সবচেয়ে বহুল প্রচলিত চারটি বেদআত

মুসলিম সমাজে বেদআত বলে প্রচলিত যেসব জিনিস আছে; যথা- মাজার পুজা, আগুন পুজা ইত্যাদি, সেগুলো আমার এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। কারণ, সেগুলো ইতিমধ্যে (already) সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ ও মূলধারার ওলামায়ে কেরাম দ্বারা প্রত্যাখ্যাত এবং বিদআত বলে চিহ্নিত ও সাব্যস্ত। ওসব বেদআতের অনুসারীরা মুসলিম সমাজে এখনো সংখ্যালঘু হিসেবেই পড়ে আছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনজীবনে কোন গুরুতর (major) হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু এখানে আমি সেই সব বিদআতের কথা উল্লেখ করতে চাই, যেগুলোকে কেউ বিদআত বলে ধরতেই পারেননি এবং যেগুলো জনগণের মাঝে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ও সমাদৃত অবস্থায় আছে।
আমার মতে, মুসলমানদের মাঝে সবচাইতে প্রতিষ্ঠিত ও সর্বাধিক প্রচলিত বেদআতগুলো হলো:-
(১) মাযহাব
(২) গণতন্ত্র
(৩) বোরখা
(৪) লেখাপড়া

ঘাবড়ে যাবেন না বা আঁতকে উঠবেন না। বেদআতের সংজ্ঞা এবং তার আলোকে আমাদের সমাজব্যবস্থা, আচরণ ও কীর্তিকলাপ পর্যালোচনা করলেই দেখতে পারবেন, আমার এ পর্যবেক্ষণ ঠিক আছে কিনা। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেখুন:-

বেদআত: এবাদত ও সওয়াব মনে করে বা ধর্মের নামে এমন কোন কাজ করা বা করানো, যা আসলে আল্লাহ ও রসূল আমাদেরকে করতে বলেননি, তাকেই বেদআত বলা হয়। বেদাতের এই সংজ্ঞার আলোকে আমার উল্লেখিত বিষয়গুলো যাচাই করা যাক।

(১) মাযহাব: কোরআনের কোন আয়াতে মাযহাব বা সুনির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ সম্পর্কে কিছু নেই। নবীও তাঁর কোন হাদীসে এসব কিছু বলে যাননি। নবীজী আমাদেরকে ছেড়ে যাবার শত শত বছর পরে এসবের প্রচলন ঘটেছে। অতএব এটা নিশ্চিতভাবেই মনগড়া বেদআত।

(২) গণতন্ত্র: জগতের সকল ওলামায়ে কেরাম, মুফাসসির, হাফেজ ও মুহাদ্দিসগণ কেউই বলতে পারবেন না যে, গণতন্ত্র নামে কোন শব্দ আল্লাহর কিতাব বা নবীর হাদীসের কোথাও বর্তমান আছে। অথচ অনেকে এই গণতন্ত্রকেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র সহীহ পদ্ধতিরূপে গ্রহণ  করেছে; এমনকি গণতন্ত্রের আন্দোলনের নামে, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে জনগণের জান-মালের সমূহ ক্ষতি সাধন করছে। একে বেদআত ছাড়া আর কি-ই বা বলা যেতে পারে?

(৩) বোরখা: কোরআন শরীফে বোরখা বলে কিছুর উল্লেখ নেই, নবীর জিন্দেগিতেও বোরখা বলে কোন পোশাকের অস্তিত্ব ছিল না। কোরআনে বলা হয়েছে চাদরের কথা, এবং চাদরটা শুধু মাথায় না দিয়ে চাদর দিয়ে সামনের বুকটাও ঢেকে রাখার কথা। এখন কেউ চাদর বা ওড়না দিয়ে মার্জিত ও শালীনভাবে চলতে পারলেও শুধু বোরখা না থাকার কারণে এটাকে যদি ধর্মের প্রতি উদাসীনতা হিসেবে গণ্য করা হয়, ধার্মিকতার অভাবের আলামত হিসেবে ধরে নেয়া হয়, তাহলে এমন মানসিকতা সাক্ষাৎ বেদআত বৈ আর কিছু নয়। অথচ বোরখার নামে স্কিন টাইট পোশাক- যা কিনা পর্দার মূল উদ্দেশ্যকেই মাটি করে দেয়, সেটাকেই আজকাল পর্দাশীলতা ও ধার্মিকতা হিসেবে গণ্য করা হয়। অপরদিকে সাধারণ সাদামাটা পোশাক দিয়ে স্বাভাবিক শালীনতা বজায় রাখাকেও ধর্মহীনতা ও বেপর্দা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বোরখাও ইসলামী পোশাক নয়, হিজাব বা স্কার্ফও কোন ইসলামী পোশাক নয়, বরং ইসলামী পোশাক হচ্ছে চাদর বা প্রশস্ত মোটা ওড়না। কারণ, চাদরের কথা যেমন সরাসরি কোরআনে নির্দেশিত হয়েছে, তেমনি বাস্তবে মানুষের শরীরের রং ও অবয়ব ঢেকে রাখবার জন্যও একমাত্র এটাই উপযোগী পোশাক, তদুপরি এ পোশাক শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান আবৃত রাখার পাশাপাশি অনাবৃত অংশটুকুকেও আকর্ষণীয়রূপে তুলে ধরে না, খোলা অংশটুকুর জন্যও বাড়তি সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবে কাজ করে না। পর্দার বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্য প্রকাশকে নিষেধ ও নিরুৎসাহিত করা। বোরখা বা হিজাব যদি সৌন্দর্য প্রদর্শনেরই মাধ্যমে পরিণত হয়, সেক্ষেত্রে সেটাকে পর্দা হিসেবে গণ্য করা যায় না। তবে হ্যাঁ, বোরখা বা স্কার্ফ যদি ঢিলেঢালা, বড় ও প্রশস্ত আকারের হয়, নন-ফ্যাশন্যাবল (Non-Fashionable) হয়, তাহলে এটা পর্দার মাধ্যম হতে পারে।
অতি গোড়া ও নির্বোধ টাইপের কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে শিশুদেরকেও বোরখা দিয়ে মুড়িয়ে রাখার এক হাস্যকর প্রবণতা দেখা যায়। অথচ বাচ্চাকে বাচ্চা হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত। বাচ্চাদেরকে বড় মানুষের সুরতে তুলে ধরার কোন যুক্তি নেই। পর্দার বিধান যে কারণে নাযিল হয়েছে, সে কারণটি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (applicable) নয়। শিশুকে শিশুর মতো রাখাটাই শিশুর নিরাপত্তার জন্য অধিক সহায়ক। সাবালক পোশাক (Adult Dress) নাবালককে বালেগ ভাবতে প্ররোচিত করবার একটি আশংকা তৈরি করে।
আমাদের সমাজে যারা বোরখা পরে, তাদের মধ্যে কয়জন আছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পর্দা রক্ষার্থে স্বেচ্ছায় তা পরিধান করছে? বোরখা কি অধিকাংশ মেয়ে স্বেচ্ছায় পরে, নাকি তাদের উপর এটা আরোপ করা হয়? মূলত: বোরখা পরা হয়ে থাকে হয় সামাজিক কারণে ও মুরুব্বীদের চাপে, অথবা নিছক ফ্যাশন হিসেবে। আর ফ্যাশন তো হলো সৌন্দর্য প্রকাশেরই অপর নাম, যেই সৌন্দর্য প্রকাশকে নিষিদ্ধ করবার উদ্দেশ্যেই ইসলামে পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য, মানুষের ভয়ে সামাজিকতা রক্ষার্থে যে আমলই করা হোক না কেন, তা তো শিরক বৈ আর কিছু হবে না। পর্দা মূলত: দুই প্রকার- ধর্মীয় পর্দা এবং সামাজিক পর্দা।

(৪) লেখাপড়া: লেখাপড়া বেদআত- এ কথাটিকে হয়তো আপনারা নবীর (সা:) হাদীসের বিপরীত কথা হিসেবেই গণ্য করে বসবেন। কিন্তু না, আমাদের নবীজী (সা:) যেই লেখাপড়ার কথা বলেছেন, আমি সেই লেখাপড়ার কথা বলছি না। আমি বলছি আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত লেখাপড়ার কথা। নবী (সা:) আমাদেরকে বলেছেন ধর্মীয় এলেম শিক্ষা করতে। কিন্তু আমাদের সমাজে অভিভাবকরা স্কুলের পরীক্ষাকেন্দ্রিক লেখাপড়াকেই ধর্মীয় কাজ হিসেবে জাহির করে থাকেন। পিতামাতার কথা শোনা, লেখাপড়া করা এগুলো হলো আল্লাহর আদেশ এবং পিতামাতার কথামত লেখাপড়া না করলে, পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট না করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন- এমন একটা তত্ত্ব প্রচারিত হয়ে আসছে আমাদের সমাজে বহু বছর ধরে।
আমাদের দেশের কথিত ভাল স্কুলগুলোর পাঠ্য তালিকা বিচার করে দেখুন, তার মধ্যে ধর্মের কতটুকু অংশ আছে। স্কুলে আমাদের শিশুদেরকে ধর্মের আগে ধর্মের ফেস্টিভ্যাল শিখতে হয়। অর্থাৎ, মুসলমানদের উৎসব হল ঈদ, হিন্দুদের উৎসব দুর্গাপুজা, খ্রীস্টানদের বড়দিন, আর বৌদ্ধদের বুদ্ধ পূর্ণিমা। কিন্তু তার আগে ধর্ম কি, আমাদের ধর্মটাই বা কি, ধর্মের মূল কথা কি, স্রষ্টা কে- এসব কথা ওভাবে শেখানো হয় না। এখন আপনারাই বলুন, এখানের প্রচলিত লেখাপড়া থেকে যে এলেম শিক্ষা ফরজ, সেই ফরজ কি আদায় হয়? এসব অনর্থক পড়া মুখস্থ করতে গিয়ে কি প্রকারান্তরে আসল ফরজ দ্বীনী এলেম শিক্ষার কাজেই ব্যাঘাত ঘটছে না? যেই এলেম শিখতে গিয়ে নামাজ পড়ার সময় পাওয়া যায় না, সেই এলেম যে আল্লাহ ও রসূলের নির্দেশিত ফরয এলেম নয়, সেই এলেম যে মূলত শয়তানের পাতা ফাঁদ- এটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবার কথা নয়।
আমাদের সমাজে লেখাপড়ায় শিথিলতাকে নৈতিক দোষ হিসেবে গণ্য করা হয়। লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করা বা লেখাপড়ার ব্যাপারে সিনসিয়ার ও সিরিয়াস হওয়াটাকে পুণ্যকাজ এবং লেখাপড়ায় কোনরূপ ব্যর্থতা বা উদাসীনতাকে পাপকাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু পাপ-পুণ্যের সংজ্ঞা এভাবে মানুষ নির্ধারণ করতে পারে না। আল্লাহর নির্দেশিত হালাল-হারাম ও পাপ-পুণ্যের বিধানের বাইরে নিজেরা কোন কাজকে পুণ্য আর কোন কাজকে পাপ সাব্যস্ত করবার এখতিয়ার মানুষ রাখে না। আল্লাহ ও নবী (সা:) যে কাজকে পাপ হিসেবে সাব্যস্ত করেননি, সে কাজকে পাপ হিসেবে দাবি করা এবং তার জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া ইসলামসম্মত নয়। আর এ কাজটাতে যদি ধর্মের দোহাই দেয়া হয়, তাহলে একে খোদার উপর খোদগিরি ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের বাইরে অন্য কিছুকে নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করাটাই বেদআত। তথাকথিত লেখাপড়াকে মানুষ যেভাবে ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে, এবাদত বানিয়ে নিয়েছে; একে বেদআত ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়?
আগের দিনে মুসলমানদের কাছে লেখাপড়ার অর্থই ছিল কোরআন-হাদীস অধ্যয়ন করা ও ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা করা। তখন তাই লেখাপড়া করাটা প্রশংসনীয় ব্যাপার ও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য ছিল এবং লেখাপড়ায় অবহেলার মানে ছিল আল্লাহর আদেশ পালনে শিথিলতা- যেহেতু আল্লাহই কোরআন-হাদীস শিখতে বলেছেন। কালের বিবর্তনে মুসলিম জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মজ্ঞান চর্চা নির্বাসিত হয়েছে এবং ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে চালু হয়েছে ধর্মহীন শিক্ষা। এখন লেখাপড়ার মানে হয়ে দাড়িয়েছে বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি সাহিত্য, চারুশিল্পের ইতিহাস ও দর্শনের সূত্র মুখস্থ করে কোনমতে একটা ডিগ্রী হাসিল করা। শিক্ষার ধরন ও বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হলেও শিক্ষা সংক্রান্ত ফতোয়াটা পূর্বের মতই রয়ে গেছে। অর্থাত, লেখাপড়া করাটা পুণ্যের কাজ আর না করাটা পাপের কাজ- এ ধারণাই মুসলিম সমাজে প্রচলিত রয়ে গেছে। কিন্তু উক্ত ফতোয়াটা কোন্‌ প্রোক্ষাপটে কোন্‌ ধরনের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, সেটা আজ ভুলে বসেছে মুসলমান।
লেখাপড়া নিয়ে প্রচলিত বেদআতের সবচেয়ে চূড়ান্ত পর্যায়টি হল লেখাপড়ার জন্য প্রহার করাকে জায়েয মনে করা। আমাদের মুরুব্বীদের মাঝে সবচাইতে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত অবিদ্যাটি হল, শাসন না করলে ছেলেপেলে মানুষ হয় না, মারপিট না করলে ছেলেপেলের লেখাপড়া হয় না। কিন্তু একজন মুমিন সবসময় কোনকিছুর ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দ যাচাই করতে হলে আল্লাহর বিধান ও রাসূলের (সা:) জীবনীর মধ্যে দেখে নেবে। রসূলুল্লাহ (সা:) কি কোনদিন লেখাপড়ার জন্য কাউকে মেরেছেন বা বকেছেন? কিংবা এমন কি হয়েছে যে, নবীজীর (সা:) কোন সাহাবী লেখাপড়ার জন্য কোন শিশুকে মারপিট বা তিরস্কার করেছেন, আর নবী তাতে সায় দিয়েছেন? তেমনটি যদি না হয়ে থাকে, তাহলে যারা শুধু লেখাপড়ার জন্য শিশুদেরকে মারা বা বকাকে হালাল মনে করে, তারা নবীর (সা:) উম্মতই না।

এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় বিবেচ্য যে, আল্লাহর এবাদত তথা আল্লাহর হুকুম পালনের উপরে অন্য কিছুকে প্রাধান্য দেয়াটা একপ্রকার শিরক। বর্তমানে প্রচলিত লেখাপড়া নিয়ে মানুষের অনাবশ্যক দৌড়ঝাঁপ ও চেষ্টা-সাধনা যে পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়, আল্লাহর স্মরণ ও আল্লাহর নাম-কালাম শেখানোর ব্যাপারে তার এক দশমাংশ চেষ্টা বা গরজও মানুষের মাঝে দেখা যায় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণের পরিবর্তে সামাজিকতা, রিয়াকারিতা ও লৌকিকতাই মানুষের মাঝে প্রাধান্য পাচ্ছে- যা মানুষকে সূক্ষ্মভাবে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

নবী করীম (সা:) বলেছেন, "প্রত্যেক বেদআতই হচ্ছে গোমরাহী।" তাইতো আমরা প্রত্যেকটি বেদআতের ভয়াবহতা ও ক্ষতিকর প্রভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। উপরে আলোচিত ১ নং বেদআতটির ফল হচ্ছে যুগে যুগে মুসলিম দেশগুলোতে লাশের পাহাড়। ২ নং বেদআতটির ফলাফল হচ্ছে নিরীহ মানুষ আগুনে পুড়ে মরা। ৩ নং বেদআতটির ফল হচ্ছে নারী নির্যাতন বা নারীদের হয়রানি ও ভোগান্তি, যা ঘটে শারীরিক অসুস্থতা কিংবা মানুষের কুদৃষ্টির মধ্য দিয়ে। আর ৪ নং বেদআতটির ফল হচ্ছে শিশু নির্যাতন, যা কিনা শিশুদের জীবনকে বিষাদময় ও শ্বাসরুদ্ধকর করে তোলে। এ শেষোক্ত বেদআতটিই আজ বাংলার ঘরে ঘরে ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে শিশুদের পার্থিব জীবন বিশেষত শৈশব জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে এবং পারলৌকিক জীবনকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কারণ, ইহা শৈশব জীবনের বিশ্রাম, বিনোদন, শান্তি-আরাম ও মানসিক বিকাশকে যেভাবে ব্যাহত করে, তেমনি পারলৌকিক জীবনের জন্য ধর্মীয় এলেম শিক্ষা ও ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করবার পথেও বাধা সৃষ্টি করে।
অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আমাদের আলোচ্য এ চারটি বিষয় মানুষকে এমন ফ্যানাটিক, অসহিষ্ঞু ও স্বেচ্ছাচারী করে তোলে যে, নিজের মতামত ও সিদ্ধান্ত অন্যের উপর চাপিয়ে দেবার প্রবণতা দেখা যায় এবং ঘরের-বাইরের, প্রতিদ্বন্দ্বী, পোষ্য-অধীনস্থ নির্বিশেষে মানুষের জীবন, সুখ-শান্তি ও সম্মানের প্রতি সম্মান জানানোর প্রয়োজনীয়তা বিলুপ্ত হয়। অভিজ্ঞতায় আরও দেখা যায়, যে পরিবারে বোরখা ধার্মিকতার মাপকাঠি হয় এবং লেখাপড়া নৈতিকতার মাপকাঠি হয়, সে পরিবার থেকে ন্যায়বিচার চিরতরে বিদায় নেয়। কারণ, একজন ধর্মদ্রোহী দুরাচারী ব্যক্তির পক্ষেও শুধু বাহ্যিক লেবাসের দ্বারা নিজেকে ধার্মিক দেখিয়ে ধর্মবিরোধী ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড নিরাপদে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। একজন স্বার্থপর লোভী সংকীর্ণমনা ব্যক্তিও শুধু লেখাপড়ায় ভাল হবার গুণে অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করে নিজের অন্যায় আবদার পূরণ করতে এবং অন্যদের হক নষ্ট করতে সক্ষম হয়।
মাযহাবের নামে ফেরকাবাজির দ্বারা এবং গণতন্ত্রের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচীর দ্বারা সমাজে, রাষ্ট্রে ও পৃথিবীতে মুসলমানদের মাঝে যত রক্তপাত হচ্ছে, লেখাপড়ার নামে মাতলামি ও বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে পরিবারে যত সন্তান হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, এগুলোকে কেন জানি আল্লাহর গযব বলেই মনে হয়। আমরা জানি, বনী ইসরাইল কর্তৃক বাছুরকে উপাস্য বানানোর পর তার শাস্তি হিসেবে আল্লাহর তরফ থেকে যা ধার্য হয়েছিল, তা হল 'ফাকতুলূ আনফুসাহুম' অর্থাৎ নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করা। উল্লেখ্য, অতীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে যা সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ হিসেবে জারি হতো, বর্তমানে তার অনেক কিছুই ঘটতে দেখা যায় অন্যভাবে। যেমন, পারস্পরিক হত্যাকাণ্ডটা আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে প্রায়শ্চিত্যস্বরূপ হয় না, বরং পরিস্থিতিতে পড়ে মানুষ নিজেরাই করতে প্রবৃত্ত হয়। আবার, বনী ইসরাইলের উপর অনেক হালাল খাবার হারাম করে দেয়া হয়েছিল তাদের গোয়ার্তুমির শাস্তি হিসেবে, আর এখন অনেকের হালাল খাবার বর্জন করতে হয় শারীরিক সমস্যার দরুন ডাক্তারের পরামর্শে, যা মূলত আল্লাহর তরফ থেকে পরোক্ষভাবে আসা শাস্তিস্বরূপ। এ হিসেবে ফাকতুলূ আনফুসাহুমের ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, শিরকে লিপ্ত হবার শাস্তি হচ্ছে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক রক্তপাত। মানুষ যখন আল্লাহকে বাদ দিয়ে অপর কিছুকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ ও আল্লাহর হুকুম যতটা গুরুত্ব পাবার কথা অন্য কিছু সেই স্থান দখল করে বসে, তখন সেই উপাস্যগুলোই মানুষের জন্য মরণরূপে দেখা দেয়, পারস্পরিক খুনাখুনির কারণ ঘটায়। আল্লাহ ভালো জানেন। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
বেদআতের দ্বারা মানুষ যতটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা অন্যান্য পাপের দ্বারা হয় না। এর কারণ হল দুটি; প্রথমত, অন্যান্য পাপ কাজকে মানুষ পাপ হিসেবে জানলেও বেদআতকে কেউ পাপ মনে করে না, বরং পুণ্য ভেবেই করে থাকে। এ প্রসঙ্গে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, তা হল ইবলীসের একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, "আমি পাপ করিয়ে করিয়ে মানুষকে ঘায়েল করতে থাকি, আর মানুষ তওবা করতে করতে আমাকে ঘায়েল করতে থাকে; অবশেষে মানুষকে আমি এমন কিছু পাপের মাঝে জড়িয়ে দেই, যা সে ভাল মনে করে করতে থাকে, ফলে জিন্দেগিতেও আর তওবা করার তওফিক হয় না।" মনে করুন, প্রবৃত্তির তাড়নায় পাপে লিপ্ত কাউকে মৃত্যু ও দোযখের ভয় দেখিয়ে ফেরানোর চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু পীরপূজায় লিপ্ত কাউকে মৃত্যুর আগ মুহুর্তেও তওবা করানো কঠিন। কারণ, সে ঐ কাজটাকে এমন কোন পাপ মনে করছে না যা পরকালে নাজাতের প্রতিবন্ধক হবে, বরং একে নাজাতের মাধ্যম বলেই আশা নিয়ে আছে, পরকালে মুক্তির আশাতেই সে তা করছে। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য পাপের দ্বারা দ্বীন ও আখেরাতের ক্ষতি হলেও দুনিয়াবি কিঞ্চিত ফায়দা হাসিল হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ ডাকাতি বা লুচ্চামি করলে সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও দুনিয়ায় সাময়িকভাবে কিছুটা লাভ সে পায়। কিন্তু যে বা যারা ফেরকাবাজি করে হানাহানি করে মরল, কিংবা ডিগ্রীবাজি করে বাচ্চাদের জীবন ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করল, তাদের তো সব দিক থেকেই লোকসান (loss) হল। অন্যান্য পাপে হয় খণ্ডনাশ, আর বেদাতে হয় সর্বনাশ। শিরক তথা মূর্তিপুজা থেকে যেমন কোন তৃপ্তি বা আরাম পাওয়া যায় না, খামাখা কেবল জাহান্নামের খোরাক হতে হয়, বেদআতের দ্বারাও ঠিক তেমনই শুধু দোজাহানের একতরফা ক্ষতিই সাধিত হয়। যে ব্যবসায় কোন লাভের সম্ভাবনা নেই, বরং শুধু নিশ্চিত ক্ষতিই আছে, জেনেশুনে সেই ব্যবসায় হাত দেয় কোন্‌ বেকুবে?
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তিনি যতটুকু দিয়েছেন ততটুকু গ্রহণ করার এবং তাঁর নির্ধারিত ও আরোপিত দায়িত্বের বাইরে যেকোন প্রকার বাড়তি বোঝা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)

এসব ব্যাপারে সকল ইসলামি চিন্তাবিদ বা গবেষকগণ একমত হতে পারেন নি। কেউ বিদআত বলছেন, কেউ এসব অপরিহার্য বলছেন। এটা খুবই জটিল বিষয়।

রাসূল (সাঃ) বলেন, ধর্মের নামে সকল নতুন কাজ হল বিদাত, সকল বিদাত হল গোমরাহি বা পথভ্রষ্টতা। (মুসলিম- ১৫৩৫)

সকল গোমরাহির পরিণাম জাহান্নাম। (নাসাঈ- ১৫৬০)

আজ ৯০% এর অধিক সংখ্যক মুসলিম এসবে জড়িত। 

-

আবদুল আউয়াল

এসব বিষয় বিদআত হবার ব্যাপারে একমত হওয়া বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া কঠিন। তবে এগুলো যেহেতু আমাদের প্রায় সকলেরই ব্যক্তি ও পরিবার-পরিজনের জীবনকে প্রভাবিত করে, তাই এসব জিনিসের সার্বিক উপকারিতা ও অপকারিতা পর্যালোচনা করে আমাদের জীবনের অনেক কিছুই পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। আমরা সবাই মিলে এসব ক্ষেত্রে নিজ নিজ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করে মুসলিম জনগণের জন্য কোন্‌ কাজটি কল্যাণকর আর কোন্‌ কাজটি অকল্যাণকর সে ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারি।
তবে একটা ব্যাপারে আমাদের সবাইকে একমত হতে হবে যে, মাযহাব না মানার কারণে কোন মুসলিমকে, বোরখা না পরার কারণে কোন নারীকে, প্রচলিত ফরমায়েশী লেখাপড়ায় অনীহার কারণে কোন শিশুকে হেয় করা যাবে না।

সালাম

বোরখা  না পড়লে   কোন  নারীকে  যেমন  হেয়  করা  যাবে  না  ,  তেমনি  বোরখাকে  বেদআত   বলাও  ঠিক  হয়  নি ।    যে   ঢিলাঢিলা  কাপড়  পরলে   পুরো  শরীর   ভালভাবে  ঢাকা  থাকে  ,  আমাদের   দেশে সেটাকেই    বোরখা  বলে  ।     তাই   বোরখা  পরা   বেদআত  বললে   অহেতুক  একটি   বিতর্কে  মুসলমানরা  জড়িয়ে  পড়বে  ।

বোরখা পরাটা বেদআত নয়, বরং বোরখাকে ফরয মনে করাটা বেদআত। অর্থাৎ, ইসলাম নির্দেশিত পর্দার ফরয বিধানটা কেবল বোরখার দ্বারাই পালিত হতে হবে, অন্য কোন শালীন পোশাকের দ্বারা করলে ফরযটি অনাদায়ী থাকবে- এমনটি ভাবা বেদআত।

প্রশ্ন হতে পারে, আমাদের আলোচ্য এ চারটি বিষয় একেবারে বাদ দেয়া সম্ভব কিনা। এ প্রসঙ্গে আমরা অন্তত এটুকু বলতে পারি যে, এ বিষয়গুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি, গোঁড়ামি ও মাতলামি পরিহার করতে পারলেই সমাজে শান্তি ফিরে আসবে।

মাযহাব— যে ইচ্ছা একটা মাযহাব মানুক, যে ইচ্ছা আরেকটা মানুক, যে ইচ্ছা কোন মাযহাবই না মানুক, যে ইচ্ছা সবগুলো মাযহাবের থেকে যে ব্যাপারে যেটা সুবিধা সেটা মানুক— এজন্য কাউকে বোমা মারার দরকার নেই।

গণতন্ত্র আপনি পছন্দ করেন করতে পারেন, কিন্তু এটা যে থাকতেই হবে, এটা ছাড়া যে কিছুদিন চলা যাবে না— এ প্রবণতা পরিহার করুন। দেশে গণতন্ত্র আনার জন্য মানুষকে পুড়িয়ে মারার দরকার নেই।

বোরখা যে ইচ্ছা পরিধান করুক, যে ইচ্ছা এটা ছাড়া অন্য কোন পন্থায় পর্দা বজায় রাখুক। এ নিয়ে কাউকে মন্দ বলার দরকার নেই।

আর লেখাপড়া— বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করান, নো প্রবলেম। লেখাপড়া করুক, বেশ ভালো। তবে শুধু এটুকু বলব, বাচ্চা ক্লাস ডিঙাতে পারলেই সন্তুষ্ট থাকুন। ফার্স্ট হবার জন্য চাপাচাপি বা পীড়াপীড়ি করার দরকার নেই।
লেখাপড়া একেবারে না করলে সমাজেও স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না, অপমানিত থাকতে হবে। এছাড়া ধারাবাহিক লেখাপড়া ছাড়া মানসিক বিকাশও পূর্ণতা পাবে না। কিন্তু শুধু একটা বিষয়ে সতর্ক থাকবেন, লেখাপড়া নিয়ে এমন কোন অতিরিক্ত উন্মাদনা ও অস্থিরতা করা যাবে না, যা শিশুর জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে। লেখাপড়ার প্রতি এমনভাবে addicted বা উন্মত্ত হওয়া যাবে না, যা পারিবারিক শান্তিকে বিনষ্ট করে এবং ধর্মশিক্ষা ও ধর্মপালনের সময় ও মনোযোগকেও কেড়ে নেয়।

সর্বোপরি "Excess of Anything is Bad" প্রবাদটি সর্বদা স্মরণ রাখবেন। তাহলে কোন জিনিস অপকারী হলেও তার অপকারিতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যাবে এবং উপকারী হলে তার উপকারিতা বজায় থাকবে। আর সবসময় ধৈর্য্য ও সহনশীলতা বজায় রেখে চলবেন। তাহলে কোন কিছুই আপনার বুদ্ধিলোপ ঘটাতে পারবে না। বাচ্চাদের ডিগ্রী ও ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে গিয়ে মায়ের হাতে শিশু হত্যার মত মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে।

ধর্ম বহির্ভূত মনগড়া বেদআত মানুষের ধর্ম ও আকীদা নষ্ট করে, মানুষের মাঝে ফেতনা-ফাসাদ-বিশৃঙ্খলা-অশান্তি সৃষ্টি করে এবং ধর্মের আসল বিষয়, মূল শিক্ষা ও জরুরী দায়িত্ব থেকে মানুষের মনোযোগকে সরিয়ে নেয়। মানুষের এক নম্বর দায়িত্ব তো সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট থাকা, কারণে-অকারণে নাশোকরী ও শেকায়েত না করা। দুই নম্বর দায়িত্ব হল পরিবারে ও সমাজে যার যার কর্তৃত্বাধীন গণ্ডি ও পরিমণ্ডলে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারকে নিশ্চিত করা ও সমুন্নত রাখা। তিন নম্বর দায়িত্ব হল আপনজনদেরকে নামায ও কোরআন শিক্ষা দেয়া। কিন্তু যারা বেদআত নিয়ে বা তুচ্ছ ছোটখাটো নফল আমল নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাদের পক্ষে এ বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। পরিবারের ভিতর জুলুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সংরক্ষণের চেয়েও বোরখা কে পড়ল কে পড়ল না এটা দেখাই তাঁদের কাছে বেশি জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দেখা যায়, ব্যভিচারী, শিশু নির্যাতনকারী, চোগলখোর এমনকি আল্লাহদ্রোহী ব্যক্তিও শুধু বাহ্যিক লেবাসের গুণে মুরুব্বীয়ানে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। বোরখা পরায় কোনরূপ শিথিলতা তাঁদের কাছে ছাড়যোগ্য না হলেও ব্যভিচার, শিশু নির্যাতন (এমনকি শিশুকে হত্যা বা ধর্মচ্যুতির উদ্দেশ্যে, ধর্মীয় ও চারিত্রিক দিক থেকে বিপথগামী করবার উদ্দেশ্যে নির্যাতন), আল্লাহদ্রোহিতা, বিদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টির তৎপরতা তাঁদের কাছে সহনীয় (tolerable)। এছাড়া তাঁরা নিজেরাও পরিবারের ভিতর শোষণ, বৈষম্য ও অবিচার থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে অতটা যত্নবান নন, যতটা যত্নবান থাকেন প্রতীকী বিষয়াদি নিয়ে।
যেকোন বেদআত বা ভ্রান্ত কর্মপন্থা চালু হয় মূলত: দুটি জিনিসের দোহাই দিয়ে; তাহল 'ইজতিহাদ' ও 'হেকমত'। ইজতিহাদ ও হেকমত মূল দ্বীনের অন্তর্গত বিষয় হলেও ভ্রান্তি বা ভুল ব্যাখ্যাবশত নিজেদের আবিষ্কৃত ও অবলম্বিত বিশ্বাস বা কর্মপন্থাকে এ দুটি দিয়ে বৈধ ও ইসলামসম্মত করে নেয়ার একটি প্রবণতা মানুষকে ভুল পথে চলতে উৎসাহ যোগায়। কিন্তু ইজতিহাদ ও হেকমতের প্রকৃত অর্থ হলো আল্লাহ ও রসূলের নির্দেশিত মূলনীতি বজায় রেখে নতুন আবিষ্কৃত জিনিসের মধ্য থেকে হালাল-হারাম নির্ণয় করা। নতুন আবিস্কৃত ও লব্ধ যেকোন প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহার বৈধ; যেমন- রসূল (সা.) যদি লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে থাকেন, সেজন্য এখন ট্রাক্টর ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে না; রসূল (সা.) যদি উট বা ঘোড়াকে যানবাহন হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন, তার জন্য এখন গাড়ি বা বিমান ব্যবহারে দোষ নেই; রসূল (সা.) বালতি দিয়ে পানি তুললেও এখন পানি উত্তোলনে মটর ব্যবহার বৈধ; রসূল (সা.) তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করলেও এখন বন্দুক-কামান ও যুদ্ধ বিমান ব্যবহারে দোষ নেই। কিন্তু রসূল (সা.) প্রদর্শিত মূলনীতি এবং আল্লাহ কর্তৃক কোরআনে ঘোষিত সুস্পষ্ট হালাল-হারামের বিধানকে কেউ যুগের দোহাই দিয়ে পাল্টাতে পারবে না। যেমন- বিনা দোষে মানুষ হত্যা ও শিশু হত্যা সে যুগে যেমন হারাম ছিল, এখনও তেমনি হারাম। পথের উপর থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা তখন যেমন পুণ্য কাজ ছিল, এখনও তেমনি পুণ্য কাজ। ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের ক্ষতি করা ও মানুষের জীবনযাত্রায় অসুবিধা সৃষ্টি করা তখন যেমন হারাম ছিল, এখনও সেই বিধানে পরিবর্তন আসার কোন কারণ নেই। রসূল (সা.) কর্তৃক যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুবাহিনীর প্রবেশপথে অবরোধ আরোপের স্বাভাবিক যুক্তিগ্রাহ্য পদক্ষেপের রেফারেন্স দিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষকে অবরুদ্ধ করে রাখাকে জায়েয প্রমাণের হাস্যকর প্রবণতাও কোন সুস্থ বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে না। কেবল দলীয় অন্ধ আনুগত্য ও গোষ্ঠীগত দায়বদ্ধতার মোহে পড়েই মানুষ দ্বীনের বিধানে এমন বিকৃতি আরোপ করতে পারে।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)