আত্মকথন..

মেঘলা শীতের সকালগুলো সাময়িক চলে গেছে, কয়েকদিনের থেমে থেমে টানা বৃষ্টির পর উর্কিঁ দিচ্ছে বৈশাখী রোদ। এলোমেলো বাতাস মনে করিয়ে দিচ্ছে ঝঁড় আবার আসবে, সাময়িক বিরতি দিয়েছে মাত্র। পথের দুপাশের আবর্জনায় গজিয়ে ওঠা ধুতুরাটা মুমূর্ষু হয়ে অপেক্ষা করছে আরেক ফাল্গুনের। আমি এই নাগরিকতার বিস্বাদ আলো কিংবা অন্ধকার থেকে বের হয়ে যেতে থাকি। রাস্তায় নেমে আমি অদ্ভুত জনজীবনের সস্তা ছুটে চলা দেখে ক্লান্ত হেসে উঠি। বিপরীত দিক থেকে আসছে একটা বিজয় মিছিল- পেছনে বাদ্য বাজাতে বাজাতে। নাচছে দলের পাতি থেকে প্রধান কর্মী। “বুকের ভেতর তোর নাম লিকেছি, রেকেচি বাসন্তী খামে পুইরারে, ভালো করিয়া বাজাওরে দোতারা” বাজাতে থাকে বাদ্যযন্ত্রীরা। পালিয়ে যেতে জোরে জোরে পা চালাই আমি। সামনে আমার গতিরোধ করে সমাবেশ একটা। নেতা আঙ্গুলের নাচনে আসর গরম করে রেখেছে, কেঁপেকেঁপে স্লোগান দিতে থাকে উপস্থিত জনতা। এবার নেতার মুখ দেখেই আমার বমি করতে ইচ্ছে করে; কান চেপে ধরি আমি, যেন কোন শব্দ প্রবেশ করতে না পারে, ছুটতে ছুটতে চলে আসি একটা কিন্টারগার্ডেনের সামনে। শত শত নিষ্পাপের মুখ দেখে ভুলে যাই কিছুক্ষণ আগের কুত্তাটার চিৎকার। ব্লাকবোর্ডের দিকে তাকালেই বুক জমে যায় ওদের কান্নায়, গেটের বাইরে লাইন করে বসে থাকা মূর্খ কিছু অভিভাবক দেখতে পাই। এদের হাঁসি শুনতে পেয়ে শয়তানের কথা মনে মনে পড়ে আমার। একটা নবজাতককে কোলে নিয়ে বসে আছে একজন সচেতন অভিভাবক!  বাচ্চাটাকে বলতে ইচ্ছে করে, “যার কোলে অচেতনে ঘুমিয়ে আছো বাছা, কিছুদিন পর এই তোমায় ধরিয়ে দেবে আত্মহত্যার ট্যাবলেট, যে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ওখানেই বেঁছে বেঁছে মুগুর ভাজবে, গোটাল গোটাল গাইড আর প্রাইভেট টিউটর গিলিয়ে খাওয়াবে তোমায়”। এসব ভাবতে চাইনা আমি, ছুটতে থাকি সম্মুখে; আমার চন্দনা চাই, ময়না চাই; শালিক চাই। এদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই আমার। এরা মরুক- বাঁচুক, সভ্যতার চরম শিখরে উঠুক কিংবা পিছিয়ে গিয়ে কয়েকশো বছর মৌলবাদের খাদ্যে পরিণত হোক বা জন্ম দিক শত শত নিষ্প্রাণ শিশু, বিকৃত করে দিক সুন্দর গুলগুলে সম্ভবনাময় মেধাবী ছেলেটার মাথা! আমার কিচ্ছুটি যায় আসে না। এদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। সবাই আমাকে Sceptic ভাববে? ভাবুক। আমি পালিয়ে আসি, পা আটকে যেতে থাকে রাস্তার কালো পিচে, পাথর ঢুকে যায় জুতোর সোল ভেদ করে পায়ের
পাতায়, হাঁপাতে থাকি আমি। থামিনা তবুও থামিনা। একছুটে স্কুলের সীমানা পেরিয়ে কারুকার্যময় মসজিদের পাশে! সেখানে উদ্ধত তলোয়ার আর টুপির ভেতর হাজার হাজার নিউরনিয় শয়তান দেখে ভয়ে ছুটতে থাকি, শত
শত মৌলবি আর ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার-শিক্ষক- অধ্যাপক- চামার-চণ্ডাল-ভালো ছাত্র-গবেট ছাত্র-মোল্লা ধাওয়া করে আমাকে। আমি প্রাণ ভয়ে দৌড়াতে থাকি। পেরিয়ে যেতে থাকি আবার, দোকান, পাশার ক্লাব, রেস্তরা, তাসের
আড্ডা, সরকার, সংসদ, গণতন্ত্র। পিছনে পরে থকে শহীদ মিনার, সিনেমা হল, বেশ্যাপাড়া, রাজনৈতিক কার্যালয়, হোটেল, রেস্টহাউস, কলেজ, ডাকবাংলো, পোস্ট অফিস, ব্যাংক। আমি ছুটতে থাকি, ছুটে যেতে থাকি কোনো পাহাড়ের দিকে, সমুদ্রের গভীরতার দিকে, অরুন্যের নির্জনতার দিকে। আমার সবুজের নির্মলতা চাই, আমার সীমাহীন উদারতা চাই, আমার মৌন বিলীনতা চাই।
.
ছুটতে ছুটতে শত শত মাইল পেরিয়ে যেতে থাকি আমি। রাস্তা কখনো নদী কখনো পাহাড়ের রূপ নেয়। মেঘলা দুপুর বদলে যায় গ্রীষ্মে, ঘাম ঝরতে থাকে অবিরাম পাহাড় ফেটে বেরুনো কোন ঝর্ণার মতো। হঠাত আবার মেঘ নেমে আসে, অন্ধকার নামে, ঢেকে যায় মধ্যগগণে থাকা নির্দয় সূর্যটা, আগুন জল হয়ে নেমে আসে। আমার পথ কর্দমাক্ত হয়ে যায়, পা পিছলিয়ে যেতে চায়। বিদ্যুতে পুড়িয়ে মারতে চায় আমাকে, মেঘরাজ মুক্তি চাওয়ার অপরাধে, থেমে থেমে গর্জন করে থেমে যেতে বলে! আমি থামাই না পথচলা কোন মেঘের শাসানিতে, কোন মূর্খ সূর্যের চোখের আগুনে জ্বালিয়ে দিতে পারেনা আমার দৃষ্টি, পিছলে পথ রোধ করতে পারেনা আমাকে গন্তব্য থেকে। আমি চলতে থাকি। রোদ ঢেকে মেঘ আসে, আমি মেঘ উপভোগ না করে দৌড়াতে থাকি দোয়েল, শ্যামা আর শালিকের জন্য। গ্রীষ্মবর্ষা ঘাম হয়ে বেড়িয়ে যায়। আমি আবির্ভূত হই বৈশাখীর ছাইরঙা বিকেলে পাবলিক ভার্সিটির পাশে। অর্ধগোলাকার হয়ে বসে থাকা কিছু ছেলেমেয়ের উচ্ছ্বল আড্ডা দেখে আমার করুনা হয়। চোখে ভবিষ্যতের যে রঙরঙা ছবি দেখে ওরা এসাইন্টমেন্ট আর বিরক্তিকর ক্লাস হজম করছে সে ছবি কাছ থেকে দেখলে ওরাই আবার চরম হতাশায় মুখ থুবড়ে পরবে। আমার মায়া হয় ওদের জন্য; জীবনের স্বাদটুকু একদিন ঠিক ঠিক বিসর্জন দিয়ে ওরা ডিস্ট্রিল ওয়াটারের মত স্বাদহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, সবই গতানুগতিক, সবকিছুই সমান, উপভোগের মাত্রাটা ভিন্ন মাত্র। আমি হাঁটতে থাকি, অদূরেই ফুল বেচা শিশুটির হাতে স্বগর্বে নেতিয়ে আছে কিছু বাসি গোলাপ, শিশুটির সারাদিনের স্বপ্ন এই বুঝি মরে গেলো। বাদামের খোঁসা উড়িয়ে হাঁটছে একজোড়া কপোত-কপোতী চোখে মুখে রবি ঠাকুরের কবিতা মেখে, ভবিষ্যতে কবিতার সংসার পাতবে বলে, চাল-ডালের হিসেবে উহ্য রেখে! আমার হাসি পায়; আমি হাঁটতে থাকি, নাগরিকতার সমস্ত জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাবার নেশায় দৌড়ুতে থাকি, বিকেলের আবছা রোদে ঘামে ভেজা শরীরে আমি পৌছে যায় ঠিকানাহীন এক ঠিকানায়।
.
আমি হাঁটতে থাকি, জলের উপরে যেখানে রোদ পরে সেখানে চিকচিক করে সোনালি হয়ে যাওয়া সাদা ধুলি। মিইয়ে আসে সূর্যদেবের তেজ, আমি বাড়ির পথ ধরি। পথের দুধারে ভাট গাছে সাদা সাদা ফুল এসেছে। ধুলফির গাছে পা উঁচু করে প্রছাব করে হেলতে দুলতে এগিয়ে যায় কুকুরটা। পথ শেষ হয়। এবার নদীর ধার দিয়ে যেতে হবে খানিকক্ষণ। শরতের শেষ যৌবনের মতো নদী দুই ধারে সাজিয়ে রেখেছে কাশফুলে ফুলে। বালুর চরায় পানকৌড়ি একটা বসে থাকে। গরুগুলো তাড়িয়ে নিয়ে ফেরে
বালক এক। কাল কুটকুটে দেহে লুঙ্গিটা কাছা করে পরেছে, -“হাট হাট” গরুগুলো চেনা পথে নিজেদের গতি বাড়ায়। একটা ছাগল কোলে করে নিয়ে যায় আট’ন বছরের এক মেয়ে, ছাগিটার সাথে নাকি নিজে নিজে কথা বলে সে- বোঝা যায় না। আমি নদীর পথ ধরে বাড়ি ফিরে যাই বৈশাখীর রোদ মেঘ বেলায়, বিকেলের গাঢ় রোদ নিভে গেলে, গোধূলির চঞ্চলতা থেমে এলে সীমাহীন নির্জনতা
আর নির্ভার সময় নিয়ে সন্ধ্যা যখন আসে ধীরে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)