গীতাঞ্জলি অথবা কালের কপালে একটি নক্ষত্র

চেতনার যে-পথিক হাজার বছর ধরে পথ হাঁটেন, তাঁর পদচি‎হ্ন হারিয়ে যায়, পথরেখা মুছে যায়, পাণ্ডুলিপি ধূসর হয়ে আসে। শতাব্দির ধুলোয় কতো পাতা ঝরে ঝরে ধুলো হয়ে আছে, কতো যে স্পন্দন বিস্মরণের পারে নিথর। কিন্তু একজন রবীন্দ্রনাথ বড় বেশি করে বেঁচে আছেন; গীতাঞ্জলি, কালের কপালে একটা নক্ষত্র, জেগে আছে; একশো বছর ধরে জ্বলছে -- তার উজ্জ্বল উদ্ভাস রূপ আর অরূপের যোগপথ আলো করে রেখেছে। কিন্তু অরূপ শুধুই আলো নন, তিনি আলোর আলো, নূরুন আলা নূর, 'আলোয় আলোকময় করে' তিনি যখন কবির সত্তার গভীরে প্রবেশ করেন, তখন চোখের আঁধার মুছে যায়, 'তখন সকল আকাশ সকল ধরা আনন্দে হাসিতে ভরা', 'আলোর আলো'র আলো পড়ে গাছের পাতায় প্রাণ নেচে ওঠে, পাখির বাসায় গান জেগে ওঠে, অবশেষে তাঁর 'নির্মল হাত' ভালোবেসে কবির হৃদয় স্পর্শ করে, অধিপ্রাণিত কবি রূপসাগরে ডুব দিয়ে 'অরূপ-রতন' কুড়িয়ে এনে আলোকের ঝর্ণাধারার উচ্ছলতায় লিখে চলেন মুক্তোময় পঙক্তিমালা, মহাকালের প্রাণের বীণায় ঝঙ্কার তুলে জন্ম হয় একটি 'গীতাঞ্জলি'র এবং এভাবেই পরমাত্মার অভিসারী একজন রবীন্দ্রনাথ পরমকালের কবি হয়ে ওঠেন।

আজ একশো বছর পরে, পরিবর্তিত সময়ের পটে দাঁড়িয়ে নতুন চোখে আমরা যখন গীতাঞ্জলির পাতা ওল্টাই, কোথাও কি পুরনোর ধূলিচি‎হ্ন খুঁজে পাই? পাই না। না পেয়ে আমরা চকিত হই। আমাদের মনে হয় বিস্ময়কর সহজ এই কবিতাগুলো, অপূর্ব প্রাণময় এই গানগুলো আজকের, এবং আরো দীর্ঘ অনাগত কালের বোধ ও বাণীভঙ্গি ধারণ করে ক্ষণিকতাকে অতিক্রম করে এসেছে; ব্যক্তিক আয়তন ছাড়িয়ে বৈশ্বিকতায় বিস্তারিত হয়েছে। তাই আমরা যখন গাই: 'যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে মুক্ত করো হে বন্ধ, সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ', মুহূর্তে আমাদের হাতে-পায়ে সংসারের মায়াবি শেকলের শীতল স্পর্শ টের পেয়ে সচকিত হই, মুক্তির জন্যে সত্তার খুব গভীরে কোথাও হাহাকার জাগে, নিখিলের সাথে মহা রাজপথে মিলিত হবার জন্যে হৃদয় উন্মুখ হয়ে ওঠে; অতঃপর আমরা জেনে যাই যে ব্যক্তিজ এই বাগভঙ্গির ভেতরের আকাঙ্ক্ষাটি নিছক ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষা নয়, এই প্রার্থনা এই তাড়না এই ক্রন্দন চিরকালীন মানবাত্মার। এ কারণেই গীতাঞ্জলির চরণে চরণে প্রাণের যে-সুর বেজে ওঠে, তা সকল প্রাণের; যে-কবি আমাদের আত্মার আত্মরূপ শব্দের পুষ্পরূপে শিল্পিত করে ফুটিয়ে তোলেন, তিনি আমাদের সকলের কবি, তিনি চিরকালীন বিশ্বজনের কবি।

গীতাঞ্জলি একটি ঐশী গ্রন্থ, এ অর্থে যে এর বিষয় ও লক্ষ্য ঈশ্বর। প্রেমময়। সর্বব্যাপ্ত। 'প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে' নিখিল দ্যুলোক-ভূলোক প্লাবিত করে তাঁর 'অমল অমৃত' ঝরে ঝরে পড়ে। এ সর্বেশ্বরবাদ, না ঈশ্বরের সর্ববাদ? জগতের সকল কিছুই ঈশ্বরের পরম শক্তি ও করুণার প্রকাশ বলে ধার্মিকরা বিশ্বাস করেন -- তবে সে বিশ্বাস ধর্মগ্রন্থপ্রসূত, তাই বোধ হয় আরোপিত -- আত্মোৎসারিত নয়। কবি একে নিবিড় আবেগের রসায়নে শিল্পিত করেন, ভক্তিরসে স্বতস্ফূর্তিতে অঙ্কুরিত করেন, দিকে দিকে আনন্দ মূর্ত হয়ে ওঠে, কবির হৃদয়শতদল প্রস্ফুটিত হয় পরমেশ্বরের পায়ের কাছে এবং তিনি সমস্ত সুধাসমেত তা তথা নিজেকে তাঁর কাছে নিবেদন করেন।

তবে কি নিশ্চয় করে বলা যায় যে গীতাঞ্জলির মূল সুরটি নিবেদনের? হয়তো যায়। তবে প্রেম, ভক্তি, অভিসার, বিরহ, কৃতজ্ঞতা, প্রার্থনা, মিলনাকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি বিবিধ আবেগে উচ্ছল এই গানগুলি, কবিতাগুলি। ভাবের ভারে এগুলো অসাধারণ কবিতা, সুরের বৈভবে অপূর্ব গান। ১৫৭টি রচনার দু'একটি বাদে সবই গেয়, কিন্তু গীতাঞ্জলির ক'টি গান গীত হয়? খুবই হতাশার কথা। রবীন্দ্রনাথ তো পাঁচশোর মতো সুর সৃষ্টি করে গিয়েছেন, এমনই অনন্য যে বিশ্বের অন্য একটি সুরের সঙ্গেও একবিন্দু মেলে না -- অথচ বাংলাদেশে আমরা ঠিক সুরটি লাগিয়ে গাইতে পারেন এমন ক'জন শিল্পী খুঁজে পাই! এক বন্যা, এবং বড়জোর সাদীকে দিয়েই তো দারিদ্র ঘোচে না। অথচ প্রচুর গান হচ্ছে আমাদের দেশে, সেসব শুনে লজ্জায় কানে আঙুল দিতে পারি না।

গীতাঞ্জলির শতবর্ষে স্বীকার করছি, বইটি আমাদের জাতীয় সম্পদ, বাংলা সাহিত্যের শীর্ষতম কীর্তি। (নোবেল পাওয়া উল্লেখযোগ্য নয়।) আমাদের দুঃখে-আনন্দে ভাবে-অভাবে রবীন্দ্রনাথই আজো সবচে' প্রাসঙ্গিক। তাঁর সৃষ্টিই সম্ভবত আগামী কয়েক শতাব্দী জুড়ে আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে থাকবে। যতোদিন দরকার আছে, থাকাই উচিত।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (3টি রেটিং)

লেখাটি চমৎকার। তবে বিশেষণগুলোকে অতিরঞ্জন মনে হলো।

তাছাড়া ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ও তার কাব্যগ্রন্থকে ইশ্বরের চেয়ারে বসানোর অতি আবেগী ধোঁয়াগুলো লেখাটাকে খুব অন্ধকার করে তুলেছে।

-

সূর আসে না তবু বাজে চিরন্তন এ বাঁশী!

গীতাঞ্জলী পড়েছি। ভাল লেগেছে। 

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (3টি রেটিং)