ক্ষুদ্র ঋণ এবং আত্মকর্মসংস্থান

 

 

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির
লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বহু বছর ধরেই কাজ করে যাচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে কাজ
হচ্ছে। এটাকে আজকাল আবার কেউ কেউ স্ব-উদ্যোগ
বলেও অভিহিত করেন। তবে, যে
নামেই ডাকা হোক না কেন মূল লক্ষ্য একটিই। আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে
সরকারি ও বেসরকারিভাবে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় টার্গেট গ্রুপকে প্রশিক্ষণ সেন্টারে আনার পর তাদেরকে
একটি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা হয়। এরপর যাদের মধ্যে
নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, যারা সৃজনশীল মেধার অধিকারী,
যারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং নিজে কিছু করার মতো সাহস ও দৃঢ়
ইচ্ছাশক্তি ধারণ করে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য। আর যাদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান নেই তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া
হবে উদ্যোক্তাদের অধীনে শ্রমিক হওয়ার জন্য। সকলকে উদ্যোক্তা
তৈরির ভাবনাটি কখনো সফল করা সম্ভব নয়। সমাজের সকলে
উদ্যোক্তা হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। শতকরা হারে এই
সংখ্যাটি আড়াই শতাংশের বেশি হয় না। আড়াই শতাংশের
মধ্যেই উদ্যোক্তা হওয়ার গুণাবলি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর বাকি সকলকে এই উদ্যোক্তাদের অধীনে চাকরি করতে হবে। যদি সকলে উদ্যোক্তা তৈরির শপথ নিয়ে মাঠে নামে তাহলে সেটি কোনো ভালো
পলিসি হবে না। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেক ধরণের
সমস্যা রয়েছে। প্রায়ই দেখা যায় এ ধরণের উদ্যোগ যারা গ্রহণ করে
তারা আবার পারিবারিক বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণেও বাধ্য হয়। যখন বেকার ছিল তখন হয়তো তেমন দায়িত্ব নিতে হয়নি। কিন্তু যখনই কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখনই দায়িত্বও নিতে হয়েছে। ব্যবসার অবস্থা কেমন বা কেমন চলছে এ বিষয়গুলো নিয়ে পরিবার মাথা ঘামাতে
চায় না। তখন আয়ের পাশাপাশি ব্যয়ও করতে হয়। এ ধরণের উদ্যোক্তাদের হিসাবজ্ঞান ভালো না থাকার কারণে তারা বুঝে উঠতে
পারে না কত টাকা আয়ের বিপরীতে কত টাকা ব্যয় করছে। কখনো কখনো অনুৎপাদন খাতেও মোটা অংকের টাকা খরচ করে ফেলে। বাড়িতে নিজের বা ভাই-বোনের বিয়ের আয়োজন হলে হিসাবের
বাইরে অনেক টাকা খরচ করে। বিভিন্ন উৎসবে টাকা
খরচ করে। কিন্তু বিষয়টি যখন বুঝতে পারে তখন আর করার কিছু
থাকে না। মূলধন সংকটে পড়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়। কখনো কখনো ঋণের কিস্তির টাকাই তাদের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে, এ ধরণের উদ্যোক্তারা ঋণ পরিশোধ, সঞ্চয় বা মূলধন গঠনের মতো কাজগুলো করতে পারে না। এক পর্যায়ে তারা উদ্যোক্তার সারি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। নানা ধরণের সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও দেখা যায় শতকরা পাঁচ ভাগ উদ্যোক্তা
হয়তো ব্যতিক্রম। তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা আছে। বুদ্ধিদীপ্ত মেধা রয়েছে। উদ্যোগ গ্রহণের মতো
সাহস আছে। তারা হয়তো কিছু একটা শুরু করে। এক পর্যায়ে ওই উদ্যোক্তা হয়তো তার উদ্যোগ থেকে ভালো একটা মুনাফা করতে
সক্ষম হয়। কিন্তু, মুনাফার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা
সম্ভব হয় না। কারণ, তার
দেখাদেখি আরো অনেকেই সেই একই উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই ধরণের উদ্যোগ অনেকে গ্রহণের কারণে পণ্যের সরবরাহ বেড়ে যায়। বাজারে চাহিদা অপেক্ষা জোগান বেড়ে যাওয়ার কারণে দাম কমে যায়। এক পর্যায়ে নিজেদের মধ্যে অস্বচ্ছ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত কারো পক্ষেই বাজারে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। গ্রামাঞ্চলে এ ধরণের উদ্যোগের অনেক নমুনা রয়েছে। যুব উন্নয়ন থেকে কেউ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যদি গ্রামের কিছু জায়গায়
থাই পেয়ারার গাছ লাগিয়ে কয়েক বছর পর ভালো অর্থ উপার্জন করতে পারে তাহলে তার পরের
বছরই দেখা যাবে পুরো গ্রাম থাই পেয়ারা গাছে ভরে গেছে। শুধু থাই পেয়ারা নয়, ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করা যায় এমন
যে কোনো পণ্যের ক্ষেত্রেই অভিন্ন অবস্থা দেখা যায়। এটিও আমাদের দেশে উদ্যোক্তা তৈরিতে একটি বড় সমস্যা। তারপরেও দেশের বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে সরকারের এই মহতী উদ্যোগ
আত্মকর্মসংস্থানে এক নতুন মাইল ফলক যুক্ত করবেই।  

 

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None