অসামাজিক

ভোর পাচটা...

এলার্ম বেজে উঠল পুরোনো মাইক্রোম্যাক্স এর এন্ড্রয়েডে। ২০১৫ ভার্সনের স্ক্রিনে তাকিয়ে চোখ মুছে উঠে বসলাম। ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠে বসে থাকলাম কিছুক্ষন। আবার এলার্ম বাজল।। আর বিছানায় থাকা যায় না। বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলাম।
.
সকাল থেকে একটানা কাজ করতে করতে হাপিয়ে গেছি। ভোরে উঠে পত্রিকা নিয়ে ঢাকার রাস্তায় ফেরি করেছি। পরে এসেছি ব্লু হাইট রেস্তোরাঁয়। খদ্দের এর চাহিদা একের পর এক মিটিয়ে যাচ্ছি। পাশে থাকা নির্মল দা ব্যাপার টা আন্দাজ করেছেন। খেয়ে আজ ছুটি নিয়ে চলে যেতে বললেন। কিন্তু নাহ। এভাবে আরামে কাটালে চলবে না। লড়ে যেতে হবে, শেষ পর্যন্ত।নিজেকে বোঝালাম। আবার কাজে মন দিলাম।
*
ক্লাসে গিয়ে রিসার দিকে চেয়ে আছে মিহাদ। রিসা বান্ধবী দের নিয়ে গল্প করছে। এক পর্যায়ে হাসাহাসি ও করছে। ওর হাসি দেখে মিহাদের মনেও দোলা লাগে, সেও হাসে। মনের অজান্তে। সে হাসি কেউ দেখে না,অনুভব করে না,শোনেও না। এ হাসি চরম সুখের,চরম আকাঙ্ক্ষা'র।
.
রিসা কে দেখে এগিয়ে গেল মিহাদ। গতকাল ক্লাসে ছিল না মিহাদ। ইকোনমিকস এর জটিল এক থিওরি "প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন ফর টু ইনপুট ভ্যারিয়েবলস" পড়িয়েছেন স্যার। রিসা সেরা ছাত্রি। ওর থেকে বুঝে নিতে চায় মিহাদ।
কিন্তু এটা পড়াশোনা'র ও উর্ধে। এ যে সেই আদিম বন্ধন। মহাকালের চাওয়া। সূতো সেই যা র জন্য সব শেষ হয়। সেই চাওয়া, যা নতুনের সৃষ্টি করে।
**
ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেলাম নিজের সেই খুদে ঘর টায়। এক পাশে থাকা কঙ্ক্রিটের উপর পেতে রাখা বিছানায়। কোন রকম এ খেয়ে ঘুমের দেশে চলে গেলাম।
.
ঘুম..
আকাঙ্ক্ষিত। অনাগত আর সর্বনেশে।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে আসে সে,তারা আর অতীত।
মধুর অতীত, তিক্ত সত্য। অবান্তর কল্পনা আর না পাওয়ার, চাওয়ার গল্প। আমি স্বপ্নবাজ।স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই। কিন্ত আজ নিজেই ভয় পাই স্বপ্ন দেখতে। বাস্তব জগত দেখিয়েছে আমার মূল্যহীন চিন্তা, শুধু স্বপ্নেই মানায়। চরম সত্য বয়ে বেড়াচ্ছি ভীতি নিয়ে।এমিগডালা'য় প্রতিটি জিনিস সেভ করা আছে। কুড়ে কুড়ে নিঃশেষ করবে আমায়। কখনো বলতে পারি নি। কেউ বুঝেও নি। বোঝাতে পারিনি। নীরব কান্নায় চাপা পড়ে গেছে।
..
আমি অসামাজিক। আজ সমাজ থেকে আলাদা আমার অস্তিত্ব। খুব স্বযত্নে রক্ষা করে চলেছি নিজের স্বত্তা কে। কেউ জানে না, সুপ্ত হয়ে আছে কি। আগ্নেয়গিরি একদিন জেগে উঠবে। একদিন অগ্নি ছেয়ে যাবে চারদিক। গ্রাস করবে সবকিছু। সব। একদিন।
.
ক্লান্তি নিয়েই আবার দিনের শুরু হল আমার। জানি কি করতে হবে। বাধাধরা কাজ। নিজেকে জার্মান ফুয়েরার এর মত দিক শুণ্য লাগে। থার্ড রাইখের পতনের পর হয়ত এমনই মনে হয়েছিল ফুয়েরার এর। ক্লান্তি কে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলাম।
আজ রেস্তোরা বন্ধ। দুপুর আর রাতে কি দিয়ে পেট ভরাব সেই চিন্তায় অস্থির। পকেটে যা আছে তা দিয়ে চলবে কিন্তু তা খরচ করার মত সাহস আমার নাই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফেলে আসা রাস্তার কথা
*
রিসাকে দেখে ডাক দিল মিহাদ। ডাক শুনে ও পেছনে ফিরে তাকাল না রিসা। ডাক শোনে নি এই ভেবে আবার ও ডাক দিল মিহাদ। এবার ও ডাক শুনল কিন্তু মিহাদের দিকে না ফিরে চলে গেল রিসা। স্থির চোখে শুধু তাকিয়ে দেখল মিহাদ। কিছুই করার নাই তার।
*
সারাদিন ঘুরেও কাজ পেলাম না। দুপুরে খাবার বলতে পানি। ঘুরতে ঘুরতে সেগুন বাগিচা র সামনে এলাম। এক বাসায় বিয়ে হচ্ছে। খাবারের আসায় ছুটে গেলাম।
*
ইদানিং রিসা মিহাদ কে এড়িয়ে চলে। মিহাদ বুঝে না। সে কি কিছু করেছে। একদিন ক্লাস শেষে রিসা র মুখোমুখি হল ও। জিজ্ঞেস করল, "আমি কি কিছু করেছি??" ওর কথার কোন উত্তর দেওয়া প্রয়োজনীয় মনে করল না রিসা। চুপ চাপ চলে গেল ওখান থেকে।
*
হিউম্যান বিহ্যাভিয়ার এর একটা দিক হয়ত কখনো পরিবর্তিত হয় নি। একাকীত্ব। আপনি অনেকের মাঝেও একা। অনেক কিছুর মাঝেও একা। অনেক কিছু পেয়েও একা। এর কোন সমাধান নেই। মানুষ বাস করে থ্রি প্যারালালি। এক প্যারালাল ওয়ার্ল্ড অন্য দুটির থেকে পুরো বিচ্ছিন্ন। মধ্যরাত্রি, মাদকতায় ভরা।
জানেন, রাতের গভীরতা'র আলাদা এক মাহাত্ম্য আছে। যত রাত হয়, চারদিক ততই নীরব হতে থাকে। রাত যতই গভীর হয় প্রকৃতি'র এক অজানা দিক জেগে ওঠে। ঘুম ভেঙ্গে ওঠে সরব হয় অন্য এক দুনিয়া। এই দুনিয়া সবাই উপভোগ করতে পারে না। প্রকৃতি সবাইকে উপভোগ করতে দেয় না। নির্ঘুম অনেকেই থাকে কিন্তু প্রকৃতি কে বুঝতে কেউ রাত্রের এই নেশায় গা ভাসিয়ে দেয় না। সবার জন্য নয় এই নেশা। আর যারা একবার এর নেশায় আসক্ত হয় ওদের কাছে রাতই সবচেয়ে সেরা সময়। সারা দিন অনেকে তূচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কিন্তু জানেন নিজের সব কিছু অই গভীর রাতের জন্যই বরাদ্দ রাখে। মধ্য রাত হারিয়ে যাবার, মধ্য রাত সব কিছুকে পেছনে ফেলে নতুন ভাবে নিজেকে চেনার। মধ্য রাত সব কিছুকে ফেলে নতুন করে শুরু করার।
এই মধ্যরাতই সেই প্যারালাল ওয়ার্ল্ড যা আলাদা। আপনার অতীত, বর্তমান কে এক সূতোয় বাধা পড়ে এখানে। এখানেই আপনার ভবিষ্যৎ কে সাজিয়ে দেয়।এটাই সেই সময় যখন মানুষ সবচেয়ে অসহায়। সব থেকেও একাকী।
*
আমার পেছনের গল্প খুবই উজ্জ্বল। এখনো মনে হলে চোখ চকচক করে। ইস!! কি ফেলে এসেছি।।
আচ্ছা এখন কি ওরা আমাকে মনে রেখেছে??
মনে হয় না। হয়ত আমার অস্তিত্ব ই শেষ হউএ গেছে। আমার স্থান পূরন হয়ে গেছে। গত এক বছর হতে চলল কেউ একবারের জন্যও আমার খোজ নিল না। আমি বেচে না মরে গেছি তা জানার ও প্রয়োজনীতা বোধ করে নি কেউই। ওদের খুব স্বার্থপর মনে হল। কিন্তু পরক্ষনেই হতাশায় গ্রাস করল চারিদিকে। নিজের পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে গেছে। কি করব জানি না। হয়ত এভাবেই সমাজ থেকে পালিয়ে চলে যাবে আমার দিন। হয়ত এভাবেই হারিয়ে যাবে আমার গল্প। এভাবেই শেষ হয়ে যাব আমি। পৃথিবীর কোন কোণে আর আমার অস্তিত্ব নিয়ে ভাবার কেউই থাকবে না। সবার কাছে স্বপ্নের এক অংশ হিসবেই থাকবে আমার গল্প।
*
��আমার গল্প��
আমার গল্প খুব সাধারন। আমি ছিলাম উচ্চ মধ্যবৃত্ত পরিবারের এক সাধারন সন্তান। বাবা মা আর পরিবারের অন্যতম এক স্বপ্ন। আমি যখন আসি তখন থেকেই ঝড় ঝঞ্ঝাট এর মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। একসময় কোমায় ছিলাম, বার বার এক্সিডেন্ট করেও বেচে ছিলাম। সবার দোয়া আর আদরই বাচিয়ে রেখে ছিল আমাকে।
কিন্তু একটা সময় এল।আমি বড় হলাম। পৃথিবীর হাল বোঝা শুরু করলাম। পরিবার ছেড়ে বাইরব্র পৃথিবীতে এলাম। নিজের নতুন দুনিয়া য় এসে ই হোচট খেলাম। নতুন পৃথিবীর শুরুই ছিল আরেক চ্যালেঞ্জ। আরেক গল্ল সেটা। আমার নতুন পৃথিবীর গল্প।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)