হতে হবে সোচ্চার করতে হবে প্রতিরোধ

বাংলাদেশে মেয়েদের বাল্যবিবাহের
হার এখনো আশঙ্কাজনকভাবে বেশি—যার ভয়াবহতার শিকার শুধু মেয়েশিশুরাই না; বরং সমগ্র অর্থনীতি
ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।সহজভাবে বলতে গেলে বাল্যবিবাহ একটি মানবাধিকার
পরিপন্থী কাজ, সহিংসতা যার অনুষঙ্গ—যা হতে পারে শারীরিক, মানসিক, যৌন, আবেগজনিত বা
অর্থনৈতিক। মেয়েশিশুরাই প্রধানত এর শিকার। যদিও কখনো কখনো ছেলেশিশুদের ওপরও বাল্যবিবাহ
চাপিয়ে দেওয়া হয়। সমস্যাটি বৈশ্বিক, কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাব খুব বেশি। যেখানে
অর্ধেকের বেশি মেয়েশিশুর ১৮ বছরে বিয়ে হয়ে যায় আর প্রতি পাঁচজনে একজন মেয়েশিশুর বিয়ে
হয় ১৫ বছরের আগেই। এমনকি ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েশিশুর বিয়ের ঘটনা এ দেশে এখনো ঘটে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ ব্যাপকভাবে গৃহীতই শুধু নয়, বরং দরিদ্র পরিবারগুলো—যারা
তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত খেতে-পরতে দিতে পারেন না বা বেশি বয়সী মেয়ের বিয়েতে অধিক
হারে যৌতুক দেওয়ার ভয়ে ভীত, তারা বাল্যবিবাহকে সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার
করেন। মেয়েশিশুদের ওপর এর পরিণাম হয় ভয়াবহ, তারা শ্বশুরবাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য
হয় এবং নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।একজন বাল্যবধূর
স্বামীর দ্বারা যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণজনিত সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি, যা
অনেক সময় স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক
ও মানসিকভাবে প্রস্তুত না হওয়া সত্ত্বেও তারা গর্ভধারণ করে, যার গর্ভকালীন ও প্রসবজনিত
জটিলতার ঝুঁকি সঠিক বয়সী মায়ের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। অতএব, বাল্যবিবাহকে সহিংসতার
সমার্থক বললে অত্যুক্তি হবে না।অল্প বয়সে বিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষার সমাপ্তি ঘটায়, তার সমস্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ-সম্ভাবনার মারাত্মক সংকোচন
ঘটায় এবং তাকে স্থায়ী দারিদ্র্যের মুখে ফেলে দেয়। পর্যাপ্ত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা
অর্জনের সুযোগের অভাবে একটি সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য তাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে
হয়।একজন বাল্যবধূ একজন সঠিক বয়সে বিবাহিত মেয়ের তুলনায় অনেক বেশি অপুষ্টিপ্রবণ হয়,
তাদের বাচ্চারা স্বল্প জন্ম ওজন, অপুষ্টি ও সঠিক দৈহিক-মানসিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় বেশি
ভোগে, পরিণামে ভবিষ্যতে কার্যকর শিক্ষা গ্রহণ ও উপার্জনের সক্ষমতা কমে যায়।এই বংশানুক্রমিক
অপুষ্টি চক্র ব্যক্তি পর্যায়েই শুধু নয়, গোটা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ সরকার
ও ইউএসএইডের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, অপুষ্টিজনিত কর্মক্ষমতা হ্রাস ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার
কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় এক বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।বাল্যবিবাহের
ভয়াবহতা এবং একটি সুস্থ ও উপযুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়তে এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে
স্পষ্ট। তাই সরকারের পাশাপাশি দেশের সকল শ্রেনির জনগণকে এই
বাল্যবিবাহ রোধ করতে হবে এবং এই বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে।  

ছবি: 
আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None