আদিবাসী নয়; উপজাতি

 

 

স্বাধীনতার
পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে অপতৎপরতা চলছিল বর্তমানে
ক্রমেই তা বেড়ে চলেছে। ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি পূর্ববর্তী সময়ে এতদঅঞ্চলে পৃথক
রাষ্ট্র গঠনের জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি বিচ্ছিন্নতাবাদি
গোষ্ঠী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল। এতে ব্যর্থ হওয়াতে চুক্তি
পরবর্তী সময়ে একই গোষ্ঠী তাদের নতুন কৌশল হিসেবে ‘আদিবাসী’
নামক অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টার মাধ্যমে একই
অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে
এই তৎপরতাকে জোরদার করতে দেখা যায়।  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অযৌক্তিক ও
অসাংবিধানিক ‘আদিবাসী’ দাবির পক্ষে
কিছু গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ
বুঝে না বুঝেই সাফাইও গাইছে। এমনকি সরকারের কিছু এমপি-মন্ত্রীও সরকারের অবস্থান
এবং বাংলাদেশের অখন্ডতার বিষয়টিকে অবজ্ঞা করে ‘আদিবাসী’
স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ বিদেশি
অপশক্তির চাপে তাদেরকে ঐ স্বীকৃতি দিলে তা বাংলাদেশের অখণ্ডতার জন্য হুমকি হয়ে
দাঁড়াবে। উল্লেখ্য, আদিবাসী বিষয়ে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মানদণ্ড বিবেচনা
করেই পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী (Indigenous)
অভিহিত না করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি (Tribal) হিসেবে অভিহিত করে আসছে বাংলাদেশ। শান্তিচুক্তি ও সর্বশেষ পঞ্চদশ
সংশোধনীতেও তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী/উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করে সমান নাগরিক অধিকার
নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ ফোরামে ভারত, পাকিস্তানসহ
অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোও তাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের কখনও ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে না। এ দুটি শব্দকে সমার্থক
হিসেবে ব্যবহার করা জাতিসংঘে আদিবাসী সম্পর্কে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিপন্থি। এ
হিসেবেই ৯ আগস্ট জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’
পালন করে না বাংলাদেশ। এরপরও কিছু গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার প্রচলিত উপজাতি ও আদিবাসী
সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ে জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার দু'টি চার্টার ১৯৫৭ (১০৭) ও ১৯৮৯
(১৬৯) এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ৬১তম
অধিবেশনে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’
রয়েছে। এ তিনটি বিষয় পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য
হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টির
পূর্ব থেকে বসবাস করা। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠী উপজাতি অথবা আদিবাসী হবেন উপর্যুক্ত
শর্তের ভিত্তিতেই। আইএলওর সংজ্ঞাটি যদি বাংলাদেশের চাকমা, মারমা,
ত্রিপুরা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের ক্ষেত্রে বিচার করা
হয় তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা আদিবাসী নয়; উপজাতি। সেই
বিচারে বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ বা
আদি-বাসিন্দা হচ্ছে এদেশের বাঙালি কৃষক সম্প্রদায়, যারা বংশ
পরম্পরায় শতাব্দির পর শতাব্দি মাটি কামড়ে পড়ে আছে। আদিতে তারা প্রকৃতি পুঁজারী,
পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান যে ধর্মের অনুসারীই হোক
না কেন। ইতিহাসবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ৪৫টি বিভিন্ন ক্ষুদ্র
জাতিসত্ত্বার এতদঅঞ্চলে আগমণ কয়েকশ’ বছরের বেশি পূর্বে নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান। সেখান থেকে
বিতাড়িত হয়েই তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ত্রিপুরাদের আদি বসবাস
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমা জনগোষ্ঠী এসেছে বার্মা থেকে। তারা বিভিন্ন স্থান
থেকে বিতাড়িত হয়ে এদেশের নানা স্থানে আশ্রয় নিয়ে আনুমানিক তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ বছর পূর্ব থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাস
করতে শুরু করেছে। এর বাইরে বাকি উপজাতিদের অধিকাংশেরই বৃহত্তর অংশ রয়েছে প্রতিবেশী
ভারতে। ক্ষুদ্রতর একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে আগে-পরে বাংলাদেশে এসেছে। তাই বাংলাদেশে
বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী কোনো বিচারেই ‘আদিবাসী’ হতে পারে না – এরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী/উপজাতি, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো
অবকাশই নেই।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None