মানুষের সম্মার রক্ষা করা ছিল ইমাম রেজার বিতর্কের প্রধান বৈশিষ্ট

ইমাম
রেজা(আ.) ইসলামী বিষয়ে মুনাজারা বা বিতর্কের সময় প্রতিপক্ষের সম্মান ও
মর্যাদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি ইসলামের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ করতে
গিয়ে কখনোই কাউকে অপমান বা হেয় করতেন না।

হুজ্জাতুল ইসলাম
হামিদরো মোতাহরি বলেন,
ইমাম রেজা(আ.) বিভিন্ন ধর্ম ও মাজহাবের ধর্মীয় নেতাদের সাথে মুনাযিরা তথা বিতর্ক করেছেন।
কিন্তু তিনি কখনোই কারও সম্মান নস্ট করেন নি।

তিনি বলেন: আমরা
ইমাম রেজার(আ.) বিতর্কের পদ্ধতিকে নিজেদের জন্য আদর্শ হিসাবে ধরতে পারি।
কেননা ইমাম রেজা(আ.) ইহুদি,
খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের লোকের সাথে মুনাযিরা করলেও কখনোই তাদের
অসম্মান করেন নি। তিনি এমনকি এমন কোন বাক্য ব্যবহার করতেন না যাতে তাদের
মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়।

ইমাম রেজা (আ.)
বিতর্কে অংশগ্রহণকারী পণ্ডিতদের ধর্ম-বিশ্বাস ও মতবাদে উল্লেখিত দলিল-প্রমাণের
আলোকেই তাদের প্রশ্নের জবাব দিতেন। একবার খলিফা মামুন বিখ্যাত
খ্রিস্টান পণ্ডিত জাসলিককে বললেন ইমাম রেজা (আ.)’র সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত
হতে। জাসলিক বললেন,
আমি কিভাবে তাঁর সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হব যখন তাঁর
ধর্মগ্রন্থ তথা কুরআন ও এর দলিল-প্রমাণের প্রতি আমার বিশ্বাস নেই এবং তিনি যেই নবীর
বক্তব্যকে দলিল-প্রমাণ হিসেবে পেশ করবেন তাঁর প্রতিও আমার ঈমান নেই।
ইমাম রেজা (আ.) বললেন,
যদি ইঞ্জিল তথা বাইবেল থেকে দলিল-প্রমাণ তুলে ধরি তাহলে কি আপনি তা
গ্রহণ করবেন?
জাসলিক বললেন,
হ্যাঁ।
আসলে ইমাম উভয়-পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে জাসলিকের সঙ্গে বিতর্ক
করলেন। বিতর্কে জাসলিক এতটা প্রভাবিত হলেন যে তিনি বললেন: খ্রিস্ট বা ঈসার
কসম,
আমি কখনও ভাবিনি যে মুসলমানদের মধ্যে আপনার মত কেউ থাকতে পারেন।

ইমাম রেজা
(আ.)ইহুদি সর্দার ও পণ্ডিত রাস উল জালুত-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, মুসা (আ.)’র নবী হওয়ার দলিল
বা প্রমাণ কী?
রাস উল জালুত
বললেন,

তিনি এমন মু’জিজা বা অলৌকিক
নিদর্শন এনেছেন যে তাঁর আগে আর কেউই তেমনটি আনতে পারেনি। ইমাম
প্রশ্ন করলেন: কেমন সেই মো’জেজা? জালুত বললেন: যেমন, সাগরকে দুই ভাগকরে
মাঝখানে পথ সৃষ্টি করা,
হাতের লাঠিকে সাপে পরিণত করা, পাথরে ওই লাঠি দিয়ে আঘাত করে কয়েকটি
ঝর্ণা বইয়ে দেয়া,
হাত সাদা করা এবং এ রকম আরো অনেক মু’জিজাবা অলৌকিক
নিদর্শন;
আর অন্যরা এর মোকাবেলায় কিছু করতে পারত না ও এখনও তার চেয়ে বেশি
ক্ষমতা কারো নেই।

জবাবে ইমাম রেজা
(আ.) বললেন,
এটা ঠিকই বলেছেন যে,
হযরত মুসা (আ.)’র আহ্বানের সত্যতার
প্রমাণ হল,
তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যা অন্যরা করতে পারেনি; তাই কেউ যদি
নবুওতের দাবিদার হনও এমন কিছু কাজ করেন যা অন্যরা করতে পারেন না, এ অবস্থায় তাঁর
দাবিকে মেনে নেয়া কি আপনার জন্য ওয়াজিব বা অপরিহার্য নয়?

ইহুদি আলেম বললেন:
না,
কারণ আল্লাহর কাছে উচ্চ অবস্থান ও নৈকট্যের দিক থেকে কেউই মুসা
নবীর সমকক্ষ নয়। তাই কেউ যদি মুসা নবীর মত মু’জিজা বা অলৌকিক নিদর্শন
দেখাতে না পারেন তাহলে তাকে নবী হিসেবে মেনে নেয়া আমাদের তথা ইহুদিদের জন্য
ওয়াজিব নয়।

ইমাম রেজা (আ.)
বললেন,
তাহলে মুসা নবীর (আ.) আগে যে নবী-রাসূলবৃন্দ এসেছেন তাঁদের
প্রতি কিভাবে ঈমান রাখছেন?
তাঁরা তো মুসার (আ.) অনুরূপ মু’জিজা আনেননি।

রাস উল জালুত এবার বললেন, ওই নবী-রাসূলবৃন্দ
যদি তাঁদের নবুওতের সপক্ষে মুসা নবীর মু’জিজার চেয়ে ভিন্ন
ধরনের মু’জিজা দেখাতে পারেন
তাহলে তাদের
নবুওতকে স্বীকৃতি দেয়ায়ও ওয়াজিব বা জরুরি।

ইমাম রেজা (আ.)
বললেন,
তাহলে ঈসা ইবনে মরিয়মের (আ.) প্রতি কেন ঈমান আনছেন না? অথচ তিনি তো মৃতকে
জীবিত করতে পারতেন,
অন্ধকে দৃষ্টি দান করতেন, চর্ম রোগ সারিয়ে দিতেন, কাদা দিয়ে পাখি
বানিয়ে তাতে ফু দিয়ে জীবন্ত পাখিতে পরিণত করতেন।

রাস উল জালুত এবার
বললেন,
তিনি এইসব কাজ করতেন বলে বলা হয়ে থাকে, তবে আমরা তো দেখিনি।

ইমাম রেজা (আ.)
বললেন,
আপনারা কি মুসা নবী (আ.)’রমু’জিজা দেখেছেন? এইসব মু’জিজার খবর কি
আপনাদের কাছে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে পৌঁছেনি?

-জি হ্যাঁ, ঠিক তাই। বললেন
রাস উল জালুত।

-ইমাম রেজা (আ.)
বললেন,
"ভালো কথা, তাহলে ঈসার (আ.) মু’জিজাগুলোর নির্ভরযোগ্য খবরও
তো আপনাদের কাছে বলা হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থায় আপনারা মুসা নবী (আ.)-কে
নবী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনলেও ঈসার (আ.) প্রতি ঈমান
আনছেন না। "তিনি আরো বললেন, "বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদদের (সা.) নবুওতসহ
অন্যান্য নবী-রাসূলদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। আমাদের নবীর (সা.) অন্যতম
মু’জিজা হল এটা যে
তিনি ছিলেন একজন দরিদ্র ইয়াতিম ও রাখালের কাজ করে পারিশ্রমিক নিতেন। তিনি
কোনো পড়াশুনা করেননি এবং কোনো শিক্ষকের কাছেও আসা-যাওয়া করেননি।
কিন্তু তারপরও তিনি এমন এক বই এনেছেন যাতে রয়েছে অতীতের নবী-রাসূলদের কাহিনী
ও ঘটনাগুলোর হুবহু বিবরণ। এতে রয়েছে অতীতের লোকদের খবর এবং কিয়ামত
পর্যন্ত সুদূর ভবিষ্যতের খবর। এ বই অনেক নিদর্শন ও অলৌকিক ঘটনা তুলে ধরেছে।

এভাবে রাস উল
জালুতের সঙ্গে ইমাম রেজার (আ.) আলোচনা চলতে থাকে। সংলাপ এমন পর্যায়ে উপনীত
হয় যে ইহুদি সর্দার ও পণ্ডিত রাস উল জালুত ইমাম রেজাকে (আ.) বললেন:

আল্লাহর কসম! হে
মুহাম্মদের সন্তান (বংশধর)! ইহুদি জাতির ওপর আমার নেতৃত্বের পথে যদি
বাধা হয়ে না দাঁড়াত তাহলে আপনার নির্দেশই মান্য করতাম। সেই খোদার কসম
দিয়ে বলছি,
যে খোদা মুসার ওপর নাজেল করেছেন তাওরাত ও দাউদের ওপর নাজেল
করেছি যাবুর। এমন কাউকে দেখিনি যিনি তাওরাত ও ইঞ্জিল আপনার চেয়ে ভালো
তিলাওয়াত করেন এবং আপনার চেয়ে ভালোভাবে ও মধুরভাবে এইসব ধর্মগ্রন্থের
তাফসির করেন।

এভাবে ইমাম রেজা
(আ.) তাঁর অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে সবার জন্য সর্বোত্তম ও বোধগম্যভাবে
ইসলামের বিশ্বাসগুলো তুলে ধরেছিলেন। আর তিনি এত গভীর ও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী
এবং সেসবের প্রচারক ও বিকাশক ছিলেন বলেই তাঁকে ‘আলেমে আলে মুহাম্মাদ’ বা বিশ্বনবীর(সা.)
আহলে বাইতের আলেম শীর্ষক উপাধি দেয়া হয়েছিল।

ইকনা

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None