Story of Dark

আধারের গল্প

আমি কাগজ টির দিকে একবার চোখ বুলালাম। এর পর আরো একবার। এরপর আবার। আমার মনে এখনো ক্ষীন এক চিলতে আশা রয়েছে। আমি হয়ত ভুল দেখছি অথবা এখানেই ভুল লেখা রয়েছে। 

আমি রিপোর্টের ওপরে থাকা নাম্বারে ফোন দিলাম। অপর প্রান্ত থেকে ও বলল। ঐখানে কিচ্ছু ভুল নেই। 

হতাশ ভাবে ফোন রেখে আমি বেডে শুয়ে পড়লাম। কাগজ টা এখনো আমার হাতে ধরা। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্ত উঠে জালাবার শক্তি টুকু ও পাচ্ছি না৷ 

সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। 

ঘুম যখন ভাঙল তখন বিকাল।  আমি তখন ও সকালের ঐ ড্রেস পরে শুয়ে আছি।  একবার মনে হল রিপোর্টের কথা। পরক্ষণেই ভাবলাম। ঐটা হয়ত স্বপ্ন ছিল। ধুর, ঘুমের জন্য ক্লাস হুদাই মিস দিলাম!!  নিজেকে শাপ শাপান্ত করতে করতে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলাম। 

রুমে এসেই আবার চোখে পড়ল। কাগজটা আমার বেডের তলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। হাতে তুলে নিলাম। আমার ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট।  লিউকেমিয়া পজিটিভ। অর্থাৎ আমি ব্লাড ক্যান্সার স্টেজ থ্রি'র রোগী। হাতে হাতে গোনা কিছুদিন। 

আমার মন খারাপ হয়ে গেল। সবে মাত্র অনার্স থার্ড ইয়ার শেষ  করে ফাইনাল ইয়ারে উঠছি৷ রিপোর্টের কথা অনুযায়ী আমার ফাইনাল ইয়ার শেষ করার কথা না। কত দিন আছে সেটাও জানি না। হয়ত আজ আছি কাল নেই। 

ভাবনা'র সূতো ছিন্ন হয়ে গেল ফোনের শব্দে। আমার রুমমেট ফোন দিয়েছে। ল্যাব ক্লাস মাত্র শেষ হইছে।  বাইরে যাওয়ার কথা বলে ফোন রেখে দিল। কিছুক্ষণ পরেই আবার ফোন।  এবার তিথি৷ আজকে ক্লাসে কেন গেলাম না? ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। কোনরকমে প্রশ্ন টা কাটিয়ে ফোন রেখে দিলাম। 

বুঝতেছি না আমার কি করা উচিত বা৷ কি করা দরকার। রেডি হলাম। রিপোর্ট টা মানিব্যাগের চিপায় রেখে বের হলাম। বাবা নেই৷ শুধু মা আছে৷ মায়ের মুখ মনে হতেই আমার মাথা চক্কর দিতে লাগল। 

আমি ত আর খুব বেশি দিন নেই। কেননা, আমার যে ব্লাড ক্যান্সার!!

আজকে ছিল বৃহস্পতিবার।  শুক্র শনি ছুটি। আমার মাথায় কিছু ই ঢুকছে না। আমার কি করা উচিত। 

আচ্ছা একজন মানুষ যে জানে, তার জীবন অর্থাৎ বেচে থাকা  নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। তার কি করা উচিত!! 

আমি কত ভেবেছি যদি কখনো এমন হয় আমি কি করব। কিন্ত আজকে এই সত্যির মুখে দাঁড়িয়ে আমি যেন সব কথা, চিন্তা সব ই হারিয়ে ফেলেছি। 

বাইরে গিয়ে সরাসরি চলে গেলাম আমাদের নতুন ফ্যাকাল্টি ভবনে। কাজ শেষ হইছে কিন্ত এখনো চালু হয় নাই। ছাদে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। বিকেলের শেষ আলো আছড়ে পড়ছে আমার গায়ে।  আমি জানি, এই অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য আমি আর বেশিদিন নেই।।। 

পকেট থেকে একটা সিগারেট জালিয়ে ভাবতে থাকি৷ আমি এখন কি করব!! আমি সত্যিই মরে যাব এই ভাবছি না। আমি ভাবছি এখন আমার কি করা উচিত।  

ফোন সাইলেন্ট করে ভাবছি। যত ই ভাবি কিছুই খুজে পাই না। সারা রাত ঐ ছাদেই কাটিয়ে দেই। জ্যোৎস্না দেখি। চাদের আলোয় অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে থাকি। আজকে যেন সব কিছুর সৌন্দর্য উপচায়ে পড়তেছে৷ আমি শুধুই চেয়ে থাকি।  আর অবাক হই। 

সকালে রুমে ফিরলাম। রুম্মেট ঘুমিয়ে আছে৷ আমি গিয়ে সব কিছু ছেড়ে গোসল করলাম। তারপর আবার ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙল সেই সন্ধ্যার পর। বাইরে গেলাম। আজকে থেকে সব কিছুতেই আমি খুব অবাক হই। ঐ যে শরীফের দোকানের সামনে একটা কুকুর থাকে সেটার লেজ নাড়ানো দেখেও আমি অবাক। কিছুদুরে গিয়ে দেখি অনি, রিহান, সৈকত সব বসে আড্ডা দিচ্ছে৷ গতকাল থেকে আমারে দেখে নাই। ওদের সাথে বসলাম। ওদের সাথে বসে চা খাচ্ছি৷ আর অবাক হয়ে ওদের ফাইজলামি দেখতেছি। সত্যি বলছি আমার কিন্ত কস্ট লাগছে না। আমি হয়ত কাল ওদের সাথে না ও বসতে পারি। আমি অবাক হচ্ছি। সব কিছু এত মায়াময়,  এতটা সুন্দর কেন!! 

রাতে তিথি কে নক দিলাম।  আচ্ছা,  কারো যদি ব্লাড ক্যান্সার হয় আর যদি সে জানে অল্প কয় দিন বাচবে তাহলে তার কি করা উচিত? তিথি খুব ই অবাক হয়ে গেল। দোস্ত, তুই এইসব পাগ্লমি প্রশ্ন বাদ দে৷ ক্লাসে কেন আসিস নাই সেইটা আগে বল। 

আমি আবার ভাবনায় ডুবে গেলাম। ওর মেসেজ আসছে সিন করতে খেয়াল ও নাই। এরমধ্যে আম্মা ফোন দিছে। তাকেও এক ই প্রশ্ন। আম্মাও অবাক। এইসব আজগুবি চিন্তা করিস কেন!! আম্মার কথাতেও আমার মনযোগ হারিয়ে গেল এরপর। ফোন রেখে আমি ঐ কাগজ টা বের করলাম।  আমার ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট। সেখানে নিচে ডাক্তারের মন্তব্য। লিউকেমিয়া, পজিটিভ। স্টেজ ৩। 

আমি কাগজ দেখে বাইরের দিকে তাকালাম। আমার মাথায় একটাই ভাবনা। আমার ব্লাড ক্যান্সার। আমি অল্পদিন বাচব। কিন্ত আমি জানি না আমার এখন কি করা উচিত। 

বাইরে চাদের জোস্না ছড়িয়ে পড়ছে। আমার জানালা দিয়ে সেই জ্যোৎস্না আমার মুখে এসেও পড়ছে। হঠাত হাসতে থাকি। খুব ই হাসি। 

আমার যে লিউকেমিয়া, পজিটিভ। স্টেজ ৩!!!

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None