সিয়াম সাধনার মাস মাহে রামাদান (২)

بسم ا لله ا لر حمن ا لر حيم

সিয়ামের সামাজিক দিক:

সিয়াম ইসলামের একটি অন্যতম রুকন (স্তম্ভ) । যারা মনের গোলাম ও খেয়াল-খুশির
পূজারি তাদের জন্য সিয়াম অত্যন্ত কঠিন । তাই এ বিধানটি খুবই জোরদার ও দৃঢ়াত্মক
শব্দের বর্ণনা করা হয়েছে । হযরত আদম (আঃ)হতে অদ্যাবধি এ বিধানটি বারবার চলে আসছে,
যদিও দিনক্ষনের মাঝে পার্থক্য রয়েছে ।-(তাফসীরে উসমানী)

সিয়াম মুসলিম জাতির মধ্যে এক মনোরম আবহাওয়া সৃষ্টি করে । কারণ, সারা
বিশ্বের মানুষ একই মাসে একই উদ্দেশ্যে একই নিয়ম মেনে সিয়াম পালন করে । আল্লাহর
নযরে ধনী গরিব একই সমান, এই ধরনাটি উপলব্দী করা য়াই সিয়ামের মাধ্যমে । সিয়াম
পালনের মাধ্যমে ধনী গরিব সকলে উপোষ তাকার অভিজ্ঞতা লাভ করে, সে দেশের হোক না কেন ।

সিয়াম পালনের মাধ্যমে ধনী গরিবদের মধ্যে সহনূভতি জাগিয়ে তোলে । এই সিয়াম
পালনের মাধ্যমে ধনীরা গরীবদের দুঃখের জ্বালা কিছুটা অনূভব করতে পারে এবং ভিখারীর
খিদের জ্বালা সম্পর্কে কিছুটা হলে ও অনুমান করতে পারে । কোন ব্যক্তির যদি নিজ
দুর্দশাগ্রস্ত না হলে এবং খিদের জ্বালা ভোগ না করলে সে কোন দিন অন্যে দুর্দশা ও
খিদের জ্বালা বুঝতে সক্ষম হবে না । তাই রামাদান মাসে ধনীদের ঐ জ্ঞান বাস্তবে তারা
গরিবদের পাশে এসে দাড়ায় এবং দান করে ।সিয়াম ধনীদের কে গরীবে প্রতি সহানূভুতি হতে
বাধ্য করে। যারা সিয়াম পালন করে তারা সকলে এক সাথে বসে ইফতার করে, একসাথে বসে
ইফতার করে চরম আনন্দ লাভ করে । তখন মুসলিমদের মধ্যে সমাজবদ্ধতা সৃষ্টি হয় । সুতরাং
সিয়ামের সামজিকদিক গুলো চরম শিক্ষণীয় এবং বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় ।

সিয়ামে সুফল:

সিয়ামে বরকতের কথা শুনে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে, মুসলিমরা আজ সিয়াম
পালন করে আর সলাত আদায় করে তার আদৌ সুফল ভোগ করছে না কেন? একটু চিন্তা করলেই
বর্তমান মুসলিমদের ইবাদত নিষ্ফল হয়ে যাওয়ার কারণ সহজে বুঝতে পারা যায় । বর্তমান
মুসলিমরা সলাত, সিয়াম এবং বাহ্যিক অনুষ্ঠান সমূহকে আসল ইবাদত মনে করছে ।তারা মনে
করে এই অনুষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে পালন করলে, ইবাদত সম্পূর্ণ হয়ে যায় ।তারা ঐ ব্যক্তির
মত যে ব্যক্তি ভাতে মুঠি বানাল এবং গিলে ফেললো । অতপর সে বুমি করে ফেললো এতে তাদের
কিছু আসে যায় না । তানাহলে, সিয়াম পালনকারি ব্যক্তি কিভাবে মিথ্যা কথা বলতে পারে,
কি করে সে গীবত করতে পারে, কি করে সে কথায় কথায় ঝগড়া করতে পারে, তাদের মুখ থেকে
কেমন করে গালি-গালায ও অশ্লীল কথা বের হয়? পরের হক তারা কিভাবে কেড়ে নে? হারাম
খাওয়া ও অন্যকে হারাম খাওয়ার কাছে কিভাবে কর? তারা কি সত্যি আল্লাহর ইবাদত করছ! তারা এমন ভাবে আল্লাহতালার ইবাদত করছে, যেমন
বালি খাওয়ার পর তারা বলে খাওয়ার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে ।

তাছাড়া দেখার বিষয় যে, ১মাস ব্যাপি ৩৬০ঘন্টা আল্লাহর ইবাদত করার পর, শাওয়াল
মাসের ১ম তারিখে এ বিরাট ইবাদতের সকল প্রভাব একে বারে বিলুপ্ত হতে দেখা য়াই । অর্থাৎ মুসলিমদের ঈদের উৎসবে
(বিষেশ করে শহর অঞ্চলে) ব্যভিচার নাচ-গান মদ পান আর জুয়ার তুফান বইতে শুরু করে ।

সুতরাং রামাদান মাস শেষ হবার পর তাকওয়া
কত জন লোকের মধ্যে বিদ্ধমান তাকে? সৎকাজে
কত জন অংশগ্রহন করেন? আল্লাহর বিধান লংঙ্গন করতে কত জন লোক ভয় করে?

ভেবে দেখার বিষয় এর প্রকৃত কারণ কি? এর
একমাত্র কারণ হল মুসলিমরা ইবাদতের অর্থ সম্পর্কে যে ধারনা করে তা ভুল ।তারা মনে
করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্য়ন্ত কিছু না খাওয়ার নাম ইবাদত ।   সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্য়ন্ত ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত  থাকার নাম আসল ইবাদত নয়, এটি ইবাদতের বাহ্যিক
রূপ । এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহর ভয় ও ভালবাসা জাগিয়ে তোলা
।  তাদের মধ্যে এতদূর শক্তি জেগে উঠে যে,
তারা বড় বড় লাভ কাজকে ওকেবল আল্লাহর অসন্তুষ্টির জন্য ভয় করে আর কঠিন বিপদের ও যেন
কেবল আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য মন কে শক্ত রাখতে পারে । এই শক্তি মুসলিমদের মধ্যে
তখন আসবে যখন সিয়ামের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম 
হবে আর রামাদান মাস জুড়ে আল্লাহর ভয় ও ভালবাসায় নিজের মনকে নফসের খাহেস হতে
রাখবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রস্তুত হবে । যেমন,

এ মাস তাকওয়া ও পূন্যের জোয়ার আসে
।মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা জাগ্রত হয় । মানুষ অধিক অধিক
মাগফিরাত কামনা করে ।অধিক অধিক নেক ও কল্যাণের কাজে লিপ্ত হয় । মুমিনের অন্তরে এ
মাসে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের তীর অনুভুতি জাগ্রত হয় । নিজে ভালো ও ন্যায় কাজে
অগ্রসর হয় । অপরকে ও এজন্য উৎসাহিত করে । নিজে
মন্দ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে, অন্যদেরকেও তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা
করে পূণ্যের এই প্রবণতা এবং অপূণ্যের বিতাড়ন এ মাসে দারুণ ব্যাপকতা লাভ করে। এই
বিস্তৃত ব্যক্তি ও পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পর্য়ন্ত ছড়িয়ে
পড়ে ।

সিয়ামের আসল উদ্দেশ্য:

নবী করিম (সঃ) বিভিন্ন ভাবে সিয়ামে
উদ্দেশ্য সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন ।যেমন,

নবী করিম (সঃ) বলেন,

“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ
করবে না তার শুধু খানা-পিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই”।

“যে লোক রামাদান মাসর সিয়াম পালন করবে ঈমান ও চেতনা
সহকারে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করা হবে”।

 “সিয়াম ঢাল স্বরূপ । তোমাদের মধ্যে কেউ কোন দিন সিয়াম পালন করলে তার মুখ
থেকে যেন খারাপ কথা বের না হয়, সে যাতে মূর্খতা সুলভ আচরণ না করে ।যদি কেউ তার
সাথে বিবাদে লিপ্ত হয় কিংবা গালমন্দ করে সে যেন বলে আমি সিয়াম রেখেছি”।

“অনেকে সিয়াম পালন করে কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া যার
ভাগ্যে অন্য কিছু জোটে না । তেমনি রাত্রিতে ইবাদত কারী অনেক মানুষ ও এমন আছে, যার
রাত্রি জাগরন ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারে না”।

এখনে বুঝা যাই যে, শুধু ক্ষুধার্ত ও পিপাসায় কাতর থাকাই ইবাদত নয়, এটি আসল
ইবাদতের উপায় অবল্বন মাত্র ।

“ঈমান এহতাসাবের সাথে যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে তার
অতীতে সকল গুণাহ মাফ করে দেওয়া হবে”।

আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি বললেই ইমানের শর্ত পূরণ হবেনা,
ইমান আনতে হবে আল্লাহর যাবতীয় গুনাবলীর উপর এবং তা  বাস্তব নিজের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে হবে। ইমানের
সাথে যত গুলো দিক জড়িত রয়েছে, সেই দিক গুলো সর্ম্পকে প্ররিপূর্ন ধারনা ও প্রবল
বিশ্বাস না থাকলে মৌখিক স্বীকৃতির কোন মূল্য নেই। ইমান আনার সাথে সাথে ইমানের শর্ত
গুলো পূরণ করতে হবে। ১ম শর্ত হল, আল্লাহতালার উপর দূঢ় ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে
হবে। ২য় শর্ত হল, আল্লাহর ক্ষমতার উপর দূঢ় বিশ্বাস স্থাপন। ৩য় শর্ত হল, রাসূলের
উপর দূঢ় বিশ্বাস তাকতে হবে। ৪ র্থ  শর্ত
হল, আখেরাতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং সেই অনুসারে জীবন পরিচালনা করতে
হবে।

“গুনাহ থেকে তওবা করলে, সে একেবারে নিষ্পাপ হয়ে যায়”।

অন্য হাদিসে বলা হয়েছ,

“তোমাদের মধ্যে রামাদান মাস উপস্থিত । এটি অত্যন্ত বরকতময়
মাস ।এ মাসে তোমাদের প্রতি সিয়াম ফরজ করেছেন । এ মাসে আকাশের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া
হয় । জাহান্নামের দরজা গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় । আর অবাধ্য শয়তান গুলো আটক করে
রাখা হয় । আল্লাহর জন্য এ মাসে একটি রাত আছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম । যে লোক
এই রাত্রির কল্যান হতে বঞ্চিত হল, সে সত্যি বঞ্চিত হল” ।

“রামাদান মাসে যে ব্যক্তি কোনো সিয়াম পালন কারিকে ইফতার
করাবে; তার এ কাজ তার গুনাহ মাফ এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবার কারন হবে । এ
সিয়াম পালন কারির যত সওয়াব হবে, তাতে তারও ঠিক ততখানি সওয়াব হবে ।কিন্তু তাতে
সিয়াম পালন কারির একটুও কম হবে না”।

আত্মসংযম:

সিয়ামের অসংখ্য নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক সুফল রয়েছে ।মানুষের মধ্যে আত্মসংযমের
শক্তি সৃষ্টি তার মধ্যে অন্যতম ।

যে ব্যক্তি তার নফসের চিন্তার তাড়নাই যদি সৃষ্টি কর্তাকে অস্বীকার করে,
বিশ্ব মালিকের অধীনতা ও আনুগত্য স্বীকার করে না, বরং আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
করে, উচ্চতর নৈতিক বিধান মেনে নিতে প্রস্তুত নয় । যে তার নফসের করায়ত্ব করে নফসের
দাসে পরিণত হয় ।তবে তা ফেরাউন, নমরূদ, হিটলার ও মুসোলিনির ন্যায় বড় বড় প্রলয়
সৃষ্টি কারীর- উদ্ভব করতে পারে । এরূপ আন্তসংযম কখনও প্রশংসনীয় হতে পারে না ।
ইসলাম এধরনের আন্তসংযম সমর্থন করে না । যে ব্যক্তি নফস নিজ আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত
হবে, আনুগত্যে মস্তক অবনত করবে এবং তার মন ও কামনা বাসনার ওপর স্বীয় শক্তি আধিপত্য
কায়েম করবে-যেন তা দুনিয়ার সংস্কার সংশোধন করার জন্য বিরাট শক্তিরূপে মাথা তুলবে ।

নফস ও দেহের দাবী-দাওয়া দেখলে বুঝা য়াই যে, তার মধ্যে তিনটি দাবী হচ্ছে মূল
ও ভিত্তিগত । যথা:

১.ক্ষুণ্নিবৃত্তের দাবী

২.যৌন আবেগের দাবী

৩.শান্তি ও বিশ্যাম গ্রহনের দাবী

সিয়াম নফসের এই তিন টি বাসনাকে নিয়ন্ত্রিত করে,

যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তার সিয়াম তাকে বলে: আল্লাহ
আজ সরাটা দিন পানাহার করাকে তোমার ওপর নিষেদ করেছে বা হারাম করেছে, এ সময়ের মধ্যে
কোন প্রবিত্র খাদ্য এবং সদুপায় আর্জিত কোন খাদ্য বা পানীয় গ্রহন করা জায়েয নয় ।

সিয়াম বলে: আজ তোমার মালিক মহান আল্লাহ তোমার যৌন ক্ষুধা ওপরে বিধি-নিষেধ
আরোপ করেছে ।সুবহে সাদিক হতে সূর্য়াস্ত পর্য়ন্ত নিতান্ত হালাল উপায়েও নফসের
লালসা-বাসনা পূর্ণ করা তোমার জন্য হারাম করে দিয়েছেন ।

সিয়াম আর ও বলে: সারাদিন দুঃস ক্ষুধা পিপাসার পর যখন তুমি ইফতার করবে, তখন
তুমি পরিশ্রান্ত হয়ে আরামের পরিবর্তে ওঠ অন্যের চেয়ে বেশি ইবাদত কর ।

তাছাড়া সিয়াম এটাও জানিয়ে দে, বহু রাকায়তের সলাত শেষ করার পর যখন বিশ্রাম
করবে তখন বেহুঁশের মত না ঘুমিয়ে মধ্য রাতে সেহেরির জন্য জাগো, সুবেহ সাদেক শেষ
হবার পূর্বে তোমার দেহকে খাদ্য দ্বারা শক্তিশালী কর।

বস্তুত এতেই তোমার রাব্বুল আলামীনের সন্তোষ নিহিত আছে ।

এরূপ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কেবল এটাই নয় যে, মুমিনের নফস তার
ক্ষুধা পিপাসা যৌনবৃত্তি এবং বিশ্রাম অভিলাষকেই আয়ত্বধীন করে নিবে আর কেবল রামাদান
মাসেই জন্যেই এরূপ হবে ।

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

জাযাকাল্লাহ খায়ের রমাদ্বান মাসে সিয়াম সম্পর্কিত লেখা পোস্ট করার জন্য।

-

"এই হলো মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।" [আলে-ইমরান: ১৩৮]

ধন্যবাদ আপনাকে ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)