বিচারহীনতায় সাংবাদিক নির্যাতন

বিচারহীনতায় কমেনি সাংবাদিক নির্যাতন

পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী যখন যার অপকর্ম, দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায় তখন তারাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। এসব হামলায় কখনও কখনও সাংবাদিকদের প্রাণ দিতে হয়। সাংবাদিকদের ওপর অযাচিত আক্রমণ, সহিংস ঘটনার বিচারিক তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নির্যাতনের ঘটনা কমছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে ৩৮ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম। ঢাকা থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক জনতা এবং মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পাতাকুঁড়ির দেশ’ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার তিনি। শ্রীমঙ্গল থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জলিল যোগদানের পর থেকে চুরি,ডাকাতি, মাদক ব্যবসা বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশের জেরে তাকে নির্যাতন করা হয় বলে দাবি করেন সাইফুল।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল সাদা পোশাকে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি আবদুল জলিলের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল আমাকে আটক করে থানায় নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে। ২৪ এপ্রিল শুক্রবার বিকেলে গাড়িতে পেট্রোল বোমা হামলা এবং পুলিশ অ্যাসল্টের ২টি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আমাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। কারাগারে প্রেরণ করা হলে কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়। তখন মেডিক্যাল রিপোর্টে নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়। আমার স্ত্রী রুমি বেগম মৌলভীবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওসি আবদুল জলিলকে প্রধান আসামি করে ৬ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ২-৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি ডিবি পুলিশ, পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেলেও আসামিদের পক্ষে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আমার স্ত্রী নারাজি প্রদান করেন। এরপর মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলা খারিজ করে দেন।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অনিয়মের বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে পড়তে হচ্ছে প্রতিবন্ধকতার মুখে। শিকার হতে হচ্ছে নির্যাতনের। সাংবাদিকদের ওপর এমন নির্যাতনের সংখ্যা কম নয়।

জানা গেছে, অবৈধ ভূমি দখল নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পালনকালে দীপ্ত টিভির সাংবাদিক আনিসুর রহমান ও ক্যামেরা পারসন মাসুদ দেওয়ানের ওপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা। ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের চান্দগাঁও এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় দৈনিক সরেজমিন বার্তার সাংবাদিক নুসরাত জাহান ও দৈনিক আজকের দুর্নীতি পত্রিকার শোয়েব বিপ্লবের ওপরও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় দীপ্ত টিভির সাংবাদিকরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলেও পরদিন সোমবার ভোরে তারা রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পৌঁছুলে আবারও হামলার শিকার হন।

এমনকি এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ হলে দীপ্ত টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) সাতজনের বিরুদ্ধে গত ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেন শেখ আহমেদ নামের জনৈক ব্যক্তি। যদিও ১৩ এপ্রিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও তার ছেলে মজিবুর রহমানের নামে মানহানিকর সংবাদ প্রচারের অভিযোগে দীপ্ত টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি)সাতজনের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে করা দু’টি মামলা স্থগিত করেন হাইকোর্ট।

গত বছর বাক-স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকেল-১৯ সাংবাদিক নির্যাতন নিয়ে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই হার হয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর প্রায় ২৩ শতাংশ নির্যাতনই ঘটেছে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ১১ শতাংশ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন বাংলাদেশ-২০১৪’ শীর্ষক আর্টিকেল-১৯ এর প্রতিবেদনে বলা হয়,২০১৪ সালে রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৬৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের হাতে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। হয়রানির মধ্যে মানহানির দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। ২০১৩ সালে হয়রানির ঘটনা ছিল ৩৩টি; ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮টিতে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১০টি ফৌজদারি মামলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়,২০১৪ সালে মোট ২১৩ জন সাংবাদিক ও আটজন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চারজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।  গুরুতর জখম হয়েছেন ৪০ জন। আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬২ জন সাংবাদিক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক নেতারাসহ ১৩ জন মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে আদালত অবমাননার অভিযোগের মুখোমুখি করা হয়েছে। ২০১৪ সালে আটজন ব্লগার ও অনলাইন ব্যবহারকারীসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৩ জনকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়। আক্রান্ত সাংবাদিকদের মধ্যে ১৯ জন (৮ দশমিক ৯২ শতাংশ) হুমকির শিকার হয়েছেন। গত বছর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘটা সহিংস ঘটনার একটিরও বিচারের মাধ্যমে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র পাঁচটি ঘটনার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। ২৭ শতাংশ ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। আর প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনা আইনের আওতার বাইরে রয়েছে। ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ আক্রমণের ঘটনায় কোনও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনের অস্পষ্টতা ও দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাংবাদিক, ব্লগার ও অনলাইনের কর্মীদের হয়রানির সুযোগ পায়। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় সুস্পষ্টভাবে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে নির্দোষ প্রচারণার কারণেও সাংবাদিক ও ব্লগাররা আইনি হয়রানির শিকার হন। বিচারহীনতার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র,এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা অনেক সময় সহিংসতা ও আক্রমণের ঘটনা ঘটান।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে এক বিবৃতিতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশ ও স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি প্রসার ঘটছে। বছরে আড়াই হাজারেরও বেশি পত্র-পত্রিকা প্রকাশনার পাশাপাশি রয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, এফএম রেডিও এবং কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর বলে পরিচিত কমিউনিটি রেডিও। অনলাইন সংবাদ পোর্টালের সংখ্যাও হাজার ছাড়িয়েছে। গণমাধ্যমের এই অভূতপূর্ব বিকাশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, উদ্যোক্তা, গবেষক ও কর্মীরা এ বিষয়ে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ও সংবাদকর্মীদের ওপর হয়রানি, দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা প্রতিহত করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এমন কোনও আইনি, প্রশাসনিক, নীতি থাকা উচিত নয়, যার ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। সাংবাদিক নির্যাতন, হত্যার দ্রুত সুষ্ঠু বিচার হওয়া জরুরি। না হলে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের প্রবণতা বন্ধ হবে না।

সাংবাদিকদের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব আবদুল জলিল ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশে পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী যখন যার অপকর্ম, দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায় তারাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। এখন পর্যন্ত অনেক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, কিন্তু বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা কমছে না।

আবদুল জলিল ভূঁইয়া আরও বলেন, সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ থেকেও সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে এখন মালিকপক্ষের স্বাধীনতা। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা প্রয়োজন। রাজনীতি, ব্যবসার স্বার্থে সংবাদপত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে সাংবাদিকদের নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাংবাদিকদের ঐক্য না হলে এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। সাংবাদিকদের মধ্যে একতা না থাকায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেই। সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোও দুর্বল। সবাই ব্যক্তি স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করে। ইউনিয়নের বিভক্তি দূরে ঐক্য প্রয়োজন।

আবদুল জলিল ভূঁইয়া বলেন, সরকার বদল হলেও ভাষা বদল হয় না। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেই সাংবাদিকদের হুমকিতে থাকতে হয়। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা গণমাধ্যমের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এই ধারা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের নির্যাতনে ঘটনা ঘটছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি অনেকটাই অনির্দিষ্ট যে, অনলাইন বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনও ব্যক্তির যে কোনও কাজই এর আওতায় আসতে পারে, যা খুবই বিপদজনক। ৫৭ ধারা মূলত সংবিধানের ৩৯ আর্টিকেল এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যা স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করে।

ছবি: 
আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None