কৃতজ্ঞতা কোন্ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

যারা কোনো ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা বিশেষ কোন রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য পোষণ করেন, তারা নিজ সমর্থিক গোষ্ঠীকে ভালো প্রমাণ করা ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখবার জন্য হাস্যকর সব যুক্তি পেশ করে থাকেন। নিজের প্রিয় ও আরাধ্য গোষ্ঠীর বিরোধী ও সমালোচকদের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তাদের প্রতি বিদ্রূপের স্বরে বলে থাকেন, "দেশের মানুষ অমুক দেশের পিঁয়াজ খায়, আবার তাদেরকেই গালি দেয়।" অর্থাৎ, তারা বোঝাতে চান, ওরা যেহেতু আমাদের পিঁয়াজ খাওয়াচ্ছে, কাজেই আমাদের উচিত সর্বাবস্থায় তাদের শুকরিয়া আদায় করা, তাদের ন্যায়-অন্যায় সকল কাজ, আচরণ ও আবদার হাসিমুখে মেনে নেয়া এবং তাদের দ্বারা ঘটিত উপকার-অপকার সবই স্বাগত জানানো। এমন ভাব জনগণের মাঝে না পেয়ে এ জাতিকে তারা অকৃতজ্ঞ জাতি মনে করে হা-হুতাশ ও মাতম করতে থাকেন এবং জনগণের উদ্দেশ্যে খোঁটা শোনাতে থাকেন।
এবার আমরা আসি, কৃতজ্ঞতা মানে কি এবং তা কোন্ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সোজা কথায়, কৃতজ্ঞতা বলতে বোঝায় উপকারীর উপকার স্বীকার করা। কিন্তু এই উপকার বিচার করতে গিয়ে একপেশে বিচার না করে সামগ্রিক বিচার করা উচিত এবং উপকারটা সে কতটা আন্তরিক ও নি:স্বার্থভাবে করেছে এবং অপকারের তুলনায় উপকার বেশি হয়েছে কিনা তা না দেখে অন্ধভাবে শুকরিয়া জ্ঞাপন করাটা নিমকহালালি নয়। কৃতজ্ঞতার দাবি হলো, যখন কেউ আন্তরিক ও নি:স্বার্থভাবে কোন উপকার করবে, তখন তার প্রতি ধন্যবাদ ও সন্তুষ্টি জ্ঞাপন করা এবং সকল ভালো কাজে তাকে সাধ্যমত সহযোগিতা ও সমর্থন প্রদান করা। এখন দেখা যাক, তারা যেসব জিনিসের দোহাই দিয়ে তারা মানুষকে খোঁটা দিয়ে থাকেন, সে জিনিসটা এ ধরনের নি:স্বার্থ উপকারের মধ্যে পড়ে কিনা, যার জন্য নি:শর্ত কৃতজ্ঞতা জরুরী। আমাদের দেখতে হবে—
প্রথমত, বর্ণিত জিনিসটা আদৌ একতরফা উপকারের পর্যায়েই পড়ে না, বরং নিছক ব্যবসায়িক ও পারস্পরিক লেনদেন মাত্র। এখানে এক পক্ষ পণ্য কিনে খেয়ে উপকৃত হয়, আরেক পক্ষ পণ্য বিক্রি করে অর্থ পেয়ে লাভবান হয়। এখানে হয়তো বরং ক্রেতা পক্ষ পিঁয়াজ না খেয়েও চলতে পারবে, কিন্তু পিয়াজ কেনা-বেচা বন্ধ হলে বিক্রেতা পক্ষকেই বুক চাপড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তাদের দেয়া পিঁয়াজ ও চিনির গুণগত মান কেমন। আমাদের অভিজ্ঞতা যদি এমন হয়ে থাকে যে, আমাদের দেশের পিঁয়াজ বা চিনির চাইতে ওদেরটা কম স্বাস্থ্যকর এবং নিজেদেরটা না খেয়ে ওদেরটা খেয়ে বরং ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছি, তাহলে তো ওদেরকে বাহবা প্রদানের কোনো কারণ দেখি না। তদুপরি যদি এমন হয়ে থাকে যে (আমি নিশ্চিত নই), তারা নিজেরা ভালোটা খেয়ে আমাদের জন্য ঝড়তা-পড়তাগুলোই গচিয়ে দিচ্ছে, তাহলে তো কৃতজ্ঞতা দেখানোটা আত্মপ্রবঞ্চনা বৈ আর কিছু নয়।
তৃতীয়ত, তারা আমাদেরকে খাদ্য দিচ্ছে কি আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করার জন্য, নাকি আমাদের দেশের অর্থনীতিকে বাঁশ দেবার জন্য, সেটাও খতিয়ে দেখা আবশ্যক। চাল নিয়ে তাদের চালবাজির কথাও মানুষ ভোলেনি। অভাবের সময় চাল দেব দেব করে যেই না কৃষকের ধান কাটার মওসুম এসে গেল, অমনি চালের চালান ছেড়ে দিয়ে আমাদের দেশের কৃষকের ভাত মারার ব্যবস্থা করা হলো। আবার গরু নিয়ে তাদের ভগলামিও মাত্র দু'এক বছর আগের। ধর্মের নামে গোমাতাভক্তি দেখিয়ে গরু বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে দেশী খামারীদেরকে অধিক গরু উৎপাদনের প্ররোচনা যুগিয়ে শেষে কোরবানীর সময় ঠিকই সীমান্ত খুলে দিয়ে দেশী গরুর মালিকদের পেটে লাথি দানের ব্যবস্থা হলো। (অবশ্য আমাদের দেশের খামারীদেরও দোষ আছে, অসৎ উপায়ে গরু মোটাতাজা করার ফল পেয়েছে।) ধর্মের নামে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাপ্পাবাজির চরিত্র উন্মোচিত হলো।
চতুর্থত, কারো উপকার সম্পূর্ণ নি:স্বার্থ ও নি:শর্ত হলেও এর বিনিময়ে তার অন্যায় কাজে সমর্থক বা সহযোগী হতে হবে- এমন কোন যৌক্তিকতা নেই। উপকারের প্রতিদান কেবল বৈধ ও হালাল বিষয়ে দাবি করা যেতে পারে। অবৈধ কাজে সমর্থন বা সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে কারো উপকারের ঋণ শোধ করার নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই। মায়ের ঋণ শোধ করতে গিয়ে মায়ের কথায় বউকে মারা যাবে না। ফেরাউন যখন মূসা (আ.)-কে নিজের উপকার ও লালন-পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দিল, তখন মূসা (আ.) জানিয়ে দিলেন যে, তাই বলে এর বিনিময়ে গোটা বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের গোলাম বানিয়ে রাখাটা মূসা (আ.)-কে মেনে নিতে হবে— এমন দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইতিবাচক অবদানগুলোকে আমরা অস্বীকার করি না। চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সম্বলিত বই-পুস্তক আমরা এসব দেশ থেকে পেয়েছি। উক্ত দেশের টিভি সিরিয়াল থেকেও অনেক শিক্ষণীয় জ্ঞান লাভ করেছি, যা আমাদেরকে বাস্তব জীবনে সতর্ক হতে ও চোখ খুলে দিতে সহায়তা করেছে। কিন্তু একটা দেশের চিকিৎসক ও গুণীজনদের অবদানের জন্য তো সেই দেশের অপরাপর যারা আছেন আমাদের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন, তাদেরকে তো সমর্থন জানাতে পারি না। উপকারী ব্যক্তিবর্গের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে অপকারী ব্যক্তিদের অপকারকে তো উপেক্ষা করতে পারি না। একটা দেশের উপকারী ও অপকারী উভয় মহল কৃতজ্ঞতা ও অসন্তুষ্টি দুটোই পৃথকভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে প্রাপ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট দেশ ভালো বা খারাপ হতে পারে না। ভালো ও বন্ধুভাবাপন্ন মানুষগুলোকে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাবো, আর বিদ্বেষপরায়ণ ও শত্রুভাবাপন্ন মানুষগুলোর থেকে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেবো।
২০০১ সালে আফগানিস্তানের উপর মার্কিন তাণ্ডব চলাকালে একদিন এক ভাই আমাকে চকলেট খেতে দিয়ে কটাক্ষ করে বলেছিল, "ভাইয়া আমেরিকান চকলেট খায়, কিন্তু আমেরিকাকে সমর্থন করে না।" কী আশ্চর্য চিন্তা! একটা চকলেটের ক্ষণিক স্বাদের বিনিময়ে লাখো মানুষের উপর বীভৎস হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন জানাতে হবে? গোলামি মানসিকতা কতটা চরমভাবে পেয়ে বসলে, বিবেক ও মাথা-মুণ্ডুটা কতখানি বন্ধক রাখতে পারলে মানুষ এরকম অদ্ভুত চিন্তাধারার অধিকারী হতে পারে? মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও মানবিকতা এতই সস্তা যে, একটা চকলেটের বিনিময়ে বিক্রয়যোগ্য!
আমেরিকারও অনেক ইতিবাচক অবদান আছে, যা আমরা অস্বীকার করি না। এখানে যে লিখতে পারছি, এটাও আমেরিকার অবদান- একথা স্বীকার করি। কিন্তু শর্তহীন গোলামীর শর্তমতে কোন ইতিবাচক অবদানের বিনিময়ে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলোকে সমর্থন করবার প্রবণতাকে আমরা যৌক্তিক মনে করি না। আমাদের ধন্যবাদ যেটুকু তা বিল গেইটস, ল্যারী পেইজ আর জুকার্সবাগই প্রাপ্য হবেন; জর্জ বুশ, রামসফিল্ড ও তাদের পিছনের প্ররোচনাদাতারা এই ধন্যবাদের অংশীদার হবেন না। কোন কোন মহিলা এমন আছে, যারা স্বামীর দানের খোঁটা মানুষকে দিয়ে থাকে। দান করল একজন, আর বাহাদুরি ফলায় আরেকজন!
আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None