ফেরকা-মাযহাব বিভেদের আসল রহস্য

ফেরকা ও মাযহাব নিয়ে কোন্দল ও দলাদলির রহস্য বলতে যা আবিষ্কার করেছি তা হলো, এগুলো যতটা না ধর্মীয় ও মতাদর্শগত মতভেদপ্রসূত, তার চাইতে অধিক হচ্ছে (১) অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, (২) অহংকার ও ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং (৩) রাজনৈতিক ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থেকে উদ্ভূত। প্রথম দুটির সাথে সম্পৃক্ত আছেন বিভিন্ন ফেরকা ও ঘরানার আলেমগণ, আর শেষোক্তটির সাথে জড়িত আছেন দরবারি আলেম, ইমাম, রাজা-বাদশাহ ও রাজনীতিবিদগণ।
হুজুরদের অর্থবিত্ত ও সম্মান-প্রতিপত্তির মূল যে দুটো মাধ্যম ও উৎস দেখতে পেয়েছি তা হলো- (ক) ওয়াজ, লেকচার বা বক্তৃতা এবং (খ) রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক তথা যাদু ও জিনের চিকিৎসা। প্রথমটিতে সালাফী আলেমরা তুলনামূলকভাবে বেশি এগিয়ে আছেন বিধায় সুফী ও দেওবন্দী আলেমদের রিযিক নষ্ট হচ্ছে, তাই তারা ক্ষুব্ধ। আবার দ্বিতীয়টিতে সফলতা ও কার্যকারিতার দিক থেকে সুফী ও তাবলীগী আলেমরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অগ্রগামী থাকায় সালাফী ও কোন কোন দেওবন্দীরা অর্থ ও সুনামের দিক থেকে লোকসানের শিকার হচ্ছেন, তাই তারা হতাশ, উদ্বিগ্ন ও পেরেশান।
সালাফী আলেমদের এলেম ও বাগ্মিতার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে না পেরে সুফী ও দেওবন্দী আলেমগণ সালাফী আলেমদের ব্যক্তিগত ত্রুটি অন্বেষণে নেমে পড়েন এবং কোট-টাই পড়া জায়েয কিনা এ ধরনের বিতর্কে প্রবৃত্ত হন। আবার সুফী ও তাবলীগী আলেম ও চিকিৎসকদের সফলতার সামনে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণে সালাফী আলেমগণ প্রতিপক্ষের চিকিৎসা পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে বিতর্ক জুড়ে দেন। অথচ এ দুটি সেবাই দ্বীন ও মানবতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলাম ও জনগণের কল্যাণে এ দুটি বিষয়ে পারস্পরিক দোষারোপের পরিবর্তে সহযোগিতাই কাম্য ছিল। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিগত ইগো যখন দ্বীন ও মানুষের কল্যাণের উপরে স্থান পায়, নিজের স্বার্থ ও জিত রাখাটাই যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই মানুষ আসল কাজ বাদ দিয়ে অনাবশ্যক কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়িতে মত্ত হয়। একটা মানুষ যখন পানিতে পড়ে হাবুডুবু খায়, তখন তাকে পানি থেকে তোলাটাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত; ডান হাত দিয়ে তুলতে হবে নাকি বাম হাত দিয়ে তুলতে হবে- এ বিতর্ক তখন অর্থহীন এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি পরিহাস মাত্র।
ধর্ম ও মানুষের কল্যাণের উপরে যখন ব্যবসায়িক লাভ ও ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই অনাকাঙ্ক্ষিত হানাহানি ও রেষারেষি পরিলক্ষিত হয়। ডাক্তারদের কাছে এক দল (বা প্যাথি) আরেক দল (বা প্যাথি)-কে হাতুড়ে প্রমাণ করাটা যখন রোগীর নিরাময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, পীর ও আলেমদের কাছে একজন আরেকজনকে কাফের প্রমাণ করাটা যখন ইসলামের মর্যাদা ও ধর্ম প্রচারের উপরে বেশি প্রাধান্য পায়, মুসলিম দল ও ফেরকা-মাযহাবগুলোর কাছে যখন একদল আরেকদলকে বাতিল প্রমাণ করাটা ইসলামের শত্রুদের প্রতিরোধ করা ও মজলুম মুসলমানদের রক্ষা করার চাইতেও বেশি গুরুত্ব পায়, রাকীদের কাছে একে অপরকে যাদুকর প্রমাণ করাটা যখন সত্যিকার যাদুকর শয়তানদের প্রতিহত করা ও যাদুর ভিকটিম মজলুম মানবতাকে মুক্ত করার চাইতেও বেশি জরুরী মনে হয়, তখনই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনা ঘটে। ফলে দ্বীনের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়, সমাজে অন্যায়-অনিষ্ট-রোগব্যাধি ও ফেতনা প্রাধান্য বিস্তার করে, মানুষের/মুসলমানদের অকল্যাণকামী শয়তানরাই লাভবান হয়। শয়তান বরাবরই মানুষকে মূল দায়িত্ব ও আসল কাজ থেকে সরিয়ে রেখে যার যার ব্যক্তিগত লোভ ও ইগোকে উষ্কে দেয়ার দ্বারা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পরস্পরকে ঘায়েল (এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে নির্মূল) করবার আত্মঘাতী সর্বনাশা খেলায় মাতিয়ে রাখে।

ভিন্ন ফেরকার অনুসারী বা কোন ব্যাপারে (যেমন- চিকিৎসা ও রুকিয়ার ব্যাপারে) নিজেদের থেকে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনকারীদেরকে কাফের-মুশরিক বা বাতিল প্রমাণের কাজটি মূলত: যে দুটি পন্থায় করা হয়ে থাকে তা হলো- প্রথমত, সুন্নতের থেকে ভিন্ন হবার অযুহাতে বেদাত সাব্যস্ত করার মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়, কোরআনের আয়াতের অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ও অপব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজের প্রতিপক্ষকে (একে অপরকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করাটাই অর্থহীন) হেয়  করবার জন্যই ফতোয়া ও মাসআলার মধ্যে ফাঁক-ফোকর অনুসন্ধান করে প্রতিদ্বন্দ্বীর খুঁত দেখানোর চেষ্টা করা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থ বা আত্মম্ভরিতার মোহে তাড়িত হয়ে যেভাবে এ কাজটি করা হয় তা নিম্নে উল্লেখ করছি:-
চিকিৎসা ক্ষেত্রে: চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটা চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বনকারীদেরকে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান করার জন্য কোন কোন রাষ্ট্র বা ধর্মীয় ফেরকা অপর একটি চিকিৎসা পদ্ধতিকে এলকোহল ব্যবহারের অযুহাতে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করে রাখে। অথচ সকল চিকিৎসা পদ্ধতিতেই ঔষধ সংরক্ষণের জন্য সীমিত মাত্রায় এলকোহল ব্যবহার করা হয়। আর হোমিওপ্যাথিতে রূপান্তরিত ও পরিশোধিত এলকোহল (স্পিরিট) ব্যবহার করা হয় মূলত ঔষধ dilution করার মাধ্যম হিসেবে পানির বিকল্প হিসেবে, যেহেতু পানির সাথে মিশিয়ে attenuation করলে তা অল্পদিনেই নষ্ট ও বিকৃত হয়ে যায়। আর মজার ব্যাপার হলো, ঔষধ ও চিকিৎসার মত জরুরী বিষয়ে এলকোহল ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক বা বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলেও শৌখিন কোমল পানীয়সমূহে preservative হিসেবে এলকোহল ব্যবহৃত হলেও ঐ সব দেশে বা মাযহাবে এ নিয়ে কোন আপত্তি করা হয় না।
ওয়াজ বা ধর্মীয় লেকচারের ক্ষেত্রে: কোন জ্ঞানী ও সুবক্তা যখন কোরআন-হাদীস নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন, তখন তার মধ্যে সঠিক বক্তব্যগুলো মেনে নেয়া এবং ভুলগুলো সঠিকতা ও যৌক্তিকতা বিচার সাপেক্ষে শুধরে দেয়াই কাম্য। কিন্তু বক্তার ব্যক্তিগত লেবাস ও সুরত সুন্নতী কিনা, তা নিয়ে হৈ চৈ বাধানো উদ্দেশ্যমূলক। কারো ব্যক্তিগত আমল ও পোশাকে সুন্নতের পরিপন্থী ভাব পরিলক্ষিত হলে তাকে এ ব্যাপারে নসীহত ও উপদেশ প্রদান করা যেতেই পারে, কিন্তু সুন্নতী পোশাকের অনুপস্থিতির দোহাই দিয়ে তার সকল বক্তব্যই প্রত্যাখ্যানযোগ্য হবে- এমন জেদী ও একপেশে ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও হঠকারিতাপূর্ণ।
রুকিয়া তথা ঝাঁড়ফুঁকের ক্ষেত্রে: যাদুটোনা, বদনজর, কুফরী কালাম ও জিনের আছরের শিকার রোগীদের চিকিৎসা এবং অনিষ্টকারী জিন ও মানুষদেরকে শায়েস্তা করবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘরানার রাকীগণ একে অপরকে ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য প্রথমত প্রতিপক্ষের অনুসৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রসূলুল্লাহ (সা.) হুবহু পালন বা নির্দেশ প্রদান করেননি এমন আমলগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোকে বেদাত সাব্যস্ত করেন এবং দ্বিতীয়ত কোরআনে শয়তান জিনদের বিরুদ্ধে ও তাদের সাথে মানুষ অনুচরদের পারস্পরিক সহযোগিতার বিরুদ্ধে নাযিলকৃত আয়াতগুলোকে আমভাবে সকল জিনের সাথে জুড়ে দিয়ে জিনের সাথে যোগাযোগের দায়ে যাদুকর সাব্যস্ত করেন।
প্রথমে সুন্নত বনাম বেদাত বিষয়ে বলি, একটা আমল বেদাত হিসেবে বিবেচিত তখনই হবে, যখন তা নিছক সওয়াবের নিয়তে ফযীলতের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় রীতি হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে নিত্য নতুন উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে কোরআনের কোন আয়াতের নিত্য নতুন ব্যবহার কিংবা অন্য কোন নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন করাটা বেদাত নয়। নতুন সবকিছু মাত্রই বেদাত হলে যেকোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারকেই বেদাত ধরতে হবে, যা সম্পূর্ণ অবাস্তব চিন্তা, যা স্বয়ং বেদাত নিয়ে খুঁতখুতে প্রকাশকারীরাও করেন না। নিছক ধর্মীয় ফযীলত হাসিলের লক্ষ্যে পালনকৃত আমল হুবহু রসূল (সা.) কর্তৃক পালিত বা নির্দেশিত হওয়াটা জরুরী। আর সমস্যা সমাধান বা বাস্তব জীবনে প্রয়োজন পূরণে গৃহীত কর্মপন্থার ক্ষেত্রে শুধু এটুকু দেখতে হবে যে, আল্লাহ ও রসূলের প্রদত্ত ও ঘোষিত আদর্শ, মূলনীতি ও কর্মপন্থার সাথে সাংঘর্ষিক বা বিপরীতমুখী কিনা। আল্লাহ তাআলা কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, যা কিছু হারাম তা আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণাই করে দিয়েছেন, এর বাইরে মনগড়াভাবে কোন কিছুকে (মানে বস্তু বা কর্মকে) হারাম সাব্যস্ত করা যাবে না (সূরা আনআম দ্রষ্টব্য)। সুতরাং মানুষ যেকোন রোগব্যাধি বা শত্রুতা থেকে মুক্তিলাভের জন্য কোরআন ও হাদীসের যে কোন আয়াত বা দোয়াকেই প্রাসঙ্গিক মনে হলে পড়তে পারবে- এ নিয়ে হৈচৈ ও ফতোয়াবাজির কিছু নেই।
জিন ও যাদু তাড়াতে জিন ব্যবহারের বিষয় নিয়েও রাকীদের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ ও তাকফিরের প্রবণতা লক্ষণীয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জিন ব্যবহার মানেই যাদু বা কুফর নয়, বরং জিনকে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যবহার করতে গিয়ে তার শর্ত পূরণার্থে কোন কুফরী বা শেরেকী কাজ করা [যেমন- শয়তানের স্তুতিকীর্তন ও আল্লাহর প্রতি অবজ্ঞাসূচক মন্ত্রপাঠ করা] কিংবা নিরপরাধ মানুষের ক্ষতিসাধনে জিনকে ব্যবহার করাটা যাদু ও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। যাদু বা যেকোন সমস্যা ডায়াগনোসিস ও নিরাময়ে কিংবা যাদুকর খান্নাসদের শায়েস্তা করবার কাজে জিনদের সাহায্য গ্রহণ কুফরী নয়, যদি না এ সহায়তার বিনিময়ে জিনদের কোন অবৈধ শর্ত বা অন্যায় আবদার পূরণ করতে হয়। জিন ব্যবহার মানেই যদি কুফর হতো, তাহলে আল্লাহর একজন নবী [সোলায়মান (আ.)] এ কাজ করতেন না। অতীতে বিপথগামী বিভ্রান্তরা যেমন সোলায়মান (আ.)-এর মোজেযা ও যাদুকরদের কুফরীকে এক করে গুলিয়ে ফেলত [যা খণ্ডন করতে গিয়ে সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াত নাযিল হয়], তেমনি বর্তমানেও অনেকে মুমিন জিনদের সাহায্যে রুকিয়া ও শয়তান জিনদের সাহায্যে যাদুটোনা করাকে এক পাল্লায় মেপে থাকেন।
ভিন্নমতাবলম্বী বা ভিন্ন পন্থা অবলম্বনকারী রাকীদেরকে প্রতিপক্ষ জ্ঞান করে ঘায়েল করবার নেশায় কেউ কেউ এতই অন্ধ হয়ে থাকেন যে, যাদুকর প্রেরিত অনিষ্টকারী জিনকে আটক করার বিষয়েও অনাবশ্যক আপত্তি ও বিরোধিতায় নিয়োজিত হন। তাদের যুক্তি হলো, রসূলুল্লাহ (সা.) যেহেতু সোলাইমান (আ.)-এর সম্মানার্থে নিজে জিনকে বেঁধে রাখতে পেরেও ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাই আমাদের জন্য কোন জিনকে আটক করা জায়েয নয়, এমনকি কেউ এটা করলে তিনি রসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়েও বড় হয়ে গেলেন কিনা বা নিজেকে রসূলের (সা.) চেয়েও বড় মনে করেন কিনা- এ ধরনের ব্যাঙ্গোক্তিপূর্ণ প্রশ্ন জুড়ে দেন। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীতে বর্ণিত শয়তান জিনকে শারীরিকভাবে বেঁধে রেখে তারপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু রাকীগণ কেউ কোন জিনকে সরাসরি physically আটক করে না, সেই সামর্থ্য বা ক্ষমতাও কারো নেই। রুকিয়ার ক্ষেত্রে জিন আটক করা হয় মূলত মানুষের (ভিকটিমের বা ভিকটিমের সাহায্যকারী অন্য কোন রাকীর) শরীরে, কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে স্বপ্নের ভিতরে। তদুপরি রসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে সাময়িকভাবে আটক ও মুক্তিপ্রাপ্ত জিনেরা স্বত:প্রণোদিতভাবেই এসেছিল, কোন মানুষ তাদেরকে প্রেরণ করেনি। তাই তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এর প্রেরক সম্পর্কে জানা ও প্রেরককে ধরবার কোন প্রয়োজন ছিল না। আর এখনকার যুগে আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিন চালান হয়ে থাকে আল্লাহদ্রোহী যাদুকর তথা মানুষরূপী শয়তান পিশাচদের তরফ থেকে। আর সেক্ষেত্রে জিন আটক পদ্ধতির রুকিয়ার দ্বারা রোগী তথা ভিকটিমকে মুক্ত করার পাশাপাশি সেই জিনদেরকেও অশুভ শক্তির কবল থেকে মুক্ত করা হয় এবং সত্যের পথ দেখানো হয়। সর্বোপরি কোন রাকীই নিজেকে সোলাইমান (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.) অপেক্ষা অধিক শক্তিমান দাবি করে না, বরং সম্পূর্ণ আল্লাহর কালাম কোরআনের আয়াত তেলাওয়াতের দ্বারাই কাজটি সাধন করে থাকে, যা মূলত একমাত্র আল্লাহর ক্ষমতারই বহি:প্রকাশ মাত্র, কোন রাকির ক্ষমতা বা কেরামতির নিদর্শন নয়। কী আশ্চর্য যুক্তি, জিনকে মানুষের ঘাড়ে চেপে থেকে দিন-রাত জ্বালাতন করার সুযোগ দেয়াতে কোন সমস্যা নেই, সমস্যা হলো তাকে আটক করলে! জিনকে যদি শুধু তাড়িয়ে দিয়েই রুকিয়া সম্পন্ন করা হয়, তাহলে তো একজনের ঘাড় থেকে বিদায় নিয়ে আরেকজনের ঘাড়ে গিয়ে চাপবে- জনদুর্ভোগ তো কমবে না। নাকি জিন শয়তানদের দৌরাত্মকে ইচ্ছাকৃতভাবে জিইয়ে রেখে নিজেদের ব্যবসাকে চাঙ্গা রাখাটাই অভিপ্রায়? কী সুন্দর ব্যবসা, বার বার জিনেরা মানুষের ঘাড়ে চেপে তাণ্ডব করবে, আর বার বার রুকিয়া করে তাড়াতে হবে! মামাবাড়ির আবদার আর কী! এ তো দেখছি সেই  অসাধু ডাক্তারদের মতই আচরণ হয়ে গেল, যারা রোগ স্থায়ী নিরাময়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিংবা কোথায় কার কাছে পাঠালে স্থায়ী নিরাময় হবে জানা সত্ত্বেও রোগের কিছুটা অনিরাময় অবস্থায় রেখে দেয় কিংবা রোগের পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনাটা রেখে দেয়। আর যারা কম খরচে পূর্ণ নিরাময়ের অফার করে, তাদের নামে কুৎসা গায়।

ফেরকা-মাযহাব নিয়ে দলাদলি ও ফেতনা-ফাসাদের শেষোক্ত যে কারণটি উল্লেখ করেছিলাম, সেটা হলো রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। ইসলামের ইতিহাসের শুরুতে শিয়া ছিল একটি রাজনৈতিক দল বা মতবাদের নাম, যা পরবর্তীতে ধমীয় ফেরকায় রূপ নেয়। আবার বর্তমানেও মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের ভিতরে গদি দখলের লড়াই থেকে শুরু করে গোটা এলাকায় এক দেশের সাথে আরেক দেশের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইটাও ফেরকা-মাযহাব দলাদলির আড়ালে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে একটি পক্ষ (শিয়া) যেহেতু ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জন্য মাতম ও শোক প্রকাশ করে থাকে, তাই তাদেরকে জব্দ করবার জন্য অপর পক্ষ (রাজতন্ত্রপন্থী সালাফী) ইমাম হোসাইনের (রা.) হত্যাকারীদের স্তবকীর্তন করে থাকে। এদিকে প্রথম পক্ষটি আবার অতীতকাল থেকেই ইসলামের প্রধান খোলাফায়ে রাশেদীন ও রসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করে আসছে। মোটকথা, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্যই একে অপরের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিবর্গের মানহানি করা, হালাল-হারাম বা মাসলা-মাসায়েল বিষয়ে প্রতিপক্ষের উল্টো অভিমত জ্ঞাপন করা এবং নিজ নিজ খেয়াল-খুশী মোতাবেক ইমাম মাহদীকে বের করে আনার ধান্ধাবাজি চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ বা হালাল-হারাম গবেষণা কারোই উদ্দেশ্য নয়। ধর্মীয় বা যেকোন ইস্যুতে নিজ নিজ প্রতিপক্ষকে ভ্রান্ত প্রমাণের দ্বারা মুসলিম জনগণের সমর্থন ও আনুগত্য হাসিলের মাধ্যমে নিজ নিজ দল ভারি করা ছাড়া রাজা-বাদশাহ ও রাজনীতিবিদদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। সত্যি কথা বলতে কি, ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম জনগণের কল্যাণ এদের সবার কাছেই তুচ্ছ।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

জাযাকাল্লাহ। যথার্থই লিখেছেন।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)