বর্ণচোরা ফেসবুক গ্রুপগুলোর আজব ও উদ্ভট নীতিমালা

ইদানীং কিছু ফেসবুক গ্রুপের মডারেটরগণ তাদের লক্ষ্য ও নীতিমালা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন যে-

  • কেবল কৌতুক ও বিনোদনই তাদের লক্ষ্য।
  • গ্রুপে আস্তিক-নাস্তিক সকলে যোগদান ও পোস্ট করতে পারবেন।
  • আস্তিক বা নাস্তিক নির্বিশেষে কেউ কাউকে গালি দিতে পারবে না; তবে স্রষ্টা, ধর্ম ও ধর্মীয় মহাপুরুষগণ সম্পর্কে টিজ করতে পারবে।

দেখুন, কী চাতুর্যের সাথে নিজেদের আসল উদ্দেশ্য লুকানো হচ্ছে এবং নিজেদেরকে নিরপেক্ষ হিসেবে জাহির করা হচ্ছে! তাদের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস নষ্ট করা, স্রষ্টার থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা এবং স্রষ্টা ও তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি মানুষের আস্থা ও সম্মানবোধকে বিনষ্ট করা। কিন্তু তারা বলছে, নিছক কৌতুক করাই তাদের উদ্দেশ্য। জগতে কৌতুকের বিষয়ের তো আকাল পড়েছে যে, ধর্মকেই সকল কৌতুকের উৎস হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

নিজেদের গ্রুপে নাস্তিকদের পাশাপাশি আস্তিকদেরকেও প্রবেশাধিকার দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে, তারা বড়ই উদার ও পরমতসহিষ্ঞু। তারা মানুষের বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, সকলকেই কথা বলার ও লেখার সমান সুযোগ দিচ্ছে। তারা দেখাতে চাচ্ছে, ধর্ম নিয়ে কৌতুক করবার পাশাপাশি নাস্তিকতা নিয়েও তো কৌতুক করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে, আস্তিক-নাস্তিক সবাইকে সমান অধিকার দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আসলে তারা তো এমনি এমনি আস্তিকদেরকে তাদের আড্ডায় প্রবেশাধিকার দেয়নি। মদের আড্ডা বা বেশ্যাখানায় মসজিদের মুসল্লীদের প্রবেশাধিকার দেয়াটা কোন উদারতা বা মানবিকতার প্রমাণ নয়, বরং মুসল্লীদের দ্বীনদারী নষ্ট করবারই শয়তানী প্রয়াস। অনুরূপভাবে, ধর্মবিদ্বেষীদের প্লাটফরমে ধর্মবিশ্বাসীদের প্রবেশের সুযোগ দিয়ে তারা মূলত ধর্ম নিয়ে খেল-তামাশায় তাদের সাথে এদেরকেও শরীক করে নিতে চায়। কারণ, নাস্তিকতা জিনিসটা এক-আধটু ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার হলেও ধসে পড়বে না, কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস সামান্য রং-তামাশার দ্বারা হালকা হয়ে যাবে। ধর্মের স্রষ্টা ও মহাপুরুষগণকে নিয়ে খেলা-তামাশা করলে, তাঁদের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করলে ধর্মবিশ্বাসীদের ঈমান ও ধর্মবিশ্বাসই নষ্ট হয়ে যাবে। একজন সতী নারীর ছেলে ও একজন বেশ্যা নারীর ছেলের মধ্যে যদি কথাবার্তার আলোচ্যসূচি এই নির্ধারণ করা হয় যে, তারা একে অপরকে মন্দ বলতে পারবে না, কিন্তু একে অপরের মাকে নিয়ে যা খুশী তাই বলতে পারবে, তাহলে তো সতী নারীর ছেলেরই ঠকা হলো। কারণ, বেশ্যা নারীর মর্যাদা তো নতুন করে হারাবার কিছু নেই। তাকে হাজারটা গালি দিলেও কোন ক্ষতি নেই। অপরদিকে সতী নারীর যেহেতু চরিত্রে দাগ নেই, সেহেতু উভয়ে উভয়কে গালি দেবার সুযোগ থাকলে তারই মান-সম্মান হারাবে। নির্দোষ নারীকে একটা গালি দিলেও তার জন্য মহা সর্বনাশ। ঠিক এই কারণেই মক্কার মুশরিকগণ কর্তৃক উভয়ে উভয়ের ধর্ম পালনের প্রস্তাবকে নাকচ করে সূরা কাফেরূন নাযিল হয়েছিল। কারণ, সত্য আর মিথ্যা উভয়ের মধ্যে মিলন ও মিশ্রণ হোক, বা উভয়কে হাসি-তামাশার বস্তু বানানো হোক, তাতে সত্যেরই লোকসান।

শুধু স্রষ্টা ও ধর্মীয় মহাপুরুষগণ বিদ্রূপের যোগ্য হবেন, কিন্তু সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীরা গালিগালাজের ঊর্ধ্বে থাকবেন, এ এক উদ্ভট নীতি। কোথায় শেখ সাদি, কোথায় বর্গির লাদি! কী আশ্চর্য, মানুষ আমাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বললে আমি অভিযোগ করতে পারব, কিন্তু আমার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় কাউকে নিয়ে বিদ্রূপ করা হলে সেটাকে নিছক খেলা ও কৌতুক হিসেবে আমাকে সহজভাবে মেনে নিতে হবে! তবে এই নীতিমালাটা হাস্যকর হলেও সুচিন্তিত বটে। এর পিছনের মতলবখানা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। আমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত পুরুষগণ যতটা শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত, নাস্তিকদের কাছে কি তার সমমানের কোন শ্রদ্ধাভাজন কেউ আছে নাকি? আমরা হয়তো বড়জোর নাস্তিক্যবাদ ও কমুনিজমের উদ্ভাবক ও প্রবক্তা দু'চারজন ব্যক্তির নামে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে পারব। কিন্তু তাদের দার্শনিক গুরু মার্কস বা লেনিনের মর্যাদা কি আমাদের নবীর সবচাইতে কম মর্যাদার সাহাবীর পায়ের নখের সমানও হবে? তারা যে সৈন্য (বড়ে) বিসর্জন দিয়ে আমাদের রাজা-মন্ত্রী খেয়ে নিতে চাইছে! আল্লাহর কাছে মর্যাদা ও ধর্মবিশ্বাসের বিষয়টি যেহেতু তারা মানতে চাইবে না তাই তা নাহয় তাদের সামনে পেশ করা বাদই রাখলাম। কিন্তু পার্থিব সুনামের দিক থেকেও কি কার্ল মার্কসের সম্মান হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মর্যাদার ধারেকাছেও আছে?

প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও পরনিন্দার মজলিসে যোগদানের নিমন্ত্রণ জানানোর পূর্বে কতই না চমৎকার ও নিখুঁত সুরক্ষার ব্যবস্থা নিজেদের জন্য করে নিয়েছে এরা! কারণ এরা ভালো করেই জানে যে, তাদের প্রতিপক্ষের বিতার্কিক ছেলেপেলেকে ব্যক্তিগতভাবে অপদস্থ করার চাইতে তাদের শ্রদ্ধাভাজন প্রভু ও পয়গম্বরগণকে হেনস্থা করাটাই যে তাদেরকে ব্যথা দেবার জন্য যথেষ্ট।

এই মতলববাজরা যদি কৌতুক ও বিদ্রূপকে মূল চর্চার বিষয় না বানিয়ে তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তিতর্কের আহবান করতো, তাহলে নাহয় বুঝতাম যে, তাদের সৎসাহস আছে। কিন্তু কৌতুক এমন এক জিনিস, যার দ্বারা শুধু মানি লোকের মান নষ্ট করা যাবে, কিন্তু কানকাটা লোকদের কান হারানোর কোন ভয় থাকবে না। সত্যি, টপিক্‌স নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের মেধা ও বুদ্ধিমত্তা অসাধারণই বলতে হবে!

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)