নিয়তের বিভিন্নতা

একই কাজ বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন নিয়তে করে থাকে। নিয়তের এই বিভিন্নতার কারণে কাজের ফলও বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। একই কাজের দ্বারা কেউ সওয়াব লাভ করছে, কেউ গুনাহ কামাচ্ছে, আবার কারো পাপ-পুণ্য কোনটাই হচ্ছে না। এর কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে দেয়া হলো:-
(ক) কোরবানী দেয়ার কাজটি কেউ করে নিছক গোশত খাওয়ার জন্য, কেউ করে বড়লোকি দেখানো ও নাম কামানোর জন্য, কেউ করে নিছক উৎসব ও হুড়ঝুড় করার জন্য, আর কেউ করে তাকওয়া অর্জনের জন্য। যারা এ কাজটি আল্লাহর হুকুম পালনার্থে তাকওয়া অর্জনের নিমিত্তে করে, যাদের উদ্দেশ্য থাকে এর মাধ্যমে নিজের ইচ্ছার উপরে আল্লাহর ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার প্রদানের ইব্রাহীমী চেতনাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা, তারা এ কাজের দ্বারা সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর বাদবাকি উদ্দেশ্যগুলো সওয়াবের পরিবর্তে গোনাহই এনে দেবে।
(খ) পহেলা বৈশাখ পালন কেউ করে নিছক উৎসব ও বিনোদনের জন্য বা প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য, কেউ করে চোখের দ্বারা হারাম জিনিস দর্শন করে নাফসের সুখ লাভের জন্য, আর কেউ করে বিশেষ চেতনাকে প্রতিষ্ঠা ও বিশেষ চিন্তা-চেতনাকে বিলুপ্ত করবার অর্থাৎ সোজা কথায় ধর্মকে নির্বাসিত করবার সুপরিকল্পিত লক্ষ্য হাসিলের জন্য। এই তিন ধরনের ক্যাটাগরির মধ্যে প্রথমোক্ত নিয়ত পোষণকারীগণের পাপ-পুণ্য কোনটাই হবে না, দ্বিতীয় নিয়ত পোষণকারীগণের কবীরা গুনাহ হবে, আর শেষোক্ত নিয়ত পোষণকারীগণ ইসলামের বাইরে বলে গণ্য হবে।
(গ) দাড়ি রাখার কাজটা কেউ করছে অলসতার কারণে অর্থাৎ দাড়ি কামানোর মত সময় ও পরিশ্রম না থাকার জন্য, কেউ করছে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে মানুষের কাছে নিজেকে দ্বীনদার ও ঈমানদার হিসেবে জাহির করবার জন্য, আর কেউ করছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত পালনের জন্য। এই তিন দলের মধ্যে প্রথম দলটির পাপ বা পুণ্য কোনটাই হবে না, দ্বিতীয় দলটি পাপী হবে আর শেষোক্ত দলটি পুণ্যবান হবে। দাড়িটা কে ধর্মীয় কারণে রাখছে আর কে অলসতার কারণে রাখছে, তা যাচাই করবার উপায় হলো, শরীরের অন্যান্য চুল তথা গোঁফ, মাথার চুল, বগল ও অন্যান্য স্থানের চুলসমূহ যেগুলো কেটে রাখার নিয়ম সেগুলো সে নিয়মিত কাটছে কিনা।
(ঘ) দাড়ি কামানোটা কেউ করছে সামাজিক কারণে অর্থাৎ লোকে কি বলবে তা ভেবে, কেউ করছে বিয়ে হবার জন্য বা দাম্পত্য জীবন সুখী করবার জন্য, কেউ হয়তো করে থাকতে পারে ওজুর সময় সহজে পানি পৌঁছানোর জন্য, কেউ হয়তো পরনারী আকর্ষণের জন্য, আবার কেউ করছে ধর্মকে সেকেলে ও ধার্মিকতাকে গেঁয়ো ব্যাপার মনে করে ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্যভাব ও নাক ছিটকানো মানসিকতার বশবর্তী হয়ে। এদের মধ্যে ১ নং ব্যাপারটিতে রিয়াকারিতার গুনাহ হচ্ছে, ২ নং নিয়তটি বৈধ, ৩ নং নিয়তটিতে সওয়াবও হতে পারে, ৪ নং নিয়তটি কবীরা গুনাহ, আর শেষোক্ত নিয়তটি কুফরী।
(ঙ) বোরখা পরা কেউ করে নিজেকে ধার্মিক হিসেবে জাহির করা আর অন্যকে হেয় করার জন্য, কেউ করে নিজের সৌন্দর্যকে আরো প্রকট করে প্রকাশ করার জন্য, আর কেউ করে পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখার জন্য। অবশ্য যে ব্যক্তি সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে করে, আর যে ব্যক্তি সৌন্দর্য ঢেকে রাখার জন্য করে, উভয়ের বোরখা পরার ধরন অবশ্যই আলাদা হবে। অবশ্য কেউ অজ্ঞতা ও অসতর্কতাবশত: পোশাক পরিধানের কোন্‌ পদ্ধতিটা পর্দা রক্ষায় সহায়ক আর কোন্‌ পদ্ধতিগুলো সৌন্দর্য প্রকাশের কারণ, সে সম্পর্কে উদাসীনও থাকতে পারে। এই তিন ধরনের নিয়তের মধ্যে প্রথম নিয়তটি রিয়াকারিতা বা মুনাফেকির অন্তর্ভুক্ত, দ্বিতীয়টি পাপ এবং শেষোক্তটি পুণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
(চ) দৃষ্টির হেফাজত কেউ করে আল্লাহর ভয়ে, আর কেউ করে মানুষের ভয়ে। কে আল্লাহর ভয়ে করছে, আর কে মানুষের ভয়ে করছে, তা বোঝার উপায় হলো, কেউ যদি শুধু সামনের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখে কিন্তু পিছনের দিক থেকে সুযোগ পেলে ঠিকই দেখে, কিংবা বাস্তব মানুষকে পেলে না তাকালেও ছবি বা ভিডিও পেলে দৃষ্টিপাত করে, তাহলে বুঝতে হবে সে কেবল মানুষের ভয়ে বিরত থাকে, আল্লাহর ভয়ে নয়। আর যে ব্যক্তি সামনে-পিছনে, বাস্তব মানুষ বা ছবি, ডিজিটাল-অ্যানালগ, লোকসমাজে বা একান্তে সর্বাবস্থায় দৃষ্টিকে সংযত রাখে, সে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়েই বিরত থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টি ও মনের চাহিদাকে সংযত রাখে, সে সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি মানুষের ভয়ে সংযত থাকে, সে সওয়াব পাবে না, তবে অনিষ্ট থেকে বাঁচার কাজটি তো হলো।
(ছ) নামাজ কেউ পড়ে মানুষের সমালোচনা থেকে বাঁচার জন্য, কেউ পড়ে মানুষের প্রশংসা লাভ করার জন্য, কেউ পড়ে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি তথা এবাদতের স্বাদ লাভের জন্য, কেউ করে আখেরাতে জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে, আর কেউ করে আল্লাহর প্রতি নতি-আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। এই নিয়তগুলোর মধ্য ১ নং নিয়তটিতে কোন পুণ্য নেই, ২ নং নিয়তটিতে পাপ আছে, ৩ নং নিয়তটিতে পুণ্য থাকলেও পরিপূর্ণ সওয়াব নাও মিলতে পারে, ৪ নং নিয়তটিতে পুণ্য রয়েছে, আর শেষোক্ত নিয়তটিতে সর্বাধিক পুণ্য রয়েছে।
আপনার রেটিং: None
নিয়তের সামান্য হেরফের মানুষের পুণ্যকে কিভাবে পাপে রূপান্তরিত করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হলো নিচের গল্পটি:-

এক দরবেশ তাঁর গ্রামের অধিবাসীদের সম্পর্কে শুনতে পান যে, তারা একটি গাছের পূজা করছে। তিনি তাই গাছটি কেটে ফেলবেন বলে সঙ্কল্প করেন, যাতে লোকেরা পথভ্রষ্টতার মধ্যে না থাকে। দরবেশ একটি কুড়াল নিয়ে গাছটির দিকে চললেন। পথে ইবলীস এসে তার পথে বাধা দেয়।
ইবলীসঃ কোথায় যাচ্ছেন?
দরবেশঃ গাছটির দিকে, ওটা কেটে ফেলার জন্য।
ইবলীসঃ আপনি ওটা কাটতে চাইছেন কেন?
দরবেশঃ কারণ, লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে ওটার পূজা করছে।
ইবলীসঃ তাতে আপনার কি? তাদেরকে তাদের কাজ করতে দিন।
দরবেশঃ কিছুতেই নয়। কিভাবে আমি তাদেরকে তাদের কাজ করতে দেই, আমার কাজ তো লোকদের হেদায়েত করা! তুমি এক অভিশপ্ত ফাসাদ সৃষ্টিকারী। তুমি মানুষকে ফেতনায় ফেলে থাক এবং তাদের জন্য কুফরি, অন্যায় আর পাপকে সুন্দর করে দেখাও; যাতে তারা বিপথগামী হয়। আর আমি তাদের সতর্ক করি ও সঠিক পথ বাতলে দিই; যাতে তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়।
ইবলীস দরবেশের সামনে দাঁড়ায় এবং তাকে যেতে বাধা দেয়। এতে দুজনের মধ্যে এক লড়াই সংঘটিত হয়। লড়াইয়ে দরবেশ ইবলীসকে হারিয়ে দেন। ইবলীস মাটিতে পড়ে যায় আর দরবেশ তার বুকের উপর উঠে বসেন আর বলেন, "অভিশপ্ত শয়তান! আমার শক্তি দেখেছিস?" দুর্বল স্বরে ইবলীস বলে, "হ্যাঁ, এখন আমাকে ছেড়ে দিন আর আপনি যা করতে চাচ্ছেন করুন।" দরবেশ তাকে ছেড়ে দেন এবং ক্লান্তি অনুভব করায় সেদিনের মত বাড়ি ফিরে যান।
পরের দিন দরবেশ আবার তার কুড়ালটি নিয়ে গাছটি কাটার জন্য সেদিকে রওয়ানা দেন। কিন্তু এবারও ইবলীস আত্মপ্রকাশ করে এবং তাকে বারবার বাধা দিতে থাকে। দুজনের মধ্যে লড়াই বাধে। এতে দরবেশ ইবলীসকে পরাজিত করেন। এবারও তাদের মধ্যে তা-ই ঘটে, যেমনটি প্রথমবারে ঘটেছিল।
এবারে ইবলীস লড়াই জেতার জন্য অন্য একটি উপায় ভাবতে লাগল। সে মনে মনে বলল, "এ লোকটির সাথে আমার প্রতারণা আর কৌশল অবলম্বন করতে হবে।" ইবলীস দরবেশের কাছে এই মর্মে প্রস্তাব রাখে যে, তিনি এখন গাছটি কাটবেন না, সেটিকে কিছুকাল রেখে দিবেন। এর বিনিময়ে সে তাকে প্রত্যেকদিন একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দেবে। এই স্বর্ণমুদ্রা তিনি প্রতিদিন সকালে বালিশের নিচে পাবেন। দরবেশ লোকটি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং গাছটিকে (না কেটে) রেখে দেন। ইবলীস তার ওয়াদা মতই কাজ করে। দরবেশ প্রতিদিন সকালে তার বালিশের নিচে হাত দিয়ে স্বর্ণমুদ্রাটি নিয়ে নিতেন।
একদিন দরবেশ লোকটি স্বর্ণমুদ্রা নেওয়ার জন্য অভ্যাসমত বালিশের নিচে হাত বাড়ান। কিন্তু সেখানে তিনি কিছুই পেলেন না। এতে তিনি রেগে গিয়ে মনে মনে বলেন, "শয়তান আমার সাথে প্রতারণা করেছে এবং আমি তাকে বিশ্বাস করার পর সে তার ওয়াদা রাখেনি। এবার আমি গাছটি কাটবই, এতে আমার যতই কষ্ট হোক না কেন।’’ তিনি যখন যাচ্ছিলেন, তখন ইবলীস তার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং তার পথ বন্ধ করে বলে, "কোথায় যাচ্ছ?’’
দরবেশঃ গাছটির দিকে, ওটা কেটে ফেলার জন্য।
ইবলীসঃ ওটা তুমি কাটতে চাচ্ছ কেন? আমি তোমাকে স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া বন্ধ করেছি বলে?
দরবেশ চুপ করে থাকল, কোন কথা বলল না। ইবলীস তখন উচ্চস্বরে হেসে ওঠে আর বলে, "তুমি ওটা কাটতে পারবে না।"
দরবেশঃ আমাকে কে বাধা দেবে?
ইবলীসঃ আমি তোমায় বাধা দেব। আর এবার তুমিই পরাজিত হবে।
দু’জনের মধ্যে আবার লড়াই হলো। এবার ইবলীস দরবেশ লোকটিকে পরাজিত করল। দরবেশ মাটিতে পড়ে গেল। ইবলীস তার বুকের উপর উঠে বসল এবং তার গলা চেপে ধরে বলতে লাগল, "বেচারা দরবেশ! তুমি কি আমার শক্তি দেখেছো?" দরবেশ দুর্বল স্বরে জবাব দিল, "হ্যাঁ, এখন আমাকে ছেড়ে দাও। আমি গাছ কাটব না। তবে আমাকে বল, কোন্ শক্তির জোরে এবার তুমি আমাকে পরাজিত করলে?" ইবলীস জবাব দেয়, "আসলে তুমিই শক্তিশালী ছিলে, আর আমি ছিলাম দুর্বল; যখন তোমার ঈমান মজবুত ছিল আর উদ্দেশ্য মহান ছিল। তুমি সত্যের পক্ষ সমর্থন করতে এবং আল্লাহর জন্য রেগে যেতে। আর এখন তোমার শক্তি চলে গিয়েছে এবং তোমার প্রতিরোধক্ষমতা কমে গিয়েছে। কেননা তুমি এখন লড়াই করছ সম্পদের জন্য, আর রেগে যাচ্ছ স্বর্ণের জন্য।"

নিয়তের চুল পরিমাণ হেরফেরের দ্বারা একই কাজ জিহাদ হিসেবে গণ্য হতে পারে, আবার ফ্যাসাদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেমন- যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি শত্রুর দ্বারা কোন নিরীহ মানুষকে খুন হতে দেখলেন এবং তার শাস্তি দেবার জন্য খুনীকে হত্যা করতে চাইলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আবার আপনার নিজের দ্বারাই কোন নৈতিক বিচ্যুতি বা পাপকর্ম সংঘটিত হলো, আর সেই খুনী শত্রুটি তা দেখে ফেলল। এমতাবস্থায় আপনার মনে এই চিন্তাও এসে গেল যে, শত্রুটিকে হত্যার দ্বারা নিজের অপকর্ম গোপন রাখার কাজটিও সম্পন্ন হবে। ফলে এই কাজটি আর আপনার জন্য জিহাদ থাকল না, বরং ফ্যাসাদে পরিণত হয়ে গেল।

Rate This

আপনার রেটিং: None