নাড়ীর টান

প্রচন্ড কুয়াশা ঝরছে, কুয়াশায় ঝাপ্সা হয়ে আসছে চারদিক। কুয়াশা যত গাঢ় হচ্ছে আমার দৃষ্টি প্রখর হচ্ছে , আমি আরও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কুয়াশা যত গভীর হচ্ছে আমি তত গভীর  থেকে গভীরে ঢুকে যাচ্ছি। আমার বাস্তব দৃষ্টি যতই ক্ষীণ হচ্ছে অন্তদৃষ্টি ততই তীক্ষ্ণ হচ্ছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেই কাঁচা-পাকা ইটের রাস্তা, সেই ঝাঁকুনি-দুলুনি, সেই মুড়ির-টিন মার্কা কাঠবডির তৈরী বাসটা যখন একটা  ছোট্ট গ্রাম্য বাজারে এসে থামলো তখন পেট্রোলের উঁটকো গন্ধে গলার মধ্যে আটকে থাকা প্রাণটা কোনরকম উল্টে আবার আগের স্থানে ঢেলে দিবার তীব্র আকাঙ্খা বোধ করলাম। লেবুপাতা দিয়ে নাক চেপে ধরে দীর্ঘ তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম এক সোনাগ্রামে। আর মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ, গায়ে শক্তি থাকলে একটা ভীষণ দৌড় দিতাম, সবার আগে পৌঁছে যেতাম, একটা মানু্ষকে জড়িয়ে ধরতাম, একটা ভালোবাসাকে। কিন্তু বমি আমার সর্বশক্তি ম্লান করে দিয়েছে। তাও ভালোবাসার টানে অদম্য স্পৃহায় ছুটে গেলাম। একটা মহিলা, থু্থ্থুরে বুড়ি, পুকুরের পাড়ে ঝাড়ু দিচ্ছে। তার চোখেও কুয়াশা, কুয়াশা কেড়ে নিয়েছে তার দূরদৃষ্টি, তাই ডাক শুনে এদিক ওদিক খুঁজে ফেরে, কে এসেছে ঠাহর করতে পারে না। ততক্ষনে তাকে যাপটে ধরে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছি। আশি বছরের একটা বৃদ্ধা স্বামীর ভিটা আঁকড়ে পড়ে রয়েছে। কি খায়, কি পড়ে তার ঠিক নেই। হ্য়তো তার অদম্য প্রেম অনেক অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেছেন, অনেক নাতি-নাতনিকে আঁকড়ে ধরে তার শেষ স্মৃতি, ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছেন, কিন্তু কেউ সেই অজপাড়া গাঁয়ে বড় হতে চায়নি, যখনি চোখ-কান ফুটেছে সবাই তাকে ফেলে চলে এসেছে। তাকে অনেকবার ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু সে ফিরে গেছে সাঁঝবেলার পাখির মত তার নীড়ে। খাবারের ঠিক নেই, নিরাপত্তা নেই, শীতে উষ্ণতা নেই, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ভালোবাসার প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।

এখানকার উঁচু- নিচু পাহাড় ঘেঁষে যখন ঝাপসা কুয়াশা ভেদ করে ট্রেন যাচ্ছে, আমার দৃষ্টি ঝাপ্সা হয়ে আসছে, সূর্যের আলো হাতড়ে খুঁজে পাচ্ছি না, কিন্তু স্পষ্ট-স্মৃতির সেই লুকানো পৃষ্ঠাগুলো ফরফর করে উলটে যাচ্ছে। ভীষণ ব্যস্ত আমরা, ভীষণ ব্যস্ততায় আমাদের ভালোবাসাগুলোকে ইট চাপা দিয়ে রেখেছি। অনেকদিন পরে যখন সময় হলো তখন উলটে দেখি সব সবুজ ঘাস সাদা-ফিকে হয়ে গেছে। যখন ঈদের আগে-পরে পত্রিকায় উপচে পড়া ভিড়ে মানুষের বাড়ি যাওয়া দেখতাম, তখন হাসতাম, মানুষগুলোকে ভীষণ নির্বোধ ভাবতাম। কি অসাধারণ মূর্খতা! আজ বুঝি এই টান কতটা তীব্র, এই টান আমাকে টেনে হিঁচড়ে এক সুদূর অতীতে নিয়ে গেছে। এখানকার রাস্তায়, শপিং-মলে অনেক নাড়ী দেখি, কিন্তু ওদের টানার জন্য কোন রশি বা চুম্বক আছে কি না জানি না। একটা বৃদ্ধ লোককে দেখি স্টেশনের কাছে বসে গান গাচ্ছে, তার হ্যাটের উপর একটা টিয়ে পাখি। লোকটা ভিক্ষে করছে! তখন ভীষণ মায়া লাগে। জানি না ওর জন্য কেউ টান অনুভব করে কিনা? হয়তো আমার মতো অনেকেই আছে ওর, কিন্তু কোনো খোঁজ নিচ্ছে না কেউ! আজ এত বছর পর একটা টান আমাকে কোথায় নিয়ে গেছে!

এতক্ষণ যার কথা বলেছি তিনি আমার নানী। যদি আমার নানী আর মায়ের মাঝ থেকে মাকে মুছে ফেলি তবে তিনিই হবেন আমার মা! কখনো কি এভাবে ভেবেছি, এভাবে কি ভাবা যায় না? কি ভীষণ স্বার্থপর আমরা! ইস, কোথায় আছেন তিনি, কি খাচ্ছেন? আজকে আমার ইচ্ছে হচ্ছে যদি তাকে পেতাম আমার সব পছন্দের জায়গায় নিয়ে যেতাম, পছন্দের পোষাক কিনে দিতাম, পছন্দের খাবার কিনে খাওয়াতাম, নিজে ড্রাইভ করে গাড়িতে চড়িয়ে ঘুরাতাম। তাকে চিৎকার করে বলতাম, দেখো, আমি কত বড় হয়ে গিয়েছি। আজ আমার সব ভালোবাসা তোমাকে উপচে দিব। কিন্তু কোথায় পাব তাকে? কিভাবে আমার এ টানের কথা তাকে বলবো?

তিনি তো আজ অন্ধ, কানে শুনেন না, অনুভূতিহীন। কিন্তু আমাকে তো বলতেই হবে, আমার এ ভালোবাসার কথা তাকে জানাতেই হবে। নয়তো আমার অস্তিত্বটাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে, বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন মনে হবে। তাহলে আমার প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে করব? কিভাবে আমার ভালোবাসার ঋণ শোধ করব? আজতো আমি অনেক প্রাচূর্যের অধিকারী, আর উনি নিঃস্ব-সম্বলহীন। তাহলে কি আমি শোধ করতে পারবো না আমার ঋণ? কোনদিনই কি তার দেখা পাবো না? কোনদিনই কি উনি আসবেন না তার অধিকারের দাবি নিয়ে? নাকি ওর কুয়াশাভরা ঝাপসা দৃষ্টি থেকে আমিও পালিয়ে বেড়াবো আর সবার মত। আর বলব, আমি তোমার সন্তান নই!

হঠাৎ দূর থেকে মুয়াজ্জিনের আযান ভেসে আসলো। ভোর হয়ে এসেছে। ঘড়ির কাটা দেখলাম, চারটা বাজে। ডিম লাইটের আলোয় চেয়ারের ওপরে রাখা লাল জায়নামাযটা চকচক করে উঠলো। হঠাৎ আমার সব বিষণ্নতা কেটে গেল, বুকের উপর থেকে সব ভার নেমে গেল। যেন পথহারা তার পথ খুঁজে পেল। মনে হতে লাগলো আমি আবার আমার ভালোবাসার মানুষটাকে জড়িয়ে ধরতে পারবো, আবার চুমু দিতে পারবো। তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবো সবখানে, আমার কোন আশাই আর অপূর্ণ থাকবে না।

বিছানা থেকে নেমে জায়নামাযের দিকে হাত বাড়ালাম।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (6টি রেটিং)

মন ছুঁয়ে গেল। লেখার বিষয়বস্তুর জন্য তো অবশ্যই, কিন্তু বিশেষ করে শুরুর কয়েকটা প্যারা দারুণ লেগেছে। কিন্তু একটু তাড়াহুড়া করে শেষ করেছেন কি?আপনার ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে আপনার সব স্বপ্ন পূরণ হোক, আন্তরিক দোআ।

ভালো লাগলো।

এমন ধারার লেখাগুলো সবসময় টানে।

nice.

ভাল লাগল

লেখাটা যেন আগেও কোথাও পড়েছি। ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।

-

সূর আসে না তবু বাজে চিরন্তন এ বাঁশী!

লেখাটি অন্য কোথাও পোস্ট করিনি। কারো লেখা বা আইডিয়ার সাথে মিল থাকলে সেটা কাকতলীয়।     ধন্যবাদ ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (6টি রেটিং)