নাস্তিকতা প্রচারের ত্রিমুখী হাতিয়ার

ইবলীস দুনিয়াতে আসার সময় আল্লাহ তাআলাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ঘোষণা দিয়েছিল, "আমি তোমার বান্দাদের সামনে, পিছনে, ডানে, বামে, উপর, নিচ সব দিক থেকে হানা দেব। আমার এ চতুর্মুখী তৎপরতার সামনে তোমার খুব কম বান্দাই টিকতে পারবে।" শয়তান তার ওয়াদা রেখেছে। আল্লাহর বান্দাদের আল্লাহর দ্বীন থেকে সরিয়ে দেবার জন্য, বিপথগামী করবার জন্য বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম কৌশল প্রয়োগ করে আসছে শয়তান ও তার দোসররা। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের এই ছোট্ট বাংলাদেশের বর্তমান নবীন প্রজন্মকে বিপথগামী করবার জন্য নাস্তিকেরা প্রধানত: তিনটি কৌশল প্রয়োগ করছে:- মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও যৌবনের উন্মাদনা। প্রথমটির উদ্দেশ্য ইসলামকে বর্বরতার ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করা, দ্বিতীয়টির উদ্দেশ্য ইসলামকে মিথ্যা বা অবাস্তব প্রমাণ করা, আর তৃতীয়টির উদ্দেশ্য ইসলামকে আপদ হিসেবে দাঁড় করানো।

(১) মুক্তিযুদ্ধের অপব্যবহার: মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে প্রথম পর্যায়ে কিশোর-তরুণদের মনে একটি বিশেষ দেশ ও একটি বিশেষ দলের প্রতি বিদ্বেষ সঞ্চার করা হয়। তারপর দ্বিতীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও দলটিকে ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য ধর্মকে দায়ী করা হয়। তারা ঐ সমস্ত কথিত কর্মকাণ্ড ধর্মের জন্যই করেছে, ধর্মই তাদেরকে বর্বর ও অমানুষ বানিয়েছে- এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয় কোমলমতিদের কচি মনে। ধর্মই যেন যত নষ্টের মূল- এমন একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
প্রতিকার: নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে, পাকিস্তানীরা বা জামাতীরা কি করল বা না করল, তার সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। ধর্মের উৎস স্বয়ং স্রষ্টা, ধর্মের ধারক-বাহক ও প্রচারক হলেন স্রষ্টার প্রেরিত মহাপুরুষগণ। মহান আল্লাহ মানুষকে কি করতে বলেছেন, আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) ও তাঁর ঘনিষ্ঠতম সাহাবীরা কি কি করেছেন, ধর্মের আসল চিত্র ও পরিচয় বুঝতে হবে সেখান থেকে। মানুষের মধ্যে যাদের কর্মকাণ্ড আল্লাহর হুকুম এবং নবী ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলবে, কেবল তারাই ইসলামের সত্যিকার প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হবে। কেউ ধর্মের নামে কিছু করলেই যে সেটা ধর্ম হয়ে যায় না, এ কথাটি তরুণদেরকে বোঝাতে হবে। এমনকি ধর্মের বদমান করবার জন্য, ধর্মের প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করবার জন্য ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্মের শত্রুদের দ্বারাও ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে অপকর্ম ঘটিয়ে ধর্মকে স্যাবোটাজ করবার নজিরেরও অভাব নেই এই পৃথিবীতে। এর পাশাপাশি অধর্মের নায়কদের কার্যকলাপ ও চরিত্র কিরূপ- তাও তুলে ধরতে হবে তরুণদের সামনে। দেশে-বিদেশে নাস্তিক তথা কমুনিষ্টদের কার্যকলাপের ইতিহাসও সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে নতুন প্রজন্মের কাছে। কমুনিষ্ট তথা নাস্তিকতার মূল প্রবক্তাদের হিংস্রতার দায় যদি নাস্তিকরা নিতে না চায়, তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য যদি কুফরী বা নাস্তিকতা দায়ী না হয়, তাহলে কতিপয় চুনোপুটি বিপথগামী হাইব্রিড জারজ মুসলমানের কর্মকাণ্ডের জন্য কেন ইসলাম ধর্ম দায়ী  হবে? আর তার দায়ই বা কেন দেশ-বিদেশের সকল মুসলমানরা চিরকাল বয়ে বেড়াবে? এছাড়া ধর্মের শত্রু তথা ধর্মবিদ্বেষী শয়তানী স্বভাবের ব্যক্তিরা মানুষকে ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করবার জন্য, ঈমান ও চরিত্র নষ্ট করে অধর্মের কাজে লিপ্ত করবার জন্য কত রকম হিংস্র বর্বরতা চালায়, এমনকি নিষ্পাপ শিশুদের উপরও কত ধরনের বীভৎসতা চালায়, সেই তথ্যগুলোও প্রচার করতে হবে এবং পরস্পর শেয়ার করতে হবে। ধর্মের অনুসারীরাই কেবল নিষ্ঠুর ও জালেম হয়, আর ধর্মবিরোধীরা স্নেহশীল ও মহান হৃদয়ের অধিকারী হয়- এ ধারণাটি যে সত্য নয়, তা তুলে ধরতে হবে তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে।
মনে করুন, সাদ্দাম ও আসাদের মুসলিম পরিচয়টা যদি সামনে আনা হয়, তাহলে মনে হবে, দেখ, মুসলিমরা কত বর্বর! কিন্তু মুদ্রার অপর পৃষ্ঠটা যদি দেখা যায়, ঐ দুই ব্যক্তির কমুনিষ্ট পরিচয়টা যদি বিবেচনায় আনা যায়, তাহলে বোঝা যাবে, তাদের নিষ্ঠুরতার কারণ ইসলাম নয়, বরং কমুনিজম তথা নাস্তিকতাই তাদেরকে অমানুষ বানিয়েছে। বাথিস্টদের (বাথ পার্টি) গণহত্যার জন্য ধর্ম দায়ী নয়, বরং অধর্মই দায়ী। ঠিক একইভাবে ইয়াহিয়া খানের শুধু মুসলিম পরিচয় আর মওদূদীর শুধু ধর্মের বাণীগুলোকে বিবেচনায় নিলে মনে হবে, মুসলিম শাসকরা আর ইসলামের প্রবক্তারা না জানি কত না জল্লাদ! কিন্তু এর পাশাপাশি পাকিস্তান আর্মি যে ব্রিটিশের হাতে গড়া ব্রিটিশ বাহিনীর উত্তরাধিকার এবং মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামীর মত দলগুলো যে বৃটিশ আশীর্বাদপুষ্ট ও পৃষ্ঠপোষকতায় ধন্য বৃটিশদের গৃহপালিত সংগঠন, এ ব্যাপারটা বিবেচনায় আনলে তাদের কার্যকলাপের দায়টা ইসলামের পরিবর্তে খ্রীস্টবাদের উপরেই বর্তাবে। আবার একাত্তরে মুসলিম নামধারী ও ইসলামের দাবিদাররাই বা কাদের দ্বারা ও কি ধরনের ঘটনার দ্বারা প্ররোচিত ও বিভ্রান্ত হয়ে মনুষ্যত্ব ও বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল এবং হঠকারি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই ব্যাপারটা ধর্তব্যের মধ্যে আনলে হিন্দুত্ববাদ আর সেকুলারবাদকেও বেকসুর খালাস দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। যারা গণহত্যা করেছে, আর যারা গণহত্যাকে সানন্দে উপভোগ করেছে, তাদের উভয়কে সমান অপরাধী ধরা হলে একাত্তরের ঘটনায় কেবল ধর্মধারীদেরকে দায়ী করার যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। আর ধর্মকে দায়ী করাটা তো সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। আবার বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রেও শুধু প্রত্যক্ষ অপরাধীদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়কে বিবেচনায় না এনে তাদের বরদাতাদের ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয়কেও যদি মেলে ধরা যায়, তাহলে এক্ষেত্রেও ইসলামকে দায়ী করবার কোন অবকাশ থাকবে না। মোটকথা, একাত্তরে সংঘটিত অপরাধগুলোর জন্য ধর্ম দায়ী নয়, বরং ধর্ম থেকে বিচ্যুতিই দায়ী; আর দায়ী ধর্মবিরোধীদের কারসাজি। এ সত্যটি তরুণ সমাজকে বোঝাতে পারলে মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবার প্রয়াস মাঠে মারা যাবে। ফেরাউনও তো শেষ মুহূর্তে ঈমান এনেছিল। কিন্তু তাই বলে কি ঈমান জিনিসটা খারাপ হয়ে গেল? ঠিক তেমনি যারা বিপদ থেকে বাঁচার জন্য বা ফায়দা হাসিলের জন্য ধর্মের আশ্রয় নেয় বা ধর্মকে ব্যবহার করে, তাদের কার্যকলাপের জন্য ধর্মকে দায়ী করবার কোন ভিত্তি নেই।
মনে করুন, মুসলিম নামধারী কোন এক খবীস মহিলা তার নাবালিকা কাজের মেয়েটিকে দিয়ে নিজের নাপাকী পরিষ্কার করানোর সময় বলল, "বিসমিল্লাহ বলে পানি ঢালবি।" এই জঘন্য তামাশা দেখে যে কারো মনে তাৎক্ষণিকভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই জন্মাতে পারে। কিন্তু এরূপ জঘন্য কর্মটির কর্তা সম্পর্কে যদি সঠিক ধারণা পাওয়া যায়, তখন আর ইসলাম সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না। সঠিক তথ্য অনুসন্ধান করলে জানা যাবে, ঐ জালেম পিশাচ ব্যক্তি আদৌ ধর্মওয়ালাদের কেউ নয়, ধর্মকে যারা গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেয় তাদের অন্তর্ভুক্ত সে নয়। তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা যাচাই করলে দেখা যাবে, সে মূলত সেকুলার মন-মানসিকতার অধিকারী, সব ধর্মকে সমান মনে করে কিংবা মানুষের জীবনে ধর্মকে গৌন ও গুরুত্বহীন মনে করে, জিহাদ ও মুজাহিদদের নিয়ে বিদ্রূপ ও উপহাস করে, এমনকি কোন কোন সময় আল্লাহর সম্পর্কেও বিভ্রান্তিকর ও কটু কথা এবং ভ্রান্ত আকীদা প্রচার করে। তার শত্রু-মিত্র সম্পর্কে যদি খোঁজ নিতে যান, দেখবেন মুসলিম নির্যাতনকারী (বিশেষত মুসলিম শিশুদের উপর নির্যাতনকারী) কাফের বা মুনাফিক জালেমদের সাথেই তার সবচাইতে অধিক সখ্যতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক বিরাজমান। তার অবস্থান অধিকাংশ সময়েই থাকে নির্যাতিত মুমিন মুসলমানদের বিপক্ষে, আর নির্যাতনকারী কাফেরের সপক্ষে। আবার ঐ ব্যক্তির মিত্র কাফের বা মুনাফিক জালেম ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কেও যদি খোঁজ নিতে যান, দেখবেন, সে একদিকে ছলে-বলে-কৌশলে বাচ্চার নামাজ-কালামে বাধাদানের প্রয়াসে কোন ত্রুটি করে না, অপরদিকে বাচ্চার উপর নির্যাতনের কাজটা করে ধর্মের নামে। যেমন- বাচ্চার পিঠে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ বসিয়ে দিয়ে তারপর নিজেই ঘুরে ঘুরে মানুষকে দেখিয়ে বেড়ায় আর বলে যে, বাচ্চাটা আমার কোলে পেশাব করে দিয়েছিল, এখন এ কাপড় পরে কি আমার নামাজ হবে? ঐ ব্যক্তি অন্তরে কট্টর ধর্মবিদ্বেষী, আল্লাহবিদ্বেষী এবং আল্লাহর বান্দাদের চরম অকল্যাণকামী হয়েও এবং নামাজ-কালামে বাধাদানের কাজে সদাতৎপর হয়েও সময় সময় আবার বাচ্চাকে নামাজ-কালাম শিখানোর নামেই রূঢ় আচরণ করে থাকে। এ থেকে বোঝা যায়, ধর্মের নামে অধর্ম হয়ে থাকে দুই ধরনের মানুষের দ্বারা:- এক ধরনের হল যারা নিজেরা স্বার্থপর জালেম সুবিধাবাদী এবং ধর্মের শত্রুদের সহযোগী ও দোসর; আরেক ধরনের হল স্বয়ং যারা নিজেরা ধর্মদ্রোহী শয়তান, যাদের উদ্দেশ্য ধর্মের নামে মানুষকে জ্বালাতন করার মাধ্যমে ধর্মের বদনাম করা, ধর্মকে স্যাবোটাজ করা ও ধর্মকে বর্বরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা। ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশে একাত্তরে যারা অন্যায় অপকর্ম করেছে, বর্তমানে যারা তাণ্ডব চালাচ্ছে, তারাও ইসলাম ও মুসলমানদের স্থায়ী মিত্র নয়। বরং তারা প্রয়োজনে কখনো কাফের-মুনাফিকদের সাথে ঐক্য করেছে, আবার কখনো মুসলমানদের পক্ষ নিয়েছে। আপনি ইসলামের সত্যিকার প্রতিনিধি হিসেবে বিচার করতে পারেন কেবল তাদেরকে, যারা সাহাবায়ে কেরামের মত সদা সর্বদা কাফেরদের প্রতি কঠোর ও মুমিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আর এমন কারো অস্তিত্ব বর্তমান যুগে আছে কি নেই সেটাও বড় কথা নয়, বরং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সকল যুগে সত্যিকার আল্লাহর বান্দা ও ইসলামের সৈনিকদের চরিত্র কেমন থাকে, তাদের আচার-আচরণ ও মানবতা কিরূপ হয়ে থাকে, সেটা দিয়েই বিচার করবেন ইসলামের সত্যিকার চেহারা ও আদর্শ। ইসলাম থেকে বিচ্যুত বেদ্বীনদের পদলেহী সুবিধাবাদী কুলাঙ্গারদের দিয়ে ইসলামকে বিচার করে ইসলাম সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের মনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা রোধ করতে হলে এ বিষয়গুলোই তুলে ধরতে হবে সবার সামনে। সবাইকে বোঝাতে হবে, নিষ্ঠুরতা, নির্লজ্জতা ও মানবতাবিরোধী কাজ নির্ভেজাল মুসলিমদের দ্বারা হতে পারে না; এগুলো হতে পারে মডারেট মুসলিমদের দ্বারা। ইসলামকে যারা নিজেদের ইচ্ছেমত মডারেট তথা রদবদল করে, তারাই পারে ইসলামের নামে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে। এ বৈশিষ্ট্যের জন্য তারা ইসলামের শত্রুদের কাছে 'মডারেট মুসলিম' হিসেবে পিঠ চাপড়ে বাহবাও পেয়ে থাকে। এখন দেখুন, ইসলামের শত্রুরা যাদের ভূমিকায় সন্তুষ্ট, তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে কিভাবে ইসলামকে বিচার করা যায়? ইসলামকে বিচার করবেন তো তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে, যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম ও নবীর (সা:) আদর্শের উপর অটল অবিচল থাকে, আল্লাহর বিধানে কোনরূপ রদবদল করার ধৃষ্টতা দেখায় না।
মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় রাজনৈতিক বিষয় ছাড়াও আরো একটি সামাজিক বিষয় আছে যেটাকে রেফারেন্স হিসেবে পেশ করে ইসলামকে নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার ধর্ম হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। অনেক নাস্তিক ব্লগারের লেখায় একটা বিষয় উল্লেখ করা হয় যে, সমাজের হুজুর টাইপের মানুষেরা ধর্মশিক্ষা বা নামাজ পড়ানোর জন্য ছেলেপেলের সাথে শারীরিক শাস্তি ও মৌখিক তিরস্কার সহ নানাবিধ দুর্ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বাস্তবতা হল, এ টাইপের লোকেরা ইসলামের সত্যিকার প্রতিনিধি নয়। তাদের এহেন আচরণের পিছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি বা ছেলেপেলেকে দ্বীনদার বানানোর চেয়ে নিজেকে জাহির করবার প্রবণতাই সক্রিয় থাকে। নিজে মসজিদে যাবার আগে একটু হাঁকডাক না ছাড়লে এবং নামাজ থেকে ফেরার পরে যারা সময়মত নামাজে যেতে পারল না তাদের উদ্দেশ্যে একটু ভালমন্দ না ঝাড়তে পারলে নিজের মসজিদে গমনের বিষয়টা তো নীরবই থেকে গেল! কাজেই এদেরকে দ্বীনের দাঈ ভেবে দ্বীনকে ভুল বোঝা ঠিক নয়। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ধর্ম নিয়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সাধারণত নতুন মুসল্লীদের দ্বারাই হয়ে থাকে। মানে, যারা প্রথম জীবনে (অর্থাৎ যৌবনকালে) ধর্মকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে উপেক্ষা করে থাকে, তারাই শেষ জীবনে (অর্থাৎ বৃদ্ধকালে) অতিমাত্রায় ধার্মিক বনে যায় এবং এমন ভাব দেখায় যেন তিনি একাই ধার্মিক, আর অন্যরা সব গাফেল বেদ্বীন। যারা মানুষকে ধর্ম শেখানো বা ধর্ম পালন করানোর নামে দুর্ব্যবহার করে, তারা প্রয়োজনে ধর্মের কাজে বাধাদানও করে থাকে। যখন বা যেক্ষেত্রে তারা ধর্মকে ফালতু বা অলাভজনক মনে করে এবং ধর্মানুরাগকেই ছেলেপেলের বোকামি ও হাবামির কারণ হিসেবে গণ্য করে, তখন বা সেক্ষেত্রে তারা ছেলেপেলের মসজিদ গমনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বসে। কিন্তু যখন বা যেক্ষেত্রে তারা ধর্মকে নিজেদের সামাজিক মান-মর্যাদা হাসিলের মাধ্যম মনে করে, যে পরিবেশে নিজেদের স্ট্যাটাস ধরে রাখবার জন্য একটু মসজিদে না গেলেই নয়, যেখানে ছেলেপেলেকে মসজিদে দেখতে না পাওয়াটা নিজের সুনামহানির কারণ ঘটাবার উপক্রম করে, সেখানে তারা ছেলেপেলেকে ধাক্কা মেরে হলেও মসজিদে পাঠাবার জন্য পাগল হয়ে যায়। অথচ নিজের বাড়ির একই ছাদের নিচে কোন মজলুম মুসলমান নামাজ-কালামের সুযোগ না পেয়ে অর্থাৎ ধর্ম পালনের কাজে (কোন কাফের কর্তৃক) বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলেও সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ করে না, এমনকি কেউ সেদিকে হস্তক্ষেপ করতে চাইলেও তাকে ফিরিয়ে রাখে। এ ধরনের মানুষেরা গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার (priority) নির্ধারণে মূলত: পার্থিব লাভ-ক্ষতিকেই বিবেচনা করে এবং বৈষয়িক বিষয়াদি যেমন- স্কুলের পরীক্ষায় ভাল ফল করা, চাকুরী-ব্যবসায় উন্নতি করা প্রভৃতি ব্যাপারে কোনরূপ অলসতা, অযোগ্যতা বা ব্যর্থতার জন্য যখন ছেলেপেলের ধর্মমুখিতাকেই দায়ী মনে করে, তখন ধর্মের উপর চটে যায়। ধর্মকে যখন বৈষয়িক উন্নতি তথা রিযিক ও ইজ্জত লাভে সহায়ক হিসেবে দেখে, তখন ধর্মকর্মকে promote করে; আর যখন ধর্মকে এক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে না পায়, তখন তাকে prohibit করে। এদের এ সুবিধাবাদী বৈষয়িক দৃষ্টিভঙ্গি তো অনেকটা নাস্তিক ও বস্তুবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথেই কাছাকাছি বলে মনে হয়। তাহলে এদের আচরণ দিয়ে নাস্তিকরা ধর্মকে বিচার করে কেন? ধর্মকে বিচার করতে হবে তাদেরকে দিয়ে, যারা আন্তরিকভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি, ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও মানুষের কল্যাণের জন্যই ধর্মকে প্রোমোট করে; মানুষের প্রতি ভালবাসা ও কল্যাণকামনার বশেই মানুষকে ধর্মশিক্ষা দান করে ও নামায কায়েম করে। তাদেরকে আপনি ব্যবহার দেখেই চিনতে পারবেন। আচার-আচরণ দেখেই বোঝা যায়, কে কোন্‌ নিয়তে কাজ করছে। বলাবাহুল্য, ধর্মের সত্যিকার ধারক-বাহকরা (অর্থাৎ আল্লাহর সত্যিকার দাঈগণ) মানুষের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা ও সুন্দর ব্যবহার দিয়েই মানুষকে ধার্মিক বানাবার চেষ্টা করে- যেমনটি করেছেন আমাদের নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবীগণ।
আল্লাহর কসম! আমার এ জীবনে ধর্মের নামে কঠোর আচরণকারী যত মানুষকে দেখেছি, তাদের প্রত্যেককে দেখেছি, একসময় ধর্মশিক্ষাকে পণ্ড করবার জন্য, ধর্মপালনের কাজে বাধা প্রদানের জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করে না; সর্বশক্তি ও সর্ববুদ্ধি দিয়ে চেষ্টা করে ধর্মের পথ থেকে সরিয়ে অধর্মের মাঝে লিপ্ত করে দিতে; আরেক সময় আবার রাতারাতি ধর্মের দরদী সেজে গিয়ে কট্টর ধার্মিক বনে যায় এবং মানুষকে ধর্মশিক্ষা দান বা ধর্মপালন করানোর নামে মানুষের উপর অত্যাচারে লিপ্ত হয়। ধর্ম নিয়ে আপাত পরস্পরবিরোধী এ আচরণ মূলত দুই ধরনের লোকের দ্বারা হয়ে থাকে। এক ধরনের মানুষ আছে সাক্ষাৎ শয়তান, যার উদ্দেশ্যই হল মানুষকে ধর্ম থেকে সরিয়ে দেয়া, মানুষের মনকে বিষিয়ে তোলা, আর সেই অভিন্ন কাজটাই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিভিন্ন আঙ্গিকে করে থাকে। তারা মানুষকে ধর্মের পথ থেকে বিরত রাখার কাজটি কখনো করে অ্যালোপ্যাথিক পদ্ধতিতে (অর্থাৎ বিপরীত দিক থেকে বাধা প্রদানের মাধ্যমে), আবার কখনো করে হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতিতে (অর্থাৎ ধর্ম শিক্ষাদানের কাজটিই কঠিন পদ্ধতিতে কঠোর আচরণের মাধ্যমে করে ধর্মের প্রতি অনাগ্রহ ও অনীহা সৃষ্টি করার মাধ্যমে)। আরেক ধরনের মানুষ আছে চিন্তা-চেতনায় মনেপ্রাণে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে নিজেরা স্বয়ং শয়তান না হলেও শয়তানের প্ররোচনায় নাফসের খায়েশ পূরণের জন্য ধর্মের ব্যাপারে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে। তাদের নাফসের ধান্ধা পূরণের পথে যখন ধর্মশিক্ষাকে অনর্থক বাধা হিসেবে দেখতে পায় (যেমন- বাচ্চাকে পরীক্ষায় ফার্স্ট হবার জুয়া খেলায় জিতিয়ে নিজের আলগা বাহাদুরি ও ফুটানি জাহির করার কুপ্রবৃত্তি ও পাশবিক ইচ্ছা পূরণের পথে বাচ্চাকে ধর্মশিক্ষাদানের প্রয়াসকে অযাচিত সময় নষ্ট হিসেবে গণ্য করে), তখন সরাসরি এর বিরোধিতা করে। আবার যখন ধর্মশিক্ষা দান করাকেই নিজের ক্রেডিট ও সুনামের মাধ্যম হবে বলে মনে করে, তখন কিলগুতা দিয়ে বা মেরে বকে গালমন্দ করে কোনমতে আরবী বানান মুখস্থ করানোর প্রতিযোগিতায় নামে। এই দুই শ্রেণির মানুষের মাঝে পার্থক্য করা কঠিন। কারণ, ধর্মশিক্ষাদানে কঠোর পদ্ধতি অবলম্বনের কাজটা কে সরাসরি শয়তানী উদ্দেশ্যে ধর্ম ও ঈমান বরবাদ করবার জন্য করছে, আর কে শয়তানের ধোকায় পড়ে নাফসের তাড়নায় বা ব্যক্তিগত অহংকার ও জেদাজেদি বশত ধর্মশিক্ষাদানের কৃতিত্বটা (credit) নিজে লুফে নেবার জন্য করছে, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা যায় না। অবশ্য এ দু'দলের মাঝে পার্থক্য করাটা খুব বেশি জরুরী নয়। আর তাদের উভয়ের মাঝে খুব বেশি একটা ব্যবধানও নেই। উভয়েরই নিয়ত মন্দ, তবে এই মন্দের মধ্যে যা একটু বেশকম আছে। নিয়তে উৎপত্তিগত ও গঠনগত সামান্য তারতম্য থাকলেও এদের উভয়ের কাজের ফলাফল একই- তাহল মানুষকের ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে ধর্মের পথ থেকে সরিয়ে দেয়া। আর উভয়ের চরিত্রই হচ্ছে মুনাফিকের চরিত্র। কারণ, আল্লাহদ্রোহিতা, ধর্মবিদ্বেষ ও মানুষের অকল্যাণকামনাকে গোপন করে নিজেকে ধর্ম ও মানুষের কল্যাণকামী হিসেবে জাহির করাটা যেমন মুনাফেকি; তেমনি পার্থিব স্বার্থ,  ব্যক্তিগত আক্রোশ, জেদ, হিংসা, যশপ্রীতি, কৃতিত্ব দখলের প্রতিযোগিতা এগুলোকে ধর্মপ্রীতি ও সন্তানের কল্যাণকামিতার নাম দিয়ে চরিতার্থ করাটাও একপ্রকার মুনাফেকি। এ উভয় ধরনের মুনাফিকদেরই বৈশিষ্ট্য হল, আদর করে খেলার ছলে ধর্মশিক্ষাদানকে এরা কখনো সুনজরে দেখে না। আপনি যদি শিশুকে সহজ পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করেন, তখন আপনার আশপাশের হিংসুক মুনাফিক ব্যক্তিরা এমন ভাব দেখাবে, যেন আপনি অযথা খেলাধূলা করে সময় নষ্ট করাচ্ছেন। অপরদিকে সে যখন ঘটা করে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘাড় ধরে বাচ্চাকে কাঁদিয়ে কাটিয়ে আরবী বানানের চর্বিত চর্বণ করতে বসাবে, বাচ্চার মাঝে ধর্মশিক্ষার ব্যাপারে শৈথিল্য ও মোচড়ামুচড়ি ভাব জন্ম দেবে, সেটাকেই ধর্মশিক্ষার সঠিক পদ্ধতিরূপে দাবি করবে এবং এ কাজের বদৌলতে নিজেকেই বাচ্চার ধর্মশিক্ষা দানকারী হিসেবে তুলে ধরবে। আর উল্টো আপনাকেই দোষ দিয়ে বসবে যে, আপনি নিজে কখনো আরবী পড়াতে বসান না, কেউ বসালে আপনি তাতে বাগড়া দেন। এভাবে নিজেকেই বাচ্চার ধর্মশিক্ষা দানকারী আর আপনাকে ধর্মশিক্ষায় অযথা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী হিসেবে তুলে ধরবে। কুচক্রী মুনাফিকের এ চতুরতায় আপনাকে থ খেয়ে রীতিমতো বোকা বনে যেতে হবে।  আপনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বাচ্চার কল্যাণের জন্য কাজ করলেও আপনাকেই যত নষ্টের মূল হিসেবে চিহ্নিত করবে। আর সে নিজে অসৎ উদ্দেশ্যে (ধর্ম নষ্ট করবার শয়তানী উদ্দেশ্যে কিংবা শয়তান ও নফসের প্ররোচনায় নিজে সুনাম হাসিল ও কৃতিত্ব হাইজ্যাকের উদ্দেশ্যে) পরিচালিত হলেও নিজেকেই ধর্মের ও মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করবে। আবার এ দুই ধরনের মুনাফিকদের (একধরনের হল শয়তানী মনোভাবাপন্ন শয়তানী উদ্দেশ্য ধারণ ও লালনকারী মানুষরূপী শয়তান, আরেক ধরনের হল নফসের অনুসারী দুনিয়াপূজারী যশকামী স্বার্থপর মানুষ) মাঝে চুম্বক-লোহার মতন অদ্ভূত রকমের এমন এক গুরু-শিষ্যের সম্বন্ধ রয়েছে যে, হাজার মাইল দূরে থাকলেও তাদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা, অনুরাগ ও আনুগত্য পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য অনুরাগ ও আনুগত্য জিনিসটা শিষ্যের তরফ থেকে একপাক্ষিকই হয়ে থাকে। একশ্রেণির মানুষ আছে, ধর্ম প্রতিষ্ঠায় বা মানুষকে ধর্মশিক্ষাদানে ও ধার্মিক বানানোতে উতসাহী না হলেও শুধু মানুষকে বিদ্রূপ ও নাজেহাল করার কাজেই ধর্মকে ব্যবহার করে। একাত্তরের অপরাধীরা মূলত: এই শ্রেণীরই প্রতিনিধিত্ব করে।
একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে, জাতিগত বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা আর ধর্মের জিহাদ এক নয়, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর ধর্মীয় লড়াই এক জিনিস নয়। ...
এককথায়, একাত্তরে ধর্মের নামে যেহেতু মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, তাই এ বিষয়টি প্রমোট করবার দ্বারা ধর্মকে মানবতাবিরোধী এবং ধর্মবিরোধিতাকে মানবতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করা সহজ। যেহেতু ঐ সময় আমাদের (অর্থাৎ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের) বিপক্ষ শক্তি ছিল ধর্মের পরিচয়ধারী, আর দৃশ্যত: আমাদের সহযোগী ও ত্রাণকর্তারা কেউ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, কেউ ছিল বিধর্মী, আর কেউ বা ছিল ধর্মবিরোধী, কাজেই এই ঘটনাটিকে রেফারেন্স হিসেবে পেশ করে অপকর্মকারীদের অপকর্মের জন্য ধর্মকে এবং সাহায্যকারীদের সাহায্য ও মানবদরদের জন্য ধর্মবিমুখিতাকে চিহ্নিত করতে পারলেই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে চিরতরে ধর্মের প্রতি বিষিয়ে তোলা যাবে। কিন্তু আমাদের তরুণদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, শুধু একটি ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট সময়কালের ঘটনার দ্বারা সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়, বরং সত্য জানতে হলে সকল কালের সকল অঞ্চলের ইতিহাস-বর্তমান-ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী সম্পর্কে জানতে হবে। একাত্তরের ঘটনা কোন ধর্মীয় সংঘাত ছিল না, বরং ছিল পার্থিব স্বার্থের সংঘাত। এ সংঘাতে ধর্মব্যবসায়ী ও বক ধার্মিকেরা যেমন তাদের সুবিধামত একটি পক্ষ বেছে নিয়েছে, তেমনি ধর্মবিরোধীরাও তাদের এজেন্ডা মত একটি পক্ষের প্রতি সমর্থন দেখিয়েছে। ধর্মধারী-ধর্মবিরোধী নির্বিশেষে সকলেই যার যার ধান্ধা মত এ সংঘাতে অংশগ্রহণ করেছে, কিংবা ভিতর থেকে বা বাহির থেকে ইন্ধন দিয়েছে। নচেত সার্বিকভাবে পৃথিবীর ইতিহাসে সিংহভাগ মানবতাবিরোধী বর্বরতাই ঘটেছে ধর্মবিরোধীদের দ্বারা, আর কায়েমী স্বার্থবাদীদের দ্বারা, আর কিছু বর্বরতা ঘটেছে ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ বিভ্রান্ত লোকদের দ্বারা। আর স্বার্থবাদীদের মধ্যে কেউ ধর্মকে ব্যবহার করে থাকলেও তারা ধর্মের প্রতিনিধিরূপে গণ্য হবে না, বরং স্বার্থবাদের প্রতিনিধি বলেই বিবেচিত হবে। সত্যিকার ধার্মিকদের দ্বারা জগতে কোন কালে কোন স্থানে কোন হিংস্রতা ঘটেনি- একথা আমরা দৃঢ়তার সাথেই বলতে পারি।

(২) বিজ্ঞানের অপব্যবহার: নাস্তিকরা একেকজন মহা পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী সেজে বিজ্ঞানের বয়ান ও তত্ত্বকথা শুনিয়ে তরুণ সমাজকে ধর্ম থেকে বিচ্যুত করবার মিশনে নেমেছে। তাদের বক্তব্য হল, এখন যেহেতু মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক উন্নতি করেছে, আর ধর্ম যেহেতু এসেছে অনেক আগে, তাই আজ আর ধর্মের কোন প্রয়োজন নেই। বলাবাহুল্য, বিজ্ঞানচর্চা বা বিজ্ঞান গবেষণা আদৌ এদের উদ্দেশ্য নয়। বরং এদের একমাত্র লক্ষ্য হল বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে ধর্মকে অস্বীকার করা। বিজ্ঞানকে স্রেফ সত্য প্রত্যাখ্যানের একটা বাহানা হিসেবে ব্যবহার করছে মাত্র। কথায় বলে, "খলের ছলের অভাব হয় না।" তেমনি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের সত্য প্রত্যাখ্যানের অযুহাতও যুগে যুগে পাল্টায়। যারা অবিশ্বাসী তারা সব যুগেই অবিশ্বাসী। যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ অন্ধকারে ছিল, তখন অবিশ্বাসীরা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন লাভকে অসম্ভব মনে করত। ভাবত, এ কী করে সম্ভব! কিন্তু আজ বিজ্ঞান যখন মরা মানুষ জিন্দা করার চাইতেও অনেক বড় বড় অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে দেখিয়েছে, তখন অবিশ্বাসীদের সত্য অস্বীকারের ধরন ও অযুহাত পাল্টে গেল। এখন আর অসম্ভব ভেবে নয়, বরং এখন বিজ্ঞানের অহংকারে ভাবতে শুরু করেছে, আমরা নিজেরাই সবজান্তা, স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্রষ্টাকে আর কী দরকার? অতীতে অবিশ্বাসীরা নবীজীর (সা:) ঊর্ধ্বগমন তথা মহাকাশ ভ্রমণের খবর বিশ্বাস করা তো দূরের কথা, মক্কা থেকে জেরুজালেম এক রাতে ভ্রমণের কথাও হেসে উড়িয়ে দিয়েছে; অথচ আজ আর এটা কোন হাস্যকর অবাস্তব ব্যাপার নয়, বরং যেকোন মানুষ পকেটের সামান্য পয়সা খরচ করলেই দু'এক ঘন্টায় হেজাজ থেকে ফিলিস্তিন ঘুরে আসতে পারে। আর মহাকাশ নিয়ে তো আজ নাস্তিকদেরকেই বেশি বাহাদুরি করতে দেখা যায়। যেই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন স্রষ্টা হাজার কোটি বছর আগে, যেই মহাকাশ ১৪০০ বছর আগেই মাড়িয়ে এসেছেন স্রষ্টার প্রেরিত পয়গম্বর, সেই মহাকাশের ছিটেফোটা কিছু জ্ঞান পেয়েই অপু-দুর্গার ট্রেন আবিষ্কারের মত লম্ফন শুরু করে দিয়েছে কিছু পণ্ডিত। রাজার ভাণ্ডার থেকে খসে পড়া একটা মোহর কুড়িয়ে পেয়ে টুনটুনি যেমন নিজেকে বড়লোক ভেবে রাজাকেও থোড়াই কেয়ার করতে শুরু করে, ঠিক তেমনি স্রষ্টার এই বিশাল মহাবিশ্বের নিম্নতম ও ক্ষদুতম আকাশটির দু'চারটা ছায়াপথ আর মিল্কিওয়ের সন্ধান পেয়েই কিছু বেকুব লোক সবজান্তা বনে যায় এবং স্রষ্টাকেই ড্যামকেয়ার করে। কবে যে এরা বিল গেটসকে এমএসওয়ার্ড শেখাতে বসে যাবে, সেই চিন্তাই করি। এদের ভাব দেখলে মনে হবে, বিজ্ঞান শুধু এরাই জানে।
কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান মেলায় সাফল্য অর্জনকারী ক্ষুদে বিজ্ঞানীদেরকে অভিনন্দন জানানোর জন্য অনেক রকম উৎসাহব্যঞ্জক কথাবার্তাই বলা যায়। তাদেরকে অনুপ্রেরণা দিতে গিয়ে আপনি বলতে পারেন, "আশাকরি, তোমরা তোমাদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দ্বারা দেশের ও দশের সেবা করবে, মানব জাতির উপকার করবে, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখবে ইত্যাদি।" কিন্তু তা না বলে যদি আপনি বলেন, "তোমাদেরকে 'বিজ্ঞানমনষ্ক' হতে হবে, 'কুসংস্কার' পরিহার করতে হবে", তাহলে এ কথাকে বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মতলবি কথা বলেই ধরে নেয়া যায়।
বিজ্ঞান কাকে বলে, তা আমরা সকলেই কমবেশি জানি। বিজ্ঞান হচ্ছে নতুন কিছু আবিষ্কার করা, তা সে পৃথিবীতে বা মহাবিশ্বে বিদ্যমান অজানা জিনিসের অস্তিত্ব উদঘাটন করা হোক, অথবা মেধা খাটিয়ে মানুষের জন্য উপকারী নতুন কিছু তৈরি করা হোক। কিন্তু 'বিজ্ঞানমনষ্কতা' কি জিনিস, তা আমাদের মাথায় ধরে না। বিজ্ঞানমনষ্কতার অর্থ যদি হয়ে থাকে, নিত্য নতুন আবিষ্কারের নেশায় অনুপ্রাণিত হ

প্রতিকার: নাস্তিকদের যুক্তি ও জ্ঞানের বহর দেখে ঘাবড়াবেন না। আপনি যেহেতু নিজেকে বিদ্বান দাবি করছেন না, সেহেতু আপনার জন্য নিজেকে তাদের সামনে বিদ্বান প্রমাণ করবার কোন দরকার নেই। এজন্য আপনার বিজ্ঞানে পণ্ডিত হবারও দরকার নেই, এমনকি কোরআনের জ্ঞান বিস্তারিত না জানলেও নাস্তিকদের সামনে ভড়কে যাবার কারণ নেই। [আপনার জীবন চলার জন্য এবং ভাল মুসলিম হবার জন্য কোরআন শিক্ষা অবশ্যই জরুরী, কিন্তু এখানে আমি বোঝাচ্ছি নাস্তিকদের যুক্তির মোকাবেলার জন্য কোরআনের জ্ঞান কম থাকলেও সমস্যা নেই।] তারা যেহেতু নিজেদেরকে বিজ্ঞানের পণ্ডিত দাবি করছে, তাই বিজ্ঞান দিয়ে কোরআনকে খণ্ডন করবার দায়িত্বটা তাদের হাতেই অর্পন করুন। আপনি শুধু তাদের কাছে একটা দাবি পেশ করুন, বিজ্ঞানের যেকোন একটি তত্ত্ব দিয়ে কোরআনের যেকোন একটি আয়াতকে ভুল প্রমাণ করুক। দেখবেন, কেঁচোর মুখে লবণ পড়ার মত মোচড়ামুচড়ি শুরু হয়ে গেছে। যদিও তারা হয়তো বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকথা শুনিয়ে বিদ্যা জাহির অব্যাহত রাখবে, কিন্তু তারপরও আপনি বার বার শুধু মূল প্রসঙ্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, বৈজ্ঞানিক কথাগুলো সব তো ঠিকই আছে, কিন্তু এর দ্বারা কোরআনের কোন্‌ আয়াতটি মিছা হয়ে গেল, সেটা তো পেলাম না! তাদের যুক্তির অপ্রাসঙ্গিকতার পয়েন্টগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন। তাদেরকে বুঝিয়ে দেবেন, কোন গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণের জন্য শুধু ব্যবহৃত সূত্রগুলো সঠিক ও নির্ভুল হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং সংশ্লিষ্ট উপপাদ্যের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হওয়া আবশ্যক। উপপাদ্যের মাঝখানে নানাবিধ গাণিতিক সূত্রের অবতারণা আর শেষ লাইনে গিয়ে অতএব, এত = এত (প্রমাণিত) লিখে দিলেই যে প্রমাণিত হয়ে যায় না, বরং বাস্তবেও হিসাব মিলতে হয়- এ কথাটি ভালোভাবে জানিয়ে দেবেন। এরপর দেখবেন, তারা অপমানের সাথে বিদায় নেবে। অবশ্য পরাজয় ঢেকে রাখবার স্বার্থে তারা মাথা নত করে যাবে না, বরং মাথা উঁচু দেখানোরই চেষ্টা করবে। নিজের মূর্খতা ঢেকে রাখবার জন্য আপনাকেই মূর্খ বেকুব সাব্যস্ত করবে। যাবার সময় আপনাকে কিছু গালিগালাজ উপহার দিয়ে যাবে। অবশ্য এতে বিরক্ত বা ক্রুদ্ধ না হয়ে গালিগালাজগুলোকে উপভোগের সামগ্রী হিসেবে গ্রহণ করুন।
নাস্তিকদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সহজে রণেভঙ্গ নাও দিতে পারে। বৈজ্ঞানিক যুক্তির খিস্তিখেউড় দিয়ে ইসলাম ও কোরআনকে খণ্ডন করবার প্রয়াস মাঠে মারা যাবার পর তারা আবার নতুন কৌশলে কোরআনকে ভুল প্রমাণের চেষ্টায় রত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে যেহেতু কোরআনের ভিতর ভুল খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, তাই এক্ষেত্রে তারা মিথ্যাচার ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের ১ নম্বর কৌশল হয়ে থাকে অর্থ বিকৃতি আর অপব্যাখ্যা। আর ২ নম্বর কৌশল হয়ে থাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে কোরআনের আয়াতের রেফারেন্স দেয়া, অর্থাৎ কোরআনে সংশ্লিষ্ট আয়াত যে প্রসঙ্গে বলা হয়নি সে প্রসঙ্গের সাথে উক্ত আয়াতকে সম্বন্ধযুক্ত করা। অর্থ বিকৃতির উদাহরণ হল, কোরআনের যে আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ উঁচুতে আকাশ স্থাপন করেছেন কোন স্তম্ভ ছাড়াই, সে আয়াতের অনুবাদ করে বসবে, পৃথিবী অদৃশ্য স্তম্ভের দ্বারা স্বর্গের সাথে সংযুক্ত আছে। অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতির উদাহরণ হল, কোরআনের যে সকল আয়াত আদৌ বিজ্ঞান বিষয়ক নয়, যেমন- কোথাও কোন ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ঘটনাস্থলের সময়কালের কোন প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাওবা কোন বিষয় বোঝাতে গিয়ে ভাষার অলংকার বা উপমা প্রয়োগ করা হয়েছে, সেই কথাগুলোকেই কোরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে সাব্যস্ত করা। যেমন- কোরআনে কোন ঐতিহাসিক ঘটনার প্রসঙ্গে সেই ঘটনা ঘটাকালীন উপস্থিত লোকজনের কোন এক জলাশয়ে সূর্যাস্ত দেখার কথা উল্লেখ করা হল, যার দ্বারা মূলত ঘটনার সময়কালটা বোঝানোই উদ্দেশ্য ছিল, সেই আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে মতলববাজরা দাবি করে বসবে, দেখ, কোরআনে বলা হয়েছে সূর্য একটা জলাশয়ের ভিতর অস্ত যায়। আবার কোথাও হয়তো আল্লাহর কুদরতের বিবরণ দিতে গিয়ে আকাশস্থ শিলার পাহাড় থেকে শিলাবৃষ্টি বর্ষণের কথা বলা হল, আর সেই আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে, দেখ, কোরআনের বর্ণনা মতে শিলার আগমন ঘটে পাহাড় থেকে। অথচ আমরা সাধারণ পরিভাষা হিসেবেও পাহাড় বলতে স্তুপ বুঝিয়ে থাকি, যেমন- অফিসে ফাইলের পাহাড় জমেছে, রাস্তায় ময়লার স্তুপ জমেছে ইত্যাদি। কেউ যদি অসৎ উদ্দেশ্যে কোরআনের কোন আয়াতের রেফারেন্স দেয়, তা সে কোরআনকে ভুল প্রমাণের চেষ্টাকারী নাস্তিক হোক কিংবা নিজের ভ্রান্ত চিন্তাধারা বা অন্যায়-অপকর্মের পক্ষে কোরআন থেকে দলীল অন্বেষণকারী হোক, তাহলে অবশ্যই কোরআনের সাথে মিলিয়ে দেখবেন। যদি সূরা ও আয়াতের নম্বর না দেয়, তাহলে তা তলব করবেন। কোরআন থেকে পেশ করা যেকোন আয়াত কোরআনের মূল টেক্সট অথবা বিশুদ্ধ অনুবাদ দেখার সাথে সাথেই আয়াতের উদ্দেশ্যমূলক বিকৃতিটা ধরতে পারবেন। কখনো কখনো হয়তো পূর্বাপর আয়াত কিংবা শানে নুযুলও যাচাই করবার প্রয়োজন হতে পারে। এককথায়, যারা রেফারেন্স ছাড়া কোরআনকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে, তাদের কাছে রেফারেন্স তলব করুন; আর যারা রেফারেন্স দিয়ে কোরআনে অসঙ্গতি দেখাতে সচেষ্ট হয়, তাদের প্রদত্ত রেফারেন্সটা শুধু একবার কোরআনের পাতা উল্টিয়ে একনজর মিলিয়ে দেখুন।
নাস্তিকরা যখন বিজ্ঞানের ফাল পেড়ে হিজিবিজি আলোচনা শুরু করে এবং আল্লাহ, রসূল ও আল্লাহর কিতাবকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে থাকে, তখন আমরা অনেকেই মুষড়ে পড়ি এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাফের বলে গালি দিয়ে মনটাকে হালকা করবার চেষ্টা করি, কেউবা আবার আবেগের সাথে বলতে থাকি, কোরআনে কোন ভুল নেই, কোরআনে কেউ কোন ভুল পাবে না। কিন্তু ক্রোধ বা আবেগের বশে হতাশ না হয়ে একটু ঠাণ্ডা মাথায় যৌক্তিক পাল্টা জবাব দিতে পারলেই তাদেরকে পিছু হটানো সম্ভব। এজন্য আমাদের জাকির নায়েক হবার দরকার নেই। বরং আমাদের উপরে আলোচ্য দুটি সাধারণ টিপস জানাই যথেষ্ট। যারা শুধু বিজ্ঞানের আলোচনা দিয়ে ধর্মকে অবজ্ঞা করতে থাকবে, তাদের কাছে বিজ্ঞান দিয়ে কোরআনের যেকোন একটা আয়াতকে বাতিল প্রমাণ করবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিন। আর যারা বিক্ষিপ্তভাবে কোরআনের আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা করে, তাদের উদ্ধৃত ও পেশকৃত আয়াতটি বাস্তবে কোরআনের সাথে মিলিয়ে দেখে অসঙ্গতি ও বিকৃতিটা বের করে ফেলুন। কোরআনে যে কোন ভুল নেই- এ কথাটা শুধু মন্তব্য আকারে না বলে বাস্তবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রমাণসহ দেখিয়ে দিন। তবেই নাস্তিকরা জব্দ হবে। নচেত শুধু আবেগ প্রকাশ করলে উল্টো তাদের কাছে হাসির পাত্র হবেন।
অবশ্য বিজ্ঞান গবেষণা বলতে যদি গু ভক্ষণ বা গুহ্যদ্বার গমনের উপকারিতা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি অনুসন্ধান বুঝায় এবং এগুলোর উপকারিতাকে স্বীকৃতি দানে ব্যর্থতাকে ধর্মের ত্রুটি ও দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়; তাহলে বলব, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই এগুলোতে আদৌ কোন উপকারিতা আছে, তবুও ধর্মের দৃষ্টিতে শুধু তথাকথিত উপকারিতাই শেষ কথা নয়, বরং উপকারিতার সাথে নৈতিকতাকেও আমলে আনা হয়। যেমন- কেউ পিতার সম্পত্তির লোভে নিজের ভাইকে খুন করতে চাচ্ছে। এখন যে ব্যক্তি এ কাজটা করতে চাচ্ছে, সে তো নিজের উপকারের জন্যই করতে চাচ্ছে। কাজটা অন্তত আর যাই হোক, তার জন্য তো উপকারীই হচ্ছে বটে! কিন্তু ধর্ম কি ঐ কাজটিকে স্বীকৃতি দিতে পারে? কারণ, কাজটা আপাতদৃষ্টিতে উপকারী হলেও অনৈতিক। কুরআনে তো মদ-জুয়ার কিছু উপকারিতাও স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, কিন্তু সেই সাথে বলে দেয়া হয়েছে যে, এর পাপের মাত্রাটা উপকারের তুলনায় বেশি।
বিজ্ঞানের আলোচনায় পরাজিত হবার পর নাস্তিক্যবাদীরা তাদের সর্বশেষ হাতিয়ার প্রয়োগ করবে; তাহল- অশ্লীলতা, নোংরামি ও কুরুচিপূর্ণ বাক্যবাণ। বলাবাহুল্য, তাদের এ নোংরা আচরণ শুধু বিতর্ককারী বক্তা ও বক্তার পিতামাতার উপর হবে না, বরং আমাদের সবচাইতে দুর্বল জায়গায় অর্থাৎ আমাদের নবীর সম্মানের উপরই হবে। এক্ষেত্রে নাস্তিক তার্কিক, যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিকরা তাদের পূর্বের নিকনেম পাল্টে নতুন নিকটেম ধারণ করবে, যাতে তাদের দ্বিমুখী চরিত্র প্রকাশ না পায়; অর্থাৎ তারা যে বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, যুক্তিবাদিতা ও বিজ্ঞানমনষ্কতার দাবি করত, তার সাথে নিজেদের আচরণের বৈপরীত্য যাতে ধরা না পড়ে যায়।

(৩) যৌবনের উন্মাদনাকে উষ্কে দেয়া: এই শেষোক্ত কৌশলটি হল ইবলীস শয়তানের চিরায়ত কৌশল, যেটি পৃথিবীতে মানবের আবির্ভাবের শুরু থেকে সকল যুগে সকল স্থানে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের যুব সমাজের মাঝে এ ধ্বংসাত্মক জিনিসটি প্রমোট করবার জন্য প্রধানত: তিনটি কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে; যথা-
(ক) সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে নাচ-গানকে প্রমোট করা [সাধারণত শহুরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যুবক-যুবতীরাই এদের লক্ষ্য হয়ে থাকে]
(খ) সামাজিক ও তৃণমূল সংগঠনের মাধ্যমে লিঙ্গবাদী ও যৌনবাদী চেতনাকে উষ্কে দেয়া এবং জরায়ুর স্বাধীনতা, যৌন স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে ঘর ভাঙ্গা ও পরিবার ভাঙ্গায় উৎসাহিত করা [সাধারণত গ্রাম্য নিম্নবিত্ত মহিলারা এদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে]
(গ) রাজনৈতিক কর্মসূচীর আবরণে নারী-পুরুষ বা যুবক-যুবতী এক জায়গায় জড়ো করে দিনের পর দিন রাতের পর রাত কাটানোর সুব্যবস্থা করে দেয়া

ধর্মের শত্রুরা ভাল করেই জানে, কাউকে চোর বানাতে পারলেই সে আর ধর্মের কাহিনী শুনবে না। অবাধ যৌনাচারের স্বাদ যদি কেউ একবার পায়, তার কাছে আর ধর্ম কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ সীমিত যৌনাচার ভাল লাগবে না। পরনারী বা পরপুরুষের স্বাদ যে একবার পায়, নিজের স্ত্রী বা নিজের স্বামীকে তার কাছে ফেলনা মনে হবে। অধর্মের কাজ যার কাছে ভাল লাগবে, ধর্মটাকে তার কাছে বিরক্তিকর ও খ্যাত মনে হবে। সে ভাববে, কোন্‌ শালা এই ধর্ম জিনিসটাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসল আমাদের অনাবিল সুখের মাঝে বাগড়া দেবার জন্য? ধর্মকে এক অসহ্য, অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব আর উটকো ঝামেলা হিসেবেই দেখবে তারা। কারণ, বয়সের উন্মাদনা এমন এক জিনিস, ঐ জিনিস যাকে পেয়ে বসে, সে ঐ পথে যার তরফ থেকে বাধা পায়, তাকেই পথের কাঁটা হিসেবে গণ্য করে এবং যেকোন উপায়ে সেই কাঁটা দূরীকরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে। সেই পথের কাঁটা কোন বস্তু হোক, ব্যক্তি হোক, সমাজ হোক, বা স্বয়ং স্রষ্টাই হোক। নিজের জীবনসঙ্গী বা শিশুসন্তানও যদি এক্ষেত্রে পথের কাঁটা হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন তাকেও চিরতরে দুনিয়া থেকে দূর করে দিতে বুক কাপে না কামাসক্ত নারী বা পুরুষদের। সমাজের আরোপিত নিয়ন্ত্রণ ও বিধি-নিষেধ (restriction) হোক, বা স্রষ্টার আরোপিত বিধি-বিধান হোক, সবটাকেই নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনের পথে, জীবনের সবচে আকাঙ্ক্ষিত কাম্য বস্তু লাভের পথে বাধা হিসেবে দেখে। তাই তারা সামাজিক প্রথা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ভাঙতে উদ্যোগী হয়, 'প্রথাবিরোধী' হয়ে ওঠে। তদুপরি আল্লাহর হুকুম লংঘন করলে আল্লাহর তরফ থেকে প্রাকৃতিকভাবেও মানুষ শাস্তিস্বরূপ অনেক রকম বিপদ-মুসীবত ও ভোগান্তির সম্মুখীন হয়, যা তাদেরকে আল্লাহর প্রতি বিরূপভাবাপন্ন করে তোলে এবং কুফরের দিকে নিয়ে যায়।
একজন মানুষকে যৌনকামনাকেন্দ্রিক ও সেক্সসর্বস্ব করে তুলতে পারলে সে মানব জীবনের সবকিছুকেই যৌনতার দৃষ্টিতে দেখে। ওটাকেই মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও সফলতার কেন্দ্রবিন্দু ও মাপকাঠি বলে গণ্য করে। তারা তখন সব মানুষকেই ঐ আয়না দিয়ে দেখতে শেখে এবং জৈবিক ইন্দ্রিয়কামনা ছাড়া কোন মহৎ উদ্দেশ্যে যে কোন মানুষ কিছু করতে পারে- এই ধারণাটাই তাদের মন থেকে বিলুপ্ত হয়। এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যখন তারা কোন মানুষের দিকে তাকাবে, তখন তারা উক্ত মানুষটির দৈনন্দিন আর সব কাজকর্মের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না, বরং কেবল তার যৌন জীবনটাই চোখে পড়বে। আর ঐ যৌন ক্ষেত্রে নিজের চেয়ে অন্যকে সুখী মনে হলে হিংসায় প্রাণ জ্বলে উঠবে, আর নিজেকে এ দিক থেকে সুখী ও সফল ভাবতে পারলে আত্মতৃপ্তি পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, কোন সেক্সসর্বস্ব ও যৌন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তিই নিজেকে অন্যের চাইতে সুখী ভাবতে পারে না; বরং সে শুধু ভাবে, শুধু আমার চাহিদাটাই অপূর্ণ থেকে গেল, আর অমুকের চাহিদাটা ষোলকলায় মিটিয়ে নিল; হায়রে হায়, হায় আমার কপাল! কোন মানুষের যৌন চেতনাকে যখন এই স্তরে নিয়ে আসা যাবে, তখনই তার মনে নাস্তিকতার বীজ ঢোকানোর উর্বর ভূমি তৈরি হয়ে যায়। কারণ, ঐ অবস্থায় স্রষ্টার প্রতি ক্ষোভ তো এমনিতে থাকেই যে, স্রষ্টা কেন খামাখা এই সুখময় বিষয়টাতে ব্যারিকেড দিলেন; আর স্রষ্টার প্রেরিত পয়গম্বরগণের প্রতিও তাদের মনটাকে বিষিয়ে তোলা সম্ভব হয়। কারণ, তাদের মনে এই চিন্তা বাসা বেঁধে ওঠে যে, ধর্মের নবী নিজে ঠিকই ১৪টা বিয়ে করে নিলেন, আর আমার জন্য শুধু ৪টাতে সীমাবদ্ধ করে দিলেন- তাও আবার দায়িত্ব গ্রহণ ও সমতা রক্ষার শর্তসাপেক্ষে। তারা কিন্তু এটা দেখে না যে, নবী কিন্তু লালন-পালন ও ভরণ-পোষণের সার্বিক দায়িত্ব না নিয়ে স্ত্রী সম্ভোগ করেননি এবং স্ত্রীদের প্রতি ইনসাফ ও সমতা শতভাগ রক্ষা করেছেন। এই নাদানগুলোকে যদি বলা হয়, তোদেরকে কে মানা করেছে ১৪টা বিয়ে করতে, করেই দেখ না, সেই সৎসাহস কিন্তু তাদের হবে না। কারণ, তারা ১৪টা তো দূরের কথা, একটি বিয়েও দায়দায়িত্বভার গ্রহণ করে করতে রাজি নয়। বরং তারা বিশ্বাস করে অবাধ যৌনাচারে। বিয়ে না করেই যদি তারা যৌনসুখ উপভোগের অবাধ সুযোগ পেয়ে যেত, তবে কতই না ভাল হতো! আল্লাহর নবী যে বিয়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বভার গ্রহণ আর সমতা রক্ষার শর্ত প্রযোজ্য করে দিয়ে গেছেন, এটাই তাদের ক্ষোভের কারণ।
নবীর জীবনের আর কোন দিকে তাদের চোখ পড়ে না। নবীজী (সা:) নিজে না খেয়ে কতবার কতজনকে খাইয়েছেন, তা নিয়ে তারা নবীর সাথে পাল্লা দেয় না। নবী কয়টি বিয়ে করেছেন, শুধু সেটা নিয়েই তারা নবীর সাথে পাল্লা দেয়।
আসল ব্যাপারটা হল, যৌন উচ্ছৃঙ্খলতাই যার একমাত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়, তার কথাবার্তা ও আচার-আচরণে কেবল অশ্লীলতারই বহি:প্রকাশ ঘটে। তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ এসব ক্ষেত্রে তারা কেবল অশ্লীল গালিগালাজ ও নোংরা অপবাদ আরোপেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আর এ ভাষার অশ্লীলতা ও নোংরা আচরণ কেবল নিজেদের পরস্পরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শুধু বন্ধু-বান্ধব একে অপরের মা-বাপ তুলে গালি দিয়েই তারা ক্ষান্ত হয় না, বরং মানী-গুণী মানুষজন থেকে শুরু করে ধর্মের নবী-রসূল পর্যন্ত সকলের উপরই যাচ্ছেতাই ভাষা প্রয়োগ করতে শুরু করে। এমন লোকদের দ্বারা সহজেই ধর্মের নবীর নামে মিথ্যা অপবাদ রচনা ও অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করানো সম্ভব হয়। অতএব, চারিত্রিক অশ্লীলতা এমন এক হাতিয়ার, যা শুধু মানুষকে নাস্তিকই বানায় না, বরং উগ্রপন্থী ফ্যানাটিক অভদ্র নাস্তিকে পরিণত করে।

নাস্তিকতা প্রচারে গৃহীত পদক্ষেপ: নাস্তিক্যবাদীরা কিন্তু চুপ করে বসে নেই। তাদের কর্মকাণ্ডও শুধু ব্লগে লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ে ও কচিকাচাদের মাঝে নিজেদের মতাদর্শ ছড়ানোর জন্য, শিশুদেরকে নিজেদের দলের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তারা বাচ্চাদের স্কুলগুলোকে বেছে নিয়েছে এবং স্কুল কর্তৃপক্ষকে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে তাদের সংস্পর্শে আসতে বাধ্য করাচ্ছে। উদ্দেশ্য, তাদের বই-পত্র পড়লে এবং বই-পড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার গ্রহণসহ তাদের প্রোগ্রামে উপস্থিত হয়ে তাদের বক্তব্য শুনলে আস্তে আস্তে শিশুদের মগজ ধোলাই করে নাস্তিকতায় দীক্ষিত করা সম্ভবপর হবে। কোন কোন স্কুলের শিক্ষার্থী ডায়েরীতে লেখা আছে: "প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বৃটিশ কাউন্সিল বা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য হতে হবে।" কোন স্কুল কর্তৃপক্ষ কি তার শিক্ষার্থীদেরকে বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণে বাধ্য করতে পারে? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যে নাস্তিকতার প্রচারক- একথা কে না জানে? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কোন এক অনুষ্ঠানে এর প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহেব একটি ধাঁধার প্রসঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের উত্তরের জবাবে হাসির ছলে বলেছিলেন, "আবার শুধু পরকাল! ইহকালের কথাও কিছু ভাব।" অতএব, আল্লাহ ও পরকালের কথা ভুলিয়ে দেয়াই যে এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য, তা বোঝাই যায়। আর বৃটিশ কাউন্সিল যদিও ধর্মবিরোধিতা বা নাস্তিকতার প্রচারের সাথে সম্পৃক্ত নয়, কিন্তু যেহেতু এটা খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বারা পরিচালিত, তাই এখানে সার্বক্ষণিকভাবে পড়ে থাকা বা এদের সাথে অতিরিক্ত মাখামাখির দ্বারা খ্রীস্টধর্ম ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি এবং নিজ ধর্মের প্রতি অনীহা চলে আসার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া যেহেতু সেখানে ধর্মীয় না হোক, অন্তত পার্থিব কোন বিষয়ে লাভবান হবার মতন মহামূল্যবান কোন জ্ঞানবিজ্ঞানসমৃদ্ধ বই-পুস্তক নেই, সেহেতু সর্বদা ওখানে পড়ে থেকে সময় অপচয়, মেধা ক্ষয় ও শরীর নষ্ট করাটাও সমীচীন নয়।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)