আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি? -আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

অতীতের যে কোনো যুগের তুলনায় বর্তমান যুগে কুফ্রী মতবাদের আধিক্য অত্যন্ত প্রবল। ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি, নাস্তিক্যবাদী সমাজতান্ত্রিক জীবন দর্শন, ধর্মহীন গনতন্ত্র, সামন্তবাদ, নিরশ্বরবাদ, বৈরাগ্যবাদ, ত্রিত্ববাদ সর্বোপরি ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ; এসব মতবাদসমূহ মৌলিক দিক থেকে কোরআন ও সুন্নাহর সাথে চরম সাংঘর্ষিক। সারা দুনিয়ার সমস্ত মুহাক্কিক আলেমে দ্বীন এসব মতবাদকে কুফুরী মতবাদ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামী বিরোধী এসব মতবাদসমূহ পুরোপুরি অথবা আংশিক অনুসরণ করতে গেলে মুসলমানদের ঈমান সংশয়পূর্ণ হয়ে পড়বে। অথচ অধিকাংশ মুসলিম দেশসমূহে উল্লেখিত মতবাদসমূহ মুসলিম নামধারী নেতা-নেত্রীরা মুসলিম জনগণের ওপরে চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে আন্দোলন করছে, কোথাও বা রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে উক্ত মতবাদসমূহ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব মতবাদসমূহের সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ করতে গেলে কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রামাণ্য ইসলামের অধিকাংশ বিধি-বিধানকে প্রত্যাখ্যান করতে হয়; যা কোনো মুসলমানের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈমান-আকিদা, চিন্তা-চেতনা ও কর্মের বিরোধী উক্ত মতবাদসমূহ ইসলামী জিন্দেগীর স্বার্থেই মুসলমানদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ইসলামের বিপরীত সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জীবনাচারের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকার প্রয়োজনেই মুসলমানদেরকে এমন ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেক বিভাগ ও স্তরে কোরআন-সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাশেদীন কর্তৃক বিধি-বিধান নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করা যাবে। যে রাষ্ট্র ও সমাজে রাষ্ট্রের নাগরিকগণ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ-নিষেধের প্রতি আনুগত্য করার যথাযথ সুযোগ পাবে এবং এ পথেই মানুষের পৃথিবী ও আখিরাতে মুক্তির পথ সুগম হবে। এই রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরকিগণও মুসলিম নাগরিকগণের অনুরূপ তাদের ধর্মীয় অধিকারসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার সমভাবে ভোগ করবে।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লাভ করবে। তারা তাদের প্রাণ, ধন-সম্পদ, ইজ্জত ও আব্র“র সম্মান ও মর্যাদার পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কেউ তাদের জান-মাল ও সম্মান-মর্যাদার প্রতি সামান্যতম কটাক্ষ করতে পারবে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি জুলুম করে তাহলে আমি কিয়ামতের ময়দানে আদালতে আখিরাতে সেই মুসলিমের বিরুদ্ধে অমুসলিমের পক্ষে আল্লাহর আদালতে মামলা দায়ের করবো।' অমুসলিমগণ পূর্ণ শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার সাথে কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক রাষ্ট্রে বসবাস করবে এবং তাদের যাবতীয় অধিকার তারা ভোগ করবে। এর বাস্তব প্রমাণ হলো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীন কর্তৃক পরিচালিত রাষ্ট্র ও সমাজের প্রামাণ্য ইতিহাস।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি আর রাষ্ট্রের সামান্য একজন নাগরিকের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু যখন মুসলিম জাহানের খলীফার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত, সে সময় তিনি একদিন সরকারী একটি অফিস পরিদর্শনে গেলেন। সেই অফিসে এক খৃষ্টান যুবক কর্মরত ছিলো। যুবকটি খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করে তার চাকরী ক্ষেত্রে প্রমোশনের জন্য খলীফার কাছে আবেদন পত্র পেশ করেছিলো। বেশ কয়েকদিন পর ঘটনাক্রমে ঐ খৃষ্টান যুবকের সাথে খলীফার সাথে সাক্ষাৎ হলে যুবকটি খলীফাকে নিজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানালো, ‘সম্মানিত খলীফা! আমি সেই খৃষ্টান যুবক, আপনার কাছে আমি আমার চাকরীতে প্রমোশনের জন্য আবেদন করেছিলাম।' হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুও স্বহাস্যে যুবককে উত্তর দিলেন, ‘ওহে যুবক! আমি ওমরও সেই মুসলমান, তোমার আবেদন পত্র আমি যথাস্থানে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সাথে সাথে প্রেরণ করেছি। তুমি তোমার প্রাপ্য বুঝে পাবে।'
মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলীফা স্বয়ং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুর ঢাল হারিয়ে গেলো। তিনি অভিযুক্ত করলেন রাষ্ট্রের এক অমুসলিম নাগরিক ইয়াহুদীকে। খলীফা আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আদালত খলীফাকে স্বশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য সমন পাঠালো। বাদী-বিবাদী আদালতে উপস্থিত হলে আদালত উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। প্রমাণের অভাবে আদালত খলীফা কর্তৃক দায়েরকৃত মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিলেন। উপলব্ধি করার বিষয়, বাদী ছিলেন ইসলামী জাহানের স্বয়ং খলীফা আর বিবাদী ছিলেন সেই রাষ্ট্রের একজন অমুসলিম নাগরিক। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা কোরআন-সুন্নাহ্ ভিত্তিক শাসিত রাষ্ট্র ও সমাজে পরিলক্ষিত হয়েছে এবং সেসব ঘটনা ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে দেদিপ্যমান রয়েছে।
এই ধরনের একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এককভাবে কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সংগঠনের। দেশ ও সমাজের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত সেই আদর্শবাদী সংগঠনের পক্ষেই সম্ভব কোরআন-সুন্নাহ্ ভিত্তিক একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বস্তরের জনশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা। আর সেই সংগঠন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে এমন একটি গঠনতন্ত্র প্রয়োজন, যে গঠনতন্ত্রের আলোকে গোটা সংগঠন নিয়মতান্ত্রিকভাবে যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত করবে। সংগঠনের প্রত্যেক স্তরে আদর্শিক প্রশিক্ষণ, সকল স্তরের জনশক্তির মধ্যে আদর্শ অনুসরণের নিষ্ঠা, আদর্শ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য, শৃংখলা, নিয়মানুবর্তিতা এবং সেই সাথে সংগঠনের আওতায় রাষ্ট্র ও সমাজ দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত কর্মসূচী ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আল্লাহর শোকর, এই ধরনের গঠনমূলক পন্থায় একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ‘জামায়াতে ইসলামী' অস্তিত্ব লাভ করেছিলো। কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা ব্যক্তিবর্গের মতামত, আদর্শ, উদ্দেশ্য, নেতৃত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোরআন-সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামদের সমষ্টিগত দলের নিয়ম-নীতি, কর্মপদ্ধতি তথা খেলাফতে রাশেদাকে মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করার মহৎ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। কোরআন-সুন্নাহর নিরিখে এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমিও আমার যাবতীয় যোগ্যতা ও ধন-সম্পদকে ব্যয় করে পরকালে নিজের মুক্তির পথ সুগম করতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট। এই লক্ষ্যেই আমি জামায়াতে ইসলামীর কর্মকান্ডের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছি এবং আমার যোগ্যতা অনুসারে আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে যাচ্ছি।
জামায়াতে ইসলামীর পরিমন্ডলে মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধানের বাস্তবায়নই একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে। কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তবরূপ হলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের জীবনাদর্শ। এ ক্ষেত্রে আহ্লুস্ সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসৃত আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মপন্থা বিশেষ কোনো কালের গন্ডীতে আবদ্ধ নয়Ñ বরং তা সার্বজনীন এবং সর্বকালের, সব যুগের ও বিশ্বের যে কেনো স্থানের মুসলমানদের ইসলামী জিন্দেগীর একমাত্র সঠিক পাথেয়Ñএ বিষয়ে কারো সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
আর ইসলামী জিন্দেগী বলতে শুধুমাত্র নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও কোরআন তিলাওয়াত করাকেই বুঝায় না। বরং জীবনের প্রত্যেক বিভাগ ও স্তরে আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করাকেই ইসলামী জিন্দেগী বলা হয়। আর ইসলামী জিন্দেগীর মূলভিত্তিই হলো কোরআন-সুন্নাহ্ ভিত্তিক বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস। এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ)-এর ‘আল ফিক্হুল আকবার' এবং ইমাম আবু জাফর আহ্মদ ইবনে মুহাম্মদ তাহাবী (রাহঃ) কর্তৃক সম্পাদিত ‘আকীদাতুত্তাহাবী' সারা বিশ্বের সকল শ্রেণীর আহ্লুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতপন্থী ওলামা-মাশায়েখগণের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নির্ভরশীল। বিশুদ্ধ চিন্তা-চেতনা, আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মপন্থা অবলম্বনের প্রয়োজনে উল্লেখিত দুটো কিতাব খুবই সহায়ক। এখানে প্রাসঙ্গিক কারণেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আহ্লুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতামতের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো মতামত অবলম্বন করতে যাওয়া চিন্তা-চেতনা ও আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ারই নামান্তর। আমার এসব চিন্তা-চেতনা ও আকীদা-বিশ্বাসের সাথে জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচীর মৌলিক কোনো বৈপরিত্ব রয়েছে বলে আমি মনে করি না।
মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী (রাহঃ) জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা; এটা কোনো গোপন বিষয় নয়। পক্ষান্তরে তাঁকে ইমাম হিসাবে অনুসরণ করতে হবে বা মানতে হবে, অথবা তাঁর যে কোনো মতামতকেই প্রাধান্য দিতে হবে, তাঁর সর্বপ্রকার চিন্তা-চেতনাকে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ ও উদ্দেশ্যে পরিণত করতে হবে, এমন কোনো কথা জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে নেই। বরং কোরআন ও সুন্নাহর আদর্শ জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং এটাই যে জামায়াতে ইসলামীর মূল উদ্দেশ্যে; এ কথাই জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ‘আপনি যদি নিজেকে সত্যকারের একজন আল্লাহর গোলাম হিসাবে গড়তে ইচ্ছুক হন, তাহলে আপনার চিন্তা-চেতনা, আকীদা-বিশ্বাস ও বাস্তব কর্মকান্ড থেকে ইসলামের বিপরীত চিন্তা-চেতনা, আকিদা-বিশ্বাস ও কর্মকান্ড পরিহার করুন'; এ কথার দিকেই জামায়াতে ইসলামী মানুষকে আহ্বান জানিয়ে আসছে।
মাওলানা মওদুদী (রাহঃ) তাঁর গোটা জীবনকালই ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতের খেদমতে নিয়োজিত রেখেছিলেন। খত্মে নবুওয়্যাতের প্রশ্নে কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন আপোষহীন। খত্মে নবুওয়্যাতের পক্ষে ও কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করার কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করেছিলো এবং বিচারের নামে প্রহসন করে তাঁর প্রতি ফাঁসির আদেশ জারী করেছিলো। কিন্তু খত্মে নবুওয়্যাতের ব্যপারে তাঁর বিশ্বাসে সামান্যতম ফাটল্ ধরানো সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে সরকার তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানালে তিনি ঘৃণাভরে সরকারের সে অনুকম্পা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর সন্তান কারাগারে তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়ে বিচলিত হয়ে পড়লে তিনি কলিজার টুকরা সন্তানকে দৃঢ়কন্ঠে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা! বিচলিত হোয়ো না, মৃত্যুর ফায়সালা আস্মানে হয়Ñ যমীনে হয় না।' খত্মে নবুওয়্যাতের ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় আকীদা-বিশ্বাস, মতামত ও বক্তব্যে তিনি ছিলেন অনঢ়। মহান আল্লাহর অসীম রহমতে সরকার পরবর্তীতে ফাঁসীর আদেশ কার্যকর করতে সাহসী হয়নি।
সৌদী আরবের বাদশাহ ফায়সাল মাওলানা মওদুদী (রাহঃ)-এর হাতে কা'বা শরীফের গিলাফ উঠিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি নিজ হাতে সে গিলাফ কা'বা ঘরে পরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ইন্তেকালে গোটা মুসলিম জাহান শোকার্ত হয়ে পড়েছিলো। মক্কা ও মদীনা শরীফের উভয় হারাম শরীফেই তাঁর উদ্দেশ্যে গায়েবানা নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো এবং আমি নিজে মক্কা শরীফে মসজিদে হারামের উক্ত নামাযে জানাযায় শরীক ছিলাম। মাওলানা মওদুদী (রাহঃ)-এর প্রতি এ ধরনের দুর্লভ সম্মান ও মর্যাদা তাঁর দ্বীনি খেদমতেরই স্বীকৃতি। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন আওলাদে রাসূলÑ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর। তিনি তাঁর গোটা জীবনকাল কোরআন-সুন্নাহর বিধান প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণ চিন্তায় অতিবাহিত করেছেন। কুফ্রী মতবাদ-মতাদর্শের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম মুখর ছিলেন বিধায় তাঁর প্রতি শত্র“তা পোষন করা আল্লাহর রাসূলের হাদীসের খেলাফ কাজ। এসব দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং তাঁর সুমহান কর্মের প্রতি স্বীকৃতি স্বরূপ সৌদী আরবসহ আরব দেশসমূহের নেতৃস্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও ওলামা-মাশায়েখগণ তাঁর সাথে খুবই সম্মানসূচক ব্যবহার করেছেন।
পৃথিবীতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসলামের বিপরীতে যতগুলো মতবাদ-মতাদর্শ আবিষ্কৃত হয়েছে, এসব মতবাদের প্রভাবে প্রায় মুসলিম দেশেরই বিরাট সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী কোরআন-সুন্নাহর বিধান থেকে দূরে সরে গিয়েছে। পাশ্চাত্যের জড়বাদ আর বস্তুবাদী জীবন দর্শনের ওপরে ভিত্তি করে গড়া ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত বিরাট সংখ্যক মুসলিম জনতা পূজিবাদী জীবন দর্শন ও নাস্তিক্যবাদী জীবন দর্শনের প্রভাবে মনে করেছে, ইসলাম শুধু মাত্র ধর্ম বিশেষ এবং ইসলামের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সভ্যতা-সংস্কৃতিক ও অন্যান্য দিকের কোনো সমাধানই নেই। এমনকি অন্যান্য মতবাদ-মতাদর্শের তুলনায় ইসলাম উন্নত কোনো ব্যবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করতে পারেনি। ফলে তারা ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি বিস্মৃত হয়েছে এবং নিজেকে মুসলমান হিসাবে দাবি করেও ইসলামের বিরুদ্ধে যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করছে।
মাওলানা মওদুদী (রাহঃ)-এর ক্ষুরধার লেখনী ইসলামী চিন্তা-চেতনা বিরোধী মুসলিম জনগোষ্ঠীর মন-মানসেই শুধু নয়; অমুসলিম চিন্তাবিদদের মন-মানসেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ কথা তারা অনুভব করছে এবং স্বীকার করতেও বাধ্য হয়েছে যে, ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্মের নাম নয়; ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, অন্যান্য মতবাদ ও মতাদর্শ জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতি পেশ করেছে, তা ইসলাম কর্তৃক প্রদর্শিত নিয়ম-নীতির তুলনায় একান্তই হীন, নগণ্য ও মানব জাতির জন্য ক্ষতিকর। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী ধর্মহীন গনতন্ত্র, প্রতীচ্যের নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীন ব্যবস্থা ইত্যাদি মতবাদগুলো যে মানব জাতির জন্য একান্তই ক্ষতি ও অকল্যাণকর, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর এবং এসব মতবাদের মোকাবেলায় ইসলামই যে মানবতার একমাত্র মুক্তির সনদ, এ বিষয়টি মাওলানা মওদুদী (রাহঃ) অকাট্য যুক্তি ও হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের সামনে উপস্থান করেছেন; এ কথাগুলো তাঁর সাথে মতপার্থক্য রয়েছে, এমন জ্ঞানী-গুণী, চিন্তাবিদ ও গবেষকগণও স্বীকার করতে কার্পণ্যতা প্রদর্শন করেননি।
তবে একটি বিষয় আমাদেরকে স্পষ্ট স্মরণে রাখতে হবে যে, মাওলানা মওদুদী (রাহঃ) আমাদের অনুরূপ একজন মানুষই ছিলেন। তিনি নবী-রাসূল, সাহাবী, তাবেঈ, তাবেতাবেঈ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও পর্যালোচক। তিনি তাঁর গোটা জীবনকালই ইসলামের খেদমতে ব্যয় করতে গিয়ে বহু কাজ করেছেন, বহু কিছু লিখেছেন এবং অসংখ্য স্থানে বক্তৃতা পেশ করেছেন। কাজ যারা করে তাদের দ্বারাই ভুল সংঘটিত হয়। সুতরাং তাঁর অসংখ্য কাজ ও কথা এবং লেখনীর মধ্যে যে কোনো ভুল হয়নি, এমন কথা চিন্তা করাও মারাÍক ভুল। বরং তাঁর ভুলের সাথে ঐকমত্য পোষণ করা ও ভুলের ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করাটাও ভুল। আবার তাঁর সাথে শত্র“তামূলক মনোবৃত্তি পোষণ করে তাঁর ভালো কর্মসমূহের বিরোধিতা করা এবং তাঁর সোজা কথাকে বক্রতার দৃষ্টিতে দেখা ও অপব্যাখ্যা করাও মহা অন্যায়।
আমি পুনরায় এ কথা উল্লেখ করছি যে, কোনো ব্যক্তির আদর্শ, চিন্তা-চেতনা, আকীদা-বিশ্বাস ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কোরআন-সুন্নাহ্ ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই জামায়াতে ইসলামীর যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টা। বর্তমানে পৃথিবীর পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতি, দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদক্ষেপ জামায়াতে ইসলামী নিয়ে থাকে, সেটাও উক্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই। সুতরাং জামায়াতে ইসলামীর যাবতীয় কর্মতৎপরতার মূলে নিহিত রয়েছে কোরআন-সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য। এসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মতৎপরতার সাথে আমি ঐকমত্য পোষন করে আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজের ক্ষুদ্র শক্তি, সামর্থ, যোগ্যতা-মেধা ও শ্রম ব্যয় করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই আমি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছি।
(অংশটি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর "আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি?" বই থেকে নেয়া।)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (5টি রেটিং)

পড়ে ভালোই লাগলো। 

ধন্যবাদ। এ সময়ে জাতীয় নেতৃবৃন্দের অবদানগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি।

-

আড্ডার দাওয়াত রইল।

> > > প্রতি শুক্রবার আড্ডা নতুন বিষয়ে আড্ডা শুরু হবে।

আল্লাহ দেশের আলেম ওলামাদের হেফাজত করুন জালিমের জুলুম থেকে

-

"এই হলো মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।" [আলে-ইমরান: ১৩৮]

কারার ওই লৌহ কাপাট ভেঙ্গে চুড়ে কররে লোপাট।

-

পাঞ্জেরি

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (5টি রেটিং)