নীল জল ও চীনামাটির দেশ !

নেত্রকোনার একেবারে উত্তরে ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের কোল
ঘেঁষে অপরূপ শান্ত ছোট্ট জনপদ দুর্গাপুর আর বিরিশিরি। কংশ নদ আর সোমেশ্বরী নদী বয়ে
গেছে বিরিশিরির গা ঘেঁষে। এখানে ঘুরতে আসলে অদ্ভূত সুন্দর নীল পানির লেক আর সবুজের
প্রাচুর্য চোখ জুড়িয়ে দেবে নিমিষেই।

বিরিশিরির মূল আকর্ষণ চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে চলে গেছে অবাক সুন্দর নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ।
শরতে নীল আকাশ আর সাদা মাটির পটভূমি জলের রঙকে আরও গাঢ় করে দেয়। আর একটু দূর
দিগন্তে দেখা যায় গারো পাহাড়ের সবুজ বনের সারি।

প্রকৃতি তার ঝুলি উজাড় করে দিয়েছে এ গারো পাহাড় সাজাতে। চারপাশে যেন সবুজের সাম্রাজ্য। পাহাড়ের অসমতল
উঁচুনিচু টিলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ঝরণা। দুই পাহাড়ের মাঝে মাঝে সমতল ভূমি। তার
মাঝে সবুজ ফসলের ক্ষেত। কোথাও সবুজ টিলার উপর ছোট কুঁড়ে ঘর। আর সবুজ গাছের ফাঁকে
নীল আকাশ। পাহাড়,
নদী, শাল-গজারি আর অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতি মিলিয়ে এ যেন বাংলার
ভূস্বর্গ।

দুর্গাপুরের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে কয়েকটি আদিবাসী
সম্প্রদায়। তার মধ্যে গারো, হাজং, কোচ, মুরং উল্লেখযোগ্য। এসব সম্প্রদায়ের মানুষেরা যুগ যুগ নিজ কৃষ্টি-কালচার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা লালন করে সৌন্দর্য ও
সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করছে।

বিরিশিরিতে দেখার মতো আরও
রয়েছে রানীখং গির্জা, কমলা রানীর দীঘি এবং সোমেশ্বরী
নদী আর কংশ নদ। বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় অনেক।
মেঘালয়ের পর্বতরাজি থেকে নেমে আসা সবুজ আর উত্তাল পাহাড়ি ঢল বর্ষায় বিরিশিরি ঘুরতে
আসা পর্যটকদের দেখায় তার বন্য সৌন্দর্য।

এইসব পাহাড় থেকে চিনামাটি উঠানোর ইতিহাস না জানা গেলেও
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, ১৯৬০ সালে কোহিনুর এলুমিনিয়াম
ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই সাদামাটি উত্তোলনের কাজ শুরু করে। পরে বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে বিসিআইসি সাদামাটি উত্তোলন শুরু করে। বর্তমানে ৯টি
প্রতিষ্ঠান সাদামাটি উত্তোলনের কাজ করছে। দুর্গাপুর বাজারের পাশে সোমেশ্বরী নদীর
পাড় হয়ে রিক্সা বা মোটরবাইকে চেপে মাটির রাস্তা দিয়ে যেতে হয় বিজয়পুরের এই
সাদামাটির পাহাড়ে।

আছে রাণীমাতা রাশিমণির স্মৃতিসৌধ। উপজেলা পরিষদ থেকে ছয়
কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামের চৌরাস্তা মোড়ে এ স্মৃতিসৌধ
। রাশিমনি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী।

দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে কাল্লাগড়া
ইউনিয়নের উত্তর পূর্ব সীমান্তে সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষে একটি উচু পাহাড়ে রাণীখং
মিশন অবস্থিত। ১৯১০ সালে এই ক্যাথলিক মিশনটি প্রতিষ্ঠিত
হয়। নান্দনিক গীর্জাসহ একটি দাতব্য চিকিৎসালয়, দুইটি
স্কুল ও একটি পোস্ট অফিস আছে এখানে। মিশনের ভেতরে সোমেশ্বরীর পাড়ে আছে
শান্তিনিকেতন নামে একটি বিশ্রামাগার। পাহাড় চূড়ার এই বিশ্রামাগার থেকে থেকে
বিরিশিরির সৌন্দর্য যেন পায় অন্য মাত্রা।

উপজেলা পরিষদের পাশেই সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি। ‘সুসং-দুর্গাপুরের ইতিহাস’ বই
থেকে জানা যায়,
একসময় এই দুর্গাপুর ছিল ৩ হাজার ৩শ’ ৫৯ বর্গমাইল এলাকা ও প্রায় সাড়ে ৯শ’ গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সুসং রাজ্যের রাজধানী। নেত্রকোনার ইতিহাস
বলে, সোমেশ্বর পাঠক থেকে শুরু করে তাঁর পরবর্তী বংশধররা প্রায় ৬৬৭
বছর শাসন করেন এ রাজ্য। জানা গেছে, সুসং রাজবাড়ি একসময় দেয়াল দিয়ে
ঘেরা ছিল। পরিখাবেষ্টিত রাজবাড়ির অভ্যন্তরে ছিল সৈনিকদের আবাস, বিচারালয়, কারাগৃহ, অস্ত্রাগার, চিড়িয়াখানা, হাতিশালা, রাজপরিবারের সদস্যদের প্রাসাদ, শয়নকক্ষ, কাছারি, বৈঠকখানা ইত্যাদি। ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সুসং
রাজ্যের রাজা জগতকৃষ্ণ সিংহ প্রাচীর চাপা পড়ে নিহত হন এবং রাজবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি
হয়। বর্তমানে যে নিদর্শনগুলো টিকে আছে তার অধিকাংশই জগতকৃষ্ণের পরবর্তী বংশধরদের
নির্মিত।

বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের পাশে উপজেলা সদর হতে ৩ কিলোমিটার
দক্ষিণে আছে ঐতিহাসিক কমলা রানী দীঘির পাড়। স্থানীয়ভাবে এটি সাগর দীঘি নামেও
পরিচিত। দীঘিটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এর দক্ষিণ-পশ্চিম পাড় জেগে আছে
কালের সাক্ষী হয়ে।

বিরিশিরিতে আরও  আছে
আদিবাসী কালচারাল একাডেমি। শান্ত-স্নিগ্ধ, সবুজে ঢাকা ছিমছাম পরিবেশ। এ
অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার নানা নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে।
এখানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় সবাই পাহাড়ি -গারো, হাজং। এখানকার পাহাড়ি বা পাহাড়িদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল
এই কালচারাল একাডেমি। পাহাড়িদের সাংস্কৃতিক পরিচয় পাওয়া যাবে একাডেমির জাদুঘরে।
দুটি লাইব্রেরি আছে বেশ সমৃদ্ধ। পাহাড়িদের ওপর লেখা সব বইপত্র, জার্নাল এখানে রক্ষিত। এখান থেকেও একটি সাময়িকী নিয়মিত বের
হয়। আর প্রায় সারা বছরই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দুর্গাপুরের পাশে জেলার মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি, কলমাকান্দায় কম বেশি ৫৬টি হাওর ও বিল আছে। শুকনো মৌসুমে এই
হাওরে চাষাবাদ হলেও বর্ষায় হাওর জলে থইথই। গ্রামগুলো মনে হয় একেকটি ছোট দ্বীপ। তখন
এসব এলাকার একমাত্র বাহন হয় নৌকা। মোহনগঞ্জ থেকে রিকশায় দিকলাকোনা গিয়ে ডিঙ্গাপোতা
হাওরে যাওয়া যায়। আর ইঞ্জিন নৌকায় করে যাওয়া যায় হাওরের বিভিন্ন গ্রামে। রূপের ডালি সাজিয়ে বিরিশিরির কংস আর সোমেশ্বরী সারাবছরই থাকে
ভ্রমণপিপাসুদের অপেক্ষায়। 

প্রয়োজনীয়
তথ্য:

ঢাকা থেকে নেত্রকোনা হয়ে
বিরিশিরি যাওয়ার চাইতে ময়মনসিংহ থেকে বিরিশিরি যাওয়া সহজ। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ
ব্রিজ (বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু) থেকে একঘণ্টা পর পর বিরিশিরি যাওয়ার বাস ছাড়ে। 

বিস্তারিত জানতে এখানে দেখুন

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)