খলের ছল

গ্রামের প্রভাবশালী সন্ত্রাসী চুন্নু মিয়া। জোর-জুলুম করে মানুষের জায়গা-জমি দখল করাই তার পেশা। বাধা পেলে মানুষকে রাতের অন্ধকারে গুম করে দেয়। এভাবে সে বহু গ্রামবাসীর জমি হাতিয়ে নিতে পারলেও নিজের ঘরের কোল ঘেষা প্রতিবেশী রজব মাস্টারকে নতি স্বীকার করাতে পারেনি। রজব মাস্টার তার বসতবাড়ি ও জমি ছেড়ে দিতে আদৌ রাজি নয়।
সুযোগ খুঁজতে থাকে সন্ত্রাসী চুন্নু মিয়া। এক শীতের মওসুমে রজম মাস্টারের স্ত্রী ও সন্তানেরা যখন রজবের শ্বশুর বাড়িতে (অর্থাৎ, তার সন্তানদের নানাবাড়িতে) গেল এবং সে নিজে কিছু কাজ সম্পন্ন করার জন্য নিজের বাড়িতে একা থেকে গেল, তখন সন্ত্রাসী চুন্নু মিয়া সেই সুযোগ গ্রহণ করে। রাতের অন্ধকারে একদল সন্ত্রাসী সাঙ্গোপাঙ্গোকে সাথে নিয়ে রজব মাস্টারের বাড়িতে হানা দেয় এবং তাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। এক রাস্তার পাশে নদী বা বিলের ধারে নিয়ে রজব মাস্টারকে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেয়া হয়। ঘটনাক্রমে উক্ত নদীর/বিলের পাড়ে ৬ জন গ্রামবাসী মাছ ধরছিলো। তারা হলো রহিম, করিম, সাদেক, আমর, কাদের ও নছিমন বিবি।
সকাল বেলা গ্রামে ফিরে এসে উক্ত ৬ জন প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনা জানায় গ্রামবাসীদের। খবর দেয়া হয় রজব মাস্টারের শ্বশুরবাড়িতে তার পরিজনদের কাছে। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। খুনী সন্ত্রাসী চুন্নু মিয়া অনেক প্রলোভন ও ভীতিপ্রদর্শন করেও ৬ জন প্রত্যক্ষদর্শীকে বাগে আনতে পারেনি। তারা আদালতে সাক্ষী দিতে যাবার ব্যাপারে অনড়।
উক্ত গ্রামের শহিদ মিয়া ছিল এক তান্ত্রিক সাধক। মন্ত্র সাধনার বলে সে বেশকিছু অলৌকিক শক্তি অর্জন করেছে। তাকে গ্রামের কেউ আধ্যাত্মিক গুরু আবার কেউ সুফী সাধক হিসেবে মান্য করে। সন্ত্রাসী চুন্নু মিয়াও এই গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে এবং সময়ে-অসময়ে, বিপদে-আপদে, প্রয়োজনে এই গুরুর আশীর্বাদ গ্রহণ করে। সে এবারের এই সমস্যাটিও আধ্যাত্মিক গুরু শহিদ মিয়ার কাছে নিয়ে যায়।  শহিদ মিয়া আবার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বলে গ্রামবাসীদের মধ্যে যে কারো দুর্বল দিক ধরতে পারে এবং সে অনুযায়ী তার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে। সে জানে, প্রত্যক্ষদর্শী ৬ জনই সহজ-সরল, অশিক্ষিত ও ধর্মভীরু। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের মধ্যে অভিন্ন। এছাড়া তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কোন্ বিষয়ে দুর্বলতা আছে, কোন্ পয়েন্টে কাকে কাত করা যাবে, সে সম্পর্কেও শহিদ মিয়া মোটামুটি ধারণা রাখে।
নিজের অপরাধী শিষ্য চুন্নু মিয়ার সাহায্যার্থে খুনের সাক্ষীদেরকে ম্যানেজ করবার জন্য আধ্যাত্মিক গুরু শহিদ মিয়া নিজের ৬ জন অনুচরকে পৃথকভাবে ৬ জন সাক্ষীর কাছে প্রেরণ করে।
  • প্রথম অনুচর সাক্ষী রহিমের কাছে গিয়ে বলে, "তুমি কি ভালো মুসলমান হতে চাও না?" রহিম বলে, "অবশ্যই চাই।" অনুচর বলে, "তুমি কি জান, ক্ষমা পরম ধর্ম? ক্ষমাশীলকে আল্লাহ ও রাসূল (সা.) পছন্দ করেন।" রহিম বলে, "অবশ্যই।" অনুচর বলে, "তুমি কি নবীজীর (সা.) এ হাদীসটা জান যে, যে ব্যক্তি অন্যের দোষ গোপন করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন করবেন?" রহিম বলে, "হাদীসটা যদিও জানতাম না, তবে খুব চমৎকার হাদীস। আমি অবশ্যই নবীর (সা.) হাদীসের উপর আমল করতে চেষ্টা করব।" অনুচর এবার তার আসল কথাটা রহিমের কানে তোলে, "তাহলে সেদিন রাতে যা দেখেছ, তা চেপে যাও। কোন কিছু দেখে যদি তোমার মনে কোন রাগ বা ক্ষোভ হয়ে থাকে, তাহলে তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করে দাও।"
  • দ্বিতীয় অনুচর সাক্ষী করিমের কাছে গিয়ে বলে, "তুমি কি জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব থেকে বাঁচতে চাও না?" করিম জবাবে বলে, "তা কে না চায়?" অনুচর বলে, "তোমার মনে কি আল্লাহর ভয়-ডর কিছু আছে?" করিম বলে, "আমি অবশ্যই আল্লাহ তাআলাকে ভয় করি।" অনুচর বলে, "তুমি কি জান, কোরআন পাকে আল্লাহ তাআলা গীবতকে কিসের সাথে তুলনা করেছেন?" করিম বলে, "হ্যাঁ, গীবত করা আর মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া সমান।" অনুচর জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি জান, গীবত কাকে বলে?" করিম বলে, "হ্যাঁ, কারো দোষ প্রকাশ করাটাই গীবত।" অনুচর বলে, "তাহলে তুমি সেদিন রাতে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখেছ, তা প্রকাশ করে গীবতের পাপে পাপী হয়ো না।"
  • তৃতীয় অনুচর গেল সাক্ষী সাদেকের মায়ের কাছে। গিয়ে বলল, "চাচীআম্মা! আপনার ছেলেটা ঝামেলায় জড়াক, অযথা বিপদে পড়ুক, তা নিশ্চয়ই আপনি চান না। কী দরকার পরের ঝামেলা নিজের উপর বয়ে আনার!" সাদেকের মা বলল, "তাই তো! ঠিক আছে, আমি ওকে মানা করে দেব, যেন গাও-গেরামের বিষয় নিয়ে নাক না গলায়।" এরপর উক্ত অনুচর সাদেকের কাছে গিয়ে বলল, "তুমি কি জান, ইসলামে আল্লাহর পরেই কাকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেয়া হয়েছে? পিতামাতার কথা না শুনলে, বড়দের কথা না শুনলে কত বড় গুনাহ হয়, তা নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে।" সাদেক বলে, "তা তো বটেই! আমি কখনো আমার বাবা-মায়ের অবাধ্য হইনি।" অনুচর বলল, "ঠিক আছে, আশাকরি তুমি পিতামাতার প্রতি তোমার এ আনুগত্যের নীতি বজায় রাখতে পারবে। বিশেষ করে মায়ের অনুমতি ছাড়া কোথাও যাবে না, কোন কাজের চিন্তা করবে না, বুঝেছ?"
  • আধ্যাত্মিক গুরু শহিদ মিয়ার চতুর্থ অনুচর গেল সাক্ষী আমরের কাছে। গিয়ে বলল, "তুমি কি আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) আনুগত্য কর?" আমর বলল, "অবশ্যই।" অনুচর বলল, "তুমি কি জান যে, আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) আনুগত্য করতে হলে নেতার আনুগত্য করতে হয়?" আমর বলল, "হ্যাঁ, তা জানি বটে!" অনুচর বলল, "তোমার কী মনে হয়, নেতার বিরুদ্ধাচরণ করলে কি কারো ঈমান থাকে?" আমর বলল, "না।" অনুচর বলল, "তাহলে শোনো বাছা, চুন্নু মিয়া আমাদের গ্রামের একজন মাথা। তিনি তো আমাদের নেতার মতই। তার অধীনে প্রচুর লোক-লস্কর আছে, এছাড়া তোমাদেরও মাঝে মাঝে দেখভাল করে থাকেন। তদুপরি তিনি বয়সেও তোমার চেয়ে বড়। সর্বোপরি আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু তো আমাদের গ্রামের সকলের নেতা, তাই না? সুতরাং চুন্নু মিয়ার মত একজন পাতি নেতাকে বিপদে ফেলা এবং আধ্যাত্মিক গুরু শহিদ মিয়ার মত শীর্ষ নেতাকে অসন্তুষ্ট করা কি আমাদের উচিত হবে? নেতাদের অবাধ্যতার দ্বারা কি আমাদের ঈমানটাই বিপন্ন হয়ে যাবে না?"
  • পঞ্চম অনুচর গেল সাক্ষী কাদেরের কাছে। গিয়ে বলল, "তুমি নিশ্চয়ই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখো।" কাদের জবাব দিল, "অবশ্যই।" অনুচর বলল, "তুমি নিশ্চয়ই তাকদীরে বিশ্বাস কর! ভালো-মন্দ সবকিছু যে আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়, একথা মানো।" কাদের বলল, "হ্যাঁ, না মানার তো কোন কারণই নেই।" অনুচর বলল, "তুমি কি সর্বদা আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাক?" কাদের বলল, "আমাদের সকলেরই উচিত সর্বদা সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা।" অনুচর এবার তার আসল প্যাচাল পাড়তে শুরু করল, "তবে শোন, মানুষের হায়াত-মউত সবই আল্লাহর হাতে। যে গেছে, সে আল্লাহর ইচ্ছাতেই বিদায় হয়েছে। এর জন্য কোন মানুষকে দোষী করে লাভ নেই। তুমি তো চাইলেও আর ঐ মৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। আসলে আল্লাহই চেয়েছেন, বেচারা অমুকের হাতে মরুক। আল্লাহই চেয়েছেন, ঘটনাটা রাতের অন্ধকারে হোক এবং কার দ্বারা ঘটনাটি ঘটেছে সেটা গোপন থাকুক। এমতাবস্থায় এ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে চাওয়া, ঘটনাটির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা এবং আল্লাহ যা গোপন করেছেন সেটা প্রকাশ করতে চাওয়াটা কি আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে গেল না? এটা কি খোদার উপর খোদগিরি হয়ে গেল না?" কাদের বলে, "আমি এভাবে তো ভেবে দেখিনি! ঠিক আছে, আমি আর এ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবো না।"
  • ষষ্ঠ অনুচর গেল সাক্ষী নছিমন বিবির কাছে। গিয়ে বলল, "তুমি কি আল্লাহকে বিশ্বাস কর?" নছিমন জবাব দেয়, "আল্লাহকে বিশ্বাস না করবার তো কোন কারণ নেই।" অনুচর বলে, "তুমি কি তাওহীদে বিশ্বাস? তোমার ঈমান কি যাবতীয় শিরক ও তাগূতের প্রভাব থেকে মুক্ত?" নছিমন বিবি বলে, "হ্যাঁ, আমি তো জেনেশুনে কোন শেরেকি বা কুফরী করছি না।" অনুচর বলে, "আরেকটু ভেবে দেখো তো, তোমার দ্বারা না জেনে কোনরূপ শেরেক-কুফর সংঘটিত হতে যাচ্ছে কিনা।" সরল বিশ্বাসী নছিমন ভড়কে গিয়ে বলে, "এরকম কিছু হয়ে থাকলে আপনি দয়া করে আমার ভুলটি ধরিয়ে দিন, আমি শুধরে নিতে দেরি করব না।" এবার অনুচর তার আসল কথায় আসে। সে জিজ্ঞেস করে, "বিচার করার  মালিক কে?" নছিমন জবাবে বলে, "কেন, আল্লাহ!" অনুচর বলে, "তাহলে তোমরা আল্লাহ বাদ দিয়ে কার কাছে বিচার চাইছ?" নছিমন বলে, "কিন্তু আমাদের নবীজী (সা.) ও তো বিচারকার্য করেছেন, খোলাফায়ে রাশেদীনও বিচার করেছেন, তাঁদের নিযুক্ত বিচারকরাও বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন।" অনুচর বলে, "আরে! তাদের বিচার আর তোমার দেশের বিচার কি এক? তাঁরা বিচার করেছিলেন আল্লাহর আইন অনুসারে, আর তুমি যেখানে বিচার চাইছ সেখানে বিচার হচ্ছে তাগূতের আইনে। যেহেতু এখানে ইসলামী আইন নেই, আদালত যেহেতু তাগূতী আইনে চলে, সুতরাং এই আদালতে কোন ব্যাপারে সাক্ষী দিতে গেলে তোমাদের কারোরই ঈমান থাকবে না, বুঝেছ!" অগত্যা ঈমান হারানোর ভয়ে বেচারা নছিমন বিবি আদালতে গিয়ে সাক্ষী প্রদানের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে।
পাঠক দেখলেন তো, ভণ্ড পীর বা ভণ্ড গুরুরা কিভাবে নিজেদের ও অনুসারীদের অন্যায়-অপকর্মকে প্রশ্রয় দেয় এবং অন্যায়কারী ও জালেমকে রক্ষার জন্য ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে দাবিয়ে রাখে? কোরআন-হাদীস ও ধর্মের আলোকে এদের কুযুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে খণ্ডন করা ও এদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দানের মতন প্রস্তুতি সবার থাকে না। এসব মতলববাজরা ইসলামের নামেই ইসলামের সাথে শত্রুতায় লিপ্ত। এরা নানানভাবে মানব সমাজে ও মানব জীবনে অশান্তি ও ফেতনা-বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং ধর্মের কিছু আদর্শকে কথার মারপ্যাঁচে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে ঢালরূপে ব্যবহার করে।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)