বিভ্রান্ত দল চেনার উপায়

ভূমিকা: বর্তমানে মুসলমানদের মাঝে আছে যেমন কয়েক ডজন ধর্মীয় ফেরকা-মাযহাব, তেমনি আছে নানা নামের নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, পীরের দরবার ও খানকা, সিলসিলা, আরো আছে নানান কিসিমের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সামরিক ও জঙ্গি সংগঠন। এদের মধ্যে কারা সত্যিকার ইসলামের অনুসরণ করছে, আর কারা দিকহারা হয়ে ইসলামের নামে অন্য কিছুর অনুসরণ করছে, তা বোঝার জন্য কিছু লক্ষণ বা আলামত জেনে রাখা ভাল। তবে প্রথমেই বলে নিচ্ছি, বিভ্রান্ত পথহারা দল চেনার উদ্দেশ্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা নয়, এমনটি করলে বরং ফেতনার আগুনেই ঘি ঢালা হবে এবং ইসলামের শত্রুদেরই নয়ন জুড়াবে। বিভ্রান্তদের চেনার উপায় জানার একমাত্র উদ্দেশ্য হল নিজেরা ঐ সমস্ত দলের সংসর্গ থেকে নিরাপদ থাকা- কোন দলের তরফ থেকে দাওয়াত পেলে যাতে এক নজর যাচাই করে নেয়া যায় সেটাই আমার এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের নাম ধরে গীবত না করে শুধু বিভ্রান্ত দল চেনার কতিপয় আলামত চিনিয়ে দেবার চেষ্টা করা হবে এ নিবন্ধে।
বিভ্রান্ত দলসমূহের অভিন্ন (common) ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:-
১। নেতার আনুগত্যে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার প্রদান
২। আল্লাহর নবী ছাড়া অন্য কাউকে বেশি হাইলাইট করা।
৩। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, অতিরিক্ত শিথিলতা ও অযাচিত শর্তারোপ।
৪। প্রয়োজনীয়/বেশি প্রয়োজনীয় বিষয়ের চেয়ে অপ্রয়োজনীয়/কম প্রয়োজনীয় বিষয়াদিতে বেশি জোর দেয়া।
৫। মাযহাব, উপদল, শ্রেণী বা সম্প্রদায়কে (মুসলিম) উম্মতের উপর প্রাধান্য দেয়া। ইসলামের সাথে সারনেম বা ট্যাগ যুক্ত করা।
৬। কোরআনের ফয়সালা মানতে অনীহা
৭। ব্যক্তিগত আক্রমণ
৮। তাকফির, তাহরিম ও গালিগালাজ
৯। হারামকে হালাল করবার প্রবণতা এবং নিজেদের অন্যায় অপকর্মের পক্ষে কোরআন-হাদীস থেকে দলীল অন্বেষণ করা।
১০। ধর্মের নামে অধর্মে লিপ্ত হওয়া
১০। অতিভক্তি ও বেয়াদবি
১১। বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঈমানদারদের চাইতে কাফেরদের দিকে বেশি ঝোঁকার প্রবণতা
১২। দ্বিমুখী নীতি
১৩। ন্যায়পরায়ণতার অভাব
১৪। সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত সত্যকে পাশ কাটানোর প্রবণতা
১৫। কুরআন অধ্যয়নকে নিরুতসাহিতকরণ
১৬। তথ্য বিকৃতি
১৭। ভোল পাল্টানো
১৭। সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ
১৮। প্রশ্নের সম্মুখীন হতে অনীহা এবং লুকোচুরি মনোভাব
১৯। ব্যক্তিগত বিষয়কে ধর্মের নামে চালানো
২০। দুনিয়া কামানোতে দ্বীনের ব্যবহার এবং ধর্মের নামে কৃত সংগ্রামে জৈবিক প্রণোদনা
২০। মূর্খতা ও অজ্ঞতা
২১। ধর্মীয় পরিভাষাগুলো সর্বদা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল উচ্চারণে করা।
২২। মিথ্যা কৃতিত্ব দাবি করার প্রবণতা
২৩। অন্যের উপর দায় চাপানো
২৪। আল্লাহর সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা
২৫। অপ্রয়োজনীয় শারীরিক খেদমত গ্রহণের প্রবণতা
২৬। দুর্বোধ্যতা ও রহস্যময়তা
২৭। ধর্ম নিয়ে ন্যাকামি ও হীনমন্যতা
২৮। মনগড়া বাহুল্য
২৯। থিউরিসর্বস্বতা ও গদবাঁধা বুলি (চরমপন্থী চেনার উপায়)

বর্ণনা:
১। নেতার আনুগত্যে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার প্রদান: কোন ব্যক্তি বা দল যদি আল্লাহ-রসূলের আনুগত্যের চেয়েও নেতার আনুগত্যের ব্যাপারে বেশি লেকচার দেয়, নেতার আনুগত্যের ফযীলত বেশি বয়ান করে; তাহলে বুঝতে হবে, আল্লাহর হুকুমের বাইরেও নিজেদের তরফ থেকে অতিরিক্ত কিছু হুকুম জারি ও তামিল করাবার মতলব আছে।
এসব দলের কর্মী-সমর্থক বা মুরীদরা যখন মানুষের সাথে আলাপে বসে, তখন তাদের মুখে কেবল নিজের নেতার গুণকীর্তন আর নিজের পীরের কেরামতি বর্ণনা ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। কোন কোন গোষ্ঠীর কথাবার্তা আবার শুধু পীরের গুণগানেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাদের প্রশংসার ধরন হয়ে থাকে বাড়াবাড়ি রকমের এবং ভক্তি প্রদর্শনের চিত্রটাও হয়ে থাকে দৃষ্টিকটু পর্যায়ের। এমনকি স্বয়ং পীর সাহেবের নির্দেশক্রমে বা অনুমতিক্রমে অনুসারীগণকে প্রকাশ্যে পীর সাহেবের কদম মোবারক নিয়ে তপস্যা করতে দেখা যায়। ইসলাম পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, একমাত্র আমার পীর কেবলাজানই আবার ইসলামকে পুনরুদ্ধার করে দুনিয়ার বুকে ফিরিয়ে এনেছেন- এমন একটা ধারণা দেবার চেষ্টা করে এসব গোঁড়া একপেশে বিভ্রান্ত দলের সদস্যরা। কোন কোন সময় ঝড়ে বক মরলেও ফকীরের কেরামতি জাহির করতে দেখা যায়। যেমন- কোন কোন পীরের মুরীদ সুদূর আমেরিকায় ঘূর্ণিঝড় হতে দেখলেও দাবি করে, আমাদের হুজুরের বদদোয়ায় এটি হয়েছে। অথচ তাদের পীর ও তারা মজলুমদের অন্তর্ভুক্তও নয়, আবার জালেমের বিরুদ্ধে সংগ্রামকারীদের অন্তর্ভুক্তও নয়। আল্লাহ যদি নিজস্ব আইন ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোন অবাধ্য ও জালেম সম্প্রদায়কে শাস্তি প্রদান করে থাকেন, সেখানে কোন অকর্মণ্য বিলাসী পীরের কেরামতি জাহির করবার কী আছে?
বাংলাদেশে ইসলামের নামে রাজনীতি করে এমন একটি বৃহৎ দলের সম্পর্কে শোনা যায়, দলটির শীর্ষ পর্যায় বা টপ লেভেল থেকে যে হুকুম দেয়া হয়, বটম লেভেলের নেতা-কর্মীরা হুবহু তা তামিল করে। কিন্তু এ সিস্টেমে যে বড় একটা ঝুঁকির দিক রয়েছে সেটা এদের কাছে উপেক্ষিতই থেকে যায়। কারণ, এরূপ কোন সংগঠনের 'প্রেতসিঙ্গা'-টা যদি একবার যার তার হাতে গিয়ে পড়ে, তাহলেই এদের পুরো শক্তিকে মিসগাইড করে বিপথে চালিত করা সম্ভব। বিশেষত শীর্ষ নেতাদের অবর্তমানে যখন আরো অধিক বিপথগামী কেউ দলটির হাল ধরে, তখন তাদের হঠকারিতা শুধু দল নয়, দেশ ও মুসলিম বিশ্বের জন্যও বিপদ বয়ে আনে।
কোন পীর, নেতা বা গুরুর হাতে বাইয়াত নিয়ে ধন্য হয়েছে এমন দলের সদস্যগণ তোতা পাখির মতন একটা মুখস্থ বুলি আওড়াতে থাকে যে, মুসলমান হতে হলে কোন না কোন নেতা থাকতেই হবে, কারো না কারো হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতেই হবে। তাদের কারো সামনে যদি ধর্মীয় কোন বিষয় আলোচনা করেন, আল্লাহর কোন আদেশ বা নিষেধ সম্পর্কে কথা বলেন, তখন সাথে সাথে তারা একটা প্রশ্নই করবে, "তোমার নেতা কে বা তোমার নেতা কৈ?" আপনাকে কোন বিষয়ে সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করতে দেখলে বা বাস্তব অবস্থা যুক্তিসহকারে তুলে ধরতে দেখলে আপনার উপর তারা শর্ত জুড়ে দেবে, আপনাকে হয় নেতা হতে হবে, অথবা কোন নেতার অনুসারী হতে হবে। কোন দলকে ভালো না লাগলে নিজেই একটা দল গঠন করতে হবে। আপনাকে যা কিছু বলার বা করার, সবই কোন না কোন নেতার পক্ষ থেকেই করতে হবে, কোন না কোন দলের হয়েই করতে হবে। দলের সাইনবোর্ড ধারণ না করে কোন কথা বলারই অধিকার আপনাকে দেবে না। আপনি কোরআন-হাদীস ও নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কোন বক্তব্য, যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করলে সেটা তারা কিছুতেই মেনে নিতে রাজি নয়, যদি না তা দলীয় প্যাডে ও নেতার সীল-স্বাক্ষর সহকারে হয়। তাদের বক্তব্য হলো, আমার যেহেতু নেতার সাইনবোর্ড আছে, তাই কথা বলার অথরিটি শুধু আমারই আছে- আমার কথা যৌক্তিক হোক চাই না হোক, আমার কথায় বাস্তবতা থাকুক বা না থাকুক। অপরদিকে তোমার যেহেতু কোন নেতার সাইনবোর্ড নেই, অতএব তোমার কথা বলার কোন অধিকারই নেই, তোমার কোন কথা কেউ শুনতেও বাধ্য নয়, তোমার কথার কোন গ্রহণযোগ্যতা বা validity-ই নেই- তোমার কথা যতই যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত হোক না কেন। তোমার বক্তব্য কোন নেতা বা দলের দ্বারা সত্যায়িত (attested) ও সনদপ্রাপ্ত (certified) না হওয়ায় তোমার কোন কথা কোরআন-হাদীস থেকে পেশ করা হয়ে থাকলেও তোমার কথায় অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে, তোমার উদ্ধৃত আয়াত বা পেশকৃত হাদীস আংশিক সত্য হতে পারে, কোরআনের অন্য কোথাও তোমার উদ্ধৃত আয়াতের বিপরীত বক্তব্যও থাকতে পারে; আবার সমাজের কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যাপারে আপনি যদি ভাল-মন্দ কোন মন্তব্য করেন, তাহলেও আপনার পর্যবেক্ষণ ভুল হতে পারে, আপনার চোখের দেখায় ভুল থাকতে পারে। অপরদিকে আমার যেহেতু দল আছে, নেতা আছে, আর নেতা মাত্রই যেহেতু জ্ঞানী-গুণী মানুষ; তাই তার (নেতার) বক্তব্যের সমর্থনে কোন দলীল যদি কোরআন-হাদীসে নাও থাকে, এমনকি তাঁর কথা যদি কোরআনে ঘোষিত স্পষ্ট ঘোষণার বিপরীতও হয়ে থাকে, তবুও তিনি নিশ্চয়ই সমগ্র কোরআন শরীফ বিচার-বিশ্লেষণ করেই তাঁর সিদ্ধান্ত বা মতামত পেশ করেছেন, অতএব এটা নিশ্চয়ই কোরআন-সুন্নাহ সম্মতই হয়ে থাকবে। বলাবাহুল্য, এগুলো আসলে মানুষের স্বাধীন মতামত ও মুক্তচিন্তাকে (প্রচলিত অর্থের মুক্তচিন্তা নয়, বরং সত্যিকার মুক্তচিন্তার কথাই বোঝাচ্ছি আমি) দাবিয়ে রাখার এবং নিজেদের অন্যায় পলিসি ও ভ্রান্ত চিন্তাধারাকে গায়ের জোরে মানুষের উপর চাপিয়ে দেবার বাহানা বৈ আর কিছু নয়। নেতার দোহাই দেয়াটা মূলত হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল এবং ন্যায়কে অন্যায় ও অন্যায়কে ন্যায়..
'বাইয়াত' ও 'খেলাফত' শব্দগুলো বর্তমানে ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে পড়ায় এন্টিভাইরাস দিয়ে Disinfect করে নেয়া জরুরী। অন্যথায় Spyware ও Trojan Horse সংক্রমণের (অর্থাৎ গুপ্তচর অনুপ্রবেশের) সুযোগ থেকেই যাবে। যেহেতু এগুলো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেহেতু এ বিষয়গুলো একেবারে স্থায়ীভাবে ডিলেট করবার বা বাদ দেবার সুযোগ নেই। তবে ভাইরাসমুক্ত ও নিরাপদ করার আগ পর্যন্ত এ প্রোগ্রামগুলোকে স্যান্ডবক্সে রেখে দেয়াই সমীচীন। অন্ততপক্ষে risk বর্তমান থাকা অবস্থায় run না করাই বাঞ্ছনীয়।
এসব দলগুলো নেতার কথা বা বড়দের কথা শোনার কি কি রকম ফযীলত আছে, অমান্য করাটা কি রকম পাপ- শুধু এ সম্পর্কেই আলোচনা করে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও যে থাকতে পারে, অর্থাৎ অন্ধভাবে বিনা বিচারে নেতা বা কারো আনুগত্য করাটাও যে কোন কোন ক্ষেত্রে বিপদের কারণ হয়ে থাকতে পারে, সে বিষয়টা এদের নজরে আসে না। পবিত্র কোরআনে জাহান্নামীদের দুর্দশা আলোচনা প্রসঙ্গে তাদের একটি স্বীকারোক্তি উল্লেখ করা হয়েছে, "আমরা আমাদের শায়খ ও মুরব্বীদের আনুগত্য করেছিলাম।" মূলত: অন্ধ অনুকরণ আর অন্ধ আনুগত্যই হচ্ছে জাহেলিয়াতের মূল ভিত্তি।
অন্ধ আনুগত্যের উদাহরণ হল, আপনি নিজে শারীরিকভাবে সুস্থ অনুভব করছেন, শরীরের কোথাও কোন জ্বালা, ব্যথা বা অশান্তি নেই, কিন্তু ডাক্তার আপনাকে চেকআপ করে বলল, আপনাকে এক্ষুণি সার্জারী করতে হবে, নইলে আপনার শরীরের অমুক স্থানের বিষটা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে- আপনি হার্টফেল করবেন, বা ক্যান্সার আক্রান্ত হবেন; আর একথা শুনে অমনি আপনি ঘাবড়ে গিয়ে সাথে সাথে ছুরি-কাচির নিচে যেতে রাজি হয়ে গেলেন। ঠিক একইভাবে আপনি নিজে কোরআনের সুস্পষ্ট আয়াত দেখে পড়লেন, আয়াতের বক্তব্য পরিস্কারভাবেই জানতে ও বুঝতে পারলেন, কিন্তু আপনি যাকে নিজের চেয়ে অধিক জ্ঞানী মনে করেন এমন কোন কথিত আলেম বা পীর সাহেব বললেন, এই আয়াতের অর্থ আসলে এই না বরং এই, আর অমনি আপনি নিজের পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি ও কমন সেন্সের (স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেচনার) বিপরীতে গিয়ে তার কথাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলেন। মূলত আত্মবিশ্বাসের অভাবই মানুষকে অন্ধভাবে পরের আনুগত্য করতে প্ররোচিত করে।
আমি যদি কোন নেতা বা ব্যক্তিবিশেষের আদেশ পালনে শতভাগ দায়বদ্ধ থাকি, তাহলে আমার শত্রুর পক্ষে আমাকে পরাজিত করা সহজ হবে। কারণ সে জানে, আমাকে বাগে নেয়ার জন্য আমার নেতাকে ম্যানেজ করাই যথেষ্ট। এই সুযোগ নিযে সে আমাকে দিয়ে তার যেকোন অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করে নিতে পারবে; যেমন- আমাকে আমার কর্তব্যকর্ম (যেমন দ্বীনের দাওয়াত ও মযলুমের হেফাজত) থেকে বিরত রাখা, আমার থেকে তার অন্যায়-অপকর্মে (যেমন আল্লাহর পথে মানুষকে বাধাদান ও নিরপরাধ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতনের কাজে) সহযোগিতা আদায় করা ইত্যাদি।
নেতা নির্বাচন ও নেতার আনুগত্য অবশ্যই জরুরী, কারণ যে যার মতন চলতে গেলে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু নেতার তাবেদারি করতে গিয়ে কোরআন-হাদীস, বিবেক-বুদ্ধি, ন্যায়-নীতিবোধ সব বিসর্জন দিতে হবে; সবকিছু বিচারের ভার নেতার হাতে ছেড়ে দিতে হবে, নেতাকেই সকল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বানিয়ে সকল ব্যাপারে নেতার ফয়সালাই অবনত মস্তকে মেনে নিতে হবে- এর কোন যুক্তি নেই। নেতার আনুগত্যের সপক্ষে যে আয়াতটি পেশ করা হয় তা হল, "তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের নেতার (আনুগত্য কর)। অতপর যদি তোমাদের মাঝে কোন মতভেদ দেখা দেয় (অর্থাত নেতার কোন আদেশ নিয়ে সন্দেহ বা খটকা লাগে), তখন তা আল্লাহ ও রসূলের কাছে সাবমিট কর।" অন্ধ আনুগত্যবাদীরা এই আয়াতের শুধু প্রথম অংশটুকুই quote করেন, আর দ্বিতীয় অংশটুকু উল্লেখই করেন না। নেতার আনুগত্যটা যে মূলত: আল্লাহর আনুগত্যের অধীন, এ কথাটি তারা চেপে যান। এ আয়াতটির শানে নুযুল যদি অন্ধ আনুগত্যবাদীরা জানত, তাহলে তারা হয় অন্ধ আনুগত্য করতই না, অথবা এ আয়াতের শানে নুযুল জানা লোকদের কাছে এ আয়াতটি উল্লেখই করত না। আয়াতটি নাযিলের প্রেক্ষাপট হল, হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা:) একবার তাঁর অধীনস্থ সাহাবীদের আনুগত্য পরীক্ষার জন্য আগুনে ঝাঁপ দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে রসূলুল্লাহ (সা:) এ কথা শুনে বলেছিলেন, তোমরা যদি তার কথামতো আগুনে ঝাঁপ দিতে, তাহলে চিরকাল আগুনেই থেকে যেতে।" ভেবে দেখুন, যেখানে স্বয়ং রসূলুল্লাহ (সা:)-এর সরাসরি মনোনীত একজন সেনাপতি বা দলনেতার আদেশ অন্ধভাবে পালনের ক্ষেত্রে এই বিধান হয়, তাহলে আমাদের বর্তমান যুগের নেতাগণ যাদের নির্বাচন বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ (সা:)-এর কোন সংশ্লিষ্টতাই নেই, তাদের আনুগত্যের ক্ষেত্রে কি মাসআলা হবে?
মানুষের মধ্যে যার সব আদেশ-নিষেধ আমাদের জন্য অবশ্যপালনীয় হবে, তাকে অবশ্যই আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি হতে হবে। যখন আল্লাহর নবী-রসূলগণ বর্তমান ছিলেন, তখন তাঁদের নিজ নিজ যুগ ও এলাকায় তাঁদের আওতাধীন মানুষদের জন্য তাঁদের সকল আদেশ-নিষেধ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ হিসেবেই গণ্য করা অবধারিত ছিল। আমরা যেহেতু শেষ নবীর (সা:) উম্মত, তাই আমাদের জন্য আমাদের নবী (সা:) যা যা বলে গেছেন, তা সবই কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের জন্য বিশ্বাস, ধারণ ও পালন করা অবশ্যকর্তব্য। নবী-রসূলগণের বাইরেও আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি থাকতে পারেন, আর আমাদের নবীর উম্মতগণের মধ্যে আমরা শুধু দু'জনের কথাই জানি, যারা ভবিষ্যতে কিয়ামতের পূর্বে আবির্ভূত হবেন- একজন হবেন ইমাম মাহদী, আরেকজন হবেন একজন সাবেক নবী [ঈসা (আ:)] যিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা:)-এর উম্মত হিসেবেই আসবেন একটি বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য। এখন আমাদের নবীজীর (সা:) প্রস্থানের পর এবং ইমাম মাহদীর আগমনের পূর্বে এই মধ্যবর্তী সময়টুকুতে আমরা আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি কোথায় পাব? যেহেতু আমাদের পক্ষে বর্তমানে আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি মনোনীত কাউকে লাভ করার সুযোগ নেই, তাই আমরা শুধু পারি আল্লাহ ও রসূলের নির্দেশনা ও মানদণ্ড অনুসারে নিজেরাই নেতা নির্বাচন করে নিতে কিংবা কেউ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে আল্লাহ ও রসূলের দেয়া কষ্টিপাথরে তাকে যাচাই করা সাপেক্ষে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে নিতে। কিন্তু তাঁদের হাতে কিছুতেই হুকুম জারির শতভাগ কর্তৃত্ব (authority) দেয়া যাবে না এবং ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে গণ্য করা যাবে না। ইসলামের প্রথম যুগের খলীফাগণ দায়িত্বভার গ্রহণের সময় বলেছিলেন, "আমাকে যতক্ষণ আল্লাহ ও রসূলের হুকুম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে দেখবে, ততক্ষণ আমার আনুগত্য করবে; এর ব্যতিক্রম দেখলে আমাকে শুধরে দেবে।" অন্ধ ও নি:শর্ত আনুগত্যের কোন দাবি তাঁরা করেননি- যেমনটি করে থাকে এখনকার যুগের নেতারা।
মানুষকে (অর্থাৎ নিজের অধীনস্থকে) আল্লাহর হুকুম পালন করানোই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এটা তো সরাসরি সুনির্দিষ্টভাবে আল্লাহর হুকুম উল্লেখ করেই পালন করানো সম্ভব। পিতা তার পুত্রকে বলতে পারেন, "বাবা, নামাযটা পড়ে নাও, কারণ নামাজ পড়া আল্লাহর হুকুম।" নেতা বা পীর তার অনুসারী বা মুরীদদের বলতে পারেন, "যাকাত দেয়া, কোরআন শিক্ষা করা আল্লাহর নির্দেশ, অতএব তোমরা সবাই কোরআন শিক্ষা কর, আর তোমাদের মধ্যেকার সামর্থ্যবানেরা যাকাত দাও। সুদ খেতে, অন্যায়ভাবে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন; অতএব তোমরা সুদ খেও না, দুর্নীতি করো না।" অর্থাৎ, আল্লাহ মানুষের উপর যেসব হুকুম জারি করেছেন, সেসব হুকুম তো এমনিতেই মানুষের জন্য অবশ্যপালনীয়; পিতামাতা বা নেতার জন্য তো এটুকুই যথেষ্ট যে, তারা আল্লাহ তাআলার যাবতীয় হুকুম-আহকামের কথা নিজ নিজ পোষ্য বা মুরীদগণকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। এর জন্য তো আলাদাভাবে নিজেদের অনুকূলে আল্লাহর তরফ থেকে প্রাপ্ত authorized letter প্রদর্শনের দরকার পড়ে না। আল্লাহর হুকুম অমান্য করাটা যে অপরাধ, একথা জানানোই তো যথেষ্ট। পিতামাতা বা নেতার হুকুম অমান্য করলে কি পাপ হবে, সেটা আলাদাভাবে উল্লেখ করার কী প্রয়োজন! আপনি যদি আপনার সন্তানকে বা কর্মী-সমর্থক-মুরীদ-অনুসারীগণকে কোরআন শিখতে উদ্বুদ্ধ করেন, সমগ্র কোরআন শিক্ষা দিতে পারেন, তাহলে তো কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী এমনিতেই তারা পিতামাতার হক, খলীফার হক, নেতার হক সব যথাযথভাবে আদায় করতে শিখবে। কিন্তু সব বাদ দিয়ে শুধু নিজের আনুগত্যের দিকে মানুষকে আহবান করাটা কি দ্বীন কায়েমের পরিবর্তে নিজের ব্যক্তিগত খাহেশাত পূরণের অভিপ্রায়ের বহি:প্রকাশ নয়? অবশ্য সন্তানেরা যদি বেয়াদবি ও দুর্ব্যবহার করে, কিংবা কর্মী বা প্রজারা যদি অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তখন তাদেরকে থামানোর জন্য আল্লাহর ভয় দেখানোটা সঙ্গত হবে।
যখন কোন বিষয়ের যথার্থতা বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন বা সংশয় দেখা যায়, তখন অনেককেই বলতে শুনবেন, অমুক পীর সাহেব এমনটি বলেছেন, বা অধিকাংশ পীরই এ কাজ করে থাকেন, অতএব কোন চিন্তা বা সমস্যার কারণ নেই। কিন্তু কথা হল, যে কাজটা শরীয়তবিরোধী, সে কাজটা সকল পীর সাহেব করে থাকলেও শরীয়তসম্মত হয়ে যাবে না। অনেক পীর সাহেবই ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কারণে কিংবা মানুষকে খুশি রাখতে গিয়ে মানুষের মনস্কামনা পূরণের তদবির হিসেবে মুরগীর বাচ্চা জীবন্ত তপ্ত করার মত পদ্ধতি গ্রহণ করেন, যা সুস্পষ্টতই শরীয়তবিরোধী। মক্কার কুরাইশরা যেমন বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে নিজেদের গোমরাহী আচরণের পক্ষে ওজর পেশ করত, ইহুদী-খ্রীস্টানরা যেমন পীর-পুরোহিতদেরকে নিজেদের রব বানিয়ে নিয়েছিল, তেমনি মুসলমানরাও অনেকে পীরদের কর্মকাণ্ডের রেফারেন্স দিয়ে অবৈধ কাজকে বৈধ ভেবে থাকে।
আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানকেই হকের মাপকাঠি বলে গণ্য করে এবং মুসলিম জনগণের উদ্দেশ্যে এই দাবি করে যে, কারো কোন কথা হক-বাতিল বা ইসলামিক-অনৈসলামিক যাচাই করতে হলে, কারো কথা গ্রহণ করতে হলে আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে- কোরআন-হাদীসের মানদণ্ড দিয়ে যাচাই করতে বা কোরআন-হাদীসের সাথে মিলিয়ে দেখে নিতে বলে না।
অন্ধ আনুগত্যকামীরা মুসলিম জনগণের উপর নিজেদের নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রয়োজনে কোরআনের অপব্যাখ্যা করে, হাদীস জাল করে। আবার তাদের অনুসারী তথা অন্ধ আনুগত্যবাদীরা জেনে বা না জেনে তাদের রচিত কথাই গ্রহণ ও প্রচার করে। আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে, "যার কোন পীর নাই, তার পীর শয়তান।" এটা মূলত পীরপ্রথা ও পুরোহিততন্ত্রকে টিকিয়ে রাখবার উদ্দেশ্যেই রচিত। আবার যদি কোথাও লেখা দেখেন, "যে যুগের ইমামকে চিনতে না পেরে মরল, সে কাফের হয়ে মরল", তাহলে বুঝবেন, এটা নিছক কোন নির্দিষ্ট পীর সাহেবকে যুগের ইমাম হিসেবে দাড় করানোর চাপাবাজি ছলনা বৈ কিছু নয়।
সবসময় যে অন্ধভাবে পরের আনুগত্য করলে চলে না, বরং কোন কোন সময় নিজের মাথাও খাটানোর প্রয়োজন হয়, এটা বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করুন, আপনার কোন অসুস্থতা নিয়ে যখন বিভিন্ন ডাক্তারের পরামর্শ চাইবেন, সার্জন কেবল সার্জারীর কথাই বলবেন; হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার বলবেন হোমিওপ্যাথিই এ রোগের একমাত্র...
সত্য ধর্ম ও সঠিক আকীদায় মানুষকে দীক্ষিত করবার জন্য কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রতি আকৃষ্ট করা বা অনুগত করার দরকার হয় না, বরং কেবল স্রষ্টা ও তাঁর পয়গম্বরের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করাই যথেষ্ট। পক্ষান্তরে ভ্রান্ত ধর্ম বা বাতিল আকীদায় মানুষকে দীক্ষিত করতে হলে মিথ্যার প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করাটা কঠিন বিধায় প্রথমে কোন ব্যক্তি বিশেষের মাহাত্ম্য তুলে ধরবার প্রয়োজন হয় এবং তারপর সেই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনার বীজ বপন করা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি ভাল ও শুভ শক্তির প্রতীক হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তার প্রতি অতিভক্তি দেখিয়ে অতিরঞ্জিত গুণকীর্তনের দ্বারা তাকে আল্লাহ বা নবীর স্তরে দাড় করানোর মাধ্যমে মানুষকে শেরেকীতে লিপ্ত করে ফেলার দ্বারা ঈমান নষ্ট করে দেয়া হয়। আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি মন্দ ও অশুভ তথা খল-প্রতারক কেউ হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তার আনুগত্য করানো, হুকুম পালন করানো ও তার প্রচারিত তত্ত্বকে গ্রহণ করানোর মাধ্যমে মানুষকে পথভ্রষ্ট করা হয়। ধর্মের নামে ভণ্ডামী ও বিকৃতি হোক, কিংবা ধর্মবিরোধী জাহেলী মতবাদ হোক, অথবা সামাজিক ও জাতীয় জীবনে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী প্রচারণাই হোক- এই সবগুলোর ক্ষেত্রেই প্রাথমিক ও মূল পদক্ষেপ হয়ে থাকে এগুলোর প্রবক্তা কোন ব্যক্তির প্রতি জনগণকে মোহগ্রস্থ করা এবং তার প্রতি মানুষের মনে বিশেষ ধরনের ভক্তি সঞ্চার করা। ভ্রান্ত আকীদার প্রচারটা হয়ে থাকে মূলত ব্যক্তির প্রচারের সাথে সাথে। মূলত ব্যক্তিপূজা আর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাই ভ্রান্ত মতবাদের মূল বাহন। অবশ্য সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নেতা এবং সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু ইসলামের সঠিক ও নির্ভেজাল আকীদা মানুষকে শিক্ষাদানের জন্য কোন ব্যক্তির প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন বা কারো কদম মোবারক চুম্বনের প্রয়োজন হয় না। শেরেক ও বাড়াবাড়িমুক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য বিবর্জিত আনুগত্যই ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যথেষ্ট।
কোন মানুষ বা জিন যদি সরাসরি নিজেকে খোদা বলে দাবি করে, কিংবা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর পরে অন্য কেউ যদি নবুয়তের দাবিদার হয়; এবং তাকে যারা সরাসরি খোদা বলে বা নবী বলে মান্য করে, তাহলে তারা নি:সন্দেহে কাফের হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু কেউ সরাসরি নিজেকে খোদা বা নবী বলে দাবি না করলেও যদি খোদার সমান মর্যাদা বা নবীর মত সম্মান পেতে চায়, নিজের আদেশ-নির্দেশকে খোদার হুকুমের মতই সর্বাবস্থায় বিনাপ্রশ্নে বিনা বাক্যব্যয়ে পালিত দেখতে চায়, মানুষের কাছে শর্তহীন আনুগত্য পেতে চায়; এবং তাকে যারা খোদার মত ভক্তি করবে ও নবীর মতন মান্য করবে, তার আদেশকে খোদার আদেশতুল্য গণ্য করে যারা অন্ধভাবে বিনা বিচারে শর্তহীনভাবে পালন করাটা ফরয মনে করবে, এককথায় তার প্রতি এমন পর্যায়ের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রদর্শন করবে যেটা কেবল আল্লাহর প্রতি বা নবীর প্রতি হবার কথা, তারা মুনাফিক বলে গণ্য হবে। মোটকথা, নেতার আনুগত্য মানেই আল্লাহর আনুগত্য, নেতার কথা মানলেই আল্লাহর কথা মানা হয়- এমন ধারণাকে প্রশ্রয় দেয়াটাই বিপথগামিতা ডেকে আনে।
এককথায়, কোন ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি এমন পর্যায়ের অনুগত (loyal) ও  নিবেদিত (dedicated) হওয়া, যার ফলে মানুষের কাছে আল্লাহর হুকুমের গুরুত্ব উপেক্ষিত হয়, কিংবা আল্লাহর হুকুমের গুরুত্ব বুঝলেও আল্লাহর হুকুম জানার উৎস হিসেবে শুধু নিজের পছন্দের নেতৃত্ব ও দলকেই যথেষ্ট মনে করা হয় এবং আল্লাহর হুকুম জানার মূল উৎস (তথা আল্লাহর কিতাব) থেকে নিজে আল্লাহর হুকুম জানা বা যাচাই করবার প্রয়োজনীয়তা অবহেলিত হয়, এ ধরনের অন্ধ আনুগত্য আর অন্ধ বিশ্বাসই মানুষকে বিপথগামীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে।

২। আল্লাহর নবী ছাড়া অন্য কাউকে বেশি হাইলাইট করা।
৩। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, অতিরিক্ত শিথিলতা ও অযাচিত শর্তারোপ। বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। মনে করুন, এক ব্যক্তি নামায পড়তে যাবে। কিন্তু সে এমন অসুস্থ যে, পানি স্পর্শ করলে জীবন সংশয় বা শারীরিক ক্ষতির আশংকা রয়েছে। এখন তাকে যদি বলা হয় যে, তোমাকে যেকোন মূল্যে ওযু-গোসলই করতে হবে, নইলে তোমার নামাযই হবে না, তাহলে এটা হলো অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির দৃষ্টান্ত। আবার যদি ঐ ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে থাকে এবং তার গোসল ফরয হয়ে থাকে, কিন্তু তাকে যদি কেউ বলে যে, অত কষ্ট করে অযু-গোসল করার দরকার নেই, আল্লাহ দয়ালু, আল্লাহ আমাদের জন্য সহজটাই পছন্দ করেন, অতএব তুমি এ অবস্থাতেই নামায পড়তে পার, তাতেই চলবে; তাহলে এটা হবে অতিরিক্ত শিথিলতার নিদর্শন। আবার যদি অবস্থা এমন হয় যে, ছে
"বলুনঃ হে আহলে কিতাবগন, তোমরা স্বীয় ধর্মে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না এবং এতে ঐ সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।" (সূরা মায়েদা: ৭৭)
৪। প্রয়োজনীয়/বেশি প্রয়োজনীয় বিষয়ের চেয়ে অপ্রয়োজনীয়/কম প্রয়োজনীয় বিষয়াদিতে বেশি জোর দেয়া; ফরজ বাদ দিয়ে নফল নিয়ে মেতে থাকা। আল্লাহর নির্দেশিত ফরয বিধান তথা নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত পালন করা, আল্লাহর নিষিদ্ধ হারাম কাজ তথা নিষ্ঠুরতা, অশ্লীলতা ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা, অন্যায় ও জুলুমের প্রতিবাদ করা, মজলুম ও দু:খী মানুষকে সহায়তা করা, ঈমান-আকীদা বিশুদ্ধ রাখা ইত্যাদি জরুরী বিষয়গুলো বাদ দিয়ে ওরস শরীফ, মিলাদ শরীফ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং 'মেসওয়াক করা ওযুর সুন্নত নাকি নামাযের সুন্নত', 'আল্লাহর নবী কি নূরের তৈরি নাকি মাটির তৈরি' ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিতর্কে মেতে থাকা। আসল কাজ থেকে ভুলিয়ে রাখা এবং আসল দায়িত্ব পালন থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই যে এসবের উদ্দেশ্য, এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
৫। মাযহাব, উপদল, শ্রেণী বা সম্প্রদায়কে (মুসলিম) উম্মতের উপর প্রাধান্য দেয়া। ইসলামের সাথে সারনেম বা ট্যাগ যুক্ত করা। অর্থাৎ, নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে মুসলিম পরিচয়কে যথেষ্ট মনে না করে কোন্‌ ধাঁচের বা কোন্‌ প্রজাতির মুসলিম, সেটা জোরেশোরে উল্লেখ করা। নিজেরা কোন্‌ টাইপের ইসলামের অনুসারী, কিরূপ মতাদর্শভিত্তিক ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটা খাস করে দেয়া। এককথায়, সামগ্রিকভাবে দ্বীন ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার চাইতে ইসলাম শব্দের আগেপিছে বিশেষণ যুক্ত করে ইসলামের কোন খণ্ডিত বা বিশেষায়িত ধারার প্রতিনিধিত্ব করতেই এরা অধিক স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। বিশেষ করে দলবাজি ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা যখন মুসলিম জাতির মধ্যে মহামারী আকার ধারণ করে, তখন তারা দল ও সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে কিছুই চিন্তা করতে পারে না; ধর্ম, রাজনীতি সবকিছুকেই দলীয়করণ করে ফেলে। তখন সমাজে এমন এক হাস্যকর প্রবণতা দেখা যায় যে, মসজিদের নামগুলোও দল বা সম্প্রদায়ের নামে নামকরণ করা হয়ে থাকে।
কোন কোন দল বা গোত্র আছে, 'সুন্নীয়ত' 'সুন্নীয়ত' করে সারাক্ষণ চিৎকার করলেও তারা মূলত শিয়া আকীদাই প্রচার করে থাকে। তাদের প্রতিটি কথাবার্তা ও ধ্যান-ধারণা অবিকল শিয়াদের প্রচারণা ও ভাবাদর্শেরই অনুলিপি। সুন্নীবাদের মোড়কে শিয়া মতাদর্শ প্রচারের দ্বারা একই সাথে সাম্প্রদায়িক বিভক্তি ও আকীদা বিনষ্ট করা দুটো উদ্দেশ্যই হাসিল হয়। অথচ নিজেদের আকীদা ঠিক রেখে সকলের সাথে শান্তি ও সমঝোতা বজায় রাখাটাই কল্যাণকর ছিল।

৬। কোরআনের ফয়সালা মানতে অনীহা: এরা কখনো কোরআনের কাছে হার মানে না। অর্থাৎ, কোরআনের ফয়সালার প্রেক্ষিতে নিজেদের নীতি বা মতামত পরিবর্তন করে না। বরং কোরআনের আয়াতকে কিভাবে ঘুরিয়ে পেচিয়ে ব্যাখ্যা করে নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয়া যায়, সে ব্যাপারেই এরা সিদ্ধহস্ত। এদের 'ইজতিহাদ' কোরআনের আয়াতকেও 'মনসুখ' করে দেয়।
কোরআনকে যারা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহারে অভ্যস্ত, তারা কোরআনের আয়াতের সরল বোধগম্য অর্থটি না নিয়ে নিজেদের মনমত একটা কিছু আবিষ্কার করে জুড়ে দেয়। যেমন- আমরা সবাই জানি, 'খতম' শব্দের অর্থ শেষ, তাই স্বভাবতই 'খাতামুন নাবিয়্যীন' অর্থ শেষ নবী হওয়াই স্বাভাবিক। এখন কেউ যদি এই সুস্পষ্ট অর্থটিকে পাশ কাটিয়ে বলতে থাকে, খতম বলতে এখানে শেষ বোঝানো হয়নি, কেবল সীলমোহর বোঝানো হয়েছে, তাহলে এটা নেহায়েত খামখেয়ালীপনাপূর্ণ মনগড়া কুযুক্তি হিসেবেই গণ্য হবে।
বিপথগামীদের স্বভাবই হল কোরআনের আয়াত তথা আল্লাহর হুকুমকে সহজভাবে মেনে নিতে না পারা। কোরআনের প্রতিটি term-কে তারা প্রকৃত অর্থে না নিয়ে এর ভিন্ন কোন অর্থ বের করে নেয়। এরা বলে, 'জিহাদ' বলতে কোন লড়াই-সংগ্রামের কথা বোঝানো হয়নি, বরং জিহাদ অর্থ চেষ্টা-সাধনা। আর এই চেষ্টা-সাধনা বলতে এসি রুমে চোখ বন্ধ করে বসে বসে ঝিমানো পর্যন্তই বোঝায়। কোরআনের আয়াত তথা আল্লাহর বাণীকে নিজেদের ইচ্ছামত মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে অস্বীকার করবার প্রবণতাকে যদি প্রশ্রয় দেয়া হয়, তাহলে এটা শুধু শরীয়তের দু'একটি বিধানকে অগ্রাহ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পর্যায়ক্রমে ইসলামের সকল বিধান এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিধানগুলোকেও প্রত্যাখ্যান করবার প্রবণতা তৈরি হয়। অধিকাংশ বিপথগামী দল যখন জিহাদকে অস্বীকার করবার ধারণাকে বিনা বাধায় প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলো এবং মুসলিম জনগণের মধ্য থেকে মোটামুটি একপ্রকার বাদ করে দিতে পারল, তখন দু'একটি বিপথগামী দলের মধ্যে শরীয়তের মূল বিধান নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতকে চ্যালেঞ্জ করবার সাহস তৈরি হলো। তারা দাবি করতে শুরু করল, নবীজীর (সা:) সময় নাকি নামায-রোযা বলতে আনুষ্ঠানিক কোন এবাদত ছিল না, এগুলো নাকি পরবর্তীতে অন্য ধর্মের মানুষদের আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনা দেখে তাদের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। তারা বলে, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায যে পড়তেই হবে একথা নাকি কোন হাদীসে নেই। সালাত কায়েম করা বলতে নাকি বোঝানো হয়েছে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা বা কোরআনের আদর্শভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আবার কোন কোন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি আছে, তাদের কুকর্মকে হারাম করে বা কুকর্মের পরিণতি বর্ণনা করে কোরআনে যেসব আয়াত ও বিধান জারি করা হয়েছে এবং যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোকেও নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করে নিজেদেরকে ঐসব আয়াতের আওতার বাইরে রাখতে সচেষ্ট হয়। কোন কোন সমকামী ব্যক্তি দাবি করে, কওমে লূতের ঘটনা সম্পর্কিত কোরআনের বর্ণনা ও অভিমত থেকে নাকি সমকামিতা হারাম হওয়া প্রমাণিত হয় না, বরং কওমে লূতকে তিরস্কার ও শাস্তি প্রদান করা হয়েছে নাকি কেবল নাবালক ছেলেদের জোরপূর্বক ধর্ষণের কারণে, পুরুষে পুরুষে পারস্পরিক সম্মতিপূর্বক সমকামিতা নাকি এর দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয় না। এভাবেই বিপথগামী মতলববাজরা নিজেদের ইচ্ছেমত যুক্তির মারপ্যাঁচ দিয়ে কোরআনের নির্দেশ ও ফরয বিধানকে যেমন অস্বীকার করে, হালালকে হারাম করে, তেমনি কোরআন কর্তৃক নিষিদ্ধ ও হারামকৃত কাজগুলোকেও জায়েয করে ফেলে।
সুতরাং দেখা গেল, কোরআনের কোন একটা আয়াত বা বিধানকে যদি অস্বীকার করবার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে আস্তে আস্তে ক্রমে ক্রমে গোটা কোরআনকেই একদিন মুসলমানদের জীবন থেকে নির্বাসন দেবার পথ তৈরি হয়। জিহাদ শুধু রসূলুল্লাহর (সা:) সময়ই প্রযোজ্য ছিল, এখন আর এর কোন প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা নেই- এই ধারণাকে মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবার পর নামায-রোযাও এখন আর দরকার নেই, কোরআনের সব হুকুম আর সবকালে প্রযোজ্য নয়- এমন একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব বলে আশার মুখ দেখতে শুরু করেছে ইসলামের শত্রু মতলববাজ ও তাদের অনুসারী মুসলিম নামধারী বিপথগামীরা। 'আম' (সবার জন্য সর্বকালে প্রযোজ্য সাধারণ বিধান)-কে 'খাস' (ব্যক্তি, কাল বা ক্ষেত্রবিশেষের উপর প্রযোজ্য সুনির্দিষ্ট বিধান) আর 'খাস'-কে 'আম' সাব্যস্ত করার দ্বারা গোটা কোরআনের সকল বিধানকেই অস্বীকার করা সম্ভব। এ কারণেই হযরত আবুবকর (রা:) যখন দেখলেন, একদল লোক যাকাত অস্বীকার করছে এই বলে যে, কোরআনের যে আয়াতে যাকাত আদায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে কেবল আল্লাহর রসূল (সা:)-কে খাস করে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে জনগণের কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ ও বণ্টন করতে, অতএব নবী (সা:) যতদিন আমাদের মাঝে ছিলেন ততদিনই এ বিধান প্রযোজ্য ছিল, নবীর অবর্তমানে এ বিধানের আর validity নেই; তখন তিনি এ প্রবণতাকে শক্ত হাতে দমন করলেন। কারণ, তিনি [খলীফা আবুবকর (রা:)] বুঝতে পেরেছিলেন, কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা করে শরীয়তের বিধান অগ্রাহ্য করার প্রবণতাকে যদি শুরুতেই থামিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে ক্রমে এই উম্মতকে আল্লাহ তাআলার সকল আদেশ ও বিধান থেকেই দূরে সরিয়ে দিয়ে বিপথগামী করে দেবে। মানুষ যে বিধানকেই পছন্দ না হবে, সে বিধান সম্পর্কেই বলবে, এ হুকুম কেবল রসূলুল্লাহ (সা:) ও সাহাবীদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল, বর্তমানে আমাদের উপর আর উক্ত বিধানের বাধ্যবাধকতা নেই।
আল্লাহর দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করা থেকে শুরু করে আল্লাহর হুকুম ও নবীর আদর্শকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা নিজেদেরকে সেই বিধানের আওতা থেকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত করবার সবচাইতে সহজ ও বহুল ব্যবহৃত পন্থাটি হল মনগড়া ব্যতিক্রম অন্বেষণ করা; অর্থাৎ একথা বলা যে, ১৪০০ বছর আগে নবীর যুগে এটা প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু এখন যুগের পরিবর্তন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আর তা প্রযোজ্য নয়। যারা ধর্মবিরোধী, তারাও বলে, কোরআন নাযিল হয়েছে ১৪০০ বছর আগে, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে সঠিক ও উপযোগীই ছিল বটে, কিন্তু এখন এই আধুনিক যুগে তা অচল। আর যারা ভ্রান্ত পলিসি ও অন্যায় কর্মপন্থা অবলম্বনকারী বিপথগামী বা সুবিধাবাদী মুসলিম, তারা নিজেদের নীতি ও কার্যকলাপ আল্লাহর বিধান ও নবীর আদর্শের বিপরীত হলেও ওজর দেখাবে, যুগ পরিবর্তনের বাস্তবতায় নবীর সকল আদর্শ হুবহু ধরে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না, কোরআনে নির্দেশিত জায়েয-নাজায়েযের বিধানও তাদের জন্য সবটা প্রযোজ্য হবে না। যারা জিহাদবিরোধী, তারা মনে করে, নবীর সময়ের কাফেরদের তুলনায় এখনকার কাফেররা অনেক উদার ও সহনশীল, মুসলমানদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, ধর্মগ্রহণ ও ধর্মপালনে কোন বাধা দেয় না, ধর্মের জন্য মুসলমানদের উপর কোনরূপ অত্যাচার করে না, অতএব জিহাদের বিধান নবীজীর সময়ে প্রযোজ্য থাকলেও এখন আর তার কোন প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা নেই। অপরদিকে যারা জিহাদের নামে নিরীহ মানুষ ও শিশু হত্যাকে জাস্টিফাই করে, তাদের যুক্তি হলো, নবীর সময়ে যুদ্ধ হতো দু'পক্ষের মাঝে সামনাসামনি, যাতে শুধু দু'পক্ষের সেনাবাহিনীই অংশগ্রহণ করত, তখন প্রতিপক্ষও মুসলমানদের সাধারণ মানুষের জনপদে হামলা বা শিশুহত্যা করেনি, তাই মুসলমানদের জন্যও শত্রুপক্ষের নিরীহ মানুষ ও শিশুদেরকে হত্যার প্রয়োজন হয়নি, কাজেই আগ্রাসনকারী শত্রু ছাড়া যুদ্ধের সাথে জড়িত নয় এমন নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ব্যাপারে কোরআনের নিষেধাজ্ঞা কেবল তখনকার জন্যই প্রযোজ্য ছিল; আর বর্তমানে শত্রুপক্ষ যেহেতু শিশুহত্যা করছে, তাই আমাদের জন্যও তা করা জায়েয হয়ে গেছে! বলাবাহুল্য, দুই কিসিমের বিপথগামী দলের এ পরস্পরবিরোধী দাবিই তাদের উভয়ের দাবিকে ভ্রান্ত প্রমাণ করবার জন্য যথেষ্ট।
"এটা আর এটা এক নয়"- এই বাক্যটিই বিপথগামীদের বহুল ব্যবহৃত বাহানা। ধর্মীয় ব্যাপারে আল্লাহ ও নবীর পথ ছেড়ে যারা বাঁকা পথ অবলম্বন করে, তাদের অযুহাত হলো, নবীর যুগ আর এখনকার যুগ এক নয়। আবার পার্থিব সাংসারিক ব্যাপারে যারা বৈষম্য ও অবিচার করে, দুই জায়গায় দুই রকম নীতি প্রয়োগ করে, তারাও কথার মারপ্যাচে দুইজনের ব্যাপার (case) দুইরকম দেখাতে চায়। যেমন, নিজের মেয়ে বছর ভরে বারো মাস বাপের বাড়ি থাকলেও তাদের ভাষায় সেটা হয় অনিবার্য কারণবশত নিতান্ত প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে থাকা, আর ছেলের বউ পাঁচদিনের জন্য বাপের বাড়ি হলেও সেটা হয় কাজ ফাঁকি দিয়ে বিলাসিতা ও শখের বেড়ানো।
বিভ্রান্ত লোকেরা কোরআনের কোন বক্তব্য যখন নিজেদের মনমত না হয়, অর্থাৎ তাদের স্বার্থ বা মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তখন তারা যেকোন বাহানায় তার বিরোধিতা করবেই। তাদের পছন্দনীয় নয় এমন কোন কথা যদি কোরআন থেকে পেশ করেন, তখন আপনাকে জব্দ করার জন্য হয়তো প্রশ্ন করে বসবে, তুমি কি আরবী জান নাকি? কোরআনের বক্তব্য বুঝলে কিভাবে? তখন আপনি যদি পাল্টা প্রশ্ন করেন, তুমি আরবী জান কিনা, তখন হয়তো বলবে, আমি আরবী না জানলে কি হবে, আমার গুরু তো আরবী জানেন, আর তিনি বলেছেন কোরআনের এই আয়াতের অর্থ আসলে হবে এই।

৯। হারামকে হালাল করবার প্রবণতা এবং নিজেদের অন্যায় অপকর্মের পক্ষে কোরআন-হাদীস থেকে দলীল অন্বেষণ করা। যেমন ধরুন, ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক, নিষ্ঠুরতা ও অশ্লীলতা হারাম। কিন্তু বিপথগামীরা তাদের প্রয়োজনমত এই ঘৃণ্য জঘন্যতম হারামগুলোকেও যুক্তিতর্ক দিয়ে হালাল বানিয়ে নেয়। ধর্মের নামে যারা শিরকের গুনাহে লিপ্ত, তারা কোরআন থেকেই এর পক্ষে রেফারেন্স পেশ করে। যে সমস্ত পীর নিজেকে সেজদা করায় এবং যেসব মুরীদ নিজ পীরকে সেজদা করে বা এ ধরনের সেজদাকে সমর্থন করে, তারা সূরা ইউসুফে বর্ণিত ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে পেশ করে এবং দাবি করে, যেহেতু কোরআনের অন্য কোন আয়াত দ্বারা সম্মানসূচক সেজদাকে মনসুখ করার ঘোষণা দেয়া হয়নি, সেহেতু সম্মানসূচক সেজদার বিধান এখনো বহাল আছে। কিন্তু কথা হল, সম্মানসূচক সেজদা যদি এখন জায়েযই থাকত, তাহলে অবশ্যই কোরআনে আর কাউকে না হোক অন্তত আমাদের নবীকে (সা:) সেজদা করবার জন্য সাহাবীদেরকে নির্দেশ প্রদান করে আয়াত নাযিল করা হতো। যেহেতু নবীর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনে যাতে ত্রুটি না হয়, এমনকি তাঁর সামনে নিজেদের গলার স্বরও যাতে উঁচু না হয়, সে ব্যাপারে নবীর সঙ্গী-সাথীগণকে সচেতন করতে আল্লাহ ভোলেননি। জীবিত ভণ্ডপীরদের না হয় তারা ইবাদতের উদ্দেশ্যে সেজদা করে না, কেবল সম্মান প্রদর্শনার্থে সেজদা করে, কিন্তু মৃত সত্যিকার পীরদের কাছে তো তারা সরাসরি হাত তুলে প্রার্থনাই করে, যেভাবে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়। সাহায্য কামনা তো মানুষের কাছেও করা যায়, কিন্তু কারো কাছে যদি নিজেকে এমনভাবে সপে দিয়ে এমন ভাব প্রকাশ করা হয় যে, তুমি ছাড়া আমার সাহায্য করার কেউ নেই, তোমার সাহায্য ছাড়া আমি বাঁচব না, তবেই সেটা শেরেকীর পর্যায়ে পড়বে। আর জীবিত বা মৃত ভণ্ড বা কামেল পীরদের কাছে প্রার্থনা করার ব্যাপারেও তারা যুক্তি দেখায়, আল্লাহ বলেছেন আল্লাহকে পাওয়ার জন্য উছিলা তালাশ করতে, আর এই উছিলা মানেই হল পীর ধরা, পীরের শরণাপন্ন হওয়া, পীরের কাছে মোনাজাত ধরা। অথচ এমন যুক্তি তো পৌত্তলিকরাও দেখায় যে, আমরা এবাদতের উদ্দেশ্যে পূজা করি না, বরং আমরা পূজা করি এ উদ্দেশ্যে যে, এনারা আমাদেরকে স্রষ্টার নিকটবর্তী করে দেবে। প্রকৃতপক্ষে উছিলা বা মাধ্যম অন্বেষণ করার অর্থ হল, আল্লাহকে পাওয়া বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে আল্লাহর আনুগত্য তথা নেক আমল করা, এবং এই নেক আমলের সুযোগ ও উপায় খুঁজে বের করা। পীর বা নেতাও মানুষের আল্লাহর পথে চলার সহায়ক হতে পারেন, তাঁরাও দিকনির্দেশনা দিয়ে দ্বীনের পথে চলতে মানুষকে সাহায্য করতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাঁরা অবশ্যই উছিলা বলেই গণ্য হবেন; কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে, পীরের কাছে এবাদতের ভঙ্গিতে নতশিরে প্রার্থনা করতে হবে, কিংবা পীর ছাড়া সরাসরি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করা যাবে না। পীরের কাছ থেকে হেদায়েত গ্রহণ করা বা তাঁর কাছে দোয়া চাওয়া এক জিনিস, আর পীরকেই নিজের ভাগ্যবিধাতা আর ভগবানতুল্য গণ্য করা আরেক জিনিস। মাজারে গিয়ে সেজদা করা, মোনাজাত ধরা ও মাজারে দান-মানত করার পক্ষেও কোরআন থেকে অপ্রাসঙ্গিকবাবে অদ্ভুত দলিল পেশ করে। কোরআনে আল্লাহ  তাআলা শহীদদের সম্পর্কে যেখানে বলেছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না, এ আয়াতটিকে পেশ করে তারা যুক্তি দেখায়, আল্লাহর ওলীরা অমর, তাই তাদের কাছে প্রার্থনা করা যাবে, তাদেরকে দানও করা যাবে। অথচ আয়াতে বলা হয়েছে নিহত হওয়ার কথা, যেসব ওলীগণ স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁরা তো এ আয়াতের আওতায় আসার কথা নয়। আর এ প্রশ্নের উত্তরে তারা বলে থাকে, নিহত হওয়ার অর্থ আল্লাহতে বিলীন হয়ে যাওয়া। অবশ্য একথা ঠিক যে, আল্লাহর ওলীগণের মর্যাদাও শহীদগণের চাইতে কম নয়, সেই হিসেবে তাঁরা জীবিত হিসেবে বিবেচিত হতেই পারেন। কিন্তু আল্লাহ তো একথাও বলেছেন যে, শহীদগণকে আল্লাহ রিযিক দেন। তাহলে তাঁরা আমাদের দান-খয়রাতের মুখাপেক্ষী হবেন কেন? আর তাঁরা জীবিত বলে গণ্য হলেই যে তাঁদেরকে সেজদা করতে হবে, তাঁদের কাছে এবাদতের ভঙ্গিতে প্রার্থনা করাটা জায়েয হয়ে যাবে, তার কী মানে আছে?
ইসলামের নামে যারা নিষ্ঠুরতা চালায়, নিরপরাধ মানুষের উপর হত্যা বা জুলুম করে, তারা যুক্তি দেখায়, আল্লাহর রাস্তায় এক-আধটু অন্যায় বা দোষ-ত্রুটি করলে সেটা আল্লাহ নিজ গুণে মাফ করে দেবেন। ইতিহাসেও এ ধরনের একটি দল ছিল, যারা শিশুহত্যার পক্ষেও যুক্তি হিসেবে সূরা কাহাফে বর্ণিত খিজির (আ:)-এর ঘটনা থেকে দৃষ্টান্ত দিয়ে বলত, ভবিষ্যতে খারাপ হবার আশংকা আছে এমন শিশুদের হত্যা করা জায়েয। আবার একদল আছে, যারা ধর্মের নামে অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, পীর সাহেবের নগ্নতাকে তার জন্য বিশেষত্ব ও মর্যাদাকর মনে করে এবং নারী-পুরুষের মিলিত নাচ-গানকে খোদার নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে দাবি করে। জাহেলী যুগে কাবা ঘরের সামনে উলঙ্গ তওয়াফের প্রচলন ছিল এবং এ সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হয়, "তারা যখন কোন অশ্লীল কাজ করে, তখন বলে আমরা বাপ-দাদাকে এমনি করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এ নির্দেশই দিয়েছেন। আল্লাহ তো অশ্লীলতার আদেশ দেন না। এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জান না।" (সূরা আরাফ: ২৮)
সংক্ষেপে বলা যায়, আল্লাহ কোরআনের যে আয়াতকে যে উদ্দেশ্যে নাযিল করেছেন, যে আয়াত দ্বারা যে কথা বোঝাতে চেয়েছেন, সে আয়াতকে সে উদ্দেশ্যে না বুঝিয়ে, আয়াতের মূল বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাই বিপথগামীদের কাজ। যেমন, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করা সংক্রান্ত আয়াতটির মূল উদ্দেশ্য হলো জিহাদ ও শাহাদাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা বোঝানো। কিন্তু তারা বলে, কিন্তু তারা এ আয়াতকে আল্লাহর ওলীদের অমরত্ব ও তাঁদেরকে মানুষের পূজনীয় প্রমাণে ব্যবহার করে।
মূলত: কোরআন-হাদীসের অপব্যাখ্যাই হচ্ছে ভ্রান্ত আকীদা প্রচারের প্রধান হাতিয়ার। আর যেকোন অপব্যাখ্যার মূল বাহন হচ্ছে ভ্রান্ত কিয়াস। ভ্রান্ত কিয়াস হল যেটা যে জিনিসের সাথে তুলনীয় নয়, সেটাকে সেই জিনিসের সাথে তুলনা করা। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিসের পার্থক্যকে এড়িয়ে গিয়ে সাদৃশ্য দেখানোর চেষ্টা করা। ভ্রান্ত কিয়াসের উদাহরণ হল সুদকে ব্যবসার সাথে, যাকাতকে জিযিয়ার সাথে, সন্ত্রাস ও জিহাদকে পরস্পরের সাথে তুলনা করা। মক্কার কাফেররা সুদ খাওয়ার জন্য এর যৌক্তিকতা প্রমাণার্থে অপর একটি বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কাজ ব্যবসাকে এর সাথে তুলনা করত। মদীনার এক অতিচালাক প্রতারক ব্যক্তি যাকাতকে এড়ানোর জন্য একে অমুসলিমদের জন্য ধার্যকৃত কর জিযিয়ার সাথে তুলনা করেছিল এবং নিজে মুসলিম হিসেবে অনুরূপ কোন কর প্রদানে বাধ্য নয় বলে প্রমাণ করতে চেয়েছিল। বর্তমানে কোন কোন বিভ্রান্ত গোষ্ঠী জিহাদকে (অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম জনপদে আগ্রাসনকারী হানাদার কাফের বাহিনীকে প্রতিরোধ করাকে) সন্ত্রাস হিসেবে এবং সন্ত্রাসকে (অর্থাৎ আদালতপাড়ায় নিরীহ জজ-ব্যারিস্টার ও বিচারপ্রার্থী মানুষ হত্যা এবং বাসে-গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যাকে) জিহাদ হিসেবে প্রচার করছে।

৭। ব্যক্তিগত আক্রমণ:
৮। তাকফির, তাহরিম ও গালিগালাজ: নিজেদেরকে ছাড়া আর সবাইকে কাফের মনে করা। দুনিয়ার সবাই কাফের-মোশরেক হয়ে গেছে, আমি একাই এবং আমার কতিপয় অনুসারীই মুসলমান আছি- এমন একটা ভাব প্রদর্শন করা। বিশেষত এ ধরনের প্রচারণার ক্ষেত্রে যখন স্বপ্নে আদিষ্ট হবার উদ্ভট দাবি করা হয়, তখন সেটা স্বভাবতই আরো বড় রকমের ভন্ডামি হিসেবে গণ্য হবে। কিংবা একতরফাভাবে নিজেকে বা নিজেদের দলীয় নেতাকে মুসলিম বিশ্বের খলীফা ঘোষণা করা এবং এ খলীফার হাতে যারা বাইয়াত গ্রহণ না করবে তারা সবাই কাফের হয়ে যাবে- এমন খামখেয়ালীপূর্ণ স্বেচ্ছাচারী ফতোয়া দেয়াটাও চরম ভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতারই লক্ষণ। এছাড়া সকল কাজকর্মে সকল ব্যাপারে একমাত্র আমরাই শুধু নবীর হাদীস অনুসারে সহীহভাবে আমল করছি, আর অন্যরা সবাই বেদাতী- এমন অহংকারী ধ্বংসাত্মক ধারণাও মানুষকে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। "তোমাদের কারো নামাজ-রোজা কিচ্ছু হয় না, শুধু আমাদেরটাই শতভাগ সহীহ ও নির্ভুল"; কিংবা "এতদিন নামাজ-রোজা যা করেছি সব খালে গেছে, এখন আবার সহীহ তরীকায় নামাজ শুরু করে নতুন করে মুসলমান হয়েছি"- এমন গোঁড়া ও উগ্র মানসিকতাও বিভ্রান্তিরই নমুনা মাত্র।
নিজের খেয়ালখুশীমত কাফের ফতোয়া দেয়ার পাশাপাশি নিজের খেয়ালখুশীমত হারাম ফতোয়া দেয়াটাও বিপথগামী নেতা ও দলের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে- এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।”[সূরা আন্‌-নাহল, আয়াত: ১১৬]" অতএব, আল্লাহর ঘোষিত হারামের তালিকার বাইরে নতুন করে কোন কিছুকে হারাম ঘোষণা করবার এখতিয়ার কারো নেই। তবে হ্যাঁ, হালাল-হারামের যে মূলনীতি ইসলামে নির্ধারিত আছে, সেই মূলনীতির ভিত্তিতে নতুন সৃষ্ট বা আবিস্কৃত বস্তু কিংবা নতুন প্রচলিত কাজকর্মের ব্যাপারে ফতোয়া দেয়া যাবে। হালাল-হারাম নির্ধারণে ইসলামের মৌলনীতি হল, যেকোন নিষ্ঠুরতা, নির্লজ্জতা ও নোংরামি হারাম এবং মানুষের জন্য যা কিছু ক্ষতিকর ও কষ্টদায়ক তা সবই হারাম। এই মূলনীতির ভিত্তিতে হরতাল ও অবরোধকে একবাক্যে হারাম বলে দেয়া যায়। কিন্তু লংমার্চের বেলায় হালাল বা হারাম বলার ক্ষেত্রে দেখতে হবে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টি বা দ্বীন ও মানুষের কল্যাণে না হয়ে নিজেদেরকে জাহির করার উদ্দেশ্যে বা কোন পার্থিব সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে হয় এবং তার দ্বারা যদি কোন দ্বীনী কল্যাণ হাসিল হবার পরিবর্তে অযথা নিরীহ মানুষের ক্ষতি সাধিত হবার সম্ভাবনাই প্রবল থাকে, সেক্ষেত্রে এটা হারাম বলে গণ্য হবে। অপরদিকে যদি এটা দ্বীনের শত্রুদের উপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে ইতিবাচক কোন ফলদায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন এটাকে হারাম বলার কোন কারণ নেই। আজকাল এক ধরনের পীর আছেন, যারা খুটিনাটি একেকটা বিষয় ধরে শুধু এটা হারাম ওটা হারাম ইত্যাদি ফতোয়া আওড়াতেই ব্যস্ত থাকেন। অবশ্য নিজেদের রিজিক হাসিলে সহায়ক বিষয়গুলোকে তারা সযতনে সতর্কভাবে হারামের তালিকার বাইরে রেখে থাকেন, যেমন- খতম তারাবি পড়ানোর বিনিময়ে উজরত গ্রহণ করা। তার মানে, জাতে মাতাল তালে ঠিক।
বিভ্রান্ত দলের অহংকারী ও দাম্ভিক নেতা বা পীর সাহেবদের আরেকটা কমন অভ্যাস হল গালমন্দ করা। একমাত্র নিজের পীর ছাড়া আর সব পীর ও আলেমদেরকে বিকৃত নামে ও বিকৃত উপাধিতে ডাকা তাদের এক নিয়মিত চর্চা।
কথায় কথায় কাফের আখ্যা দেয়া, হারাম ফতোয়া দেয়া কিংবা গালিগালাজ করাটা তাদের নিয়মিত অভ্যাস হলেও শুধুমাত্র নিজেদের কায়েমি স্বার্থ ও পছন্দমাফিক কর্মটিকে

১১। সুন্নতের বিপরীত আচরণ: যে সমস্ত পীর সাহেবদের মুরীদেরা পীর সাহেবের কদম মোবারক খুঁজে বেড়ালেও তার কদম মোবারক খুঁজে পাওয়া যায় না, তারাও নিশ্চিতভাবে বিভ্রান্ত দলেরই অন্তর্ভুক্ত। কারণ, পুরুষ লোকের জন্য অহংকারবশত গোড়ালির নিচে কাপড় পরিধান করাকে হাদীসে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

১০। অতিভক্তি ও বেয়াদবি:
সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে মর্যাদার ক্রমকে পাল্টে দেবার প্রবণতাও দেখা যায় বিপথগামীদের মাঝে। যেমন- রবুবিয়তের উপর নবুয়তকে, নবুয়তের উপর ইমামতকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা।
১১। বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঈমানদারদের চাইতে কাফেরদের দিকে বেশি ঝোঁকার প্রবণতা: ....
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা ভাল- সদ্ব্যবহার ও সুবিচার, বন্ধুত্ব এবং আনুগত্য এই তিনটি হচ্ছে সম্পূর্ণ তিন জিনিস। ভাল ব্যবহার ও ন্যায়বিচার সকলেরই প্রাপ্য, কেবল জালেম অমানুষ ও ক্রিমিনাল ছাড়া আর সকল মানুষের সাথেই ভাল আচরণ ও দয়া প্রদর্শন করতে হবে। আর বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা হতে পারে কেবল তাদের মধ্যে, যাদের ধর্ম-দর্শন, মন-মানসিকতা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। বন্ধু ও অন্তরঙ্গ বলতে তাকেই বোঝায়, যার কাছে প্রকাশ্য-গোপন সব কিছু শেয়ার করা যায়, অভিন্ন মিশন বাস্তবায়নে পরস্পর সহযোগিতা করা যায়। আর আনুগত্যের ক্ষেত্রে শর্তহীন নিরঙ্কুশ আনুগত্য কেবল আল্লাহ ও রসূলের প্রতিই হতে হবে। আর নেতা, শাসক, পিতামাতা,
১২। দ্বিমুখী নীতি: বিপথগামী দলগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা এবং স্ববিরোধী ও পরস্পরবিরোধী আচরণ করা। যেমন- একদল নবীপ্রেমিক আছেন, আমাদের নবী (সা:) মাটির তৈরী নাকি নূরের তৈরি এ ব্যাপারে খুবই সেনসিটিভ, নবীকে হাজির-নাজির না জানলে বা মিলাদ শরীফে কিয়াম না করলে নবীর সম্মান নিয়ে এদের ক্রন্দনে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে; কিন্তু নবীর শানে কেউ সরাসরি বেয়াদবি করলে, নবীর নামে মিথ্যা অপবাদ দিলে, নবীর নামে গালিগালাজ করলে তখন তাদের নবীপ্রেম চুপসে যায় এবং রীতিমত ভোল পাল্টে ফেলে। ইসলামের শত্রুদের দালালি করাটা তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলেও তাদের এ আসল মতলবটাকে আড়াল করে তারা নসীহত করতে শুরু করে, আল্লাহর নবীর সম্মান আল্লাহই রক্ষা করবেন, এ নিয়ে আমাদের কাউকে ভাবতে হবে না। আল্লাহর দ্বীনের (ইসলামের) হেফাজত যদি মানুষ করতে চায়, তাহলে সেটা কুফরী বা শেরেকী হবে ইত্যাদি। বাস্তব জীবনেও দেখা যায়, কোন জালেম শয়তান ব্যক্তিকে তার জুলমের কাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে তার সমর্থক ও সহযোগীরা যুক্তি দেখায়, আল্লাহ যাকে মজলুম অসহায় ও নির্যাতিত অবস্থায় রাখতে  চান, তাকে রক্ষা করার বা মুক্ত করবার চেষ্টা করলে সেটা খোদার উপর খোদগিরি করা হবে, আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। এদের এসব ধান্দাবাজি ও শঠতাপূর্ণ যুক্তি আল কোরআনে বর্ণিত কাফেরদের সেই যুক্তির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, "।" (সূরা ইয়াসিন: ) ভণ্ড প্রতারক চরিত্রের লোকেরা ধর্মের হেফাজতের বেলায় কোরআনের রেফারেন্স দিয়ে যুক্তি দেখায়, কোরআন তথা ধর্মের হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহই নিয়েছেন; মজলুমকে বা ক্ষুধার্তকে সাহায্য করার বেলায় ওজর দেখায়, জীবন ও জীবিকার মালিক আল্লাহ এবং আল্লাহর বান্দাদের জীবন-মৃত্যু ও রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহই নিয়েছেন; অতএব ধর্মের প্রতি বা মানবতার প্রতি আমাদের কোন দায়িত্ব বা করণীয় নেই; কিংবা করতে গেলেও সেটা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা হবে; অতএব আল্লাহর উপর 'তাওয়াক্কুল' করে আল্লাহ যাকে যে অবস্থায় রাখতে চান সেভাবেই তাকে থাকতে দেয়া উচিত। অথচ নিজেরা সম্পদ অর্জনের বেলায় এ যুক্তি মানবে না যে, রিযিকের মালিক আল্লাহ, বরং বৈধ-অবৈধ যেকোন উপায়ে মানুষের ক্ষতি করে হলেও সম্পদ হাসিলে ঠিকই নিয়োজিত থাকবে; নিজেদের বেলায় ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এটা দেখেও দেখবে না যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দেন, বরং সেক্ষেত্রে হাজারো মানুষকে মেরে কেটে হলেও ক্ষমতা নিশ্চিত করবে। এদের যত তাওয়াক্কুল সব শুধু ধর্মরক্ষার বেলায়, আর পরের বিপদ ও অভাবের বেলায়। জান-মাল ও ক্ষমতাসহ যেকোন পার্থিব স্বার্থ ও লোভ-লালসার ক্ষেত্রে নিজেদের বেলায় এরা কখনো আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে না। ধর্মের ধ্বজাধারী ভণ্ড লোকেরা যেমন ধর্মের শত্রুদের সাথে দোস্তি করার জন্য দ্বিমুখী নীতির আশ্রয় নেয়, তেমনি সেকুলারপন্থীরাও নিজেদের সেকুলার অবস্থানের আপাত বিরোধী এই বক ধার্মিকদের বেলায় চোখ বন্ধ করে থাকে। এরা সদা সর্বদা ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হলেও ধর্ম নিয়ে মাজার ব্যবসার ব্যাপারে এদেরকে কেউ কিছু বলতে শুনবেন না। বরং লালসালুওয়ালাদের সাথেই এদের সখ্যতা বেশি দেখা যায়। এরা উঠতে বসতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও স্থান, কাল ও পাত্রভেদে এদের সাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়। কেউ সামগ্রিকভাবে ইসলামের পক্ষে মুসলিম পরিচয়ে পারিবারিক বা সামাজিক পর্যায়ে কোন ভূমিকা রাখতে চাইলে, নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য করতে চাইলে সেটাকে তারা সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে অভিহিত করলেও যারা কোন ফেরকা বা উপদলের হয়ে গোত্রীয় বা গোষ্ঠীগত বিভেদকে প্রমোট করে, মুসলমানদের মাঝে সাম্প্রদায়িক বিভক্তি চাঙ্গা করে তুলতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে, তাদেরকে এরা সাম্প্রদায়িক বলা তো দূরের কথা, বরং 'শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী' আধুনিক উদারমনা শান্তিপ্রিয় মূলধারার সত্যিকার আলেম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। স্বঘোষিত আশেকে রসূলদের নবীপ্রেম আর ধর্মনিরপেক্ষদের ধর্মব্যবসাবিরোধিতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আসল স্বরূপ এখানেই নিহিত। কোন নিষ্ঠাবান মুসলমানের ধর্মপ্রেম ও ধার্মিকতা এদের কাছে ধর্মান্ধতা হিসেবে গণ্য হলেও অন্য কোন ধর্মের নরবলি বা সতীদাহ প্রথাও এদের কাছে কোন অন্ধতা বা উগ্রতা হিসেবে বিবেচ্য হয় না। ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম বা মতাদর্শের জঙ্গি কর্তৃক ভিন্ন ধর্মের মানুষদের উপর গণহত্যা ও বর্বরতা এদের দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িকতার আওতায় না পড়লেও মজলুম ভিকটিম মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ এদের কাছে সাম্প্রদায়িক চিন্তা হিসেবে গণ্য। এছাড়া যেসব রাজনৈতিক দল সাধারণ মানুষকে পুড়ে মরতে দেখেও অণুমাত্র দু:খবোধ করে না, কিন্তু নিজেদের নেতা বা নেত্রীকে এক-আধ বেলা না খেয়ে থাকতে দেখলেই সমস্বরে মাতম শুরু করে দেয়, তারাও মূলত: দ্বিমুখী নীতিরই অনুসারী এবং তাদের এ আচরণ ও মনোভাব বিপথগামী দল হবারই অন্যতম আলামত। আবার যারা আল্লাহর আইন চায় কিন্তু নিজেরাই আল্লাহর আইন সবচেয়ে বেশি লংঘন করে, এমনকি আল্লাহবিরোধী কাজের দ্বারাই আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারাও এই স্ববিরোধী চরিত্রের অধিকারী। দ্বিমুখী নীতির চর্চাটা সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে মানবাধিকার ইস্যুতে। একটা দেশের সংখ্যালঘু অধিকারের খোঁজ নিতে গিয়ে সারাদেশে মাইক্রোস্কোপ ও স্যাটেলাইট স্থাপন করে দেশের কোন্‌ অজপাড়াগায়ে কোন্‌ সংখ্যালঘুর টিনের চালে একটা ঢিল পড়িল, কিংবা কোন্‌ সংখ্যালঘুর টেকো মাথায় একটা কাক ইয়ে করে দিল এসব নিয়ে একদিকে গবেষণায় পড়ে থাকা; অপরদিকে সেই দেশেরই পাশের দেশগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে সংখ্যালঘু হত্যা-ধর্ষণ ও দগ্ধ করার ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা ইনিয়ে বিনিয়ে সমর্থন ও বৈধ করার চেষ্টায় মেতে থাকা- এটা হচ্ছে দ্বিমুখী নীতির সর্বাপেক্ষা নির্লজ্জ উদাহরণ।
বিপথগামী ব্যক্তিবর্গ ও দলসমূহের দ্বিমুখী চরিত্রের আরেকটি নিদর্শন হল, তারা ইসলামকে শান্তির ধর্ম ও উদারতার ধর্ম হিসেবে প্রচার করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শান্তিপ্রিয় ও উদার স্বভাবের নয়। তাদের উদারতা ও সহনশীলতা কেবল কাফেরদের জন্য প্রযোজ্য, মুসলিমদের জন্য নয়; তাদের দয়া ও সহানুভূতি কেবল জালেমের তরে, মজলুমের তরে নয়; তাদের ক্ষমা ও মহানুভবতা কেবল অপরাধীর জন্যই বরাদ্দ, নিষ্পাপ নিরপরাধ মানুষের জন্য নয়। ধর্মের ধ্বজাধারী বিপথগামীরা যেমন ধর্মের একই বাণীর দুই রকম প্রয়োগ করে, তেমনি ধর্মের প্রকাশ্য বিরোধীরাও তাদের ঘোষিত নীতিমালার ক্ষেত্রে দুই রকম আচরণ করে। যেমন- ধর্মের বিরোধিতা করাটা তাদের বাক স্বাধীনতা, কিন্তু ধর্মকে সমর্থন করাটা তাদের কাছে বাক স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে না; আল্লাহ ও রসূলের নিন্দা করাটা তাদের মত প্রকাশের অধিকার, কিন্তু আল্লাহ ও রসূলের প্রশংসা করাটা মত প্রকাশের অধিকার নয়; ধর্মপালন করা বা ধর্মের বাণী প্রচার করাটাকে ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে মানতে তারা নারাজ।
মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও এই দ্বিমুখী নীতির বহি:প্রকাশ বিভিন্নভাবে দেখা যায়। দ্বিমুখী স্বভাবের মানুষেরা যখন নিজের বাচ্চাদের বশ করার প্রয়োজন হয়, তখন পিতামাতার কথা না শুনলে আল্লাহ কত পাপ দেবে, কতবড় দোযখে দিয়ে দেবে এসব বলে ভয় দেখায়। এমনকি নিজের কোন অন্যায় বা অপ্রয়োজনীয় আদেশ পালন করানোর জন্যও ধর্মের দোহাই দেয়। কিন্তু নিজেরা যখন পিতামাতার সাথে আচরণ করে, তখন এসব কথা ভুলে যায়। নিজেরা পিতামাতাকে কষ্ট দেবার সময় আর আল্লাহর ভয় বা দোযখের ভয় প্রযোজ্য থাকে না। এসব মানুষের ভাব হল, আল্লাহ যেন আমার একার জন্যই, আল্লাহ যেন শুধু আমার স্বার্থটাই দেখবেন, আমার মতের বা স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা যাবে দোযখ বুঝি শুধু তাদেরই জন্য। কোন কোন মেয়েলোক আছে, নিজে ১২ মাসের মধ্যে সাড়ে ১১ মাস বাপের বাড়ি থেকে ভাইয়ের বউকে ৭ দিনের জন্য বাপের বাড়ি যেতে দেখলেই পিতামাতার দরদে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে যে, বউকে বাপের বাড়ি ফেলে রেখে কেন তোমরা কষ্ট করে অসুস্থ হয়ে পড়ছ, এতদিন কেউ বাপের বাড়ি বেড়ায় নাকি ইত্যাদি। পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এ ধরনের দ্বিমুখী চরিত্রের লোকদের যুক্তিতর্ক ও ফায়সালা কেবল কাফের ও জালেমদের সাহায্যার্থেই নিবেদিত থাকে। পরিবারে যদি কোন কাফের শয়তান মহিলা তার শিশুকে নির্যাতন ও ছলনার মাধ্যমে ভবিষ্যত জীবনে বিপথগামী করার প্রয়াস চালায়, তখন এই দ্বিমুখী চরিত্রের মানুষেরা সেই জালেমের অনুকূলে যুক্তি দেখায় যে, মায়ের আদেশ পালন করা সন্তানের দায়িত্ব, সন্তানকে নিজের বাধ্য করার জন্য মারপিট ও জবরদস্তি করা মায়ের জন্য বৈধ, সেই নির্যাতন থেকে বা অন্যায় আদেশ পালন থেকে বাচ্চাটিকে রক্ষা করবার চেষ্টা করা তৃতীয় কারো জন্য বৈধ নয় ইত্যাদি। অথব এসব যুক্তি পেশকারী ব্যক্তি নিজের পিতামাতার সাথে বেয়াদবি ও পিতামাতাকে কষ্টদানে সকলের চ্যাম্পিয়ন হলেও কিছু আসে যায়না। শুধুমাত্র নিজে এবং নিজের সমর্থিত জালেম ব্যক্তি ছাড়া জগতের আর সব মানুষের সন্তানেরা পিতামাতার অবাধ্য হলেও তার কোন আপত্তি নেই। এরা সন্তানের উপর পিতামাতার অধিকারের দোহাই দিয়ে অন্যের নির্যাতিত শিশুকে উদ্ধার করতে যাওয়াটাকে সমীচীন মনে না করলেও অন্যের বাচ্চার উপর নির্যাতন করাটাকে দোষনীয় মনে করে না। শিশু নির্যাতনকারী ব্যক্তির সমালোচনা করাটাকে এরা অনধিকার চর্চা মনে করলেও কেউ নিজের বাচ্চাকে 'আহলাদ' দিল কিনা সেটা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করবার অধিকার এরা ঠিকই সংরক্ষণ করে। সন্তানের উপর পিতামাতার অধিকার, পিতামাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য এসব বাণী তারা কেবল সন্তানের উপর নির্যাতন করা বা সন্তানকে ধর্মচ্যুত করার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য মনে করে; সন্তানকে আদর করা বা সন্তানকে দ্বীনদার বানানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করে না। আরো মজার ব্যাপার হল, জাতীয় রাজনৈতিক পর্যায়ে যেমন ধর্মব্যবসায়ী ভণ্ড লোক আর ধর্মনিরপেক্ষ সেকুলার গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক থাকে, তেমনি পারিবারিক পর্যায়েও ধর্মব্যবসায়ী ভণ্ড ব্যক্তি যারা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ, ব্যক্তিগত হিংসা-বিদ্বেষ ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত চিন্তা ও দাবিকে ধর্মের নাম দিয়ে চালায় এবং তুচ্ছ বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে কৌশলে মানুষকে ধর্মহীন ও বেদ্বীন সাব্যস্ত করে ব্লাকমেইল ও কোণঠাসা করে আর নিজেরা দ্বীনদার বনে যায় তারা এবং আল্লাহর পথে তথা নামায-কালামে বাধাদানকারী ধর্মবিদ্বেষী জালেম শয়তান ব্যক্তি এই দুই মুনাফিক চক্রের মধ্যে পারস্পরিক সমর্থন ও যোগসাজস থাকে। ধর্মব্যবসায়ী মতলববাজ ব্যক্তিরা ধর্মের নামে মুমিন-মুসলমানদের মানহানি ও বিব্রত করলেও ধর্মদ্রোহী মুনাফিক অত্যাচারী ব্যক্তিকে কখনো নাজেহাল করে না। তার মানে জাতে মাতাল তালে ঠিক। কুটিলতা আর অশুভকামনা হচ্ছে এই দুই শ্রেণির (ধর্মব্যবসায়ী ভণ্ড আর ধর্মবিদ্বেষী শয়তান) অভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা এই আপাত বিরোধী দুই শক্তির সেতুবন্ধনস্বরূপ কাজ করে।
ব্যক্তিগত জীবনে দ্বিমুখী নীতির আরেকটি উদাহরণ হল নিজের সন্তান ও অন্যের সন্তানের ক্ষেত্রে দু'রকম নীতি গ্রহণ করা। যেমন- নিজের মেয়ে বিয়ে দেবার সময় জিজ্ঞেস করা, আমার মেয়েকে দিয়ে আবার ঘর-সংসার করাবে না তো? কিন্তু পরের মেয়ে ঘরে আনার সময় জিজ্ঞেস করা, তোমার মেয়েটা ঘর-সংসারের কাজ করতে পারবে তো? নিজের মেয়েদের বেলায় এটা নিশ্চিত করা যে, কোনদিন তাকে একদিনের জন্যও শ্বশুর বাড়ি যেতে বা কাউকে একবেলার জন্যও রেঁধে খাওয়াতে হবে না। অপরদিকে পরের মেয়ের বেলায় বিয়ের পরপরই মেয়ের মা-বাপের কাছে প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়া যে, আপনাদের মেয়ে জীবনে কোনদিন আর আপনাদের বাড়িতে যেতে পারবে না। নিজের মেয়ে বনাম ছেলের বউয়ের মধ্যে পার্থক্য করাটা বহুল প্রচলিত দ্বিমুখী নীতি। তবে দ্বিমুখী স্বভাবে যারা একটু অগ্রগামী, তারা নাতি-নাতনীদের মধ্যেও (ছেলের ঘরের বনাম মেয়ের ঘরের) পার্থক্য করে থাকে। আবার তাদের মধ্যে যারা একেবারে চরম বিবেকহীন ও মনুষ্যত্ব বিবর্জিত, তারা এক ছেলের ঘরের নাতি বা নাতনী শিশুটির উপরে নিজের অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদেরকেই অগ্রাধিকার দেয়। আবার যারা মুনাফেকী ও নির্লজ্জতার চরম পর্যায়ে উপনীত হয়, তাদের দ্বিমুখী নীতি এতটাই বিশ্রী রকমের হয় যে, নিজের মেয়েরা চাহিবামাত্র সদা সর্বদা নানান স্বাদের নানান রকমের খাদ্য ও সেবা পেয়ে স্বর্গসুখী হয়ে জীবনযাপন করলেও এমনকি নিজেদের লজ্জাস্থানের নাপাকী পর্যন্ত অন্যকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিতে পারলেও তাদেরকে জনমদু:খী বলে প্রচার করে, মেয়েদের কথিত দু:খ নিয়ে হাহাকার ও মাতম করে বেড়ায়; পক্ষান্তরে ঘরের বউ গোটা পরিবারের (যৌথ ও বৃহৎ পরিবারের) প্রত্যেকের চাহিদা ও রুচি মতো (নিজের ও নিজের বাচ্চা বাদে) সার্ভিস প্রোভাইড করতে গিয়ে নিজের ও বাচ্চার জীবন ধ্বংস করে দিলেও তাকে জামানার সেরা সুখী ও বিলাসী হিসেবে দেখে- বউ জানি সংসারের কোন কাজকর্ম না করে শুধু সারাদিনরাত নাক ডেকে মহাসুখে ঘুমায় আর বাচ্চাকে আদর-সোহাগ দিয়ে ভরিয়ে রাখে, সংসারের কাজ বাদ দিয়ে নিজের বাচ্চা নিয়েই পড়ে থাকে। নিজের ছেলেমেয়েদের মধ্যেই একজন যদি বাচ্চাসহ নিজে পূর্ণ ননীযুক্ত আড়াই লিটার দুধ সহ অন্যান্য পুষ্টিকর ও রুচিকর খাবার প্রতিদিন খায়, তবুও বলবে আমার এ মেয়েটা এবং এ নাতনীটা একদম কিছুই খায় না; অপরদিকে আরেকজন যদি বাচ্চার স্তন্যদায়ী মাকে বাদ দিয়ে শুধু বাচ্চার মুখেও ননীবিহীন আধা লিটার করে দুধ তুলে দেয়, তাহলে এমন ভাব দেখাবে যেন, এই নাতিনটার দুধের খরচ যোগাতেই বুঝি সংসারটা ফতুর হয়ে গেল। এরূপ দ্বিমুখী ব্যক্তিরা ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতিদিন বোতল ভর্তি দুধ ফেলে দিলেও এই ইচ্ছাকৃত অপচয়ের ব্যাপারে কোন নসীহত করবে না, আবার কেউ কেউ অসুস্থ বাচ্চার চিকিৎসার্থে আদার রস খাওয়াতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে দু'এক ফোঁটা আদার রস পড়ে গেলেও..। এসব দ্বিমুখী নারী-পুরুষদের দ্বিমুখী মানসিকতার বহুল প্রকাশটা ঘটে থাকে বাপের বাড়ি বেড়ানোর ইস্যু নিয়ে। এরা এতটাই বিশ্ববেহায়া যে, নিজের বিবাহিত মেয়েদেরকে বছরের পর বছর অনির্দিষ্টকাল কোলের মধ্যে গুঁজে রেখে তাদের দিয়ে বউকে বাচ্চাসহ প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তুললেও বউয়ের বছরে তিনদিন বাপের বাড়ি বেড়ানো নিয়ে সবগুলো শেয়ালের একই সুরে হুক্কা হুয়া শুরু হয়। চালুনী কর্তৃক সুইকে খোঁচা মারার মত চোরের মা থেকে শুরু করে মাসী পর্যন্ত দাঁত কামড়ে নাক ঘোঁচিয়ে ভেংচি কাটতে শুরু করে- "আমাদের মেয়েরা একটু মায়ের কাছে আসলে তোমার বউ অসুবিধা feel করে; আর তোমার বউ যে বাচ্চার স্কুল কামাই করে মায়ের কাছে পড়ে থাকে, তাতে কোন দোষ হয় না!"
আহলাদ দেয়া বনাম শাসন করার ব্যাপারেও দ্বিমুখী লোকদের অবস্থান সব জায়গায় একরকম থাকে না। এরা প্রায়ই মানুষকে নসীহত করে যে, বাচ্চা-কাচ্চাকে আহলাদ দিলে নষ্ট হয়ে যায়, সবসময় চাহিবা মাত্র সব কিছু দেয়া উচিত নয়, মাঝেমধ্যে শাসন করতে হয় ইত্যাদি। এমনকি কোন শিশুর মৌলিক প্রয়োজন (তা সে খাবারের প্রয়োজন হোক বা আদরের চাহিদা হোক) পূরণ করতে চাওয়াকেও এরা অপ্রয়োজনীয় আহলাদ মনে করে, অসুস্থ শিশুর অসুস্থতা বৃদ্ধি থেকে সামান্য সতর্কতা অবলম্বনকে অযথা আদিখ্যেতা ও তুনু তুনু ভাব হিসেবে গণ্য করে; অথচ নিজেদের প্রাপ্তবয়স্ক যুবতী সন্তানদের রসনা বিলাস সহ ন্যায্য-অন্যায্য সব দাবি ও চাহিদা সর্বদা পূরণ করার পাশাপাশি যাবতীয় স্বেচ্ছাচারী আচরণ, বেয়াদবি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও শিশু নির্যাতনকে অবনত মস্তকে মেনে
দ্বিমুখী নীতির অনুসারীদের কথাবার্তাতেই নিজেদের স্ববিরোধিতা প্রকাশ পায়। যেমন- কোন দেশের জনগণের উপর (সেদেশের স্বৈরাচারী গণবিরোধী শাসক ও বিদেশী মদদদাতাদের মিলিত) আগ্রাসনকেই সেদেশের জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করা। এমনকি নিজেরা সরাসরি বাইরের শক্তিকে দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশটির উপর অবৈধ হস্তক্ষেপ করিয়ে এবং জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে মুখে এই মর্মে বুলি আওড়ানো, "দেশটির ভবিষ্যত ও দেশটির শাসনকাজ পরিচালনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রয়েছে একমাত্র সেদেশের জনগণের এবং এ কাজ হতে হবে বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া।" এতে দেখা গেল, দ্বিমুখী স্বভাবের বিপথগামী ব্যক্তি, দল, রাষ্ট্র ও শাসকেরা যখন কোন কথা বলে, কথাটা নিজেদের পক্ষে গেল নাকি বিপক্ষে গেল, সেদিকে হুঁশ থাকে না। কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যদি শুধু বিরোধী বাহিনীকেই বিদেশী মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন, কিন্তু নিজেই আবার বিদেশী মদদ ছাড়া টিকে থাকতে পারতেন না বলে স্বীকার করেন, তাহলে তিনিও হতে পারেন দ্বিমুখী নীতির আদর্শ মডেল।

১৩। ন্যায়পরায়ণতার অভাব: ইসলাম ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড চিরস্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং যেকোন অন্যায় ও জুলুমের বিপক্ষে অবস্থান করাটা মুসলমানদের জন্য অবধারিত করে দিয়েছে। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ তথা দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করাই ইসলামের নীতি। কিন্তু সমাজে কিছু ব্যক্তি ও দল আছে, যারা কেন জানি সর্বদা সর্বাবস্থায় অন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের যত সমর্থন, সহযোগিতা, যুক্তি ও ফায়সালা কেবল অন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়কারীর পক্ষেই প্রদর্শিত হয়ে থাকে- অন্যায়কারী সে যেই হোক না কেন। তাদের কথাবার্তা, কার্যকলাপ ও আচার-আচরণ দেখে মনে হয়, কেবল অন্যায়কারীকে সুবিধা করে দেয়া আর অন্যায় কাজকে নির্বিঘ্ন ও কণ্টকমুক্ত রাখাই যেন তাদের লক্ষ্য। অন্যায় কাজ করা জায়েয কিনা, মানুষের ক্ষতি করা বা মানুষের উপর জুলুম করা সঙ্গত কিনা- এ বিষয়ে কোন ফতোয়া তাদের মুখে কেউ কোনদিন শুনতে পাবেন না। শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বা জুলুমের প্রতিরোধ করা জায়েয কি নাজায়েয, কিংবা কার জন্য জায়েয আর কার জন্য নাজায়েয- এসব ফতোয়া আর উপদেশই তারা পাড়তে থাকে। যেমন- মানুষের গাড়িতে আগুন দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা বা দগ্ধ করা আইনসম্মত কিনা, এ প্রশ্ন তারা কেউ না তুললেও অগ্নিসংযোগকারী দুর্বৃত্তকে গুলি করার নিয়ম আইনে আছে কিনা সে ব্যাপারে তারা উপদেশ বিলাবে। যেহেতু পেট্রোল বোমাবাজরা আইনের লোক নয়, ক্রসফায়ারকারীরা আইনের লোক, তাই আইন শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের বেলায়ই প্রযোজ্য হবে, আর সন্ত্রাসীরা আইনী বাধ্যবাধকতার আওতার বাইরে থাকবে- এটাই তাদের যুক্তি। অনুরূপভাবে, নরহত্যা, নারীধর্ষণ, শিশুনির্যাতন, আল্লাহ-রসূলের অবমাননা, আল্লাহর পথে (অর্থাৎ ধর্মপ্রচার, ধর্মশিক্ষা ও ধর্মপালনে) বাধাদান, শয়তানের কাজে (যেমন- যেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হতে কিংবা এরূপ কাজে লিপ্ত করাবার উদ্দেশ্যে মদ খেতে বা বমি খেতে) বাধ্য করা ইত্যাদি আল্লাহবিরোধী ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডগুলো জায়েয কিনা এ নিয়ে এ ধরনের মানুষেরা কেউ কোন প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। কিন্তু এসব জুলুম ও অনাচারের প্রতিবাদ করাটা জায়েয কিনা, এ নিয়ে যত রকমের নসীহত বিলাবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে বড়দের সাথে বেয়াদবি করা হবে, বড়দেরকে সম্মান করা ইসলামের বিধান, বড়দের অসম্মান করাটা ইসলামের দৃষ্টিতে নাজায়েয; কোন কোন ক্ষেত্রে আবার সন্তানের উপর পিতামাতার অধিকার রয়েছে, তাই পিতা বা মাতা কর্তৃক শিশুর উপর নির্যাতন হলে সেখানে নাক গলাতে যাওয়াটা ইসলামী বিধানের খেলাফ হবে; ইসলাম শান্তির ধর্ম, তাই কোন মুসলিম জনপদে গণহত্যা ও আগ্রাসন পরিচালনাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে যাওয়াটাও ইসলামের শান্তিবাদী নীতিকে কলঙ্কিত করবে- ইত্যাদি যত প্রকারের ফতোয়া ও উপদেশ আছে সবই পাবেন মুখোশধারী মতলবী লোকদের ভাণ্ডারে। তাদের যুক্তি হল, ইসলামের শত্রুরা যেহেতু ইসলামের অনুসারী নয়, তাই ইসলামের বিধি-বিধানের আওতায় তারা পড়ে না, সুতরাং তাদের দ্বারা জুলুম ও নৃশংসতা হতেই পারে। কিন্তু মুসলমানরা যেহেতু ইসলামের অনুশাসন পালনে বাধ্য, তাই বড়দের সম্মান, শান্তিপ্রিয়তা ইত্যাদি ইসলামী নীতি মেনে চলে শত্রুকে নির্বিঘ্নে তাদের কর্ম সম্পাদন করতে দেয়া এবং তাদের কর্মকাণ্ডের পথে কোন ঝামেলা না বাধানোটাই মুমিনদের কর্তব্য। এককথায়, জালেমদেরকে জুলুমের কাজে সুবিধা করে দেবার লক্ষ্যে যতরকম বাহানা ও ফতোয়া আছে, সবই বিলাতে থাকে বিকৃতমনস্ক বিপথগামী চরিত্রের মানুষেরা।
কোন কোন ধর্মীয় ফেরকা আছে, যারা নিজেদেরকে একমাত্র সুপথগামী দল ও সহীহ হাদীস অনুসরণের একমাত্র কাণ্ডারী বলে দাবি করে, কিন্তু শুধু এই ন্যায়পরায়ণতার অভাবের কারণেই তাদের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে কেন জানি খলনায়কদের প্রশস্তি গাইবার বেলায় এদেরকে অধিক উৎসাহী দেখা যায়। যেই লোকটির অন্যায় ও জুলুমের ব্যাপারে সারা দুনিয়া একমত, যার অপরাধ দিবালোকের ন্যায় প্রকাশ্য ও দৃশ্যমান, যার অনাচার ও নৃশংসতার ভিকটিম স্বয়ং নবীজীর (সা.) প্রিয়তম দৌহিত্র, সেই লোকটিকে ইনিয়ে বিনিয়ে নির্দোষ প্রমাণ করা কিংবা লোকটি দোষী হয়ে থাকলেও সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করাটাকে নিষ্প্রয়োজন ও অনভিপ্রেত বলে আখ্যায়িত করার এক আজব প্রবণতা এই দলটির মাঝে লক্ষ্য করা যায়। মূলত: ন্যায়পরায়ণতার অভাব তথা নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতাই এদের এহেন আচরণের কারণ।
বিপথগামী লোকদের ব্যক্তিগত জীবনেও ইনসাফের অনুপস্থিতি দৃশ্যমান। জুলুম ও অসম বণ্টন এদের চিরন্তন নীতি। নিজের অধীনস্ত পরিবারের বা প্রতিষ্ঠানের মানুষদের মধ্যে আচরণ ও অধিকার বণ্টনে সমতা রাখতে পারে না। একাধিক স্ত্রী থাকলে স্ত্রীদের মধ্যে, নিজের সন্তানদের মধ্যে, পুত্রবধু ও জামাইদের মধ্যে, এমনকি নাতি-নাতনি শিশুদের মধ্যেও এরা একেক জনের জন্য একেক রকমের অধিকার বরাদ্দ করে। এদের মধ্যে যারা একটু বেশি খাডাস টাইপের, তারা এমনকি দুধের শিশুদের চাইতে প্রাপ্তবয়স্ক তাগড়া জোয়ান-জোয়ানীদের দিকে অধিক নেক নজর দিয়ে থাকে- অসুস্থ শিশুর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে সুস্থ সবল যুবক-যুবতী পুত্র-কন্যাদের  মুখে তুলে দেয় নির্দ্বিধায়। কর্ম বণ্টনের বেলায় একজনের জীবন ও সর্বস্ব বরবাদ করে হলেও অন্য সকলের বিলাসিতা নিশ্চিত করে। আর খাদ্য ও অধিকার বণ্টনের বেলায় একদলের জন্য দুধের সর ও মুরগীর সুপ এবং আরেক দলের জন্য দুধের পানি ও মুরগীর সাবা বরাদ্দ করে।
১৪। সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত সত্যকে পাশ কাটানোর প্রবণতা: সত্য যতই সুস্পষ্ট হোক, নিজেদের মতের সাথে না মিললে এরা সত্যকে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। বরং ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে তাদের নিজেদের দাবি ও ধারণাকে অটুট রাখার চেষ্টা করে। কোরআনের কোন আয়াত যদি নিজেদের আকীদা ও ধ্যান-ধারণাকে বাতিল প্রমাণিত করে, তখন তারা বলবে, এ আয়াতে আসলে একথা বোঝানো হয়নি, আপাতদৃষ্টিতে আয়াতের অর্থ এরূপ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ হয়তো বা অন্য কিছু। তাদের পীর কখনো অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় অসংলগ্ন কোনরূপ কথাবার্তা বলে ফেললে কিংবা পীরের কোন ভ্রান্ত বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা মানুষের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লে তারা বলবে, তিনি আসলে কথাটা এ অর্থে বলেননি, তিনি আসলে হয়তো অন্য কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। কখনো কোন ব্যাপারে সুস্পষ্ট সত্য দলিল জানতে পারলে আপনি হয়তো ভাববেন, এবার আর তারা যাবে কোথায়, এবার ঠিকই তাদের সামনে দলিল-প্রমাণ পেশ করে সত্য স্বীকারে বাধ্য করেই ছাড়ব; কিন্তু আপনি হয়তো ভাবতেই পারবেন না যে, সত্য গ্রহণকে এড়িয়ে যাবার ওজর তাদের কাছে তৈরিই থাকে।
শুধু বর্তমান যুগে নয়, সকল যুগেই এই পয়েন্টটা বিপথগামী চেনার একটি আলামত ছিল। আমাদের নবীজী (সা:) সহ সকল নবী-রসূলগণের সময়েই কাফেররা সুনির্দিষ্ট মোজেযা দেখার দাবি জানিয়ে সেই দাবি পূরণের শর্তে ঈমান আনার ওয়াদা দিত, কিন্তু তা দেখার সাথে সাথে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করত। যেকোন সুস্পষ্ট সত্য দেখার পর "এটা আসলে এরকম না, ওরকম"- এ টাইপের কথাই শোনা যায় বিভ্রান্ত দলগুলোর অনুসারীদের মুখে।
১৫। কুরআন অধ্যয়নকে নিরুতসাহিতকরণ: ভণ্ডপীরেরা তাদের মুরীদদেরকে সর্বপ্রথম যে দীক্ষাটি দিয়ে থাকে, তাহল- কোরআন বোঝা কি এতই সহজ? কোরআন বুঝতে হলে এই লাগে, সেই লাগে, আরো কত কী! অথচ আল্লাহ তাআলা স্বয়ং কোরআনে বলেছেন, "আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?" (সূরা ক্বামার: ১৭)
আমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের মধ্যে এ ধরনের লোকেরা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে ইচ্ছেমত পরিবর্তন সাধন করেছিল এবং নিজেদের মতামত ও সুবিধা অনুসারে কিছু যোগ করেছিল আর কিছু বাদ দিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর শেষ কিতাবের ক্ষেত্রে এ সুযোগ না থাকায় বর্তমানকালের বিভ্রান্ত লোকেরা আল্লাহর কিতাবের বেলায় যে নীতি গ্রহণ করেছে তা হল গোপন করা ও অপব্যাখ্যা করা। আর এ সুযোগটি তারা কেবল তখনই পেতে পারে, যদি সাধারণ মানুষ নিজেরা সরাসরি কোরআনের সংস্পর্শে না আসে। তারা চায়, সবাই তাদের আয়না দিয়ে কোরআনকে দেখুক। তারা কোরআনের যেটুকু শেখাবে, মানুষ শুধু সেটুকুই শিখবে; তারা কোরআনের যে বার্তাগুলো গোপন রাখবে, সে বার্তাগুলো মানুষের অজানাই থাকবে। তারা কোরআনকে যেভাবে শেখাবে, কোরআনের যে আয়াতের ব্যাখ্যা যেভাবে করবে, মানুষ সে আয়াতের অর্থ সেভাবেই বুঝবে। অতএব, তাদেরকে পাশ কাটিয়ে কেউ যাতে ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খেতে না পারে, অর্থাৎ তাদের কাছ থেকে তালিম না নিয়ে নিজেরা সরাসরি কোরআন অধ্যয়ন করতে না পারে, সে ব্যাপারে তারা সজাগ আছে এবং এ উদ্দেশ্যে নিজেরা কোরআনের পুরোহিত ও রক্ষক সেজে কোরআনের ক্ষেতে বেড়া বসিয়েছে। তারা মানুষকে বোঝাচ্ছে, কোরআন শেখা অত সহজ নয়। এনাদের মধ্যে কেউ বলেন, কোরআন শিখতে হলে যাহেরী-বাতেনী শরীয়ত-মারেফত সবরকম জ্ঞানে পণ্ডিত হতে হবে; আবার কেউ বলেন, আরবী ব্যাকরণ ও তর্কশাস্ত্রে পারদর্শী হতে হবে। আর তোমাদের যেহেতু এসব জ্ঞান কিছু নেই, অতএব তোমাদেরকে কোন কামেল পীর বা বিজ্ঞ আলেমের কাছেই কোরআন শিখতে হবে। একা একা শিখতে গেলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। অথচ প্রকৃতপক্ষে অন্যের কাছে শেখার চাইতে সরাসরি নিজে শেখাটাই অধিক নিরাপদ। কারণ, অন্য ব্যক্তি আমার চেয়ে বেশি পণ্ডিত হতে পারেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব স্বার্থ, চিন্তাধারা বা মতামত থাকতে পারে, যেটা তিনি কোরআনের নাম দিয়ে আমাকে শেখাতে পারেন, কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যাও তিনি নিজস্ব আঙ্গিকে করে দেখাতে পারেন। কিন্তু আমি নিজে যদি শিখি, তাহলে আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এবং কোরআনের কোন কোন আয়াত বুঝতে সাময়িক অসুবিধা বা ভুল হলেও কারো মনগড়া বিকৃত ব্যাখ্যার ফাঁদে পড়ে বিপথগামী হবার সম্ভাবনা তো থাকবে না। কোরআন শেখার প্রয়োজনে কোন নির্মোহ সুযোগ্য আলেমের সহায়তা আমি নিতেই পারি, কিন্তু কোন মতলববাজ ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ী চক্রের খপ্পরে যাতে না পড়ি সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। কোরআন শেখাকে এরা সার্জনের সার্জারী শেখার মতই কঠিন ও জটিল বিষয়ে পরিণত করেছে। কোরআন-হাদীসের সোল এজেন্টধারী পুরোহিত মশাইদের বলে দিতে চাই, নিজে নিজে কোরআন-হাদীস পড়ে মুফাসসির বা মুহাদ্দিস হওয়া না গেলেও আলেম হওয়া যায়, কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়া যায়। আমাদের বিশ্বাস ও কর্ম ঠিক রাখার জন্য, দৈনন্দিন জীবনে পথ চলার জন্য কোরআন যতটুকু বোঝা দরকার, ততটুকু বোঝার যোগ্যতা দিয়েই আল্লাহ আমাদেরকে কোরআনের নেয়ামত দান করেছেন। অতএব, আল্লাহর কালাম বোঝার জন্য কোন মাজার ব্যবসায়ী বা ফতোয়া ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হতে হবে না। কোরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী আল্লাহর কোন সৎ ও মুখলিস বান্দা আলেমকে যদি আমরা শিক্ষক হিসেবে পাই, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। অন্যথায় একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে আল্লাহর দেয়া আকল (বুদ্ধি) ও যোগ্যতা দিয়ে নিজেরাই আল্লাহর কালামকে অধ্যয়ন ও আতস্থ করব আমরা ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলার প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বান্দাই সম্পূর্ণ কোরআন বুঝে পড়ার সামর্থ্য রাখে। অবশ্য অভিজ্ঞতা ভেদে কোরআনে বর্ণিত কোন বিষয় বোঝার ব্যাপারটা কমবেশি হতে পারে; একই মানুষ কোরআনের একটা আয়াত একসময় একটু কম বুঝতে এবং আরেকসময় আবার ভালো করে বুঝতে  পারে।

১৬। তথ্য বিকৃতি: কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত তথ্য (ইতিহাস বা ভবিষ্যদ্বাণী) সরাসরি হুবহু বর্ণনা না করে একটু ঘুরিয়ে পেচিয়ে বক্রতার সাথে বর্ণনা করা। এদের বর্ণনার ধরন দেখলেই মনে হবে, নিজেদের সমর্থিত বা বিরুদ্ধ কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নেতা, দল, বাহিনী, গোত্র, সম্প্রদায়, রাষ্ট্র, সরকার বা প্রশাসনের দিকে নিয়ে যাওয়াই যেন উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে নিজেদেরকে আল্লাহ ও নবীর বর্ণিত সুসংবাদপ্রাপ্ত সুপথগামী দলভুক্ত এবং নিজেদের রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদী বা প্রতিপক্ষকে অভিশপ্ত বিপথগামী প্রমাণিত করবার প্রবণতাই ফুটে উঠবে। মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ করে যখনই কোন সাম্প্রদায়িক বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনই বিবদমান সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর মাঝে নিজেদেরকে ইমাম মাহদীর সৈনিক প্রমাণের এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এদের মধ্যে আবার একটি সম্প্রদায়ের মাঝে জালিয়াতির প্রবণতাটা একটু বেশী লক্ষ্য করা যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, মূলত: জাল হাদীসের উপর ভিত্তি করেই বুঝি উক্ত মাযহাবটি প্রতিষ্ঠিত। এরা বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ দিতে গিয়ে স্থান ও পাত্রের নাম উল্লেখ করে হাদীসের নামে বর্ণনা করতে থাকে। ভাব দেখে মনে হয়, ইমাম মাহদীকে এক্ষুণি বের করে ফেলবে, কাকে ইমাম মাহদী বানাবে তাও মনে হয় ঠিক করে রেখেছে। এদের ইমাম মাহদী যে কয়বার অদৃশ্য হবেন আর কয়বার পুনরাবির্ভূত হবেন তা বলা মুশকিল। নিজেদের প্রয়োজনমত এরা যখন ইচ্ছা ইমামকে নিরুদ্দেশ করবে আবার যখন ইচ্ছা ডেকে আনবে।
তথ্য বিকৃতিজনিত বিভ্রান্তি নির্ণয় করবার উপায় হল, তথ্যের আসল উৎস তথা আল কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রতিষ্ঠিত ধারণার সাথে মিলিয়ে দেখা। যেমন, কুরআন-হাদীসের আলোকে হযরত ঈসা (আ:) সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণা হল, শত্রুর হত্যা প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে তাঁকে আল্লাহ নিরাপদে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং পুনরায় তিনি আখেরী নবীর উম্মত হিসেবে আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিশেষ কার্য সম্পাদনের জন্য পৃথিবীতে আগমন করবেন। এখন এর বিপরীতে খ্রীস্টানরা যদি বলে, তিনি নিহত হয়েছিলেন এবং পুনরায় জন্মগ্রহণ করবেন; কিংবা মুসলিম নামধারী কোন বাতিল আকিদা পোষণকারী ঐতিহাসিক বা মুফাসসির যদি বলে থাকেন, তিনি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ  করেছেন এবং আর তিনি আবির্ভূত হবেন না; তাহলে এসব মতবাদের কোনটাই গ্রহণযোগ্য হবে না। ঈসা নবী সহ সকল নবী-রসূলগণকে প্রদত্ত আল্লাহ তাআলার মুজেযাসমূহকে অস্বীকার করাটাও হঠকারিতা আর গোয়ার্তুমি ছাড়া কিছুই নয়। আল্লাহর অনুগ্রহে আল্লাহ কর্তৃক ঈসা (আ:)-এর হাত দিয়ে মৃতকে জীবিত করবার ঘটনাকে স্রেফ 'মৃত জাতিকে জীবিত করবেন' বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাও আল্লাহর আয়াতকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করবার নামান্তর, যা কেবল মওলানা নামধারী বৃটিশ অনুচরের পক্ষেই সম্ভব। অথচ এক্ষেত্রে কোরআনে তো স্পষ্টভাবেই বলে দেয়া হয়েছে, যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা ইবনে মারিয়াম, তোমার প্রতি ও তোমার মাতার প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করো। যখন আমি তোমাকে পবিত্র আত্মা দ্বারা সাহায্য করেছিলাম। আর তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে। তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজিল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কাদামাটি দিয়ে আমার অনুমতিক্রমে পাখিসদৃশ আকৃতি গঠন করতে অতঃপর তাতে ফুৎকার দিতে, ফলে তা আমার আদেশে পাখি হয়ে যেত। জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার আদেশে নিরাময় করে দিতে এবং আমার অনুমতিক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে। আমি বনি ইসরাইলকে তোমার থেকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম, যখন তুমি তাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে, তারা বলল, 'এটা তো স্পষ্ট জাদু।' (সুরা আল মায়েদা : ১১০) অনুরূপভাবে, ইমাম মাহদী (আ:) সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণা হল, তিনি জন্মগ্রহণ করবেন এবং ৪০ বছর বয়সে হারাম শরীফে আত্মপ্রকাশ করবেন। এখন এর বিপরীতে কেউ যদি বলে, তিনি হাজার বছর আগে একবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তারপর আবার নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন, কিছুদিন পর আবার ফিরে আসবেন- তাহলে নবীর হাদীসে বর্ণিত তাঁর ৪০ বছর বয়সে আত্মপ্রকাশ, পিতার নাম আবদুল্লাহ ও মাতার নাম আমিনা হওয়া এগুলো কিছুই মিলবে না। আবার কেউ যদি দাবি করে, ইমাম মাহদী জন্ম নেবেন কোন সবুজ-শ্যামল দেশে, কিংবা খোরাসানের দিক বলতে যদি বাংলাদেশকে বুঝিয়ে বাংলাদেশের কোন বাতিল আক্বীদার ভণ্ডপীর গোষ্ঠীকে বুঝিয়ে থাকে, তাহলেও সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। চলমান বিষয় নিয়ে বিবদমান কোন পক্ষের তরফ থেকে হাদীসের নামে কোন ভবিষ্যদ্বাণী প্রচারিত হতে দেখলে সেটা যাচাই করবার জন্য কোরআন ও সহীহ হাদীসের শরণাপন্ন হবার পাশাপাশি ধর্মীয় ও ইতিহাসের বইপত্রের সাথেও মিলিয়ে দেখতে হবে, তবে বইগুলোর প্রকাশকালটাও বিবেচনা করে দেখুন। যে বইগুলো তুলনামূলক পুরাতন, যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট পরিচিত নায়কদের আবির্ভাবকালের অনেক পূর্বে, সে বইগুলোই গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে টপে থাকবে।
বাতিল আকীদাপন্থীরা শুধু ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ:)-এর ন্যায় শুভ শক্তির প্রতিনিধিগণকে নিয়েই তথ্য বিকৃতি করে না, এর বিপরীতে শয়তান ও দাজ্জালের ন্যায় অশুভ শক্তির প্রতিভূদেরকে নিয়েও তথ্য বিকৃতি করে। যেমন- শয়তান সম্পর্কে কোরআনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ধারণা হল, জিন জাতি নামক এক সৃষ্টিকূলের মধ্যে ইবলীস নামক এক ব্যক্তি ছিল এবং সেই ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে শয়তানে পরিণত হয়। এছাড়া জিন ও মানুষ জাতির মধ্যে যে বা যারাই আল্লাহদ্রোহিতা ও কুটিলতায় লিপ্ত হবে, মানুষ ও জিনদেরকে আল্লাহর বিরুদ্ধে কুমন্ত্রণা দেবে, তারাও শয়তান বা খান্নাস হিসেবে অভিহিত হবার যোগ্য। আর দাজ্জাল সম্পর্কে সহীহ হাদীসের আলোকে প্রতিষ্ঠিত ধারণা হল, শেষ জামানায় ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ:)-এর সময়কালে ইহুদীদের শাসক বা নেতা হবে দাজ্জাল। এছাড়া যেকোন চরম মিথ্যাবাদী ও কুচক্রী ব্যক্তিকেই দাজ্জাল বলে অভিহিত করা চলে। কিন্তু কিছু কিছু বিশেষ বিশেষ ঘরানার কথিত পীর সাহেবদের মুরীদেরা প্রচার করে, শয়তান কোন ব্যক্তির নাম বা উপাধি নয়। ইবলীস বা শয়তান নামে নির্দিষ্ট কারো অস্তিত্ব নেই। শয়তান মূলত: আমাদের মনের মধ্যেই। শয়তান বলতে শুধু আমাদের নাফস বা কুপ্রবৃত্তিকেই বোঝায়। আবার কোন কোন স্বঘোষিত জামানার মোজাদ্দেদ বা জামানার ইমাম আবিস্কার করে বসেন যে, দাজ্জাল নামে কোন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটবে না। দাজ্জাল বলতে নাকি কেবল বর্তমান ইহুদী-খ্রীষ্টান সভ্যতাকেই বোঝানো হয়েছে। অথচ ইহুদী-খ্রীষ্টানদের অস্তিত্ব ও দাপট এবং তাদের ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী কার্যকলাপ ও তৎপরতা তো পূর্ব থেকেই ছিল। এর মধ্যে এমন নতুন কী আছে, যার জন্য ঘটা করে রসূলুল্লাহ (সা:)-কে ভবিষ্যদ্বাণী করে যেতে হবে? নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই দাজ্জালকে টেনে বের করে আনা নিজেকে ইমাম মাহদী সাজানোর খায়েশ নয় তো? নবীর (সা:) হাদীসে বর্ণিত দাজ্জালের একচোখ কানা হওয়াটাকে এরা একচোখা বা পক্ষপাতিত্বমূলক দ্বিমুখী নীতির অর্থে গণ্য করে এবং পশ্চিমাদের দ্বিমুখী আচরণের উল্লেখ করে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতাকেই দাজ্জালরূপে চিহ্নিত করে। কিন্তু রূপক অর্থে একচোখা স্বভাব কি আর নতুন কিছু হল? পক্ষপাতী আচরণ তো আমাদের ঘরে ঘরেই থাকতে পারে। দ্বিমুখী নীতি তো আমাদের মা-বোনদের মাঝেই হামেশা available। যারা ইহুদী-খ্রীষ্টান সভ্যতাকেই দাজ্জাল সাব্যস্ত করে নিজেদেরকেই ইহুদী-খ্রীস্টানদের মোকাবেলায় প্রধান সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখাতে চায়, ইহুদী-খ্রীস্টানবিরোধী অতিরিক্ত জজবা ও অতি উতসাহী মনোভাব প্রদর্শন করে ইহুদী-খ্রীষ্টানবিরোধী মুসলিম জনগণকে নিজেদের দলে টানতে  চায়, তারা যে প্রকৃতপক্ষে ইহুদীদেরই ভাড়াটিয়া গোলাম বা ক্রীতদাস, তার প্রমাণ হল ইহুদীবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় সংগ্রামরত ফিলিস্তিনী মুসলিমদেরকে এরা বিপথগামী সাব্যস্ত করে। শয়তান ও দাজ্জাল বলতে শুধু যে একজন করেই আছে তা নয়। শয়তানের ক্ষেত্রে সত্য ব্যাপার হল, প্রধান শয়তান ছাড়াও জিন ও মানুষের মধ্যে তার সমপর্যায়ের কিংবা তার চাইতে কমবেশি একটু উচ্চ বা নিম্ন পর্যায়ের শয়তান রয়েছে যারা তার সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকে। এছাড়া মানুষের নাফসে আম্মারা বা কুপ্রবৃত্তিও ইবলীস শয়তানের তুলনায় কোন অংশে কম ক্ষতিকর নয় একথাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। দাজ্জালের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য যে, মূল দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বেও বিভিন্ন সময় অনেক ছোট-বড় জানা-অজানা দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে এবং একথাও সত্য যে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত ইহুদী-খ্রীষ্টান শক্তিগুলো মূলত: দাজ্জালেরই বাহিনী এবং দাজ্জালকে রিসিভ করবার জন্যই তারা পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে অপেক্ষমান। কিন্তু তাই বলে আসল শয়তান ও দাজ্জালের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা আল্লাহ ও রসূলের সুস্পষ্ট বাণী তথা কোরআন-হাদীসের প্রতিষ্ঠিত সত্যকে অবজ্ঞা করারই নামান্তর- যা কিনা বিপথগামী দলেরই বৈশিষ্ট্য। আসলে মূল দাজ্জালের অস্তিত্ব অস্বীকার করা আর ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণের চেষ্টা করা নিজেদের কাউকে মাহদী বা মাসীহ প্রমাণ করার লক্ষ্যেই প্রচারিত। আর এই মাহদী বা মাসীহ দাবি করার প্রবণতা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উচ্চাভিলাষবশতও হতে পারে, আবার ইসলামের শত্রুদের ইন্ধনে মুসলমানদের ঈমান-আকীদা বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যেও হতে পারে।
শেষ জামানায় ইমাম মাহদী পূর্বকালীন ঘটনাবলীতে মুসলিম ও বিধর্মীদের মধ্যকার লড়াইয়ে বিধর্মীদের মধ্যকার কোন্‌ গ্রুপটির সাথে মুসলমানদের সাময়িক কৌশলগত ঐক্য হবে এবং কোন্‌ পক্ষটির বিরুদ্ধে সমবেতভাবে সম্মিলিতভাবে লড়াই করতে হবে, সে ব্যাপারেও বর্তমানে বিবদমান প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের চয়েসকৃত ও নিজেদের সাথে জোটবদ্ধ গোষ্ঠীকেই নবীর বর্ণিত সেই সম্ভাব্য মিত্রপক্ষ হিসেবে প্রমাণ করা এবং অপর পক্ষটিকে নবীর হাদীসে বর্ণিতপ্রধান শত্রু (যার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম লড়াই করতে হবে) হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস চালায় নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে কোরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা করবার মাধ্যমে। কোরআনের কিছু আয়াত থেকে এমন সব হাস্যকর ব্যাখ্যা দাড় করায়, যা কিনা আসলে তাদের নিজেদেরই বিপক্ষে যায়। সূরা মায়েদার এক আয়াতে যেখানে মুসলমানদের সবচেয়ে প্রধান শত্রু হিসেবে ইহুদী ও মুশরিক সম্প্রদায়কে নির্দেশ করা হয়েছে এবং খ্রীস্টানদেরকে তাদের তুলনায় মুসলমানদের মিত্রতার দিক থেকে কাছাকাছি বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে, সেই আয়াতের রেফারেন্স তুলে ধরে এরা বর্তমানে খ্রীস্টানদের মধ্য থেকে যেই গোষ্ঠীকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে সেটাকে জাস্টিফাই করতে চায়। এ আয়াতে উল্লেখিত মুশরিক বলতে তারা খ্রীস্টানদের মধ্যকার তাদের প্রতিপক্ষ গ্রুপটিকে বুঝিয়ে থাকে নানা তুচ্ছ অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করার মধ্য দিয়ে, অথচ জগতে মুশরিক বলতে প্রধানত যে প্রকাশ্য মূর্তিপূজারী পৌত্তলিক সম্প্রদায়কে বোঝায় এবং বর্তমানেও যাদের উগ্র মুসলিম-বিদ্বেষের কথা সর্বজনবিদিত, সেই গোষ্ঠীর সাথে নিজেদের মিত্রতার বিষয়টি এড়িয়ে যায়। আবার যেই খ্রীস্টানদেরকে তুলনামূলক মিত্র হবার কারণ হিসেবে তাদের অপেক্ষাকৃত বিনয়ী হওয়া এবং তাদের মধ্যে সংসারবিরাগী সাধু-সন্ন্যাসীদের অস্তিত্ব থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই খ্রীস্টানদের বোঝাতে এরা এমন জাতির উদাহরণ দিচ্ছে, যাদের দেশে এতকাল মসজিদ-গীর্জা সব নিষিদ্ধ ছিল, আল্লাহ বা ঈশ্বরের নাম মুখে আনাটা দণ্ডনীয় ছিল; সবেমাত্র তারা ধর্মের ব্যাপারে সেই  চরমপন্থী অবস্থান থেকে খানিকটা সরে আসলেও এবং সীমিত মাত্রায় ধর্মকর্মের চর্চা করবার অনুমতি দিলেও পররাষ্ট্রনীতিতে কোন পরিবর্তন আনেনি, বসনিয়াকে মুসলিমশূন্য করবার কাজে প্রকাশ্যে সক্রিয়ভাবেই সহযোগিতা করেছে। এছাড়া এখনো যে কমুনিষ্ট রাষ্ট্রটিতে নামায-রোযা নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয়, সেই রাষ্ট্রটির সাথেও এদের সম্পর্ক ও মৈত্রী পূর্ববত বহাল আছে। আর সাধু-সন্ন্যাসীদের আশ্রম ও মঠ ব্যবস্থা শুধু একটা দেশেই আছে, এমন একটা হাস্যকর দাবি করে নিজেদের মিত্র দেশটিকে রসূলুল্লাহ (সা:)-এর বর্ণিত মুসলমানদের মিত্রশক্তি প্রমাণের প্রচেষ্টা চরম হাস্যকর। আর মুসলমান বলতে কি শুধু মুসলমানদের একটা ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু মাযহাবের অধিকারী এটি মাত্র রাষ্ট্রকে বোঝায়? বাদবাকি বিশ্বের মুসলমানরা কাদেরকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করল সেটা কি বিবেচ্য বিষয় নয়? মুসলমানদের কাছে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মিত্রশক্তি হিসেবে ধর্মকর্ম নিষিদ্ধকারী নাস্তিক্যবাদী পরাশক্তিকে খ্রীস্টান নাম দিয়ে গ্রহণ করে নিচ্ছেন, আর পাশ্চাত্য খ্রীস্টানদের দেশগুলোতে যেখানে অন্তত মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতাটুকু আছে তাদেরকে তুলনামূলক বড় শত্রু ঠাওরাচ্ছেন? তারপর আবার বেকুবের মত সূরা রূমের রেফারেন্স দিয়ে তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্যের অধিকৃত এলাকাগুলোর মধ্যে কোন্‌টা বর্তমানে কার দখলে আছে তা দেখাচ্ছেন, অথচ রোমানদের রাজধানীটা এখন কোন্‌ দেশের মধ্যে পড়ে তা কি দেখতে পাচ্ছেন না? আর যে পারস্যের বিরুদ্ধে রোমানদের বিজয়কে মুসলমানরা উদযাপন করবে বলে সূরা রূমে ভবিষ্যদ্বাণী করা ছিল, সেই পারস্য দেশটির অধিকারী এখন কারা, তাও কি বলে দিতে হবে? উপরের দিকে থুথু নিক্ষেপ করলে যে দশা হয় আর কী! আসলে নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা আর নিজেদের সমর্থিত পক্ষকে হক প্রমাণে মানুষ যখন অন্ধ ও দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন শুধু ক্যথলিককে অর্থডক্স আর অর্থডক্সকে ক্যাথলিক নয়, নারীকে পুরুষ আর পুরুষকে নারী বানাতেও তাদের বাধে না। গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় একেই বলে, "বোঝে না সাধ বাধ, ঘোড়ার ধনকে কয় কলার কাত।" আরেকটা কথা, ইমাম মাহদী আবির্ভাবের পূর্বে খ্রীস্টানদের বিবদমান দুটি দলের মধ্যে যে দলটির সাথেই মুসলমানদের Alliance হয়ে থাকুক না কেন, সেটা হবে সাময়িক মৈত্রী এবং পরবর্তীতে সেই মিত্র দলটিও শত্রুতে পরিণত হবে আর তাদের বিরুদ্ধেই মুসলমানদেরকে যুদ্ধ করতে হবে ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে।  সুতরাং তাদের প্রশংসায় এতটা পঞ্চমুখ হয়ে ওঠার কিছু নেই। কোরআনে সংসারবিরাগী সূফী খ্রীস্টান বলতে যাদের বোঝানো হয়েছে, যাদের মধ্যে কোন অহংকার বা বিদ্বেষ নেই, তারা আদৌ কোন রাষ্ট্র, রাজনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদির মধ্যে জড়িত নয়; বর্তমানকালে বা ইমাম মাহদীর আবির্ভাবকালে বিবদমান কোন পরাশক্তিই তাদের মধ্যে পড়ে না।
মুসলিম উম্মাহর মাঝে যখন একেকটা বিপথগামী দলের আবির্ভাব হয়, কোরআনের প্রতিষ্ঠিত আকীদার বিপরীত তত্ত্ব নিয়েই হাজির হয়। ইতিহাসে একসময় এমন একটা দলের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা মিরাজের ঘটনাকেই স্বীকার করত না। অথচ মিরাজের ঘটনা কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে একাধিক জায়গায়। সূরা বনী ইসরাইলে বায়তুল মোকাদ্দাস গমন এবং কোরআনের অপর এক স্থানে জিবরাইল (আ:) প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে ঊর্ধ্বজগতে যে স্থানে জিব্রাইলের সাথে নবীজীর (সা:) সাক্ষাত হয়েছিল সে স্থানের নাম উল্লেখ করে বর্ণনা করা হয়েছে। মিরাজ অস্বীকারকারীরা মিরাজের ঘটনাকে নিছক একটা স্বপ্ন বলে উল্লেখ করে। অথচ স্বপ্নে ঊর্ধ্বজগত ভ্রমণ আদৌ কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনাই নয় এবং স্বপ্নে যেকোন স্থানে গমন করা যেকোন সাধারণ মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
বাতিলপন্থী দলগুলো নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য কোরআনের যেকোন সূরা থেকে খেয়ালখুশীমত যেকোন একটা আয়াতকে তুলে এনে নিজেদের বক্তব্যের সাথে জুড়ে দেয় এবং দাবি করে যে, আয়াতটি তাদের বক্তব্যের সমর্থনেই নাযিল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আয়াতটি তাদের বর্ণিত বিষয়ের সাথে সম্পর্কবিহীন হলেও আয়াতের বাক্য, উপদেশ ও শব্দচয়নকে কৌশলে নিজেদের বর্ণিত ঘটনার সাথে সেট করে দেয়। যেমন, সূরা মায়েদার ৬৭ নং আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, "হে রসূল, পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।"- এ আয়াতটিকে গদীরে গুমের ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত করে। তাদের বক্তব্য হল, এই আয়াতটি নাযিল হবার পরই নাকি রসূলুল্লাহ (সা:) আলী (রা:)-কে নিজের উত্তরসূরী খলীফা হিসেবে ঘোষণা প্রদান করেন। কিন্তু আয়াতটির পূর্বাপর আয়াতসমূহ যদি অধ্যয়ন করেন, দেখতে পাবেন, এখানে মূলত ইহুদী-খ্রীষ্টানদের অবাধ্যতা সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে এবং ইহুদী-খ্রীস্টানরা যে (নিজেদের সুবিধা ও মতের বিপক্ষে গেলে) আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না সেকথাই তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, তাদের মনের কামনা ও প্রতিক্রিয়ার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে রসূলুল্লাহ (সা:) যেন নির্দ্বিধায় তাদের যেকোন মোকদ্দমা ও বিচার-ফয়সালা আল্লাহর বিধান অনুসারেই সম্পন্ন করেন, সেই তাগিদই দেয়া হয়েছে এ আয়াতে। এখানে আল্লাহর অবতীর্ণ আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের কথা পৌঁছে দেয়া বা প্রকাশ করার কথাই বোঝানো হয়েছে, নির্দিষ্ট কাউকে খলীফা মনোনীত করার কথা ঘোষণা দেবার কোন তথ্য পূর্বাপর কোন আয়াতে পাওয়া যায়নি। আল্লাহ কর্তৃক নবীকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করবার নিশ্চয়তা বলতে আল্লাহর বিধানকে অপছন্দকারী ইহুদী-খ্রীস্টানদের অসন্তোষ ও সমালোচনা থেকে রক্ষা করবার কথাই বলা হয়েছে, কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খলীফা ঘোষণা করলে সেই ঘোষণার বিরোধিতা থেকে বাঁচাবার কোন কথা বোঝানো হয়নি। আর রসূলুল্লাহর (সা:) হাতে ইসলামের বিজয় সম্পন্ন হবার পর তাঁরই জীবদ্দশায় কোন মুসলমান তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত বা বিরুদ্ধাচরণ করবেন- এমনটি ছিল অকল্পনীয়, সুতরাং এ বিষয়ে এ ধরনের কথা নাযিল হওয়াটাও ছিল নিষ্প্রয়োজন। এমনকি বিদায় হজ্জ্বের শেষে আল-কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত, "আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম ও আমার নেয়ামত বা অবদানকে তোমাদের উপর সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।" (সূরা মায়িদা-৩)- এ আয়াতটি বর্ণনা করতে গিয়েও ঐ বিশেষ সম্প্রদায়ের লোকেরা ব্যক্তির নাম টেনে আনে এবং দাবি করে যে, এ আয়াত নাযিলের পর নবী করীম (সা:) নাকি আলীর (রা:) বেলায়েতের উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন মর্মে উল্লেখ করেছেন। তাদের বক্তব্যের মর্মার্থ হল, আলী (রা:)-কে মওলা নির্বাচনের মধ্য দিয়েই দ্বীনের পরিপূর্ণতা এসেছে। আবার ধরুন, কোরআনে বর্ণিত 'আল্লাহর রজ্জু' বলতে আল্লাহর পথ তথা আল্লাহর বিধানকে বোঝাই স্বাভাবিক। আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে থাকা বলতে বোঝায় আল্লাহর পথে অটল অবিচল থাকা এবং আল্লাহর হুকুমের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। আর এই আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে জানার উৎস হিসেবে আমরা প্রথমত আল্লাহর কোরআন এবং দ্বিতীয়ত নবীর (সা:) কথা ও নির্দেশনা তথা হাদীসকেই জানি। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর রজ্জু বলতে আল্লাহর হুকুমকে না বুঝিয়ে আল্লাহর কোন সম্মানিত বান্দাগণকে বুঝিয়ে থাকে, তাহলে এটা অপ্রাসঙ্গিক ও হাস্যকর ব্যাখ্যা বলেই মনে হয়। আল্লাহর নবীর পরিবার এবং সম্মানিত সাহাবাগণ আল্লাহর পথেই ছিলেন, আল্লাহর রজ্জুকেই সঠিকভাবে আঁকড়ে ছিলেন, তাই তাঁদেরকে অনুসরণ করলেও সেটা আমাদের পক্ষে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে থাকার বেলায়ই সহায়ক হবে, একথা সত্য। আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে থাকার কাজে মাধ্যম বা উছিলা হিসেবে তাঁরা গণ্য হতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে আল কোরআনে আল্লাহর রজ্জু বলতে আলী (রা:) ও ফাতেমা (রা:)-কেই বোঝানো হয়েছে, এ কথার তো কোন ভিত্তি নেই।
বিপথগামীরা হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে হাদীসের শব্দচয়নও পাল্টে দেয়। যেমন- আমরা জানি, বিদায় হজ্জ্বে প্রদত্ত বিখ্যাত ভাষণে নবীজী (সা:) বলেছিলেন, "আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে থাকলে কিয়ামত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। এর একটি হল আল্লাহর কিতাব, অপরটি হল আমার সুন্নাহ।" কিন্তু একটি বিভ্রান্ত সম্প্রদায় আছে, যারা এ হাদীসের 'সুন্নাহ' শব্দটির পরিবর্তে 'আহলে বাইত' বলে বর্ণনা করে। আর আহলে বাইত বলতে তারা নবী পরিবারের কেবল চারজনকেই বোঝায়। [উম্মাহাতুল মু'মিনীনগণকে সুকৌশলে নবী পরিবারের বাইরে রেখেছে কোন কোন উম্মুল মু'মিনীনের প্রতি তাদের রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। আর এটা প্রমাণের জন্য স্বয়ং সংশ্লিষ্ট উম্মুল মু'মিনীনের জবানী দিয়ে হাদীসও বের করে রেখেছে।] এখন কথা হল, নবী প্রিয়জনদের সম্মানিত চারজন কি কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবেন? তাহলে নবীজী (সা:) তাঁদেরকে আমাদের মাঝে রেখে গেলেন কি করে? কোরআন আর সুন্নাহ তো কাগজের পাতায় লিখিত অবস্থায় এবং মানুষের মুখে ও স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে আমাদের কাছে থাকাটা বোধগম্য। কিন্তু যারা আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁদের বেলায় তো এটা বোধগম্য নয়। আমাদের মাঝে সশরীরে উপস্থিত না থেকেও যাদের কথা, কর্ম ও আদর্শ আমাদের জন্য অনুসরণীয়, তাদের মধ্যে তো প্রথমত রয়েছেন স্বয়ং আমাদের নবী করীম (সা:) নিজেই এবং দ্বিতীয়ত রয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম সহচরগণ, যাদের অনুসরণের বাধ্যবাধকতা স্বয়ং কোরআন দ্বারাই প্রমাণিত। কিন্তু প্রথমত নবীকে এবং দ্বিতীয়ত নবীর সকল সম্মানিত বিশিষ্ট সাহাবীগণকে বাদ দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র নির্ধারিত চারজন সাহাবীকে অনুসরণের কথা নবীজী (সা:) বলতে যাবেন কেন? অবশ্য একথা সত্য যে, আহলে বাইতকে অনুসরণ করলেও নবীর সুন্নতকেই অনুসরণ করা হবে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনকে অনুসরণ করলেও কার্যত নবীর সুন্নতকেই অনুসরণ করা হবে, যেহেতু তাঁরা প্রত্যেকেই নবীর সুন্নতের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণকারী ছিলেন। কিন্তু তাই বলে তো 'সুন্নাহ' শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে 'আহলে বাইত' বা অন্য কোন শব্দ স্থাপন করে দেয়া যায় না। নবীর হাদীস বর্ণনা করতে হবে হুবহু তিনি যেভাবে বলেছেন সেভাবে। নবীর কথার ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন বিপথগামীদেরই বৈশিষ্ট্য।
জাল হাদীস চেনার উপায় হল, যে হাদীস কোন এক সম্প্রদায়ের অনুকূলে ও আরেক সম্প্রদায়ের প্রতিকূলে হবে, এক পক্ষকে বা এক পক্ষের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে অতিরিক্ত প্রশংসা করা হবে এবং আরেক পক্ষকে বা আরেক পক্ষের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে অতিরিক্ত নিন্দাবাদ করা হবে, একটি গ্রুপকে সম্মানিত ও অপর কোন গ্রুপকে লাঞ্ছিত (humiliate) করা হবে, সে হাদীসই ব্যক্তিস্বার্থে বা গোষ্ঠীস্বার্থে প্রণীত উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরী manipulated হাদীস হিসেবে গণ্য হবে। অনুরূপভাবে, যে হাদীসকে কোন ব্যক্তি বা শ্রেণীর স্বার্থের অনুকূলে বা অভিলাষ পূরণে সহায়ক বলে মনে হবে, সে হাদীসও মনগড়া হিসেবে ধর্তব্য হবে। যেমন- "মেয়েদের মাসিক হবার আগেই বিয়ে দেয়া ফরজ", এ ধরনের কথা কন্যাদায়গ্রস্ত (কন্যাকে দায় বা বোঝা মনে করে এমন) পিতা ও অল্পবয়সী মেয়েদের বিবাহ করতে ইচ্ছুক পুরুষদের সুবিধার্থেই রচিত ও প্রণীত বলে মনে হয়।
বিভ্রান্ত, গোঁড়া ও একগুঁয়ে ব্যক্তিরা নিজেদের মত ও বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করবার নেশায় অন্ধ হয়ে কোরআনের আয়াতের অনুবাদও নিজেদের ইচ্ছামত করে থাকে। যেমন- "وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ"- এই আয়াতের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, "কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না"; কিন্তু কেউ কেউ এর অর্থ করে, "মুনাফিকরা ফকীহ হতে পারে না।" অথচ ফেকাহ শাস্ত্রের উৎপত্তি হয়েছে কোরআন নাযিল সমাপ্তি ও নবীজীর ওফাতের বহু বছর পরে। এছাড়া আয়াতের আলোচ্য বিষয়ের দিকে তাকালেও ফকীহ কে হতে পারে, কে পারে না এ বিষয়ের কোন নামগন্ধ পাওয়া যায় না। অথচ স্রেফ ফকীহগণের আনুগত্য তথা তাকলিদের পক্ষে এবং নিজের প্রতিপক্ষ তথা গায়েরে মুকাল্লিদদের বিপক্ষে দলীল দেখাতে গিয়ে কোন কোন অতি উৎসাহী কট্টরপন্থী ব্যক্তি কোরআনের আয়াতের অর্থই মনগড়াভাবে করে ফেলেছেন। ফেকাহ তথা কোরআন-হাদীস গবেষণা করে শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল বের করা একটি গৌরব ও সম্মানের কাজ এবং কোন মুনাফিক এ কাজের যোগ্য নয়, একথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু তাই বলে এটা প্রমাণ করতে গিয়ে কোরআনের আয়াতকে ইচ্ছেমত রদবদল করা কোন সুপথগামী ব্যক্তির কাজ হতে পারে না।

১৭। ভোল পাল্টানো: মানুষকে বিভ্রান্ত করবার উদ্দেশ্যে প্রচারিত কোন একটা তত্ত্ব বা দাবি যখন হালে পানি না পায়, তখন সেই দাবি থেকে সরে এসে বিভ্রান্তিকর অন্য কোন দাবি পেশ করা। কোন ব্যক্তি এবং তার অনুসারী সম্প্রদায় দুইশত বছর ধরে সেই ব্যক্তির পক্ষে নবুয়তী দাবি করে আসার পর যখন দেখল যে, সচেতন মুসলিম জনগণের কাছে ঐ ভুয়া ও অবাস্তব দাবি আর ধোপে টেকে না, তখন নবুয়তের দাবি ছেড়ে দিয়ে শুধু ইমামত আর খেলাফতের দাবি করতে শুরু করে। আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নবী দাবির পরিবর্তে শুধু মাহদী আর মাসীহ দাবি করেই সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, তারা জানে, মুমিনদের ঈমান নষ্ট করা তথা বিপথগামী করবার জন্য কোন ভুয়া ব্যক্তিকে নবী সাজানোটা জরুরী নয়, বরং ভুল ব্যক্তিকে মাহদী বা মাসীহ মানাটাও বিভ্রান্তির জন্য যথেষ্ট।

১৭। সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ: আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।" যারা শুধু মিথ্যার উপরেই থাকে, সব কথা মিথ্যাই বলে, তাদেরকে চেনা সহজ, তাদের থেকে সাবধান থাকা যায়। কিন্তু যারা কিছু সত্য আর কিছু মিথ্যা অবলম্বন করে, তাদের দ্বারা মানুষ বিভ্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ, যখন সত্য ও মিথ্যা কথা একসাথে প্রচার হয়, তখন সত্য কথার দ্বারা মানুষ আকৃষ্ট হয়, সত্যের দ্বারা মানুষের কাছে বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জিত হয়, ফলে তার প্রচারিত মিথ্যাকেও গ্রহণ করানো সম্ভব হয়।
১৮। প্রশ্নের সম্মুখীন হতে অনীহা এবং লুকোচুরি মনোভাব:

১৯। ব্যক্তিগত বিষয়কে ধর্মের নামে চালানো: নিজের বা নিজেদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে কিংবা কারো প্রতি নিজেদের ব্যক্তিগত আক্রোশ বা হিংসা-বিদ্বেষকে ধর্মের নাম দিয়ে চালানো; অর্থাৎ আমি বা আমরা এ কাজটা ধর্মের জন্য করছি বা করতে চাচ্ছি, অমুক ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে আমরা ধর্মীয় বা আকীদাগত কারণে খারাপ মনে করি এমনটি দাবি করা ভণ্ডামি ও বিপথগামিতার আলামত। যেমন- কোন ব্যক্তির ধর্মীয় এলেম ও পাণ্ডিত্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে এবং ধর্মের নামে নিজেদের ফেরকাবাজি ও ফতোয়াবাজির ব্যবসায় ব্যাঘাত ঘটবার আশংকায় সেই ব্যক্তির প্রতি বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও যদি প্রচার করা হয়, অমুক ব্যক্তি ভণ্ড, বিপথগামী ও ইসলামের শত্রুদের দালাল বলেই আমরা তাকে অপছন্দ করি, তাহলে এমন প্রচারণার দ্বারা মূলত নিজেদের ভণ্ডামি আর বিপথগামিতাই প্রকাশ পায়।
২০। দুনিয়া কামানোতে দ্বীনের ব্যবহার এবং ধর্মের নামে কৃত সংগ্রামে জৈবিক প্রণোদনা: বিপথগামী দলের নেতা এবং সুযোগসন্ধানী মতলববাজরা দ্বীন ও দুনিয়া সবকিছুকেই নিজেদের স্বার্থ বা অশুভ উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করে। যারা ধর্মব্যবসায়ী, তারা ধর্মের নাম দিয়ে নিজেদের অর্থবিত্ত ও প্রতিপত্তি অর্জন করে থাকে। কেউ মাজারের নামে চাঁদা তোলে, কেউ পীর সেজে হাদিয়া ভোগ করে, কেউ আলেম সেজে ফতোয়া দিয়ে বা জনগণের কাছে নিজেদের আস্থা ও ভক্তি-শ্রদ্ধাকে কাজে লাগিয়ে একে রিজিক হাসিলের একটা উৎস হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকে। আবার যারা ধর্মের নামে যুবকদেরকে বিপথগামী করে রাষ্ট্র ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, তারা অদ্ভুতভাবে তাদের মোটিভেশন প্রক্রিয়াতে ধর্মের সাথে জাগতিক ও জৈবিক কামনাকেও যুক্ত করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত হাসিলের কথা বলার পাশাপাশি তাদের ইন্দ্রিয়কামনা ও জৈবিক অনুভূতিতেও নাড়া দিয়ে উত্তেজিত করে থাকে। যেমন- কোন এক গরীব টোকাইকে একটা ফাইভ স্টার হোটেল দেখিয়ে বলা হল, ঐ হোটেলে কি তুই কোনদিন থাকতে পারবি? তা যখন পারবিই না, তখন মরে গিয়ে শহীদ হয়ে যা, এর চেয়ে বড় হোটেল বেহেশতে গিয়ে পাবি। অথবা বয়:সন্ধিকালের কোন এক কিশোর-যুবককে বলা হল, তুই কি তোর পছন্দের নায়িকাকে বা তোর পছন্দের মেয়েটিকে কোনদিন পাবি? তা যখন পাবিই না, তখন তাড়াতাড়ি ওখানে গিয়ে আত্মাহুতি দে, সাথে সাথে বেহেশতের হুর পেয়ে যাবি। অথচ হোটেল শেরাটনে থাকতেই হবে, কিংবা নায়িকা ঐশ্বরিয়াকে বা নিজের ক্লাসের পছন্দের মেয়েটাকে পেতেই হবে, এটা কোন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না। মুসলমানের জীবনের লক্ষ্যও ভোগকেন্দ্রিক নয়, তা সে দুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ হোক বা বেহেশতের দ্রব্যসামগ্রী হোক। বরং একজন মুসলমান তো আরো উন্নত ও মহৎ উদ্দেশ্যকে ধারণ করবে, যেই উদ্দেশ্য দিয়ে তাকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। যারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যিকার মুজাহিদ, তাদের দলে লোক রিক্রুট করবার জন্য যুবকদেরকে পার্থিব উচ্চাভিলাষ, বিলাসিতা ও নারীসম্ভোগের বাসনাকে উষ্কে দেবার প্রয়োজন হয় না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দ্বীনের মর্যাদা সমুন্নত রাখা আর মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ সাধনের মহত্তর লক্ষ্য ও চেতনাই তাদের মোটিভেশনের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহর দ্বীনের কাজ করবার বিনিময়ে আল্লাহর কাছ থেকে পার্থিব ও পারলৌকিক প্রতিদান লাভের আশা তারাও করে, জান্নাত লাভের ইচ্ছা তাদেরও আছে, কিন্তু শুধু ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাদের কর্মপ্রেরণার উৎস হিসেবে কোনদিনও স্থান পায় না। কিন্তু যাদের লক্ষ্য ও ভূমিকা আল্লাহর দ্বীন ও মুসলিম স্বার্থের অনুকূল নয়, যাদের কার্যকলাপ মানবতার পক্ষে নয়, তাদেরই দলে লোক বাগানোর জন্য মানুষের রসনেন্দ্রিয় আর জননেন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করবার প্রয়োজন হয়।

১৭। মূর্খতা ও অজ্ঞতা: ইসলামের নামে ইসলাম বহির্ভূত ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা পোষণ ও প্রচারকারী দলগুলোর মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী লোকজনের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এসব দলের কাছে যেহেতু কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণের গুরুত্ব নেই, নিজেদের খেয়ালখুশী ও মনগড়া চিন্তাধারার অনুসরণেই এরা চলে, তাই এদের মাঝে কোরআন-হাদীসের চর্চাও নেই, আর কোরআন-হাদীস জানা মানুষ তাদের দলে খুব একটা যায়ও না। এ কারণে তারা যখন কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে কোন কথা বলতে যায়, তখনই তাদের অজ্ঞতা ও দুর্বলতা ধরা পড়ে যায়। এমন কোন দলের কোন নেতা বা পীর যখন এমপি নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে যায়, তখন সেখানে গিয়েও ভাষণ দিতে গিয়ে বলে বসে, "কোরআন শরীফে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হুব্বুল ওয়াত্বানি 'আলাল ঈমান।" অথচ এ বাক্যটি হাদীস হবার ব্যাপারেই মতভেদ রয়েছে এবং অনেকেই বলে থাকেন, এটা আদতে হাদীসই নয়, বরং একটি আরবী প্রবাদ মাত্র। বিশেষ করে নেতৃস্থানীয় লোকজন মূর্খ হওয়াটা একটি দলের জন্য বিপথগামী হবারই আলামত।

১৮। ধর্মীয় পরিভাষাগুলো সর্বদা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল উচ্চারণে করা। যেমন- ইসলাম না বলে এসলাম, মুসলিম না বলে মোসলেম, ইমামের পরিবর্তে এমাম, মুসলমানকে মুশলমান ইত্যাদি। তবে যেসব শব্দ মাতৃভাষায় আঞ্চলিক রূপান্তরিত উচ্চারণে করা সহজ হওয়ায় সাধারণ মানুষের দ্বারা বহুলভাবে উচ্চারিত হতে হতে ভাষার অংশে পরিণত হয়ে গিয়েছে এবং এসবের উচ্চারণকে কোন বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর পরিভাষা বলে মনে হয় না, সেসব শব্দের বেলায় এমনটি প্রযোজ্য হবে না। যেমন- কুরআনের স্থলে কোরআন, মুহাম্মাদ (সা:)-এর পরিবর্তে মোহাম্মদ (সা:), উমারের বদলে ওমর, হিকমাত না বলে হেকমত এভাবে উচ্চারণ করলেও সেটা কোন বিপথগামিতার আলামত হিসেবে ধর্তব্য হবে না। কিন্তু যেসব শব্দের মূল উচ্চারণ মাতৃভাষায় বহাল থাকা সত্ত্বেও এবং সেই মূল শব্দটি অবিকলভাবে উচ্চারণই তুলনামূলক অধিক সহজ হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি অপ্রচলিত অথচ পরিবর্তিত উচ্চারণে করে থাকে এবং এই উচ্চারণগত পার্থক্যের দ্বারাই নিজেদের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করে থাকে, তাহলে এটা বিভ্রান্ত দলেরই এক ছোটখাটো আলামত বটে।

১৯। মিথ্যা কৃতিত্ব দাবি করার প্রবণতা: সত্যিকার মুমিনের মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কিন্তু ভণ্ড ও রিয়াকারদের ব্যস্ততা থাকে কেবল মানুষের কাছ থেকে নিজেদের পক্ষে সুনাম ও প্রশংসা লাভ করা। তাও আবার সত্য-মিথ্যা যেকোন উপায়ে। তারা শুধু নিজের করা কাজের স্বীকৃতি পেয়েই ধন্য হয় না, বরং যেখানে তাদের কোনরূপ অবদান বা ভূমিকা নেই সেখানেও নিজেদের নাম জাহির করতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তুমি মনে করো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের উপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে তারা আমার নিকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুতঃ তাদের জন্য রযেছে বেদনাদায়ক আযাব।" (সূরা আল-ইমরান: ১৮৮) দয়াময় আল্লাহ তাঁর স্বাভাবিক নিয়মে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মুমিনদের সাহায্য করে থাকেন, শত্রুদেরকে গযব দিয়ে থাকেন। কিন্তু বিভ্রান্ত লোকেরা যেখানে যা ভাল কিছু হতে দেখে, তার পিছনে নিজেদের ব্যক্তিগত বা দলীয় কৃতিত্ব দাবি করে বসে। যেমন- পৃথিবীর কোথাও কোন জালেম রাষ্ট্রের উপর ঘূর্ণিঝড় বা দাবানল আসল, তখন দাবি করে বসল এটা আমাদের হুজুরের দোয়ার কারামত। আবার কোন নির্যাতিত মুসলিম জনপদে মুসলিম বাহিনী শত্রুর মোকাবেলায় একটু ঘরে দাড়ালো, তখন বলতে শুরু করল, আমাদের অমুক অমুক মওলানা সাহেবের (সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা ও দীক্ষাগুরু) লেখা বইপত্র পড়া তরুণেরা যেই না বসনিয়ায় ঢুকল, অমনি যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। কোন ব্লগে আমাদের কোন একটা সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ লেখা পাওয়া গেল, আর অমনি সেই লেখাটা হুবহু কপি করে নিজেদের দলীয় পত্রিকায় পেস্ট করে দিয়ে তার শেষে উপসংহার যুক্ত করে দিল, একমাত্র আমাদের হুজুরের কাছেই এই সমস্যাটির সমাধান রয়েছে। যদি একথা বলত, ইসলামে বা কোরআনে সমাধান রয়েছে, তাহলে না হয় বুঝলাম ইসলাম প্রচারে এদের আন্তরিকতা আছে। কিন্তু শুধু নেতা ও দলের মাহাত্ম্য তুলে ধরাতেই এদের ব্যস্ততা- সত্য-মিথ্যা যেকোন প্রকারেই হোক, নিজের লেখা দিয়ে হোক বা অন্যের লেখা চুরি করে হোক।
এ ধরনের লোকেরা (অর্থাৎ এসব দলের প্রতিষ্ঠাতা বা গুরুরা) প্রচণ্ড রকমের অহংকারী ও প্রচারকামী হয়ে থাকে।

২৬। দুর্বোধ্যতা ও রহস্যময়তা: আল্লাহর দ্বীন সহজ ও সরল। সুতরাং আল্লাহর দ্বীনের কথাবার্তাও হবে সহজ, সরল ও সাবলীল এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য। কিন্তু বিভ্রান্ত দলগুলোর সদস্য ও প্রচারকদের কথাবার্তা হয়ে থাকে ভুতুড়ে মার্কা, দুর্বোধ্য, অগোছালো, বিক্ষিপ্ত, রহস্যময় ও খাপছাড়া টাইপের। বাতিলপন্থীদের বক্তব্য হয়ে থাকে অস্পষ্ট ও রহস্যাবৃত। কারণ, দ্বীনের ব্যাপারে স্পষ্ট মিথ্যা সহজেই ধরা পড়ে যায়। তাই যেকোন বাতিল আকীদার প্রচারে সর্বদা অস্পষ্টতা ও লুকোচুরির আশ্রয় নিতে হয়। কারণ, কথাবার্তা স্পষ্ট না হলে তা সহজে দলীল দ্বারা খণ্ডন করা যায় না, কিংবা খণ্ডন করা হলেও তাদের ধ্যান-ধারণাগুলো অস্পষ্ট ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ করে রাখায় তাদের পূর্বের বক্তব্যকে অন্য কোন নতুন ব্যাখ্যার আড়ালে পাশ কাটিয়ে ফসকে যাবার সুযোগ থাকে।
তাদের প্রচারিত হাদীসগুলোর বক্তব্য অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট হয়ে থাকে, যা থেকে কারো পক্ষে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয় না। এরা যেকোন আলোচনা ও বিতর্কের সময় প্রচুর উদ্ধৃতি মারে, কিন্তু তার সবই হয় বিক্ষিপ্ত ও অপ্রাসঙ্গিক। বিপথগামী মুসলমানরা কোরআনের উদ্ধৃতি ও নাস্তিকেরা বিজ্ঞানের (সেই সাথে মাঝে মাঝে কোরআনের) উদ্ধৃতি দিতে দিতে পাঠক বা শ্রোতাদের মোহিত করে ফেললেও এর দ্বারা নিজেদের দাবি, বক্তব্য ও থিউরী প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় না, কিন্তু পেরেছে বলে মনে করে বা ভাব দেখায়। শুধু চাপাবাজির জোর বা প্রতিপক্ষের অজ্ঞতার সুযোগ গ্রহণ ছাড়া এদের ভ্রান্ত ও বিকৃত মতবাদ চালিয়ে দেয়া বা তর্কে জয়লাভ করা সম্ভব হয় না। এদের পেশকৃত রেফারেন্স কোরআনের পাতা উল্টিয়ে একনজর মিলিয়ে দেখাই এদের যুক্তির বহর ও পাণ্ডিত্যের বেলুন ফুটা করে দেবার জন্য যথেষ্ট। কারণ, তাদের দেয়া উদ্ধৃতি বরাবরই বিকৃত ও খণ্ডিত হয়ে থাকে। এসব ছেঁড়া-কাটা ও manipulated রেফারেন্স ছাড়া তাদের ভাণ্ডারে তাদের বক্তব্য ও তত্ত্বের সমর্থনে এমন কোন অবিকৃত intact দলীল নেই, যা সৎসাহস নিয়ে কোরআন-হাদীসের পাতা খুলে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যায়। তাদের পেশকৃত যেকোন আয়াত সাথে সাথে কোরআনের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পুরো আয়াতটি বা পূর্বাপর দু'একটি আয়াতসহ পড়ে দেখলেই তাদের যে বক্তব্যের সমর্থনে উক্ত আয়াতটি পেশ করা হয়েছে সেই বক্তব্যকে খণ্ডন করে দেয়া যায়। এ কারণে তারা কোরআনের চাইতে অন্যান্য উৎসের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। অজ্ঞাত ও অসমর্থিত হাদীস অথবা কথিত ওলী-বুযুর্গ বা ইমামের রেফারেন্স দিয়ে তাদের কোরআনবিরোধী কথাকে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়।
২০। ধর্ম নিয়ে ন্যাকামি ও হীনমন্যতা:

২১। ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ব্লাকমেইল: বিপথগামীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্লাকমেইলের মাধ্যমে এমন একটা চাপ ও আবহ তৈরি করে যে, আমার কথার সাথে যে একমত না হবে সেই কাফের হয়ে যাবে। নিজেদের যুক্তি একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য মানুষকে ভয় দেখিয়ে দুর্বল করার কৌশল অবলম্বন করে, যাতে কেউ নিজের ঈমান ও ধর্মবিশ্বাস প্রশ্নের সম্মুখীন হবার ভয়ে তাদের যুক্তি খণ্ডন করতে না আসে।

২৮। মনগড়া বাহুল্য: ধর্মের মধ্যে নেই এমন অতিরিক্ত মনগড়া আচার-অনুষ্ঠান ও কার্যকলাপ ধর্মের নামে পুণ্যের নিয়তে করা, এককথায় বেদআতী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া। এর অনেকগুলো আলামতের মধ্যে আবার বিধর্মী ও ইসলামবিরোধীদের সাথে বিপথগামী মুসলিম গ্রুপগুলোর মিল ও সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন- ধোঁয়া, আগুন, ঢোল-তবলা ও উচ্চস্বরে বিকট আওয়াজকে এবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করা। ধর্মীয় স্থান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জাঁকজমক ও সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও অমুসলিমদের সাথে ভণ্ড মুসলিমদের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
২১। চরমপন্থী ও উগ্রপন্থী চেনার উপায়ঃ চরমপন্থী ও উগ্রপন্থীদের চেনার সাধারণ আলামত দুটি; যথা-
(ক) এরা থিউরিবাদী হয়ে থাকে, অর্থাৎ প্রাকটিক্যালের উপর থিউরিকে প্রাধান্য দেয়। বলতে গেলে কেবল থিউরিকেই গুরুত্ব দেয়, প্রাকটিক্যালকে মোটেই গুরুত্ব দেয় না। এরা শুধু শাস্ত্রটাই বোঝে, মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ বিবেচনা করে না। আবার শাস্ত্রের মধ্যেও শুধু নিজেদের নির্বাচিত খণ্ডিত অংশটুকুই আমল করে, বাকি সব তাদের কাছে উপেক্ষিতই থেকে যায়। একপেশে শাস্ত্র অনুসরণের উদাহরণ হল, একদল ডাকাত একজন নিরীহ নির্দোষ মানুষকে ধাওয়া করতে করতে আপনাদের কাছে এসে তার সন্ধান চাইল। এখন আপনারা যদি শুধু "সদা সত্য কথা বলিবে"- এই একটা নীতিবাক্যের উপরই আমল করে থাকেন, তাহলে জেনেশুনে ঐ নিরপরাধ লোকটির সর্বনাশ সাধন করা হবে। আর যদি থিউরির পরিবর্তে প্রাকটিক্যালকে অর্থাৎ মানুষের বাস্তব কল্যাণকে আমলে নিয়ে থাকেন, তাহলে মানুষটি বেঁচে যাবে। কিন্তু একজন চরমপন্থী বা থিউরিবাজ ব্যক্তি ঐরূপ পরিস্থিতিতে শুধু শাস্ত্রের একটা কথাকেই প্রাধান্য দেবে। শাস্ত্রে যে মানুষের প্রতি দয়া করার নির্দেশ আছে, মানুষের জীবন রক্ষা করা যে কোরআনের হুকুম, জালেমদের সাহায্য করা যে শাস্ত্রমতে নিষিদ্ধ- এই বিধি-বিধানগুলোর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবে না। দয়া-মায়া ও কল্যাণ কামনার অনুপস্থিতিই মানুষকে গোড়ামির উপর কায়েম থাকতে প্ররোচিত করে। এর বিপরীতে যারা মধ্যপন্থী, সত্যের ও আদর্শের প্রতিষ্ঠা তারাও চায়- তবে যেকোন উপায়ে বা যেনতেন প্রকারে নয়।
(খ) নির্দিষ্ট কিছু গদবাঁধা শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার। এরা চলনে-বলনে, উঠতে-বসতে একই বুলির চর্বিত চর্বনে অভ্যস্ত। এদের সাথে আলাপ করবার সময় এদের ঘরানার বাইরের যে কোন স্বাভাবিক মানুষের কাছে এদের যাবতীয় কথাবার্তাকে আজাইরা প্যাচাল, একঘেয়ে, বিরক্তিকর ও খ্যাত মনে হবে। বামপন্থীদের কমন শব্দমালা ছিল 'শ্রেণী সংগ্রাম', 'শ্রেণী চরিত্র', 'পুঁজিপতি', 'মেহনতি মানুষ'। আর ইসলামের নামে যারা সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করছে, চরমপন্থী তৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলো হচ্ছে 'তাওহীদ', 'তাগূত'। তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও তাগূতের উৎখাত যদিও ইসলামেরই বিধান এবং নবী-রসূলগণেরই মিশন, কিন্তু এই শব্দগুলো যারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার ব্যবহার করে এবং কেবল এ শব্দগুলো দিয়েই মনের মত করে গদবাধা কিছু বাক্য রচনা করে, তখন তা শুনে মনে হয় কিছু একটা অন্যরকম উদ্দেশ্য আছে। তাদের হাবভাব, মতিগতি ও কথার ধরন দেখেই মনে হয়, তাওহীদ কায়েম ও তাগূত নিধন তাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং তাওহীদ প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের মনগড়া বিকৃত মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা এবং তাগূত নিধনের নামে মানুষ হত্যার ধান্ধা খোঁজাই তাদের আসল খেয়াল। সত্যিকার তাগূতেরা কেউ তাদের তাগূতের তালিকায় কোনদিন স্থান পেয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। এরা আল্লাহর আইন কায়েমের দাবি করলেও এদের দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের বা আল্লাহর বান্দাদের কোন উপকার হয় না, কেবল শয়তানেরই খেদমত হয়। অতীতে এরূপ একটি বিপথগামী জঙ্গিগোষ্ঠী কুরআনের একটি আয়াত "ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ" (আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম বা সার্বভৌমত্ব চলবে না)-কে নিজেদের শ্লোগান বানিয়ে যখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি শুরু করেছিল, তখন আলী (রা:) বলেছিলেন, "কথা সত্য, মতলব খারাপ"- যা একটি ঐতিহাসিক প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়। কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় কোন মতলববাজ অশুভ চক্রের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন, বশীভূত, মগজ ধোলাইকৃত বা সম্মোহিত হয়ে থাকার লক্ষণই হল ঘুরেফিরে একই শেখানো বুলি বারবার আওড়াতে থাকা।

সারাংশ/নির্বাচিত অংশ: এতক্ষণ আমরা বিভ্রান্ত দলসমূহের প্রায় দু'ডজনের মত আলামত বিশদভাবে আলোচনা করলাম। এগুলোর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আলামত ও বৈশিষ্ট্য অধিকাংশ বিপথগামী দলের মধ্যেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে, তবে সবগুলো সব দলের মধ্যে নাও থাকতে পারে। তবে এগুলোর মধ্যে দু'টি কমন আলামত এমন আছে, যা পৃথিবীর প্রত্যেকটি বিভ্রান্ত দলের মধ্যেই ষোলআনা বর্তমান থাকবে। এ দুটো হলো-
(১) ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ আনুগত্য: আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে পূজনীয় জ্ঞান করা এবং আল্লাহর নবী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি বিশেষকে অন্ধ আনুগত্যের যোগ্য মনে করা।
(২) তথ্য বিকৃতি আর কোরআনের অপব্যাখ্যা: কোরআনের ব্যাপারে বা যেকোন ব্যাপারে আসল কথা ও আসল সত্যকে সোজাসুজি না বলে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া।
এককথায়, আল্লাহর হুকুমকে "সামি'না ওয়া আত্ব'না" (শুনলাম ও মানলাম) বলে নির্বিবাদে একবাক্যে মেনে নেবার পরিবর্তে ছলচাতুরী, ধানাই-ফানাই ও টালবাহানার আশ্রয় নিয়ে এবং মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর পরিবর্তে গায়রুল্লাহর (অর্থাৎ নিজের প্রবৃত্তি কিংবা নিজেদের পছন্দমত কোন ব্যক্তি বা দলবিশেষের) আনুগত্য করবার প্রবণতাই বিপথগামীদের বৈশিষ্ট্য। তাদের মধ্যে কেউ ইজতিহাদের নামে, আবার কেউ হেকমতের নামে আল্লাহর হুকুমকে এড়িয়ে নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। মূলত: কোরআনবিমুখতাই বিপথগামীদের সর্বপ্রধান সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য।

বিভ্রান্তি ছড়ানোর উৎস ও মাধ্যম: বিভ্রান্তিমূলক আকীদা বা ধারণার উৎপত্তি কিভাবে হয় এবং তা কিভাবে দ্রুত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যায়, তা একটু জেনে নেয়া যাক। প্রবাদ আছে: one picture = 1000 words। একইভাবে বলা যায়, one video = 1000 pictures, one poem/song = 1000 story/articles। সত্যিই, ভাল-মন্দ যেকোন ধারণা, তত্ত্ব বা তথ্য গান ও কবিতার মাধ্যমে যতটা সহজে ছড়ানো যায়, বক্তৃতা, গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধের মাধ্যমে অতটা ছড়ায় না। গান ও কবিতার মাধ্যমে সুরে সুরে ছন্দে ছন্দে একটা জিনিস শিশুদের মুখে মুখেও ছড়িয়ে পড়তে পারে অনায়াসে। একসময় পালাগানের মাধ্যমে জাল হাদীস ও আজাইরা বিতর্ক সমাজে ছড়িয়ে পড়তো। আমাদের জনপ্রিয় শিল্পী আবদুল আলীমের অধিকাংশ গান ইসলামের উপকারে আসলেও মাত্র দুটি গান মুসলমানদের ঈমান-আকীদার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে- 'যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কি দোষ!', আরেকটি হচ্ছে- 'প্রেম কইরাছেন ইউসুফ নবী!'। এসব গান একদিকে যেমন আল্লাহ ও নবী-রসূলদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দেয়, অপরদিকে তেমন মানুষকে নিজের পাপকর্মের উপর সন্তুষ্ট থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের কুকর্মের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শনে মানুষকে ইন্ধন যোগায়। কী আশ্চর্য! একজন নবী যে বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করার অপরাধে জেল খাটলেন, জেল খাটার পরও যে কাজটি না করার ব্যাপারে অনড় থাকলেন, তাঁর নামে প্রচার করা হচ্ছে তিনি নাকি সেই কাজটি করতে চাওয়ার কারণে জেল খাটলেন, আর জেল খাটার পরও সেই জিনিসটি ছাড়লেন না! ছোট ছোট দু'একটি গান কিভাবে অনায়াসে মানুষের আকীদা ও আখলাক দুটোই জলে ডুবিয়ে দিচ্ছে, তারই এক দৃষ্টান্ত এটি। উল্লেখ্য, যত রকমের কুফরী ও শেরেকী আকীদা ও ধ্যান-ধারণা আছে, তার অধিকাংশই মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে গান এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

বিভ্রান্তি সংক্রমণের কারণ: সঠিক আকীদার তুলনায় ভ্রান্ত আকীদা জনমনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে মূলত সঠিক আকীদার পক্ষে রক্ষাকবচ ও সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকবার কারণে। ভ্রান্ত ধারণার কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এর মোকাবেলায় সঠিক ধারণার অক্সিজেন সরবরাহ বাতাসে কম থাকায় ভ্রান্তির দৌরাত্ম্য রোধ করা সম্ভবপর হয় না। সন্তানদের আকীদা-বিশ্বাসের সুরক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের কোন তাগিদ বা গুরুত্ব নেই বললেই চলে। অভিভাবকদের যত ধ্যান, সাধনা, মুরাকাবা, মুশাহাদা, মুজাহাদা সব কেবল একটি বিন্দুতেই নিবদ্ধ- যেকোন প্রকারে নিজের সন্তানকে ক্লাসের পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়াতে হবে। এর বাইরে কেউ কেউ আবার অন্যান্য জিনিসের দিকেও মনোযোগ দেন, তবে তা এমন সব জিনিসের দিকে, যা মানুষকে ধর্মের দিকে ধাবিত করবার পরিবর্তে ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়; যেমন- নাচ, গান, চিত্রাঙ্কন, ইংরেজি শেখা ইত্যাদি। এসবের বিপরীতে সন্তানকে ধর্মের শিক্ষা দেবার ব্যাপারে, ধর্মের সঠিক আকীদায় দীক্ষিত করার ব্যাপারে তেমন কোন পর্যাপ্ত ও কার্যকর উদ্যোগ নেই। বাচ্চাদের ধর্মশিক্ষাদানের জন্য কি করেছেন- এ প্রশ্নের জবাবে শতকরা ৮০ ভাগ বাঙ্গালী মুসলমানের কাছেই যে জবাবটি পাবেন তা হল, হুজুরকে দিয়ে আরবী পড়াচ্ছি। কায়দা পড়া অর্ধেক শেষ হয়েছে, বাকিটা সম্পন্ন হলেই কোরআন শরীফ দেখে পড়তে পারবে। ভেবে দেখুন, বাচ্চারা যেখানে নাচ-গান থেকে শুরু করে বাতিল আকীদার বই-পুস্তক ও সাহিত্য সবই পাচ্ছে মাতৃভাষায়, সেখানে আল্লাহর কালাম শুধু আরবী অক্ষর দেখে না বুঝে তেলাওয়াত করতে শেখা তাদেরকে ভ্রান্ত আকীদার আধিপত্য থেকে কতটা সুরক্ষা দেবে? কার বাচ্চা কার বাচ্চার আগে আরবী পড়া শিখতে পারল, কে কতবার কোরআন শরীফ খতম দিতে পারল, এ নিয়ে গর্ব ও প্রতিযোগিতা হতে পারে, কিন্তু দ্বীন রক্ষা হয় না। অধিকাংশ মুসলমান আরবী অক্ষর শেখাকে ধর্মশিক্ষা হিসেবে গণ্য করে, শুধু তাই নয় ধর্মশিক্ষা বলতে শুধু আরবী অক্ষর শেখাকেই বোঝে এবং বাচ্চাকে ধর্মশিক্ষাদানের দায়িত্ব হিসেবে এটুকুই যথেষ্ট মনে করে। কিন্তু কোরআনে বর্ণিত ও নির্দেশিত ইসলামের মৌলিক আকীদা ও ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াটাই যে শৈশবের প্রথম কাজ এবং কৈশোর ও বাল্যকালে পর্যায়ক্রমে আল্লাহ প্রদত্ত হুকুম-আহকাম ও আদেশ-নিষেধ সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করাটাই যে আসল কর্তব্য, এই বিষয়টাতে প্রায় সকলেই উদাসীন। অনেক অভিভাবককে আফসোস করতে শুনবেন, ছেলেটা আগে প্রত্যেক ক্লাসে ফার্স্ট হতো, কিন্তু হায়, শেষ পর্যন্ত কিভাবে নষ্ট হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, তারা নষ্ট হওয়া বলতে কেবল পরীক্ষার রেজাল্টের অবনতিই বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু ছেলের চারিত্রিক অবক্ষয় বা আকীদাগত বিচ্যুতি নিয়ে কোন আক্ষেপ করতে দেখা যায় না কোন অভিভাবককে। ছেলেটা বয়সের কারণে কোন নৈতিক সমস্যায় পড়ল কিনা, কিংবা বিভ্রান্ত কোন ব্যক্তি, পুস্তক বা দলের প্রভাবে আকীদা-বিশ্বাসের দিক থেকে কোন বিভ্রান্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ল কিনা, এ নিয়ে অভিভাবকদের কোনরূপ মাথাব্যথা হয় না। এককথায়, আকীদা সংরক্ষণের দিকটা উপেক্ষিত ও অবহেলিত থাকবার কারণেই বিভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনা সহজেই সংক্রমিত হতে পারে কিশোর ও যুব সমাজের মাঝে।

ভ্রান্তিকে আঁকড়ে থাকার কারণ: মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে বা বিপথগামী হতে পারে হয় না বোঝার বা না জানার কারণে, অথবা কুপ্রবৃত্তির কারণে। যদি স্বার্থচিন্তা ও কুপ্রবৃত্তি প্রাধান্য পায়, তাহলে ভুল বা অন্যায় জেনেশুনেও মানুষ সেই ভ্রান্ত পথকেই আঁকড়ে থাকতে পারে। আর না বুঝে যারা ভ্রান্তিতে পতিত হয়, তাদের মধ্যে যারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, তারা ভ্রান্তিকে বোঝার বা চিহ্নিত করার সাথে সাথে ভ্রান্ত পথ বা আকীদা ত্যাগ করে সঠিক পথে চলে আসে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পরও যারা ভুলকে আঁকড়ে থাকে, তা মূলত হয়ে থাকে অহংকারবশত। কারণ, মানুষের স্বভাবে এমন একটি অযৌক্তিক ইগো ভাব কাজ করে, যার প্রভাবে মানুষ ভুল স্বীকার করাটাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করে।

পথভ্রষ্টতার ভয়াবহতা: সত্য সরল পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের পথের রেললাইন থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুতিই মানুষকে ছিটকে অনেক দূরে নিক্ষেপ করে। একবার যদি কেউ নিচের দিকে নামতে শুরু করে, তাহলে সে যে কতটা নিচে গিয়ে নামতে পারে, কতটা জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তা চিন্তাও করা যায় না। অধ:পতন মানেই কোন বস্তুর নিচের দিকে পতন, ক্রমশই নিচে, যার কোন শেষ নেই। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়,

বিভ্রান্তির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ: বিভ্রান্তির উৎপত্তি ঘটে ক্ষুদ্র পরিসরে, আর তার ক্রমবিকাশ ঘটে বিবর্তনের মাধ্যমে।
বিভ্রান্তির প্রকারভেদ: মানুষ বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার দুইটি প্রকার রয়েছে। এর একপ্রকার হল না বুঝে বা ভুল বুঝে বিভ্রান্ত হওয়া। আমরা সাধারণত বিভ্রান্তি বলতে মানুষের এ অবস্থাকেই বুঝি। আর
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বলে অভিহিত করেছেন। উপরোক্ত পয়েন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর নির্দেশিত এই মধ্যমপন্থা ও ন্যায়বিচারের নীতিকে যারা ধরে থাকতে পারেনি, তারাই পথহারা বিভ্রান্তদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

বিপথগামিতা থেকে বাঁচার উপায়

বিভ্রান্ত বা বিপথগামী দল চেনার উপায় তো জানলাম। কিন্তু কথা হল, বিভ্রান্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে নিজেরা বাঁচা এবং সন্তান-সন্তুতিদেরকে বাঁচানোর উপায় কি? দিনকাল যা পড়েছে, বিপথগামিতার রাস্তা কিন্তু একটি বা দুটি নয়, বরং বহু। শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার বিষয়বস্তু, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গদোষ ও কুপ্ররোচনা, বিভিন্ন বিপথগামী দলের campaign ও প্রচারণা ও প্রকাশনা ইত্যাদির পাল্লায় পড়ে কম জ্ঞানসম্পন্ন বা কম সতর্ক শিশু থেকে বুড়ো পর্যন্ত যে কেউ যেকোন একটা বিপথগামিতার রাস্তা ধরে বসতে পারে। যেকোন মানুষ যেকোন সময় যেকোন ভাবে যে কারো দ্বারা বিপথগামী হওয়া সম্ভব। সঠিক আকীদা হারিয়ে ভ্রান্ত আকীদায় দীক্ষিত হওয়া থেকে আত্মরক্ষা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষার জন্য মূলত: দুটি উপায় অবলম্বন করতে হবে; যথা-

(১) কুরআন শিক্ষা করা
(২) বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে প্রতিষেধক (preventive) ব্যবস্থা গ্রহণ করা

(১) কুরআন শিক্ষা করা: কোরআনের জ্ঞান যদি কেউ একবার অর্জন করতে পারে, আল্লাহ প্রদত্ত সঠিক চিন্তা-বিশ্বাস ও আকীদা যদি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে অন্য কারো  বিভ্রান্তিকর প্রচারণা দ্বারা তার বিপথগামী হবার সম্ভাবনা থাকে না। খ্রীষ্টান মিশনারীরা পর্যন্ত স্বীকার করেছে যে, যে মুসলমান একবার কোরআন শরীফ অর্থসহ শিখেছে, তাকে আর ধর্মত্যাগী মুরতাদ বানানো সম্ভবপর হয়নি। তবে এই কোরআন শিক্ষাটা দিতে হবে জীবনের একদম প্রারম্ভে, অন্য কিছু শিখে ওঠার আগেই। কারণ, বাতিল আকীদা বা মন্দ স্বভাব একবার যদি অন্তরে বসে যায়, তাহলে তার পরে আর কোরআন শতবার বুঝে পড়লেও আর হারানো ঈমান বা চরিত্র ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে দাড়ায়। আর এই কোরআন শিক্ষাটা অন্য কারো মাধ্যমে না শিখিয়ে সরাসরি নিজে শিখতে পারলেই ভাল। কারণ, অন্য কেউ যখন শিখাবে, তখন তার নিজস্ব অভিমত বা দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে শিখাবে। পক্ষান্তরে, নিজে খোলা মন নিয়ে নির্দোষভাবে আল্লাহর হুকুম জানার নিয়তে শিখতে পারলে অন্য কারো হস্তক্ষেপ  ছাড়া সরাসরি আল্লাহর বক্তব্যটাই জানার তওফীক হবে।
আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।" আমাদের দেশে প্রচলিত অর্থে কোরআন শিক্ষা বলতে আরবী অক্ষর শিক্ষাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। কোরআন শেখা বলতে কোরআন দেখে পড়তে পারাকেই মানুষ বুঝে থাকে। কিন্তু এটা তো কেবল শেখার পূর্ব প্রস্তুতি মাত্র। শুধু অক্ষর জ্ঞান শেখা মানে তো কোরআন শিক্ষা নয়। কোরআন শিক্ষা বলতে প্রকৃতপক্ষে মূলত: কোরআনের বক্তব্য শেখাকেই বোঝায়। মনে করুন, এক ব্যক্তি সমগ্র কোরআন শরীফ মুখস্থ করেছে কিংবা দেখে সমগ্র কোরআন শরীফ সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াত করতে পারে, কিন্তু একটা আয়াতেরও অর্থ জানে না। আরেক ব্যক্তি পুরো কোরআন শরীফের বাংলা অর্থ শিখে কোরআনের বক্তব্য অনুধাবন করেছে এবং মূল কোরআনের থেকে শুধু নামাজ পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় দু'একটি সূরা শুনে শুনে মুখস্থ করেছে। এই দুই ব্যক্তির মধ্যে আপনি কাকে কোরআন শিক্ষায় শিক্ষিত বলবেন, কোরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী বলবেন? বাংলার অধিকাংশ মানুষ প্রথমজনকে কোরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত বললেও আমি দ্বিতীয় জনকেই কোরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত বলে মনে করি। কারণ, কোরআনের জ্ঞান থেকে উপকৃত হবার সুযোগ দ্বিতীয় জনেরই বেশি।
পড়া বা পাঠ করাকে ইংরেজিতে বলে reading, আরবীতে বলে তেলাওয়াত। মুখস্থ করাকে ইংরেজিতে বলে memorizing, আরবীতে বলে হেফজ করা। আর শেখা বা অধ্যয়ন করাকে ইংরেজিতে বলে যথাক্রমে learning বা study করা, আরবীতে বলে 'আল্লামা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা কোরআন পড়া ও শেখা উভয়ই করতে বলেছেন। যেহেতু শিখতে হলে পড়তে হবে, তেলাওয়াত না শুনে কোরআন বোঝা যাবে না, তাই আল্লাহ আমাদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করতে বলেছেন। যারা আরব, তাদের তেলাওয়াতের দ্বারাই শেখার কাজটা একবারে হয়ে যায়, যদি একটু মনোযোগ থাকে অর্থাত অন্যমনস্ক না থাকে। আমরা যারা অনারব, আমাদের কোরআন শিক্ষার ফযীলত হাসিল করতে হলে হয় আরবী ভাষা শিখতে হবে, অথবা নিজ নিজ মাতৃভাষায় কোরআনের অনুবাদ পড়তে হবে। কেউ কেউ বলে থাকেন, কোরআনের মূল পাঠ ছাড়া শুধু অনুবাদ পাঠ করা সঙ্গত নয়। এক্ষেত্রে আমরা বলব, যে আরবী ভাষা জানে তার তো বাংলা অনুবাদের প্রয়োজনই হবে না। আর যে আরবী বোঝে না, তার তো অনুবাদের সাথে মূল পাঠ থাকলেও অনুবাদের ভুল ধরতে পারবে না। তবে যারা আরবী ভাষা ওরকম না বুঝলেও কোরআনের আরবীগুলো মোটামুটি বোঝেন, তাদের জন্য কোরআনের মূল টেক্সট সহ অনুবাদ পাঠ করাই উত্তম।
কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় বইপত্রও পাঠ করাতে হবে। বিশেষত শিশু অবস্থায় কোরআন পড়ে সবকিছু বোঝার সামর্থ্য অর্জনের আগ পর্যন্ত সরল ভাষায় অল্প কথায় ধর্মের মৌলিক শিক্ষাগুলো মৌখিকভাবে বা সহজবোধ্য বই-পুস্তক পড়ানো বা পড়তে দেবার মাধ্যমে শিখিয়ে দেয়া দরকার হয়। আর সেক্ষেত্রে পুস্তক নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। শিশুদের উপযোগী ইসলামী বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে ...

(২) বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে প্রতিষেধক (preventive) ব্যবস্থা গ্রহণ করা: আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখতে পাই, ইবলীস এবং ইহুদী-খ্রীস্টানদের বিপথগামী হবার জন্য তিনটি অভিন্ন কারণ ছিল; যথা- অহংকার, হিংসা ও ফয়সালা মেনে নিতে অনীহা। ইবলীসের মনে অহংকার ছিল তার নিজের সৃষ্টি উপাদানের (আগুনের) শ্রেষ্ঠত্ব অপরের (আদমের) সৃষ্টি উপাদানের (মাটির) চাইতে অধিক বিবেচনা করা এবং দীর্ঘদিনের এবাদত-বন্দেগির সুবাদে অর্জিত নিজের মান-মর্যাদা নিয়ে। বংশ ও আমল উভয় দিক দিয়ে সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ  মনে করেছিল। তার হিংসা হয়েছিল নিজের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণ্ন হতে দেখে এবং সেই সম্মানটা আরেকজনকে লাভ করতে দেখে। নিজের পরিবর্তে আরেকজনকে সম্মান প্রদানের সিদ্ধান্তটাও সে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি; ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ, অহংকার ও ঈর্ষাবশত সে আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। একইভাবে ইহুদীরাও বংশমর্যাদায় দুনিয়াবাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল। তাই তারা আশা করত, জগতের শ্রেষ্ঠ নবী তাদের বংশেই প্রেরিত হবে। কিন্তু যখন দেখল, এ মর্যাদা অন্য কোন বংশে প্রদত্ত হয়েছে, তখন তা তাদের আভিজাত্যবোধ ও অহংকারকে জাগ্রত করল। আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীকে জন্মদানের গৌরব অন্য বংশকে লাভ করতে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল। নিজেদের পরিবর্তে অন্য বংশে শেষ নবী প্রেরণের খোদায়ী ফয়সালাটা তারা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।
অহংকার, হিংসা ও ফয়সালা মেনে নেবার মানসিকতা না থাকা হচ্ছে মানুষের নাফসের তিনটি কুপ্রবৃত্তি, যা সাধারণ অবস্থায় কবীরা গুনাহ। আর এই দোষগুলো যখন বর্ধিত আকারে প্রকাশ পায়; এগুলোর প্ররোচনায় সৃষ্ট বিবাদ ও অসন্তোষ যখন শুধু সৃষ্টির সাথে সীমাবদ্ধ না থেকে স্রষ্টার অবাধ্যতা ও স্রষ্টার সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় রূপ নেয়, তখন তা কুফরে পর্যবসিত হয়। অহংকার যখন অপর কোন মানুষের মোকাবেলায় হয়, তখন তা সাধারণ গুনাহ। আর অহংকার যখন আল্লাহর সামনে নিজেকে বড় ভাবতে প্ররোচিত করে, তখন তা প্রকাশ্য কুফর ও বিদ্রোহ হিসেবেই গণ্য হবে। হিংসা যখন নিছক ব্যক্তিগত কারণে হয়, তখন তখন তা ফিসকের পর্যায়ে পড়লেও হয়তো কুফরের পর্যায়ে পড়বে না। কিন্তু হিংসুক ব্যক্তি যখন অপর কারো প্রতি হিংসায় এতটাই কাতর হয়ে পড়ে যে, যাকে সে হিংসা করছে তাকে প্রদত্ত সুখ-সম্পদ বা মর্যাদাটা স্বয়ং আল্লাহরই সিদ্ধান্ত, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট বলেই তাকে সম্মানিত করেছেন- একথা জানার পরও হিংসার উপর কায়েম থাকে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, "তারা কি মানুষকে হিংসা করে সেই জিনিসের জন্য, যা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে দান করেছেন?" (সূরা নিসা: ৫৪) আবার ফয়সালা মেনে নেবার ক্ষেত্রেও যদি দুই ব্যক্তি বা দুটি পক্ষ কোন পার্থিব জিনিসের মালিকানা বা অন্য কোন ব্যাপার নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ ও মতভেদ মীমাংসার জন্য তৃতীয় কোন মানুষকে সালিশ মানে, আর সেক্ষেত্রে যদি মানসিকতা এই হয় যে, ফয়সালা নিজের মনমত হলে বা নিজের পক্ষে হলে মেনে নেবে, আর নিজের পছন্দমত না হলে বা নিজের বিপক্ষে হলে মেনে নেবে না, অর্থাৎ 'সালিশ মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার' টাইপের মানসিকতা পোষণ করে, তাহলে এটা হবে ওয়াদা ভঙ্গ আর প্রতারণার শামিল। কিন্তু তার এই সুবিধাবাদী মনোভাব যদি এতটাই তীব্র হয় যে, ফয়সালা নিজের অনুকূল না হলে সেটি আল্লাহ ও রসূলের তরফ থেকে হলেও মানতে পারবে না, তখন সে কাফের হয়ে যাবে। হযরত ঈসা (আ:)-এর সময় এক পাপী ব্যক্তিকে একটি পুণ্য কাজ করতে দেখে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ঈসা (আ:)-এর মাধ্যমে তাকে সুসংবাদ পাঠিয়েছিলেন যে, তুমি জান্নাতে অমুক ব্যক্তির সাথে থাকবে। উল্লেখ্য, সেই অমুক ব্যক্তি ছিল সেই সময়কার একজন আবেদ বুযুর্গ ব্যক্তি। কিন্তু এই সংবাদ শুনে সেই আবেদ ব্যক্তি বলে উঠল, "না, না, অসম্ভব। আমি এমন পাপী লোকের সাথে জান্নাতে থাকতে পারব না।" তখন জানিয়ে দেয়া হলো, "ঠিক আছে, ঐ পাপী লোকটা জান্নাতে ঠিকই থাকতে পারবে, কিন্তু তুমি (অর্থাৎ সেই আবেদ ব্যক্তি) জান্নাতে যেতে পারবে না।" কারণ, সে ব্যক্তিগত অহংকার ও মানসিক সংকীর্ণতাবশত আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নেবার ব্যাপারে জড়তা প্রদর্শন করেছিল। নবীজীর (সা:) সময় মদীনাতে এক মোকদ্দামার ঘটনায় এক ব্যক্তি নবীর ফয়সালা নিজের অনুকূলে না হওয়ায় তাতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে যখন ওমরের (রা:) কাছে গেল, তখন উমর (রা:) সোজা ফয়সালা দিয়ে দিলেন, আল্লাহর নবী ফয়সালা করার পরও যে লোক তা মানতে পারে না, তার ফয়সালা তো এই (মৃত্যুদণ্ড) হয়ে থাকে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয়, "অতএব, তোমার প্রভুর কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হূষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।" (সূরা নিসা: ৬৫)

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ!

মাশাআল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয়েছে। যাযাকাল্লাহু খাইরান। অনেক কিছু জানতে পারলাম। শেখার আছে অনেক কিছু।

ভুল ধরেছি মনে করবেন না। হয়ত আপনি খেয়াল করেননি অথবা প্রিন্ট হেওয়ার সময় বাদ পড়ে গেছে।

১১ নং পয়েন্টের শেষ লােইনের শেষের ফিনিশিং হয়নি মনে হয়েছে। যেমন : ‘সন্তানকে আদর করা বা সন্তানকে দ্বীনদার বানানোর ক্ষেত্রে’ (এর পর কিছু হবে মনে হয়)।

১ থেকে ১৩ পর্যন্ত ক্রমিক ঠিক আছে কিন্তু তার পরেই আবার ১১ নং হয়েছে এবং এই পয়েন্টের শেষে “সামিল” শব্দটি বাদ পড়ে গেছে। কিন্তু তারপর ১২ নং পয়েন্টটি আমার মনে হয়েছে তারপরবর্তী ১৩ নং পয়েন্টেরই প্রথমাংশ হবে। এর পরের পয়েন্টটির নাম্বার আবার ১২ হয়ে গেছে।

এই গুলি সহ আরো কিছু সম্পাদনা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ধন্যবাদ।

মন্তব্য ও পরামর্শের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমার এ লেখাটি এখনো অসম্পূর্ণ ও নির্মাণাধীন (under construction) অবস্থায় আছে। তারপরও আপনি আমার অসম্পূর্ণ বাক্যগুলো সুনির্দিষ্ট করে দেয়ায় আমার সম্পাদনা ও লেখাটি সম্পূর্ণ করার কাজে সহায়ক হবে বলে আশা করি।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)