নিঃশেষে যে প্রাণ করিবে দান (ছোট গল্প)

নিঃশেষে যে প্রাণ করিবে দান
_ আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব

গ্রামের নাম চাষাপুর। সারি সারি তাল গাছ পরিবেষ্টিত গ্রামের পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি স্রোতস্বীনি। নদীর পাশেই বিশাল অট্টালিকা। বিত্ত-বৈভবের নেই কোন অভাব। ছেলে পুলে, নাতি নাতনি নিয়ে চাঁদের হাট সাজু মাতবরের। গ্রামের শাহানশাহের পদে অধিষ্ঠিত তিনি। লোকে বলে সাজু মহাজন। গ্রামের সবাই উঠ-বস করে তার কথায়।

গ্রামের ছফু মিয়া। স্ত্রী, বড় মেয়ে আর ছোট ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। পুবাকাশে দিনমণি উঁকি দেবার আগ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাঠে খেটেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিজেকে এক প্রকার সুখী ভাবে সে। শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রভূর কাছে পাঁচবার হাজিরা দিতে মোটেই কার্পণ্য করে না। গ্রামের মানুষ ছফুকে জানে ‘ভাল মানুষ’ হিসেবে।

গ্রামের সব কৃষককে ডাকা হয়েছে সাজু মাতবরের বাড়িতে। ছফু মিয়ার শরীরটাও আজ খুব বেশি ভাল যাচ্ছে না। মাঠ থেকে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে। উত্তর পাড়ার রহমত মিয়া, রহিম মিয়া, কেরামত আলি আর ছফু মিয়া; চারজনে মিলে হাজির মাতবরের উঠোনে। হঠাৎ এই ডাকের হেতুটা তারা ঠিক বুঝে ওঠতে পারে না; তবুও মাতবরের আদেশ, অমান্য করলে রক্ষা নেই। মাতবর শুরু করলেন, তোমরা তো সবাই আমার খুব কাছের মানুষ, তাই না! প্রথম কথাতেই তারা ধরে নিল মাতবরের মতলব খুব একটা ভাল নয়। যাই হোক, মাতবর চালিয়ে গেলেন, আমাকে কি তোমরা কখনও অন্যের উপর জুলুম করতে দেখেছ? উত্তর যেহেতু ‘হ্যাঁ’, সবাই তখন তাই নিশ্চুপ। বার বার ধমকের সুরে প্রশ্ন করার পর ভয়ে ভয়ে মৃদু কণ্ঠের আওয়াজ শুনা গেল ‘না’। মাতবর বললেন, ‘কিন্তু আমি এবার এক জনকে গ্রাম ছাড়া করতে বাধ্য হলাম। দক্ষিণ পাড়ার ছিটু মিয়া আমার গ্রামে থেকে পাশের গ্রামের জনু জমিদারের জমি চাষ করল। তোমরাই বল আমি কি অন্যায় করছি?’ সবাই তখন একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে। কারও মুখে কোন জবাব নেই। হ্যাঁ বা না; কিছুই বলতে সাহস পাচ্ছে না কেউ-ই। কিন্তু ছফূ মিয়া আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। দৃপ্ত কণ্ঠে দাঁড়িয়ে নির্ভিক চিত্তে সত্য উচ্চারণ করল, ‘না মাতবর সাব! এ কিছুতেই হইবার পারেনা। ওর অধিকার আছে, ও যেখান থিকা পারুক জমি চাষ করব। আপনে বলার কে?’ চোখ লাল হল মাতবরের। বজ্র কণ্ঠে হুংকার ছাড়লেন ‘যা, চলে যা সব। বের হ!’ ছফু মিয়া চোখের বালি, মাথার বাজ হলেন মাতবরের। মাতবর বুঝলেন ছফুকে গ্রামে রাখা মানে তার বিপদ। তাই এর একটা কিছু করা চাই। কঠোর নির্দেশ দিলেন পেয়াদাকে ‘ছফুকে যেখান থিকা পারস্ ধরি আনবি!’

ছফু মিয়া গ্রাম ছাড়া। মেয়েটার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। স্ত্রী মাবিয়া খাতুন চোখে দেখছে অন্ধকার। খেয়ে না দেয়ে দিন গুজরান করছে তারা। ছেলেটার শৈশবের উচ্ছ্বাস গেল থমকে, দুরন্তপনা যেন হারিয়ে গেল কোন অজানার দেশে। সপ্তাহ তিনেক পর ছফু মিয়া বাড়ি এল স্ত্রী-সন্তানের মুখ দেখতে। নিয়ত ছিল চলে যাবে ভোরেই। কিন্তু খবর পেয়ে পেয়াদারা গভীর রাত্রে ধরিয়ে দিল আগুন। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন কুঁড়ে ঘরের বাসিন্দারা সব। আগুনে ভস্মীভূত হল ছফু, প্রিয়তমা জীবন সঙ্গিনী, চলে গেল আদরের কন্যাটিও। বেঁচে গেল চার বছরের শিশু সন্তানটি। সে কাঁদেনি। শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল মায়ের মুখ। সে চাহনি যেন বলছে, ‘মা, বুকে কি আর আমাকে জড়াবে না? কোন দিন কি আর ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি বলবেনা!’ আদরের বোনটির দিকে চেয়ে যেন বলছে, ‘আপু! তোমার কোল কি কভূ জুটবেনা কপালে!’ তার নির্বাক চাহনিতে গ্রামবাসী শুনেছিল বিবেক বিদ্ধিত প্রশ্ন, ‘বাস্তবতা কি এমনই হয়? সত্য বলার পরিণতি এতই নির্মম?’ ওদিকে মাতবরের লোকেরা প্রচার করল রান্নার চুলার আগুনে ছফুরা মারা গেছে।

ছফু আজ নেই। কিন্তু তার সাহসী উচ্চারণে সোচ্চার হয়েছিল গ্রামবাসী। ছিটু মিয়াকে ছাড়তে হয়নি গ্রাম। সত্যের পক্ষে থেকে যেন ছফু শুনিয়েছিল কবির সে বাণী- ‘অসত্যের কাছে কভূ নত নাহি শির, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর’। যুগে যুগে এমনই হাজারো ছফুদের আত্মত্যাগে রচিত হয়েছে সত্যের বিজয়-গল্পগুলো। পৃথিবীর সব ছফু, নাও হাজার সালাম।

লেখকঃ কণ্ঠশিল্পী, ক্ষুদে কবি। অষ্টম শ্রেণি, এল আই এফ এম, চট্টগ্রাম।


ই-মেইলঃ amnazib.1997@gmail.com

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

পঞ্চতারকা খচিত হইল Smiling

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)