বুক রিভিউ : How Islam created the modern world

How islam created the modern worldমার্ক গ্রাহামের লেখা “How Islam created the modern world” বইটির মূল উদ্দেশ্য কি তা এর ভূমিকা লেখক আকবার আহমেদ বেশ স্পষ্ট ভাবেই শুরুতেই বলে দিয়েছেন: ইসলামিক সভ্যতাই যে ইউরোপকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে টেনে আলোর পথে নিয়ে এসেছে তা প্রমান করা।মধ্যযুগের সেই সময়টাতে বাগদাদ ছিল বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র।সেখানকার অনুবাদক ও জ্ঞানসাধকদের এক বিশাল জনগোষ্ঠি গ্রীক ও ভারতীয় সভ্যতার দর্শনের বিরাট ভান্ডারকে আবরীতে অনুবাদের এবং আরব সংস্কৃতি ও ইসলামের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের  জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছিল। এই কাজের জন্য তাদের অনুপ্রেরান কি ছিল? তাদের অনুপ্রেরনা ছিল ইসলাম, যা দুনিয়াতে আসার প্রথম ক্ষন থেকেই জ্ঞানঅর্জনকে গুরুত্ব দিয়েছিল। তাদের অনুপ্রেরনা ছিল বিজ্ঞান, গনিত ও দর্শনের এক স্বর্ণযুগের সূচনা করা।কিন্তু মার্ক গ্রাহাম বলছেন, এই নবজাগরনের প্রেরনা হিসেবে যে মানুষটির কথা আসে তিনি খলিফা আল মামুন- খলিফা হারুন-অর-রশীদের পুত্র।

অতীতে ডুব দেয়ার আগে সেই লোকটির পরিচয়টি একবার জেনে নেয়া যাক, যিনি তার দুঃসাহসী কলমে লিখেছেন "আজকের পাশ্চত্যের সভ্যতা ইসলামী সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের উপরই দাড়িয়ে আছে এবং এই সভ্যতা ইসলামী সভ্যতার উত্তরসূরী ব্যতিত কিছুই নয়"।আমাদের আলোচ্য বইটিতে মার্ক গ্রাহামের পরিচয় এভাবে দেয়া হয়েছে- মার্ক গ্রাহাম হলেন এডগার এওয়ার্ড বিজয়ী "দ্যা ব্যাক মারিয়া" গ্রন্থের লেখক যেটি একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক উপন্যাসের অংশ এবং এই বইটি ইতোমধ্যেই কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। মধ্যযুগের ধর্ম, ইতিহাস ও ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার সুবাদে তিনি মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসে আগ্রহী হবেন এতে আশ্চর্য হবার বিশেষ কিছু নেই।

"How
Islam created the modern world" এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায় গ্রাহাম বিভিন্ন প্রমানের সাহায্যে প্রমানের চেষ্টা করেছেন, “ ইসলাম-ই হল সেই সুবিশাল দৈত্য যার ঘাড়ে দাড়িয়ে আছে ইউরোপের রেনেঁসা" (পৃ. ৩৯)। এবং পুরো বই জুড়ে এই কথাকেই তিনি বিভিন্ন ভাবে প্রমানের চেষ্টা করেছেন।বিভিন্ন উদাহরন ও ঐতিহাসিক ঘটনাকে টেনে এনে মার্ক বলতে চেয়েছেন, পাশ্চাত্য যে ইসলামকে আজ চিত্রায়িত করছে "অসহিষ্ণু ও সংকীর্ণমনা" হিসেবে, প্রকৃতপ্রস্তাবে ইসলামের আসল চেহারাটা এরকম নয়। মার্ক বলছেন, “যখন ইসলাম তার শৌর্য, বীর্য ও জ্ঞানের চুড়ায় অবস্থান করছিল, তখন ইসলামী সমাজ ছিল বহু সংস্কৃতিক স্রোতের মিলনস্থল। এই সেক্যুলার সমাজে মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা ছিল অলংকার স্বরুপ।(পৃ.৪৮)। যদিও মার্ক"সেক্যুলার" বলতে যে ধরনের সমাজ বুঝিয়েছেন, মুসলিম ইতিহাস রচয়িতারা বলছেন ইসলামী সমাজ দুনিয়া বিমুখ ছিল না। বরং ইসলামের এই স্বর্ণযুগে ইসলামী সমাজ মানব ইতিহাসের সব মহান চিন্তা, আবিষ্কার ও ধারনাকে সাদরে বরন করেছে, হোক তা গ্রীক বা ভারতীয় বা চৈনিক সভ্যতার। জ্ঞানসাধনার পথের পিপাসার্ত পথিকের ন্যায় ইসলামী সমাজ এসব সভ্যতার বৈজ্ঞানীক আবিষ্কার, ঔষধ বিজ্ঞান, বিভিন্ন শিল্পকলা, সামাজিক নিয়মকানুন ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখাকে অধ্যয়ন করেছে এবং নিজের মাঝে ধারন করেছে ইসলামের সাথে সামঞ্জস্য সাধনের পর।জ্ঞানের জন্য এই পিপাসার অনুভব শুরু হয়েছিল খলিফা আল মামুনের হাত ধরে, যখন তিনি বায়তুল হিকমার জ্ঞান সাধকদের সব গ্রীক দর্শন আরবীতে অনুবাদের কাজ দিলেন এবং সেই অনুবাদ আরব সমাজে মানুষের হাতে হাতে যখন ছড়িয়ে পড়ল তখন তা আরব মানসে যেন চিন্তার আগুন লাগিয়ে দিল।"অভিজ্ঞতাই সকল জ্ঞানের উৎস" এই ধারনা যা Empiricism  নামে পরিচিত তা এই মুসলিম মানসের-ই অবদান। গোলাকার পৃথিবী, সূর্যকেন্দ্রীক মহাবিশ্ব, লাইব্রেরী, বিশ্ববিদ্যালয়, রুচীপূর্ন জীবন যাপন, নিয়মিত গোসল করা- যদিও সেসময়ের ইউরোপ গোসলে বড় অনাগ্রহী ছিল, এসব ধারনা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সেসময়ের মুসলিম সংস্কৃতি থেকেই।

আজকের পাশ্চাত্য তাদের ইসলামী উত্তরাধিকার কদাচিৎ স্বীকার করে। যদি কখনোবা করে তবু তারা ইসলামকে শুধু "সভ্যতার বহনকারী" বলেই স্বীকৃতি দিয়ে পার পেতে চায়। অথচ ইসলামের কৃতিত্ব শুধু এটা নয় যে তারা গ্রীক সভ্যতার উত্তরাধীকারকে যে অবস্থায় পেয়েছে তা ইউরোপের কাছে পৌছে দেয়া, বরং তৎকালীন ইসলাম বিভিন্ন সভ্যতার সম্পদকে আলিঙ্গন করেছে এর চুড়ান্ত ক্ষমতায়, এই সম্পদকে উন্নত করেছে নিজের তাগিদে এবং এর চিন্তাপদ্ধতিগুলোকে ধারন করেছে এমন মাত্রায় যে তারা কোরআনের প্রকৃতিকে ও প্রশ্ন করেছে অবলীলায়। সেই সময়ের মুসলিমরাই আরবের সংখ্যাপদ্ধতিকে গ্রহন করেছে ভারতীয় সভ্যতা থেকে, চৈনিক সভ্যতা থেকে নিয়েছে দিক নির্ণয়কারী কম্পাস ও কাগজ, এবং গ্রীক সভ্যতা থেকে নিয়েছে চিন্তার খোরাক দর্শন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সেসময় ইউরোপের চিন্তার খোরাক কি ছিল? ইউরোপের ইতিহাসবেত্তারাই একে এক অন্ধকার যুগ বলে স্বীকার করেছেন এবং তৎকালীন ইউরোপ বাগদাদ ও আন্দালুসিয়া থেকে আলোর ছিটেফোটা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে থাকত। শুধু তাই নয়, ইসলাম তাদের আধুনিক ইউরোপ নির্মানের অনুপ্রেরনা যুগিয়েছে। দান্তে'র "ডিভাইন কমেডি" যিনি পড়েছেন, তিনি যদি মুহাম্মদের (সা) এর মেরাজ যাত্রার কথা জেনে থাকেন তবে চমকে উঠেন। "ডিভাইন কমেডি" রচনার পেছনে মেরাজ-ই কি প্রেরানা যুগিয়েছিল? সময়-ই ভাল উত্তর দিতে পারে।

গ্রাহাম তার এই ২০৫ পৃষ্ঠার নতিদীর্ঘ  রচনায় সমুদ্রতল স্পর্শ করার ভালই চেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি এই বইতে মধ্যযুগের ক্রুসেডের আলোচনাও নিয়ে এসেছেন। প্রকৃতপক্ষে এখানে গ্রাহামের আসল কৃতিত্ব যে তিনি ক্রুসেড প্রশ্ন  ইসলামের প্রকৃত অবস্থানকে যথার্থভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “এইসব বর্বররা (খ্রীস্টান ক্রুসেডাররা) ইসলামী সভ্যতার উন্নত সংস্কৃতি, বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল, এবং খোলামনের ধর্ম ইসলামকে সহ্য করতে পারত না। প্রকৃতপক্ষে এই সব ফ্যানাটিকরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে ঘৃনা করতো অন্তর দিয়ে। এবং তাদের মধ্যকার কতিপয় পাদ্রী সন্ত্রাসীদের একটা বাহিনী গঠন করে যাতে তড়িৎ আক্রমনের মাধ্যমে ইসলামকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারে। এবং ইসলামী সম্রাজ্যের নিজের সভ্যতাকে বাচাঁনোর জন্য এই যুদ্ধে জড়ানো ব্যতিত আর কোন পথই খোলা ছিল না। (পৃ.১১৮)। এই কথাগুলোর মাধ্যমে গ্রাহাম মূলত ইসলামের অতিমৌলিক যে প্রকৃতি -আক্রমন নয়, আত্মরক্ষা, তার দিকেই সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু খ্রীস্টান ক্রুসেডার ও ইসলামী আত্মরক্ষাকারীদের মৌলিক যে পার্থক্য সেটি গ্রাহাম ততটা ভালমতো তুলে ধরতে পারেন নি। ১০৯৯ সালের যে সকালটিতে খ্রীস্টান ক্রুসেডাররা জেরুজালেমে প্রবেশ করে, সেই সকালটি সেখানকার সকল অধিবাসীদের জীবনের শেষ সকাল। স্থানীয় সকল মুসলিম, অর্থোডক্স খ্রীস্টানদের, তাদের সব বয়সের শিশু, নারীদের হত্যার মাধ্যমে সেদিন ক্রুসেডাররা জেরুজালেম অধিকার করেছিল। আর ইহুদীদের ভাগ্যে জুটেছিল জীবন্ত আগুনে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রনা। পক্ষান্তরে ১১৮৭ সালের গাজী সালাউদ্দীনের জেরুজালেম বিজয়ের কথা মনে করা যেতে পারে। সেদিন বিজিত অধিবাসীদের কারো জীবন অন্যায় ভাবে নেয়া হয়নি। তাহলে সালাউদ্দীন-ই কি ইউরোপীয় বীরব্রত (Chivalry)'র অনুপ্রেরনাদাতা?

ইসলামের এত এত অবদান ও স্বর্নময় অতীত, একে পাশ্চাত্য এত কঠোরতার সাথে অস্বীকার করে কেন? গ্রাহাম খুব পরিমিতভাবে এক শব্দেই এর জবাব দিয়েছেন। তিনি রেফারেন্স  দিয়েছেন আরেক কালজীয় চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদের। তিনি বলেছেন, পাশ্চাত্যের এই সামষ্টিক 'ভুলোমনার" (collective
amnesia)কারন "ওরিয়েন্টালিজম"। এই বইতে "clash
of civilizationÓ তত্ত্বের কথাও চলে এসেছে। গ্রাহাম এই তত্ত্বকে বাতিল করে দিয়ে সভ্যতার উত্তরাধিকারের কথা বলেছেন। বইয়ের সবশেষে এসে গ্রাহাম একটি ভুল অনুমানের মধ্যদিয়ে বইটি শেষ করেছেন। ইসলামী সভ্যতার পতন ও পাশ্চাত্যের উত্থানের কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে গ্রাহাম সম্পদের কথা নিয়ে এসেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, নতুন নতুন কলোনী স্থাপনের মাধ্যমে ইউরোপ যে সম্পদ মধ্যযুগে পুঞ্জিভূত করেছিল, ইউরোপীয় রেনেঁসার ভিত্তি সেই সম্পদ। গ্রাহামের এই অনুমিতি সঠিক ধরে নিলে হিসেব অনুযায়ী স্পেন বা পর্তুগালেই রেনেঁসা বা নবজাগরন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়েছে ইংল্যান্ড কেন্দ্রীক। এক সভ্যতার পতন ও অন্য সভ্যতার উত্থানের কারন অনুসন্ধানে গ্রাহাম ব্যর্থ হলেও আমিন মা'লুফ তার " THE
CRUSADES THROUGH ARAB EYESÓ বইতে খুব শক্তিশালী যুক্তি দিয়েছেন। মা'লুফ বলেছেন রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথা। মত প্রকাশের যে স্বাধীনতা খলিফা মামুন তার সম্রাজ্যে নিশ্চিত করেছিলেন-এমনকি তিনি এজন্য একটি ডিক্রিও জারী করেছিলেন, ইমাম হানবালের মতো ব্যক্তিকে জেলে প্রেরন করেছিলেন, তা সেই সমাজে চিন্তাকে শৃংখলিত করেনি বরং তা সৃষ্টিশীল মনকে প্রশ্ন করতে উৎসাহ ও সাহস যুগিয়েছিল এবং এই সৃষ্টিশীল মানস-ই ছিল ইসলীম স্বর্ণযুগ নির্মানের কাঁচামাল। একই ভাবে ইংল্যান্ড কেন্দ্রীক রেনেঁসা'র সময়ে ইউরোপে প্রত্যেক অভিজাত ব্যক্তি, শহর, নগর এমনকি কৃষকদেরও কিছু অধিকার ছিল সুনির্দিষ্ট যেখানে সবচেয়ে অন্যায় শাসকটিও হাত দিতে সাহস পেতনা। এই রাজনৈতিক স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি ভোগ করেছে ইংলিশরা এবং রেনেঁসার নেতৃত্বে তারা ছিল সম্মুখ ভাগে। 

এই বই পাঠের পর মুসলিম মানস কি উপসংহারে  পৌছুবে? কিংবা ইউরোপের জন্য এই বইতে কি কিছু আছে- যে ইউরোপ ইরাক বা আফগান যুদ্ধের মতো অন্যায় যুদ্ধে অথবা ইসলামের নামে কালিমা লাগানোর ২৪/৭ "ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইনে" লিপ্ত যাদের মূল কাজই হলো মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রায়িত করা। মার্ক গ্রাহাম তার বইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের সত্যের দিকে আঙ্গুল তুলে তাঁর দায়িত্ব শেষ করেছেন। আমিন মা'লুফ খুব কৃতিত্বের সাথে "রাজনৈতিক উদারতা/স্বাধীনতার" কথা বলেছেন যেটা মুসলিমদের গৌরবময় অতীতের ভিত্তিমূল ছিল। এখন দেখার বিষয়, মুসলিমরা "রাজনৈতিক উদারতা/ স্বাধীনতা" (Political
Liberty)কিংবা "প্রশ্ন করার অধিকারের" (Right
to Question) মতো সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারে কি না।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

ইউরোপে মুসলমানদের অবদানের অসাধারণ দলিলটা আমার খুব পছন্দ।

আসলৈ অসাধারন!

ধারাবাহিক করুন। এতে হয়ত অনেক উৎসাহী ব্লগার পেয়ে যাবেন যারা এগুলোর অনুবাদ কাজে হাত লাগাবে। যেটা বাংলাভাষাভাষীদের জন্য কল্যাণকর হবে।

-

বজ্রকণ্ঠ থেকে বজ্রপাত হয় না, চিৎকার-চেঁচামেচি হয়; অধিকাংশ সময় যা হয় উপেক্ষিত।

এই বইটা অনুবাদ হলে খুবই ভাল হতো। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমি মানুষ হিসেবে পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের কাছাকাছি, খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। শুরু করা কাজ খুব কমই শেষ করেছি Cry

নতুন বইয়ের রিভিউ কই? Smiling

অনেক ভাল পোষ্ট।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

নতুন বই যে পড়া হয় নাই.... (মাথা চুলকানোর ইমো হইবেক Smiling )

লেখাটি খুব সুন্দর হয়েছে। ধন্যবাদ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)