ঢাকার নামকরণ : ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

রাজধানী ঢাকা। হাজারো বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাস্তব সাক্ষী হয়ে আজও শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে। ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে ঢাকার অস্তিত্ব নিয়ে ঐতিহাসিকগণ অনিশ্চিত। সুলতানি আমলে এটি প্রথম নগর হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং মোগল শাসনামলে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় এর প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে রাজধানী ঢাকার নামকরণে সুনির্দিষ্ট কোন মতামত পাওয়া দুষ্কর। তথাপি বিভিন্ন সূত্র থেকে মতামতগুলো পর্যালোচনা করার চেষ্টা করেছি এবং একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবার দু:সাহস-ও করেছি! ঢাকার নামকরণ নিয়ে ইতিহাসবেত্তাগণ কয়েকটি অভিমত দিয়েছেন :

(১) এক সময় এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ ছিল, যার বৈজ্ঞানিক নাম Butea frondosa. অনেকের মতে, ঢাকা অঞ্চলের আশেপাশে প্রচুর পরিমাণে এ গাছ ছিলো।

(২) বাংলা শব্দ 'ঢাকা' অর্থ হচ্ছে লুকায়িত। অনেকের মতে, এখানে হিন্দু দেবী দুর্গা লুকায়িত হয়ে যান এবং গুপ্ত অবস্থায় দুর্গা দেবীকে (ঢাকা-ঈশ্বরী) এ স্থানে পাওয়া যায়। সম্ভবত এ স্থানের নামকরণেই আজকের ঢাকেশ্বরী মন্দির।

(৩) 'ঢাক' এর আরেকটি অর্থ হচ্ছে ড্রাম বা বাদ্য। বাংলার তৎকালীন সুবাদার ইসলাম খান রাজধানী হিসেবে ঢাকার উদ্বোধনের দিন রাজধানীর সীমানা নির্ধারণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ঢাক অর্থাৎ ড্রাম বাজিয়ে এ ঢাকের শব্দ যতদূর পর্যন্ত শোনা যাবে, রাজধানীর সীমানা-ও ততদূর পর্যন্ত নির্ধারণ হবে। অনেক পন্ডিত এ ঢাক বাজানো থেকেই 'ঢাকা'র উৎপত্তি বলে মত প্রকাশ করেন।
কোন কোন ইতিহাসবেত্তা আবার সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, নিছক উদ্বোধনের দিনে আনন্দের জন্য-ই ইসলাম খান ঢাক বাজানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

(৪) অনেকে বলেন, এ অঞ্চলে একসময় 'ঢাক ভাষা' নামে একটি ভাষা প্রচলিত ছিল। হয়ত এখান থেকেই ঢাকার নামকরণ।

(৫) দ্বাদশ শতকে কাশ্মীরের রাজাদের ইতিহাস নিয়ে কলহন রচনা করেছিলেন ‘রাজতরঙ্গিনী’ নামে একটি ইতিহাসগ্রন্থ। রাজতরঙ্গিনী-তে ব্যবহৃত ঢাক্কা শব্দের অর্থ 'পাহারা-চৌকি'। পাহারা-চৌকি থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি। কারণ প্রাচীনকালে পূর্ব বাংলার নিম্নাঞ্চলের মধ্যে ঢাকা উচ্চভূমি ছিল এবং তা প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুর ও সোনারগাঁর পাহারা-চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

কারো কারো মতে, রাজতরঙ্গিনীতে ঢাক্কা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে। বুড়িগঙ্গার পাড়টি ছিল উত্তর ভারতের শাসকদের ঢাক্কা বা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং ঢাক্কা শব্দটি থেকেই ক্রমে ক্রমে ঢাকা নামের উদ্ভব।

দু'টি মত থেকে একই সুরের-ই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

(৬) বাংলাদেশে গুপ্ত বংশীয় শাসনের (মৌর্য শাসনের পরে) ইতিবৃত্ত সংবলিত একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে ভারতের এলাহাবাদে। শিলালিপিতে গুপ্ত বংশের অন্যতম শাসক সমুদ্রগুপ্তের শাসনামলে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য হিসেবে 'ডবাক' নামক একটি রাজ্যের নাম পাওয়া যায়। অনেকের মতে, এ ডবাকই হলো ঢাকা।

কুয়াশাচ্ছন্ন ঢাকা শহরের ইতিহাস, সমাধানের খোঁজে :

ঢাকা শহরের নামকরণ ইতিহাসে এখনও সঠিকভাবে উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি। তবে আমার রিসার্চে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করলাম।

ভৌগোলিক দিক দিয়ে ঢাকা ছিল ভাটি অঞ্চল, এটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। মুঘল শাসনামলে বিদ্রোহীদের জন্য তাই বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী সহ নদীবেষ্টিত নিম্নভূমি সমূহ ছিল উপযুক্ত স্থান। তৎকালীন সুবাদার ইসলাম খান চিশতি বিদ্রোহীদের দমনের উদ্দেশ্যেই মূলত ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। প্রাচীন ঢাকা শহর পাকুড়তলি (বর্তমান বাবুবাজার) ঘিরে গড়ে উঠলেও মুঘল রাজধানী হওয়ার পর 'ঢাকা দুর্গ' নামে পরিচিত স্থান থেকে (যেখানে ইসলাম খানের দুর্গ স্থাপিত হয়েছিল) বুড়িগঙ্গার তীরের ছোট্ট শহরটি পূর্বদিকে বর্তমান সদরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

বিদ্রোহীদের দমনের জন্য ইসলাম খানের আক্রমণাত্মক সকল কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালিত হতো। তাই কলহিনী রচিত ইতিহাসগ্রন্থ 'রাজতরঙ্গিনী'তে যে মত পাওয়া যায়, ইতিহাসের অধিকাংশ পর্যালোচনায় সেটিই নির্ভরযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়। পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র্র বা পাহারা-চৌকি; দু'টো-ই এক্ষেত্রে আমার কাছে গ্রহণ যোগ্য বলে মনে হয়েছে।

ঢাকা শহরের নামকরণের অনেক মতামতের মধ্যে এ পর্যালোচনাটি ক্ষুদ্র জ্ঞান উৎসারিত একটি বিচিন্তা। আপনার মতামতটি-ও প্লিজ নির্দ্বিধায় আমাদের সাথে শেয়ার করবেন।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.5 (2টি রেটিং)

ইস্ ঢাকার কুয়াশাঢাকা একটা ছবি দিতে পারলে কি যে ভালো হত...। Smiling

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

:( :) :) :)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.5 (2টি রেটিং)