজি করে মানুষের অধিকার হরন করা হচ্ছে, বন্চিত করা হচ্ছে নুন্যতম মানবিক চাহিদা আর দাবিদাওয়া থেকে ।

আমরা এর অবসান চাই । আমরা আর ঘুমের বড়ি খয়ে বেহুশ  থাকতে চাই না । আমরা হুশে আসতে চাই । যুদ্ধপরাধীর বিচার টা হয়ে গেলে নেতাদের হাতে সেই ঘুমের বড়িটা আর থাকবে না । তখন আর সব অপকর্ম, সমস্যা, ব্যর্থতার পিছনে যুদ্ধপরাধ, স্বাধিনতার বিপক্ষ শক্তির জুজু দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন করা যাবে না ।

তখন মানুষ তার অধিকার হরিত হলে খুজে বের করবে এর হোতা কে। চিনতে শিখবে কে বা কারা তাদের বিশ্বাস আর ভালবাসা কে পুজি করে বানিজ্য করেছে। আর যখন জনতা জেগে উঠবে, তাদের ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা সেই রাজনিতিক দানবদের  টুটি ছিড়ে, তার রক্তে এই বাংলার সব  বন্চনা হতাশা আর ব্যর্থতাকে ধুয়ে মুছে শেষ করে দেবে। আনবে স্বাধীনতার সপ্ন মাখা সুদিন ।

সেই সু দিনটি আনার জন্যই এই নেশার বিনাশ চাই......... যুদ্ধপরাধীর বিচার চাই।


( আমি লেখক নই, তদুপরি লেখাটি ইউনি লাইব্রেরীতে বসে খুব দ্রুত  লেখা, তাই  অগোছালো এবং সাহিত্যক মানে অনুর্ত্তিন । কাজেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি পাবার আশা রইল।)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

তাই নাকি? মানুষ আসলেও যুদ্ধপরাধীর বিচারের ব্যাপারে সচেতন? আমার ধারণা ছিল দেশের বেশির ভাগ মানুষ এ ব্যাপারে কেয়ার করে না। কারণ স্বভাবতই মানুষের সামনে তার নিজের প্রয়োজনগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়।

সচেতনতা ঠিক সেই অর্থে নেই । কিন্তু মানুস বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক এটা নিয়া কথা বার্তা বলছে । আর লেখ্টাও ঠিক বিসর্গের জন্য লিখা হয় নাই , লিখেছিলাম অন্য  একটা ব্লগে। পড়াশুনা নিয়ে বাস্ত , তাই কপি পেস্ট করে চালিয়ে দিয়েছি।

-

Arif_Islam

যুক্তরাষ্ট্রের হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট

যুদ্ধাপরাধের ইস্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশে অপব্যবহারের আশঙ্কা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতি প্রণয়নে সহায়তাকারী
বৃহত্তম গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন বলেছে, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের
যুদ্ধাপরাধের ইস্যুকে সহজেই সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশে অপব্যবহার করার
ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। ইস্যুটিকে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে
ইসলামীকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশের সমাজে সীমিত সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করে গত
১৫ মার্চ প্রকাশিত ফাউন্ডেশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, জাতীয় ঐকমত্য বা
সমঝোতা প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়ার বদলে বিষয়টিকে প্রধানত জামায়াতের ওপর
দোষ ও দুর্নাম চাপানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিচারের সমর্থকরাও
একে জামায়াতকে ঘায়েল করার এবং জনগণের ওপর দলটির প্রভাব কমিয়ে আনার অস্ত্র
বানিয়েছেন। জামায়াতকে দমন বা বেআইনি করার জন্য কোন কোর্টকে ব্যবহার করা
ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ এবং
সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতাসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত
মূল্যায়নও করেছে। রিপোর্টে বাংলাদেশকে বিশ্বের ‘তৃতীয় মুসলিম প্রধান
রাষ্ট্র' হিসেবে উল্লেখ করে ইসলামী সংগঠনগুলোর মূল্যায়ন করা হয়েছে। ইসলামী
জঙ্গিদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডের উদাহরণ হিসেবে রিপোর্টে দুটি প্রধান
ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে: ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের বোমা বিস্ফোরণ এবং ২০০৫
সালের ২৯ নবেম্বর গাজীপুর আদালতে বোমা ফাটিয়ে নয়জনের হত্যাকান্ড। সেনা
সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের মার্চে জেএমবির ছয়জন নেতাকে ফাঁসী
দিয়েছে জানালেও রিপোর্টে অবশ্য উল্লেখ করা হয়নি যে, এদের প্রত্যেককে
গ্রেফতার করেছিল বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। তাদের
ফাঁসীর রায়ও জোট সরকারের আমলেই হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সে রায় শুধু
কার্যকর করেছে মাত্র।
তার রিপোর্টে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন বলেছে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে
পুরনো ও বৃহত্তম ইসলামী সংগঠন। জনগণের মধ্যে এর শিকড় রয়েছে অনেক গভীর
পর্যন্ত। ১৯৯১ সালে নতুন করে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার
পর থেকে প্রতিটি সংসদে জামায়াত প্রতিনিধিত্ব করে আসছে- যদিও ২০০৮ সালের
নির্বাচনে দলটি মাত্র দুটি আসনে জয়ী হয়েছে। রিপোর্টের মতে, দলটি সংখ্যায়
বেশি সিট না পেলেও ২০০১ সালের তুলনায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটির
প্রার্থীরা অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন। সংসদে আসন বাড়েনি সত্য কিন্তু জনগণের
মধ্যে দলটির সমর্থন অনেক বেড়ে চলেছে। জামায়াত সম্পর্কে হেরিটেজ
ফাউন্ডেশনের অভিমত, মাত্র ছয় থেকে আট শতাংশ ভোট পেলেও দলটিকে বাংলাদেশের
রাজনীতিতে ‘কিং মেকার' হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের রিপোর্টে জামায়াতের দুটি বাধা বা প্রতিবন্ধকের উল্লেখ
রয়েছে। একটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা, দ্বিতীয়টি বিএনপির
সঙ্গে সম্পর্ক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয় জামায়াতের
অবস্থানকেও দুর্বল করেছে বলে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন মনে করে। রিপোর্টে বলা
হয়েছে, আওয়ামী লীগসহ জামায়াত বিরোধীরা দলটির স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকে
গণহত্যার সঙ্গে একাকার করে ফেলেছে এবং গণহত্যার জন্য দলটিকে দায়ী করেছে।
আওয়ামী লীগ ও তার বামপন্থী সহযোগীদের ‘মন জয় করার উদ্দেশ্য থেকে' ২০০৭-০৮
সালের সেনাসমর্থিত সরকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
প্রসঙ্গটিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে এসেছে। জামায়াত এবং ইসলামিস্টদের
প্রসঙ্গে তদানিন্তন সেনা কর্তৃপক্ষরা ভিন্ন চিন্তা করে। কিন্তু জামায়াতের
প্রশ্নে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট পারঙ্গমতা
দেখিয়েছেন। পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নানা ধরনের
পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালানোর মাধ্যমে সময় পার করে দেয়ার পর শেষ পর্যন্ত তারা
আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে সামনে নিয়ে এসেছেন।
সেনাসমর্থিত সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নটিকে ভাসিয়ে রেখে যাওয়ায়
আওয়ামী লীগ সরকার তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করার
ব্যাপারে সুবিধাজনক অবস্থা পেয়েছে।
রিপোর্টে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
প্রশ্নে বাংলাদেশের সমাজে সীমিত সমর্থন রয়েছে। কিন্তু বিষয়টিকে জাতীয়
ঐকমত্য বা সমঝোতা প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়ার বদলে বিষয়টিকে জামায়াতের
ওপর দোষ ও দুর্নাম চাপানোর কৌশল হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এই
প্রয়াস ও কৌশল ভুল ও ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। রিপোর্টে বলা হয়েছে,
জামায়াত বাংলাদেশের সমাজ ও সরকার ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের পথে পরিবর্তন
ঘটানোর চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে। আদালতের রায় বা কার্যক্রম জামায়াতকে
সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে সত্য, তবে দলটি তার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ও
পরিকল্পনা থেকে সামান্যও বিচ্যুত হবে বলে মনে হয় না। ধর্মনিরপেক্ষ দল
হিসেবে নিজের ঢোল পেটাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ মুসলিম ভোটারদের কাছে থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এজন্যই ২০০৭ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের প্রাক্কালে
আওয়ামী লীগকে জামায়াতের তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র ও বেশি উগ্রপন্থী দল ইসলামী
ঐক্যজোটের সঙ্গে মৈত্রী করতে হয়েছিল।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এই রিপোর্টের উপসংহারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্যের
পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন সরকারের উদ্দেশে কিছু পরামর্শও
রয়েছে। এরকম একটি পরামর্শ হলো, স্বল্পমেয়াদী বা সাময়িক লাভের জন্য
উগ্রপন্থার বিষয়টির রাজনীতিকীকরণ করা বা একে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল
করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত হবে না। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের
ইস্যুটিকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হলে নানামুখী সংকট
কাটিয়ে ওঠার এবং জাতীয় সমঝোতা প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা এখনো পেছনে পড়ে আছে সে
চেষ্টা আরো বাধাগ্রস্ত হবে। মার্কিন সরকারের উচিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ
ইস্যুগুলো নিয়ে খোলামেলা বিতর্ক করার জন্য বাংলাদেশকে উৎসাহিত করা এবং
সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থোদ্ধারের জন্য বিশেষ কোনো ইস্যুকে ব্যবহার করার
ব্যাপারে দলগুলোকে নিরুৎসাহিত করা।
রিপোর্টের দ্বিতীয় মন্তব্য হলো, বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় বিরাট
শূন্যতা রয়েছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী গণতন্ত্রীরাও বাংলাদেশের বিচার
ব্যবস্থায় আস্থা রাখেন না। স্থায়ী বা টেকসই ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের
পরিবর্তে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
ব্যাপকভাবেই ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে বিকশিত হয়েছে।
ধারাবাহিক ও সঙ্গতিপূর্ণ আইন ও ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার ব্যবস্থার ভিত্তিতে
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিকশিত করে স্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থায় পরিণত
করাটা এখনো বাংলাদেশের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
তৃতীয়ত, কেবল অপরাধ কিংবা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মতবাদ হিসেবে দেখার
পরিবর্তে বাংলাদেশের দরকার উগ্রপন্থাকে ওই দুইয়ের সমন্বিত রূপ হিসেবে
দেখা। বাংলাদেশের দরকার উগ্রপন্থাকে ফৌজদারি অপরাধের চাইতে বেশি গুরুত্ব
দিয়ে তার মোকাবিলা করা। না হলে জঙ্গি বিরোধী কোনো চেষ্টাই সফল হবে না।
যেমন প্রধান নেতাদের ফাঁসী দেয়ার পরও জেএমবির কাজ কোন না কোন পর্যায়ে এখনো
অব্যাহত রয়েছে। সংগঠনকে নির্মূল করার পাশাপাশি সরকারের উচিত অন্যান্য
সংগঠন ও ব্যক্তির সঙ্গে জেএমবির মতাদর্শগত যোগাযোগ বা সাংগঠনিক যোগসূত্র
খুঁজে বের করা এবং এর বিকাশকে প্রতিহত করা, যাতে উগ্রপন্থা ছড়িয়ে না পড়তে
পারে।
আরো কিছু বিষয়েও মন্তব্য ও পরামর্শ দিয়েছে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। কিন্তু
সবকিছুর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে যুদ্ধাপরাধের আড়াল নিয়ে জামায়াতে
ইসলামীকে ঘায়েল করার বিষয়টি। রিপোর্টে প্রায় প্রত্যক্ষভাবেই অমন চেষ্টার
বিরোধিতা করা হয়েছে। বাংলাদেশকে বিশ্বের ‘তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম প্রধান
রাষ্ট্র' হিসেবে এবং জামায়াতে ইসলামীকে দেশের ‘সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম
ইসলামী রাজনৈতিক দল' হিসেবে উল্লেখ করাকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে
করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশ্লেষণে দেখা যাবে, ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদী
কর্মকান্ডকেই হেরিটেজ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে
চিহ্নিত করেছে। রিপোর্টে ব্যাখ্যাসহ একথারও উল্লেখ রয়েছে যে, জামায়াত
মোটেও হুমকি তো নয়ই, বরং সুযোগ পেলে দলটি ‘বিপ্লবী' ও ‘সুবিধাবাদী' ধারার
দলগুলোর জন্যও প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। জামায়াতের সে ভূমিকা মুসলমানদের
স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি একদিকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর
প্রক্রিয়ায় অবদান রাখবে, অন্যদিকে ইসলামের নামে বিশ্বব্যাপী চলমান
সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডকে প্রতিহত করতে সহায়ক হবে। নির্বাচন, জাতীয় সংসদ,
সরকার ও সংবিধানসহ বিদ্যমান আইন ও বিধি-বিধান মেনে চলে বলে এবং সরকারে অংশ
নেয় ও নেয়ার ইচ্ছা রাখে বলে জামায়াত কখনো গণতন্ত্রের জন্য বিপদজনক বা
প্রতিবন্ধক হতে পারে না। সব মিলিয়েই সম্ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে হেরিটেজ
ফাউন্ডেশন বলেছে, সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধের মতো দূর অতীতের
কোনো বিষয়কে উদ্দেশ্যমূলকভাবে টেনে আনার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য কল্যাণ
থাকতে পারে না।

thnx imran vai

-

Arif_Islam

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)