সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও উম্মতের বিভক্তি

নবীর (সা:) সাহাবীগণের মর্যাদা নিয়ে নবীর উম্মতেরা দু' দলে ভাগ হয়ে গেছে। একটি দল খোলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে প্রথম তিনজনকে অভিশপ্ত মনে করে প্রত্যাখ্যান করে ও শেষের জনকে খোদার আসনে বসিয়ে পূজা করে; আরেকটি দল নবীর সাক্ষাত লাভকারী ও মুসলিম পরিচয় দানকারী সকলকেই সাহাবী হিসেবে গণ্য করে এবং যাদের দ্বারা ইসলামের উপকারের চাইতে দৃশ্যত: ক্ষতিই বেশি হয়েছে এমন বিতর্কিত ব্যক্তি মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আস প্রমুখকেও সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে, আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি ইয়াজিদকেও ধার্মিক ও পরহেজগার সোনার ছেলে হিসেবে গণ্য করে। কোরআন-হাদীসের আলোকে এ বিষয়টার মীমাংসা করা কিংবা মীমাংসা করতে না পারলেও পারতপক্ষে মীমাংসার পথে কিছু চিন্তার খোরাক বের করা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
সাহাবী অর্থ সঙ্গী-সাথী। একজন মানুষের অনেক পরিচিত জন থাকতে পারে, অনেকের সাথেই স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য দেখা-সাক্ষাত হতে পারে, জীবন চলার পথে বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে অনেকের সাথেই লেনদেন ও পারস্পরিক সহযোগিতা হয়ে থাকে। কিন্তু সবাই কি আমাদের বন্ধু, সহযোগী ও সঙ্গী-সাথী হিসেবে গণ্য হয়? মনে করুন, একটি রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনীর নেতা বা সেনাপতির অধীনে অনেক কর্মী-সমর্থক বা সৈন্য-সামন্ত থাকেন, তাদের যেকোন কর্মসূচী বা অভিযানে লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণ থাকে, কিন্তু সবাইকে তাদের সহচর হিসেবে গণ্য করা হয় না। বরং তাদের নিকটতম ঘনিষ্ঠ বিশ্বস্ত নির্ধারিত কিছু ব্যক্তিবর্গ ও উপদেষ্টাগণই তাদের সহযোগী ও fellow হয়ে থাকেন।
প্রবাদ আছে, "দু:সময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু।" নবীর (সা:) সাহাবীগণকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একদল ছিলেন প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী, যখন ইসলাম ও নবীর জন্য ছিল দু:সময় ও প্রতিকূল পরিবেশ। সে সময় যারা নবীর সুখ-দু:খের সাথী হয়েছেন, নিজেদের জীবন দিয়ে নবীজীকে আগলে রেখেছেন, তাঁরাই হলেন প্রথম পর্যায়ের সাহাবী। আরেকদল ছিলেন, নবীর (সা:) নেতৃত্বে মুসলমানরা যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ইসলামের বিজয়ের আলামত যখন চোখের সামনে বিদ্যমান, নবীর বিজয় যখন অনিবার্য, অর্থাত মক্কা বিজয়ের অব্যবহিত পূর্বে বা মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে কারা জান বাঁচানোর জন্য ঈমান এনেছেন, কারা সুবিধা হাসিলের জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছেন, কারা সত্যের বিজয় দেখে সত্য উপলব্ধি হয়ে মন পরিবর্তনের কারণে সত্যকে গ্রহণ করেছেন, আর কারা পূর্বে ঈমান এনে থাকলেও অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশের জন্য ঈমানের প্রকাশটা দেরিতে করেছেন- সে সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই জানেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "মুহাজির ও আনসারদের প্রথম অগ্রবর্তী দল এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, এটাই মহা সাফল্য।" [সূরা তওবা-১০০] এখানে দুটি দলের কথা বলা হয়েছে। প্রথম দলটিকে বলা হয়েছে "সাবেকূনা আউয়ালূন" অর্থাৎ যারা নবীর দাওয়াত লাভের প্রথম পর্যায়েই সাড়া দিয়েছেন, অর্থাত প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাঁদের প্রতি আমভাবে ও নি:শর্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ঘোষণা করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় দলটির মধ্যে রয়েছেন দ্বিতীয় পর্যায়ের সাহাবীগণ থেকে শুরু করে আজকের যুগের মুসলমানরা পর্যন্ত, যাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নাজাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে প্রথম দলটির একনিষ্ঠ অনুসরণের শর্তসাপেক্ষে। অর্থাত, দ্বিতীয় দলটির মধ্যে যারা প্রথম দলটির অনুগামী হবে এবং এই অনুসরণটা সুন্দরভাবে ও খাঁটিভাবে হবে, তাদের ব্যাপারেই আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিপূর্ণ গ্যারান্টি রয়েছে।
এবার আমরা যেই সাহাবাগণকে নিয়ে উম্মতের মাঝে মতভেদ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তাঁদেরকে এ আয়াতের কষ্টিপাথরে বিচার করে দেখি। আমাদের সম্মানিত খোলাফায়ে রাশেদীন তথা চার খলীফাই যে সাবেকীনে আওয়ালীনের অন্তর্ভুক্ত, এ নিয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সবাই জানি, পুরুষদের মধ্যে আবুবকর (রা:) ও বালকদের মধ্যে আলী (রা:) প্রথম ইসলাম কবুল করেছেন। আর ইসলাম কবুলের ধারাবাহিকতার দিক থেকে সকলের মধ্যে আবুবকর (রা:) ছিলেন দ্বিতীয় এবং আলী (রা:) ছিলেন তৃতীয়। উমর (রা:) ছিলেন ৪০ নম্বর ব্যক্তি। উসমান (রা:)ও ছিলেন প্রথম দিকে ইসলাম কবুলকারীদেরই একজন। অবশ্য প্রথম পর্যায়ের ইসলাম গ্রহণকারী প্রমাণের জন্য তাঁদের অবদানসমূহ বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন না হওয়ায় এখানে তা আলোচনা করলাম না। ওদিকে আবু সুফিয়ান, মুয়াবিয়া, আমর বিন আস প্রমুখ ছিলেন দেরীতে ইসলাম কবুলকারী। আমরা বর্তমান যুগের মুসলমানরা হচ্ছি তাঁদের পরে আগমনকারী। সুতরাং দ্বিতীয় পর্যায়ের সাহাবী এবং পরবর্তী যুগের উম্মত সকলের ক্ষেত্রেই আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোচ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে শর্ত প্রযোজ্য। দ্বিতীয় পর্যায়ের সাহাবীগণের মধ্যে কেউ যদি প্রথম পর্যায়ের সাহাবীগণের যেকোন একজনের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করেন, তাহলে তিনিও আলোচ্য আয়াতে ওয়াদাকৃত সন্তুষ্টির সুসংবাদের আওতার বাইরে চলে যাবেন। কারণ, আল্লাহ তোমাকে যার তাবেদারি করার হুকুম দিয়েছেন, তুমি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পার না। [অবশ্য প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তালহা ও যুবাইর (রা:)-এর মর্যাদার ব্যাপারে কি হবে? এক্ষেত্রে ব্যাপারটা হল, আলী (রা:) এবং তালহা (রা:) ও যুবাইর (রা:) উভয়েই সাবেকীনে আওয়ালীনের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মধ্যে কে কার অধীন হবেন বা কে কার আনুগত্য করবেন, তা আল্লাহ কোরআনে সরাসরি নির্ধারণ করে দেননি। অতএব, তাঁদের মধ্যে যদি সাময়িক ভুলবুঝাবুঝিবশত: কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেও থাকে, তাঁরা কেউই আল্লাহর বর্ণিত সন্তুষ্টি ও মর্যাদার আওতার বাইরে চলে যাবেন না।] আবার আমাদের মধ্যে কেউ যদি সাবেকীনে আওয়ালীনের অন্তর্ভুক্ত এক বা একাধিক সাহাবীর সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে, তাহলে সেও আর মুসলমান থাকবে না। কারণ, আল্লাহ যাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তুমি তাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে কোন্ অধিকারে? আল্লাহ যাদেরকে ভালো বলেছেন, তুমি তাদেরকে খারাপ বলার কে? সূরা তওবার এ ১০০ নং আয়াতটি জানার পর খোলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যকার যেকোন একজনকে মন্দ বলাটাও আল্লাহর সাথে তর্ক করারই নামান্তর। ভেবে দেখুন, শয়তান কিন্তু আল্লাহকে সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়নি, সে শুধু আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু আদমকে সেজদা করাটা যেহেতু তখন তার উপর আল্লাহর হুকুম ছিল, তাই সে আদমকে অবজ্ঞা করার দ্বারা প্রকারান্তরে আল্লাহর হুকুমকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই সে কাফের হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে, ইহুদী-খ্রীস্টান ও মুশরিকরা কেউই কিন্তু আল্লাহকে অস্বীকার করেনি, বরং তারা শুধু আল্লাহর রসূলকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ যাকে রসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন, তাঁকে রসূল বলে মানতে তারা অসম্মতি প্রকাশ করেছে। তাই এর মধ্য দিয়ে তারা যেহেতু আল্লাহর সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছে, তাই আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী তারা কাফের হিসেবে গণ্য হয়েছে। ঠিক একইভাবে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ যেই সাহাবীগণকে (অর্থাত প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারগণকে) সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করেছেন, তাঁদের প্রতি যারা জেনেশুনে বিদ্বেষ পোষণ করবে, তারাও আল্লাহর ফয়সালাকে প্রত্যাখ্যানকারী হিসেবেই বিবেচিত হবে। অবশ্য কেউ যদি কুরআনে প্রদত্ত আল্লাহর এ ঘোষণা সম্পর্কে অবহিত না থেকে থাকে এবং সংশ্লিষ্ট সাহাবীদের সম্পর্কে কুধারণাটা না বুঝে করে থাকে, তাহলে সে কাফের হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে। বর্তমানে যারা মুয়াবিয়াকে গালিগালাজ করছেন, তারা মূলত এ দিক দিয়ে মুয়াবিয়ার পদাঙ্কই অনুসরণ করছেন। কারণ, তিনি যেভাবে একজন খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, এনারা সেভাবে তিনজন খলীফার সাথে বেয়াদবি করছেন। আল্লাহর নবী (সা:) যার ঈমানকে গোটা উম্মতের ঈমানের চাইতে ভারী বলেছেন, তুমি তাকে কাফের বল কোন্‌ আক্কেলে? আল্লাহকে থোড়াই কেয়ার করে, আল্লাহর নবীকে অবজ্ঞা করে নবীর পরিবারের প্রতি ভক্তি দেখানোর মত ভগলামি এ জগতে আর কী হতে পারে?
প্রথমে ঈমান আনয়নকারী সাহাবাদের মর্যাদার বিষয়টি কোরআন দ্বারা মীমাংসিত হওয়ায় এ ব্যাপারে আর further আলোচনার প্রয়োজন নেই। আর পরবর্তীকালে ঈমান আনয়নকারী সাহাবাদের বেলায় মর্যাদা নির্ধারণের বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ হওয়ায় এ ব্যাপারে আমরা হাদীসের সাহায্য নিতে পারি। প্রথম পর্যায়ের সাহাবীদের অর্থাত সাবেকীনে আওয়ালীনদের পদাঙ্ক অনুসরণে আরো অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নবীজীর (সা:) সঙ্গী হয়েছেন। নবীর সাথে নামাজ পড়েছেন, নবীর সাথে জিহাদের ময়দানে থেকেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কারা এ আয়াতের শর্তমতে পূর্বসুরীদের অনুসরণটা এহসানের সাথে অর্থাত নিখুঁতভাবে করেছেন, আর কারা দায়সারাভাবে করেছেন, এটা আমাদের জানা নেই। তাই পরবর্তী সাহাবীদের মধ্যে কারো মর্যাদা সম্পর্কে ভাল-মন্দ কিছু জানতে হলে তা আমরা নবীর (সা:) হাদীস থেকে জানতে পারি। মুয়াবিয়া সহ ২৭ জন সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে নবী করীম (সা:) ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, "আফসোস! একটি বিদ্রোহী দল আম্মারকে হত্যা করবে।" এ হাদীসটি যখন মুয়াবিয়ার কাখে উত্থাপন করা হয়, তখন তিনি জবাব দেন, "আমরা কি আম্মারকে হত্যা করেছি নাকি? তাকে হত্যা করেছে আলী আর তার সঙ্গীরা। তারাই আম্মারকে আমাদের তীর-বল্লমের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।" এভাবে না বলে তিনি যদি কৈফিয়তটা এভাবে দিতেন যে, আমি তো হত্যার নির্দেশ দেইনি, বরং আমার দলে ঘাপটি মেরে থাকা বিদ্রোহী দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাহলে না হয় সেটা গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু তিনি যেভাবে উল্টো দোষটা আলীর (রা:) উপরেই চাপিয়ে দিয়েছেন, এমতাবস্থায় আলীকে বিদ্রোহী ভাবার চেয়ে মুয়াবিয়াকে বিদ্রোহী হিসেবে গণ্য করাটাই আমাদের পক্ষে অধিকতর সহজ। এছাড়া আরো একটি হাদীস আছে, যে হাদীসে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি, এবং কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তাও আমরা বলতে পারি না, হাদীসটিতে নবী করীম (সা:) বলেছেন, "আমি হাউজে কাওসারে তোমাদের অগ্রগামী প্রতিনিধি হবো , তোমাদের মধ্যে কিছু লোককে আমার নিকট উপস্থাপন করা হবে , আর যখন আমি তাদেরকে পানি পান করাতে উদ্যত হব , তখন আমার নিকট থেকে তাদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন আমি বলবো, হে আমার পরোয়ারদিগার! এরা তো আমার সাহাবী! তিনি বলবেন, আপনি জানেন না তারা আপনার পর নতুন (বিদআত) কি করেছে।" এ হাদীসে নবীজীর পরে যারা বিদ্রোহ ও বিশৃ্ঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল তাদের দিকে ইঙ্গিত থাকতেও পারে। তবে এ হাদীসের আওতায় পড়ুক বা না পড়ুক, এর পূর্বের হাদীসটি থেকে তো মুয়াবিয়া, আমর বিন আস প্রমুখকে বিদ্রোহী হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়। এছাড়া আবু সুফিয়ান, মুয়াবিয়া প্রমুখ যদি শুভশক্তির প্রতিনিধি হতেন, কল্যাণের প্রতীক হতেন, তাহলে ভবিষ্যতে আবু সুফিয়ানের এক বংশধর সিরিয়াতে এক অত্যাচারী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হবে- এই মর্মে কোন ভবিষ্যদ্বাণী নবীর হাদীসে থাকত না। অবশ্য মুয়াবিয়ার সম্পর্কে সুসংবাদজ্ঞাপক হাদীসও রয়েছে। যেমন- নবীর (সা:) উম্মতের প্রথম নৌ অভিযান পরিচালনাকারীরা জান্নাতী। মুয়াবিয়া যেহেতু প্রথম নৌবাহিনী গঠন করেন, সেহেতু তিনি এ সুসংবাদের আওতায় আসতে পারেন। এছাড়া কুরআনেরও এক আয়াতে যারা বিজয়ের পূর্বে ঈমান এনেছে ও জিহাদ করেছে এবং যারা বিজয়ের পরে ঈমান এনেছে ও জিহাদ করেছে তাদের উভয়কেই কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। যাহোক, মুয়াবিয়া প্রমুখের মর্যাদার বিষয়টি কুরআন-হাদীস দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে মীমাংসিত না হওয়ায় মুয়াবিয়ার সম্পর্কে ভাল-মন্দ, ইতিবাচক-নেতিবাচক যেকোন ধারণা বা মন্তব্যই যে কেউ করতে পারে নিজ নিজ গবেষণা, দলীল ও ইজতিহাদের দ্বারা। মুয়াবিয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে হওয়া বা তাঁর সম্পর্কে সদুক্তি বা কটুক্তি করার দ্বারা কেউ ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে না। তবে সতর্ক থাকতে হবে, মুয়াবিয়াকে কেবল বিদ্রোহী বা পাপী বলা যেতে পারে, কিন্তু কাফের বা জাহান্নামী বলা যাবে না। কোন ব্যক্তির প্রতি যত ক্ষোভ বা বিরক্তিই থাকুক না কেন, আমাদের মানসিকতা এই হতে হবে যে, আল্লাহ যদি তাঁর কোন বান্দাকে ক্ষমা করতে চান, তাতে আমরা কেউ বাগড়া দিতে যাব না। আল্লাহর সিদ্ধান্ত যাই হোক, সেটাকে মেনে নেবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। মুয়াবিয়ার মত দ্বিতীয় পর্যায়ের সাহাবীদের মধ্যে যারা বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন, তাদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক অবস্থানে থাকাই ভাল। তাদেরকে না জেনে অভিসম্পাত করাও ঠিক হবে না, আবার অনুসরণীয় হিসেবে গণ্য করাটাও সমীচীন হবে না। আর শুধু শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া কোন মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে টানাহেঁচড়া না করে পারলেই ভাল। মুয়াবিয়ার আমলের প্রতিদান (পুরস্কার বা শাস্তি) মুয়াবিয়া পাবেন, এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার প্রয়োজন নেই। তিনি ভাল হন বা মন্দ হন, যেহেতু তিনি মৃত ব্যক্তি, তাই তিনি এখন আর আমাদের জন্য কোন হুমকি নন।
প্রশ্ন হতে পারে, মুয়াবিয়া যেহেতু একজন ওহী লেখক ছিলেন, কাজেই তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে না পারলে কুরআনের বিশুদ্ধতা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে কিনা। এর জবাব হল-
১) মুয়াবিয়াকে তো আমরা কাফের বা মুনাফিক বলছি না, কেবল ক্ষমতালোভী বিদ্রোহী স্বার্থপর বলছি। তিনি তো ইসলামের শত্রু ছিলেন না, কেবল নিজের স্বার্থের প্রয়োজনে কিছু অপকর্ম করেছেন। কুরআন নাযিলকালে কুরআনের ওহী লেখার সময় কুরআনের বাণী বিকৃত করার দ্বারা তো তাঁর কোন লাভ বা ফায়দা ছিল না। কাজেই অযথা খামাখা প্রয়োজন ছাড়া এ কাজ তিনি কেন করতে যাবেন?
২) রসূলুল্লাহ (সা:)-এর উপর ওহী অবতরণকালে তিনি যেকোন একজনকে দিয়ে লেখাতেন ঠিকই, কিন্তু এমন তো নয় যে আর কেউই তা দেখতেন না বা চেক করতেন না। লেখাপড়া জানা সাহাবীগণ তো নিশ্চয়ই ছিলেন এবং তারা অবশ্যই লিখিত ওহী যাচাই (verify) করতেন। দুনিয়ার একটা সাধারণ বই কোন লেখক শুধু টাইপিস্টের উপর ছেড়ে দেন না, বরং নিজে প্রুফ দেখে চেক করে দেন। সেখানে আল্লাহর কিতাব নবীর উপর নাযিল হবার পর কোন মানুষ কর্তৃক লিখিয়ে সেটা আর কেউ চেক না করিয়েই শুধু এক ব্যক্তির উপর ভরসা করে ফাইনাল করা হয়েছে- এমনটি হওয়া অসম্ভব।
৩) ওহী লেখক হলেই যে তিনি সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকবেন, সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত হবেন, পরবর্তীকালে তাঁর দ্বারা কোন বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা ঘটবে না- এমন কোন কথা নেই। এমন ঘটনাও রয়েছে যে, একজন ওহী লেখক ধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে খ্রীস্টান ধর্মে ফিরে যায় এবং নিজ কওমের মধ্যে প্রচার করে যে, আমি যা লিখে দিতাম তাছাড়া মুহাম্মদ (সা:) আর কিছুই জানে না। (নাউজুবিল্লাহ)
৪) আমাদের নবীজী (সা:) সহ অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম যেহেতু কোরআনের অবতীর্ণ আয়াতসমূহ মুখস্থ করে রাখতেন এবং রসূল (সা:) নিয়মিত তাঁর প্রতি অবতীর্ণ সমগ্র কোরআন জিবরাঈল (আ:)-কে শোনাতেন এবং নিজেও জিব্রাঈলের (আ:) কাছ থেকে শুনতেন, আর সর্বোপরি স্বয়ং আল্লাহ যেহেতু কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, সেহেতু কোরআনের বিশুদ্ধতা কোন ব্যক্তি বিশেষের বিশ্বস্ততার উপর নির্ভরশীল নয়।

যাই হোক, মুয়াবিয়া হয়তো আমাদের মতই দোষে-গুণে একজন মানুষ ছিলেন, পাপ-পুণ্য সবই তাঁর আমলনামায় থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমানে যারা মুয়াবিয়ার পিছনেই লেগে থাকে, মুয়াবিয়ার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতেই ব্যস্ত থাকে, তাদের লক্ষ্য শুধু মুয়াবিয়া নয়, বরং তাদের মুয়াবিয়াবিরোধী ক্যাম্পেইনের মূল মতলব হলো অন্যখানে। মুয়াবিয়া ও এজিদের অপকর্মের জন্য তারা খোলাফায়ে রাশেদীনকেই দায়ী করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য এটা প্রমাণ করা যে, পূর্ববর্তী খলীফাগণ মুয়াবিয়ার ক্ষমতায়ন করে গেছেন বলেই এসব বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটতে পেরেছে। উসমান (রা:) যেহেতু মুয়াবিয়াকে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেছেন এবং তাঁর পূর্বে উমর (রা:) তাকে দামেস্কের গভর্নর নিয়োগ দিয়েছেন, তাই উমর (রা:) ও উসমানের (রা:) খেলাফতকেই এরা কারবালার ঘটনার জন্য দায়ী করে থাকে। কিন্তু কথা হল, খলীফা উমর (রা:) ও উসমান (রা:) কি গায়েব জানতেন? তাঁদের পক্ষে কি এটা বোঝার কোন উপায় ছিল যে, কাকে নিয়োগ দিলে ভবিষ্যতে কি কি ঘটনা ঘটতে পারে? এরা উমর (রা:) ও উসমানের (রা:) খেলাফত নিয়ে টানাহেঁচড়া করলেও ইবনে সাবার ভূমিকা নিয়ে কোন কথা বলে না। অথচ আমরা জানি, ইসলামের ইতিহাসে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ঘটে ইবনে সাবার মাধ্যমেই। ইবনে সাবার সৃষ্ট গোলযোগেরই ধারাবাহিকতায় উসমান হত্যা এবং উটের ও সিফফিনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে কারবালার হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত সবকিছু সংঘটিত হয়। কিন্তু মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের কর্মকাণ্ডের জন্য ইবনে সাবাকে দায়ী না করে শুধু উমর (রা:) ও উসমান (রা:)-কে দায়ী করবার হেতুটা কি? ইবনে সাবার ব্যাপারে এদের নীরবতার একটাই কারণ, আর তাহল তারা মূলত: ইবনে সাবারই ভাবশিষ্য। প্রথম তিন খলীফা আলী (রা:)-কে বঞ্চিত করে নিজেরা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন- এই তত্ত্বের আবিস্কারক ও প্রবর্তক হচ্ছে এই ইবনে সাবা। তাদের মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাই যে এই ইবনে সাবা। নিজেদের গুরুকে কি আর দোষ দেয়া যায়?

যারা বলেন, কারবালার ঘটনায় ইয়াজিদ নির্দোষ এবং শিয়ারা নিজেরাই ইমাম হোসাইন (রা:)-কে হত্যা করে তারপর আবার নিজেরাই চিরকালের জন্য মাতম শুরু করেছে, তাদেরকে বলি, ইয়াজিদের আমলে তো শুধু এই একটা বর্বরতা ঘটেনি। তার চার বছরের শাসনামলের প্রথম বছর ঘটে কারবালার ঘটনা, দ্বিতীয় বছর ঘটে মক্কায় মদীনায় গণহত্যা, আর তৃতীয় বছর ঘটে মক্কা আক্রমণ ও কাবাঘরে অগ্নিসংযোগ। একটা ঘটনা না হয় ভুল করে বা দুর্ঘটনাবশত: হতে পারে, কিন্তু পর পর তিন বছর তিনটি মারাত্মক ঘটনা কি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা শাসকের অজ্ঞাতসারে ঘটা সম্ভব?
অপরদিকে যারা বলেন, প্রথম তিন খলীফা সত্যিকার মুসলমান ছিলেন না, তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন শুধু নবীর (সা:) বিশ্বস্ততা অর্জনপূর্বক নবীর ওফাতের পরে নিজেরা ক্ষমতা লাভের পথ তৈরি করবার উদ্দেশ্যে, তাদেরকে বলি, যখন আমাদের নবী ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন কে জানত, নবী একদিন রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং তাঁর সাথে থাকলে ভবিষ্যতে নিজেরাও রাষ্ট্রক্ষমতার উত্তরাধিকারী হওয়া যাবে? যে অবস্থায় আমাদের নবীজী (সা:) একা তাঁর দু'চারজন সঙ্গী নিয়ে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপের মধ্যে কোণঠাসা অবস্থায় কোনরকম তাওহীদের বাণী প্রচার করতেন, সে অবস্থায় একথা কি কোন পাগলেও চিন্তা করত যে, নবী একদিন অর্ধ দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ লাভ করবেন? সেরূপ প্রতিকূল অবস্থায় যারা শত বাধাবিঘ্ন ও হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে ঈমান এনেছিলেন, তারা তো নিজেদের জান-মালের ক্ষতি স্বীকার করেছেন, সমাজে তাঁদের নিজেদের যেটুকু ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, তাও বিসর্জন দিয়েছেন। তখন আশেকে রসূল (সা:) হওয়া এত সহজ ও সুলভ ছিল না, তখন নবীপ্রেমিক হতে হলে নিজের পায়ে সাপের কাপড় খেয়েও দাঁত কামড়ে থাকতে হয়েছে, কিন্তু নবীর ঘুম নষ্ট করা হয়নি। শুধু আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের জন্য মেকী চোখের পানি ঝরিয়ে বা শৌখিন মাতম করে নবীর অনুসারী তথা নবীভক্ত সাজবার কোন সহজ ও কৃত্রিম রাস্তা তখন বর্তমান ছিল না। মুনাফেকি বা তাকিয়্যা করে ফায়দা লাভ করা বা ক্ষমতার অংশীদার হবার সুযোগ মদীনার জীবনে তৈরি হয়েছিল, যেই সুযোগের সদ্ব্যবহার কেউ কেউ করেছে এবং ইতিহাসে তারা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েই আছে। কিন্তু মক্কী জীবনে এমন কোন সুযোগ ছিল বলে কোন ঐতিহাসিক দেখাতে পারবে না।
এককথায়, ইয়াজিদকে ফেরেশতা মনে করা, আর নবীর ঘনিষ্ঠতম সাহাবীদেরকে বিশ্বাসঘাতক মনে করা- এই দুই মতবাদের কোনটিই ঐতিহাসিক বিচারে ধোপে টেকে না।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)