গুলশান আরার একদিন

নামাজ শেষে বারান্দায় বসে কুরান পড়ছিলেন গুলশানারা। আনজাম গেট পেরিয়ে
বাড়িতে ঢুকছে- দেখে খুশির ঝিলিক বয়ে যায় তার চোখে মুখে। দরজা খুলে ওকে
জড়িয়ে ধরে বুক ভরে শরীরের গন্ধ নেন। কতদিন পর এলো ছেলেটা। নিঃসঙ্গ একা
জীবনে হঠাৎ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। খাবারের আয়োজন, আদর-যত্ন,
নাস্তা-পানি আর কত কথা জমা তো আছেই।

গুলশানারা প্রকৃতই একলা মানুষ নন। তার স্বামী-সন্তানেরা
ইংল্যান্ডপ্রবাসী আর কোলেপিঠে করে মানুষ করা আানজাম জীবিকার সন্ধানে দূরের
শহরে। সেখানেই তার সংসার।

দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর লন্ডনপ্রবাসী শরাফত আলীর সঙ্গে বিয়ে হয়
গুলশানারার। বিয়ের পরই আনজামকে কোলে নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি। আনজাম
সাহসী-বুদ্ধিমান, তাছাড়া খাঁড়া নাক, ফর্সা রং আর দীর্ঘদেহী হওয়ার জন্য
সহজেই নজরে পড়তো সবার। প্রতিবেশীরা প্রায়ই বলতো- আপনাদের বড় ছেলেটি
পাকিস্থানীদের মতো! আনজামকে নিয়ে গুলশানারার আদিখ্যেতা শরাফত আলীর বাড়াবাড়ি
মতে হতো, অন্যদিকে পড়শীদের এই ধরণের মন্তব্য একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাই
তিনি চাইতেন আনজাম কোন চাইল্ড কেয়ারে থাকুক। এটা নিয়েই তাদের মধ্যে
বাকবিতন্ডা এবং শেষ পর্যায়ে পৃথক থাকার সিদ্ধান্ত। ছেলেমেয়ে আর স্বামীকে
লন্ডনে রেখে গুলশানারা আনজামকে নিয়ে বাংলাদেশে থাকতে চান। তাই কয়েক বছর পর,
কোন এক সন্ধ্যায়, আবার দেশে ফেরত আসেন আনজামকে বুকে নিয়েই।

গুলশানারার তিন ছেলেমেয়ে প্রথম প্রথম মাকে দেখার নাম করে ছুটি কাটাতে
বাংলাদেশে আসতো। এখন এরা বড় হয়েছে, তাই ব্যস্ততাও বেড়েছে।তাছাড়া তাদের
ছেলেমেয়েরা ছুটি কাটাবার জন্য বাংলাদেশকে একেবারেই পছন্দ করেনা। সময় পেলে
ওরা সুইডেন বা অস্ট্রেলিয়া যায়।

আনজাম তার নিজের ছেলে নয়। একাত্তরের যুদ্ধের দুর্দিনে মানুষ যখন বাঁচার
তাগিদে ছুটে বেড়াচ্ছিলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, তখন তরুণী দুইবোন
গুলশানারা আর নয়নতারা নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষায় লুকিয়ে ছিলো রাতদিন। কিন্তু
শেষমেষ একদিন তাদের পাড়ার নুরুদ্দিন মোল্লা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পাকিস্থান
জিন্দাবাদ বলে নয়নতারাকে ধরে নিয়ে যায়। পুরো যুদ্ধের সময় তার আর কোন
খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর, একদিন ভোরের আলো আঁধারীতে আধাপাগল
নয়নতারা তাদের বাড়ির দরজায় আছড়ে পড়ে। এতোদিন কোথায় ছিলো কিভাবে এলো কিছু
বলতে পারেনি। দুদিন পর আনজামের জন্ম দিয়ে মারা যায় সে। সেই থেকে আনজাম
গুলশানারার কোলে।

ভীষণ ব্যস্ততা নিয়ে আলু ভাজি, সাতকরা-ইলিশ আর শুঁটকী ভর্তা করেছেন তিনি।
আনজাম খেতে খেতে বলে- ইস আম্মা! পুরো দুই মাস পর পেট ভরে খাচ্ছি। প্রমোশন
হওয়ায় দায়িত্ব বেড়ে গেছে তাই আগের মতো আসতে পারিনা। তোমার হাতের রান্নাও
খেতে পারিনা।

চোখে পানি এসে যায় গুলশানারার। কী যে সুন্দর লাগছে ছেলেটাকে। সে জানে
গুলশানারা তার মা কিন্তু বাবা কে কখনও জিজ্ঞেস করেনি। আনজাম কি জানে যে সে
একজন যুদ্ধশিশু!

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)