অচেনা

গ্রামের বড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হাসফাস করছেন বৃদ্ধ মানুষটি। গাছের নিচেই টিউবওয়েল থেকে পানি পান করে হাটা দিলেন আবার।

কিছুদূর গিয়েই দেখা হল একজনের সাথে। নাম তার তারাপদ খা।তারা'র কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,"বাবা, করিম মুন্সি র বাড়ি কই কইতে পারেন।" বৃদ্ধের সোম্য চেহারায় তাকিয়ে উত্তর দিলেন এই নামে কাওরেই চিনে না সে। হতাশ হয়ে বৃদ্ধ আরো এগিয়ে গেলেন। দেখা হল জামাল বাহাদুরের সাথে। জামাল বাহাদুরের ও একই কথা সে জানে না।

গ্রামের সব কিছুই কেমন যেন অচেনা। রাস্তা ঘাট,মানুষ, বাড়ি সব।আগে ত এতকিছু ছিল না। দূরে আবার একটা দালান। স্কুল ঘর অইটা। এত পরিবর্তন কিভাবে হল তা বৃদ্ধের মাথায় ঢুকছে না। মাথা নাড়তে নাড়তে এগিয়ে গেলেন করিম মুন্সির খোজে।

গ্রামের মাঝেই এক বট গাছে।তার পাশে একটা প্রাচীন ভাঙ্গা বাড়ি। ভাঙ্গা বাড়িটির অদূরেই আরেকটা বাড়ির বারান্দায় আরেক বৃদ্ধ বসে আছেন। উনার কাছে গিয়ে আবার একই প্রশ্ন। ঘোলাটে চোখে বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,"করিম মুন্সি ত গত হয়েছেন আজ একুশ বছর।পরে ৮৮ র বন্যার পরে তার ছেলে মেয়েরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গেছেন।বাপের ভিটে আজ পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে।" বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, করিম মুন্সীকে চেনেন কিভাবে?? "মুন্সিরে চিনব না?? উনার লাগিই ত আজ বাইচা আছি।উনি না বাচাই লে ত আইজ মইরা যাইতাম। বৃদ্ধ মানুষ টিকে বিদায় জানিয়ে হাটা দিলেন।

সেখান থেকে গেলেন গ্রামের উত্তর দিকে। স্কুল ঘরের সামনে একটা মূর্তি।গায়ে লেখা কবিরাজ লোকমান আলী খা'র নাম।লোকমান করিম মুন্সীর বাড়িতে কবিরাজি করত। আত্মভোলা মানুষ টি মারা গেছেন।সময় ও কম না। আজ সতের বছর।

মূর্তির কাছেই গিয়ে দেখা হল লোকমানের সাথে। মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিয়ে বৃদ্ধ অকে ডাকছেন।"মুন্সি সাহেব, আপনি এখানে??,

- একদিনের ছুটি নিয়া আসলাম। একুশ বছর পরে।

-কি দেখলেন?

-দেখলাম, সবকিছু। এক সময়ের পরাক্রমশালী করিম মুন্সি র নাম কেউই জানে না। কিন্তু ঠিকই চাল চূলোহীন লোকমানের কথা মনে রেখেছে।

-কিছু বুঝলেন?

- বোঝার আর কিই বা আছে??

-বেচে থাকতে আপনার কথা মনে ছিল কিন্তু এখন নেই। আপনি অনেক ধনবান ছিলেন। সবাইকে সাহায্য করতেন। কিন্তু আপনাকে কেউ মনে রাখে নাই। কারন আপনি ভাল কাজ করেছেন, তার পরিচর্যা হয় নি।ভাল কাজ চারাগাছের মত। আপনি যখন তা লাগাবেন তখন তাকে পানি দিতে হয়।খাবার দিতে হয়।তা ছাড়া গাছ বাচে না। আপনার সন্তান রা গাছে পানি দেবার দায়িত্ব নেয় নি। তাই আজ আপনার গাছ মারা গেছে।

-কিন্তু তুমি??

-আপনি মারা গেলে এই স্কুল ঘর খুলেছিলাম। অনেকেই শিক্ষিত করেছিলাম। আজ ত দেখছেন। আপনার কথা মনে নাই কিন্তু আমার কথা ঠিকই মনে রেখেছে। যতদিন এই স্কুল ঘর থাকবে ততদিন আমার নামও থাকবে।

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।লোকমান চলে গেছে। বৃদ্ধের চোখে জল। নিজএ বেচে থাকতে গ্রামের সব ছিলেন। তার কথার বাইরে কেউ যেত না। কিন্ত আজ আর সে দিন নাই। সময় পালটে গেছে। মানুষ পাল্টেছে। ভূলে গেছে তার কথা। সময় ভূলিয়ে দিয়েছে সব কিছু।

বৃদ্ধ করিম মুন্সি স্কুল ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেলেন। চিরদীনের জন্য।আর কখনো হয়ত আর ফিরবেন না। না ফেরার দেশে, তার যে ছুটি শেষ হয়ে গেছে।

একসময় মানুষ ও হয়ত ভূলে যাবে লোকমান কে।কিন্তু যতদিন তার স্কুল ঘর আছে ততদিন এই স্কুল ঘরই বাচিয়ে রাখবে তাকে। দৈহিক ভাবে হারাতে হবে একদিন। কিন্তু কর্ম? হারাতে দেয় না। কর্ম হারিয়ে যায় না। বাতাসে ভেসে থাকে। যতদিন পৃথিবী থাকবে কর্ম ততদিন। মানুষকে বাচিয়ে রাখে।

এমন ভাবে হারিয়ে যায় মানুষ কিন্তু খুব অল্প কয়েক জনই আজও অমর। কারন তার কাজের জন্য।তার কি ছিল বা কেমন ছিল তা নয়, তার কাজই আসল।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None