‍"‍‍ আলু টিলার অন্ধকার গুহায় "

তিমির রাত, চারিদিকে অন্ধাকারের কালো ছায়ায় ঢেকে গেছে দিগন্ত। অন্ধকার রাতের আকাশে কোটি কোটি তারা যেন মেলা বসিয়েছে। তারার মায়াবী আলো মিটিমিটি করে জ্বলছে ঐ দূর আকাশে। এ যেন এক অপরূপ দৃশ্য যা দেখে মনের মাঝে উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করছি। অন্ধাকারের বুক চিরে গাড়ি ছুটে চলছে। চারদিকে ঘন গাছ-গাছালি আর উঁচু পাহাড়ের সারি।
 
অন্ধকারের কালো চাদরে ডাকা চারদিক মনে হচ্ছে এ এক অন্ধকারের কলো সমুদ্র।

হিমছড়ি পাহাড়ের কোল ঘেসে আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে আমরা এই প্রথম ভ্রমণ করছি। অন্ধকার রাতে পাহাড়ী আঁকাবাকা রাস্তা যে কত ভয়ংকর তা বাস্তবতার সম্মুখীন না হলে বুঝানো সম্ভব নয়। আমরা হয়তো সেই কঠিন এক সময় পার করছি। আমরা চার বন্ধু আজ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। আমাদের গন্তব্য খাগড়াছড়ির রূপ সৌন্দয্য ও আলু টিলা পাহাড়ের সেই ভয়ংকর গুহা দেখা। বহুদিন ধরে ভাবছি যে পাহাড়ী অঞ্চল ঘুরবো। আজ সেই ভাবনা বাস্তবের পথ ধরে চলছে.....
 
ঢাকা থেকে গাড়ি ভালোভাবেই চলে এসেছে, চট্টগ্রামের বারৈইয়ার হাট পর্যন্ত, সময়ও খুব আনন্দে কেটেছে। কিন্তু এই অন্ধকার রাতে পাড়াহী আঁকাবাঁকা পথে খুব ভয় লাগছে। খাগড়াছড়ি যেতে হলে ৪-৫ শ ফিট উঁচু পাহাড়ের উপর এই রাস্তা দিয়ে যেতে হবে । পাহাড়ের দু’পাশের দিকে তাকালে নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়। মনে মনে খুবই ভয় লাগছে এই ভেবে যে, বুঝি বাস পাহাড়ের উপর থেকে পড়ে যাবে। পাহাড়ের চূড়ার পথ যে এত সরু হবে আর এত আঁকাবাঁকা হবে তা এই প্রথম দেখলাম। ভয় ও আতংক দুটোই কাজ করছে। তার উপর ড্রাইভার এত জোরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে কারণ রাস্তাগুলো উঁচু নিচু হওয়ায় উপরে উটতে গেলে গাড়ি জোরে চালাতে হবে। ছোট একটি ভূলও যদি হয় চলার পথে তাহলে নিমিষেই নিভে যাবে অনেকগুলো হাসি মাখা জীবন, হারিয়ে যাবে হয়তো অজানায়!!!!!!!!

মধ্যরাত পেরিয়ে প্রায় শেষ রাতের কাছাকাছি সময়। চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ধরা দিচ্ছে নিজেকে ধরে রাখতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সামনের আঁকাবাকা আর উঁচু নিচু পথের দিকে তাকালে ভয় ও আতংকে ঘুম পালিয়ে যায়। এইভাবে ভয় ও উৎকন্ঠা নিয়ে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেলো। আমরাও আল্লাহর রহমতে পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ির বাসষ্ট্যান্ডে।

তারপর আমরা একটা অটো রিক্সা নিয়ে খাগড়াছড়ি আর্মি ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমাদের এক ভাইয়ের চাকুরীর সুবাদে সেখানে যাওয়া ও থাকার একটা ব্যবস্থা হলো। দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে নিরাপত্তায় বেষ্টিত থাকার এই রকম একটা ব্যবস্থা খুবই ভালো হলো।

রাতের জার্নি ও ক্লান্তি ভরা দেহ বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুম এসে গেলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঐদিন সকলে বিশ্রাম করে কাটিয়েছি।

পরদিন সকালে আমরা চার বন্ধু আর ভাইয়া-ভাবীসহ মোট ছয়জন আলু টিলার গুহা দেখার জন্য বের হলাম। গাড়ি নিয়ে আমরা আলু টিলার উপর গিয়ে নামলাম, টিলার উপর বিশাল বড় বটগাছ, আর তারপাশে দিয়ে গুহায় যাওয়ার রাস্তা, প্রায় বিশ মিনিটের রাস্তা, পাহাড়ী সরু রাস্তায় হাটতে ভালো লাগছে। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের ছায়া ছড়িয়ে আছে। চোখ যেন ধুধু হয়ে আসে। দূর পাহাড়ের কোলে উপজাতিদের ছোট ছোট ঘর দেখা যায়, ঝুম ক্ষেতে দেখা যায় ঝুম চাষীদের। আমরা পাহাড়ের পাদদেশের দিকে হেটে যাচ্ছি আর দু’পাশের মনোরম দৃশ্য দেখে অবিভূত হচ্ছি।  মনে হচ্ছে সত্যি আমাদের এই ভ্রমণ সফল হয়েছে।

তারপর পাহাড়ের ঢালু পথ ধরে আমরা নিচের দিকে অতি সাবধানে নিচে নামছি।
কারণ অসাবধানে হাটলে  .............. ব্যাস।
 
আমরা ছয় সদস্যের দল গুহার দিকে হাটা দিলাম এবং পৌঁছে গেলাম গুহার ঠিক মুখে। চারপাশে পাহাড়ের সারি আর জঙ্গল এবং ঝোপঝাড়ে ভরা, দুপুর বেলা, কিন্তু এই জায়গাটি দেখতে খুবই ভংয়কর মনে হচ্ছে, চারদিকে ভুতড়ে ও থমথমে অবস্থা, আশেপাশের পরিবেশ দেখে গা শিউরে উটছে। কেউ এই গুহার মুখে একাকী আসলে সত্যি ভয় পাবে। পাহাড়ের পাদদেশে এই নির্জন গুহার মুখে দাড়িয়ে মনে হচ্ছে আমরা এক ভয়ংকর এ্যাডভেঞ্চারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। কারণ পাঁচশ ফিট উঁচু পাহাড়ের তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গ পথ আর সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতরে প্রবেশ করব! সত্যিই ভয়ের বিষয়!
    
যাহোক  প্রথমে আমরা সকলে গুহায় ঢুকার জন্য প্রস্তুত হলাম, মর্শাল জ্বালিয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম, ভিতরে প্রবেশের পরেই আমাদের ধারণা একেবারে বদলে গেলো। বাহিরের ঝলমলে রৌদের আলো আর এখানে মনে হচ্ছে অমাবর্শার রাত্রি, সুড়ঙ্গ পথটি খুবই সরু, আর উচ্চতা দেড় থেকে দুই মিটার হবে। আমরা মর্শাল হাতে এগিয়ে চললাম সামনে গুহার ভিতরে পানির স্রোত আছে, হিম শিতল এবং ধারালো পাথরে ভরা, আমরা হাটছি খুবই সন্তর্পণে, কারণ পিচ্ছিল পাথরের উপর দিয়ে খালি পায়ে হাটা খুবই কষ্টকর। গুহার ভিতরে সাপ বা অন্য কোন বিষাক্ত জীব থাকতে পারে। মনে মনে ভয় লাগছে। গুহার উচ্চতা কম হওয়াতে মাথা নিচু করে হাটতে হচ্ছে। নিচে আবার পিচ্ছিল ও ধারালো পাথর, তার উপর গুহার ভিতরে ঢুকার কিছুক্ষণ পরে মনে হলো যে সেখানে অক্সিজেনেরও কিছু অভাব আছে। সব মিলিয়ে একটা অপ্রতিকূল অবস্থাকে সামনে রেখে আমরা চলছি। গুহার ঠিক মাঝখানে যাওয়ার পরে দেখলাম যে বাম দিকে আরো একটা সুড়ঙ্গ এগিয়ে গেছে। মর্শালের আলোতে সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম সেই সুড়ঙ্গটা আরো সরু ও নিচু আর সেখান দিয়ে বের হওয়ার ও কোন রাস্তা নেই। আমরা সকল সদস্যরা একে অপরকে সাহস দিচ্ছি যে এইতো আমরা অপরপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। ৮/১০ মিনিট ধরে হাটছি কিন্তু মনে হচ্ছে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আরো কিছু  দূর হাটার পর একটা আলোর ঝিলিক আমাদের চোখে পড়লো। মনে একটু সাহস পেলাম যে, আমরা হয়তো সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে পৌঁছে গেছি। সুড়ঙ্গের ভিতরে আমরা সকলে ঘামে ভিজে গেছি। সবার মনে এক উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কাজ করছে। কিন্তু কেউ প্রকাশ করছে না। যাহোক এক সময় আমরা সকলে গুহার অপর প্রান্তে পৌঁছে গেলাম।

এক এক করে আমরা সকলে গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলাম। বের হয়ে এসে সকলে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। গুহা থেকে বেরিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখি, বিশাল বড় বড় পাথর, পাথরগুলো কোন যুগের কে জানে? গুহার উপরে পাহাড়ও  পাথরের মত মনে হয়। সব মিলিয়ে গুহার মুখটি এক গম্ভীর মনে হলো। আমরা পাথরের বাঁকে বাঁকে পা রেখে অতি সাবধানে উপরে উটতে লাগলাম। কেউ কেউ আবার পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিচ্ছে। সেই সাথে আমিও পাহাড়ী শীতল পানিতে নিজেকে একটু ধুয়ে নিলোম।
 
গুহা থেকে বের হয়ে আমার কাছে সত্যিই খুবই বিষ্ময় লাগছে যে, আমরা এই অন্ধাকার গুহা পাড়ি দিয়ে এলাম। আসলে এখানে থাকতে পারতো অনেক বিষাক্ত সাপ, বিচ্ছু সহ আরো অনেক ভয়ংকর প্রাণী, যদি আমাদের কোন ক্ষতি করতো। তাছাড়া এসব সরু গুহায় অনেক সময় অক্সিজেনের অভাবে মানুষ মারাও যায়। এভাবে নানা চিন্তা মাথায় আসতে লাগলো.....

গুহা থেকে বেরিয়ে আমরা সকলে উপরে উঠে এলাম, এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম, সকলে খুবই আনন্দিত যে আমরা সফলভাবে গুহার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আসতে পেরেছি। আলুটিলার এই অন্ধকার গুহার কথা মনে থাকবে হয়তো বহুদিন, এবার ক্যাম্পের দিকে ফেরার পালা....

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)