জনগণের পক্ষের ও বিপক্ষের সরকার

রাষ্ট্রপরিচালনার
দায়িত্বে থাকা গণরায়ে নির্বাচিত বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার একটি জন ও উন্নয়ন
বান্ধব সরকার। অপর দিকে সাবেক বিএনপি সরকার ছিল ব্যক্তিবান্ধব ও উন্নয়ন বিরোধী
সরকার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসায় পরপরই দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে নাইকো নামের
বহুজাগতিক কোম্পানীটির কোনো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়নি আর বিএনপি সরকার নাইকোর
দুর্নীতিকে সাদরে গ্রহণ করেছিল নিদিষ্ট কিছু ব্যক্তির স্বার্থে। এটাই বর্তমান
সরকার এবং বিএনপি সরকারের মধ্যে পার্থক্য। দুর্নীতি, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তি এবং
অদক্ষতার কারণে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় দুই দফা দুর্ঘটনায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে
যাওয়াসহ নানা অভিযোগে বাংলাদেশে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান নাইকো রিসোর্সেসের কর্মকাণ্ড
অনেক দিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। কানাডার আদালতেও বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি
প্রমাণিত হয়েছে এবং বিপুল অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। এবার বাংলাদেশের উচ্চ আদালতেও
প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে। হাইকোর্ট এক রায়ে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার
সঙ্গে নাইকোর সম্পাদিত দুটি চুক্তি বাতিল করেছে। বাংলাদেশে থাকা প্রতিষ্ঠানটির সব সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়
হেফাজতে রাখারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। টেংরাটিলা
বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত যে মামলা নিম্ন আদালতে চলমান রয়েছে, তার
নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নাইকোকে কোনো অর্থ পরিশোধ করা যাবে না বলেও রায়ে উল্লেখ
করা হয়েছে।
১৯৯৮ সালে নাইকো প্রান্তিক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের মাধ্যমে আরো কিছু গ্যাস
উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছিল। তৎকালীন সরকার বাপেক্স ও নাইকোর যৌথ সমীক্ষার মাধ্যমে
প্রান্তিক গ্যাসক্ষেত্র নির্ধারণের (সুইস চ্যালেঞ্জ) কথা বলে। ১৯৯৯ সালে যৌথ
সমীক্ষা হয়। বাপেক্সের পক্ষ থেকে ছাতক (পূর্ব) গ্যাসক্ষেত্রকে প্রান্তিক ঘোষণা
করতে আপত্তি জানানো হয়। তাদের
যুক্তি ছিল, ছাতক পশ্চিম আলাদা গ্যাসক্ষেত্র, সেখানে কিছু গ্যাস
তোলা হলেও ছাতক পূর্বে কূপই খনন করা হয়নি, সেটি প্রান্তিক হয়
কিভাবে? ফলে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার চুক্তি করেনি। ২০০১
সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর হঠাৎ
করেই নাইকো ও বাপেক্স চুক্তি সই করে ফেলে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদের
প্রতিষ্ঠান ‘মওদুদ আহমদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ ছাতক পূর্ব ও পশ্চিমকে একটি গ্যাসক্ষেত্র দেখিয়ে ছাতক পূর্বকেও প্রান্তিক
বলা যায় বলে সরকারকে পরামর্শ দেয়। এরপর আইন মন্ত্রণালয় সুইস চ্যালেঞ্জের বিধানও
বাতিল করে। ২০০৫ সালে এই ছাতক পূর্ব গ্যাসক্ষেত্রেই কূপ খনন করতে গিয়ে দুই দফা
বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায় নাইকো। চুক্তি সম্পাদনের জন্য নাইকো প্রচুর অর্থ উৎকোচ
হিসেবে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কানাডার আদালতে নাইকো স্বীকারও করেছে, তৎকালীন বিএনপির জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে একটি বিলাসবহুল গাড়ি ও বিদেশ
ভ্রমণের জন্য কিছু নগদ অর্থ তারা দিয়েছিল। বর্তমানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা
জিয়া, আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে নাইকো
সংক্রান্ত একটি দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন। বিনিয়োগবিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত
আন্তর্জাতিক আদালতেও (ইকসিড) একটি মামলা চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে
হাইকোর্ট রায় দিয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী জাতীয়
ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম থেকে বারবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কাজে দুর্নীতির
অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়
সম্পদের অপচয় বাড়ছে এবং উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। তাই নাইকোর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে
কোথায় কোথায় কি কি দুর্নীতি হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।
একইভাবে যেসব চুক্তি নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ আছে তার প্রতিটি ঘটনাও তদন্ত করে
বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের জন্য বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুন্ন হতে
দেয়া যায় না। আমরা বীরের জাতি শির নত করে নয়, উঁচু করেই চলব। তাহলেই কেউ আমাদের দমিয়ে
রাখতে পারবে না।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None