সিয়াম সাধনার মাস মাহে রামাদান (৪)

بسم ا لله ا لر حمن ا لر حيم

পবিত্র
কোর’আনে সূরা বাকারায়(আয়াত:১৮৩-১৮৭) সিয়াম:

 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
تَتَّقُونَ

হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ন্যায় তোমাদের উপরও
সিয়ামকে অপরিহার্য় কর্তব্যরূপে নির্ধারিত করা হলো যেন তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করতে
পারো
।(সূরা
বাকারা:২/১৮৩)

যে কারণে জিহাদ ফরয করা হয়েছিল,
টিক একই কারণে সিয়াম ফরয করা হয়েছে । এই সিয়াম মানুষের স্বভাবসিদ্ধ এক ব্যবস্থা,
যাতে করে আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানবমন্ডলীর ওপর মোমেনদের নেতুত্ব
কায়েম হয়ে যায় । সিয়াম পালন করার মাধ্যমে মোমন ব্যক্তি সত্যের সাক্ষ্য দান করার
দায়িত্ব পালন করে । সিয়াম মানুষের দৃঢ় ইচ্ছা ও মযবুত সংকল্পের বহিপ্রকাশ । এর
দ্বারা তার রবের সাথে তার আনুগত্যের বন্ধন স্থাপিত হয় এবং আল্লাহর দেয়া সীমার
মধ্যে জীবন যাপন করার অভ্যাস গড়ে ওঠে ।

যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার

আর এইভাবেই সিয়ামের যে মহান
উদ্দেশ্য তা প্রকাশ পাচ্ছে, তা হল
তাকওয়া অর্জন আর
এই
তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) হৃদয়পটে জাগ্রত
হওয়ার কারণে সে হৃদয় এই কঠিন ফরয আদায় করতে প্রস্তুত হয়ে যায় । এই ফরয কাজটি আদায়
করার মাধ্যকে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ পায় এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সর্ব
প্রকার ত্যাগ স্বীকারে সে রাযী হয়ে যায় ।(তাফসীর ফি যিলালিল কোর
আন)

 أَيَّاماً مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضاً
أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى
الَّذِينَ
يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ
خَيْراً
فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن
كُنتُمْ
تَعْلَمُونَ

এটা নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ অসুস্থ কিংবা
মুসাফির হয়, তার জন্যে অপর কোন দিবস হতে গণনা করবে; আর যারা সক্ষম তারা ত
পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে খাদ্য দান করবে; তবে যে ব্যক্তি
স্বেচ্ছায় স
কর্ম করে তার
জন্যে কল্যাণ এবং তোমরা যদি বুঝে থাকো তবে সিয়াম রাখাই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর
(সূরা
বাকারা:২/১৮৪)

 সিয়াম পর্য়ায়ক্রে ফরয় করা হয় । শুরুতে প্রতি
মাসে তিন দিন সিয়াম রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন । এই সিয়াম ফরয ছিলনা ।
ইসলামের ১ম দিকে যেহেতু সিয়াম পালন করার অভ্যাস ছিল না,
তাই অনবরত একমাস সিয়াম পালন করে যাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল ।
তাই সিয়াম পালন করতে সক্ষম ব্যক্তিদেরকে এ সুযোগ দেওয়া হয় ।

 তারপর দ্বিতীয় হিজরীতে রামাদান মাসের সিয়ামের এই
বিধান কুরা
আনে নাযিল
হয় । তবে এতে এতটুকুন সুযোগ দেয়া হয়, যদের সিয়াম পালন করা শক্তি থাকার পরও সিয়াম
পালন না করে তবে তারা তার বদলে একজন মিসকিনকে আহার করাবে । দ্বিতীয় বিধান টি যখন
নাযিল হয়, তখন পূর্বের প্রদত্ত সুযোগ বাতিল করা হয় । তবে রোগী মুসাফির গর্ভবতী
মহিলা বা দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাতা এবং রোযা রাখার ক্ষমতা নেই এমন  সব বৃদ্ধদের জন্য সুযোটি বহাল রাখা হয় । যখন
ওরা সিয়াম পালনে সমর্থ হবে  অথবা তাদের
অক্ষমতা দূর হয়ে গেলে রামাদানের যে ক
টি সিয়াম বাদ পড়ে ছিল তা পূরণ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হল । দ্বিতীয় হিজরীতে বদর যুদ্ধের আগে রামাদানের সিয়াম সম্পর্কে যে বিধান নাযিল হয়েছিল এ পর্য়ন্ত
সেই প্রাথমিক বিধানই বিধানই বর্ণিত হয়েছে । এর পরবর্তী আয়াত এর এক বছর পরে নাযিল
হয় । (তাফহীমুন কোর
আন) [তৃতীয়
হিজরীতে বছরে পুরু এক মাস রামাদান
মাসে সিয়াম  ফরজ করা হয়]

যদি তোমরা সঠিক বিষয় অনুবাধন করে থাক তাহলে তোমাদের জন্য
সিয়াম পালন করাই ভালো

সিয়াম পালন করা থেকে বিরতে থাকা নিয়ে অনেক ফেকহ শাস্থ্রে প্রবক্তরা যে বিতর্কে
জড়িয়ে পড়েছেন তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানো ঠিক হবে না । যারা রসূল (সঃ)-এর সময়ে
অতবা তাঁর যামানার কাছাকাছি ছিলেন তারা যা বুঝেছিলেন তাইই সঠিক । দেখুন হাদীসে কী
চম
কার ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে,

১।জাবের (রঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রসূলুল্লাহ (সঃ) বিজয়ের বছর, রামাদান মাসে মক্কা অভিযানে বের হলেন । তিনি ও তাঁর
সংগী লোকেরা সবাই
কোরায়াল
গামীম

নামক স্থানে পৌঁছানোর পূর্ব পর্য়ন্ত সিয়াম পালন অবস্থায় ছিলেন, কিন্তু ওইস্থানে
পৌঁছে তিনি এক পেয়ালা পানি আনতে বললেন । পানি আনা হলে তিনি পেয়ালাটি এমনভাবে তুলে
ধরলেন যে লোকেরা সবাই দেখতে পেলো, তারপর তিনি সে পেয়ালা থেকে পান করলেন । পরে
তাঁকে বলা হলো, কিছুসংখ্যক লোক সিয়াম ভাংগেনি । একথা শুনে তিনি বললেন, ওরা
বিরুদ্ধাচরণকারী, ওরা বিরুদ্ধচরণকারী ।(মুসলিম,তিরমিযী)

২।আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমরা নবী (সঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম ।তখন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ রোযাদার ছিলো আর
কেউ কেউ ছিলো বেরোযাদার । প্রচন্ড সে গরমের দিনে আমরা এক স্থানে অবস্থান করার
জন্যে নেমে পড়লাম । আমাদের মধ্যে যাদের কাছে চাদর ছিলো তারা বেশী ছায়াতে ছিলো,
আমাদের আরও কিছুসংখ্যক লোক নিজ নিজ হাত দ্বারা রোদ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা
করছিলো । রোযাদার ব্যক্তিরা ক্লান্তিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো এবং বে-রোযাদাররা উঠে
তাঁবু খাটালো ও আরোহন করার জীব জন্তুগুলোকে পানি পান করালো । তখন নবী (সঃ) বললেন
, আজ ভোজদারেরা
পুরস্কার নিয়ে নিলো ।(বোখারী, মুসলিম ও নাসাঈ)

৩।জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
নবী (সঃ) এক সফরে ছিলেন । এসময় তিনি লক্ষ করলেন এক ব্যক্তির কাছে লোকেরা জড়ো হয়েছে
এবং তাকে ছায়া দেয়া হয়েছে । জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে ওর? তারা বললো, লোকটি
রোযাদার । তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, সফরে রোযা রাখা কোনো নেকী নয় । ( ইমাম
মালেক, বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসাঈ)

৪।আমর ইবনে উমাইয়া আদ্ দামারি থেক
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সফর থেকে ফিরে এসে রসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে গেলাম । তখন
তিনি বললেন, হে আবা উমাইয়া, তুমি নাশতা না আসা পর্য়ন্ত একটু অপেক্ষা করো । আমি
বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ, আমি যে রোযা আছি । তিনি বললেন,
তাহলে মোসাফের
সম্পর্কে শরয়ী বিধান বলছি শোনো । আল্লাহ তায়ালা মোসাফের থেকে রোযার বোঝা ও অর্ধেক
নামায নামিয়ে দিয়েছেন

(নাসাঈ)

৫।বনী আব্দিল্লাহ ইবনে কাব ইবনে মালেক এর
এক ব্যক্তি যার নাম আনাস ইবনে মালিক, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই
আল্লাহ তায়ালা মোসাফেরের কাঁধ থেকে নামাযের বোঝা অর্ধেক নামিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে
রোযা ভাংগার অনুমতি দিয়েছেন । আর দুধ-দানকারী মহিলা ও গর্ভবতী নারীর জন্যেও রোযা
কাযা করার সুযোগ দিয়েছেন, যদি তাদের ভয় হয় রোযা রাখলে বাচাদের কষ্ট হবে ।(সিহাহ্
সেত্তার সকল হাদীসে বর্ণিত)

৬।আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমরা নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলাম । আমাদের মধ্যে রোযাদার ও ভোযদার উভয় শ্রেণীর মানুষ
ছিলো । কিন্তু রোযাদাররা ভোজদাকরদেরকে এরং ভোজদাররা রোয়াদারদেরকে, কেউ কাউকে
দোষারোপ করেনি । (ইমাম মালেক,বোখারী,মুসলিম ও আবুদাউদ)

৭।আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আম্র আসলামীর পুত্র হামযাহ্ রসূল (সঃ)-কে সফরের সময় রোযা রাখার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা
করলে ( তিনি বেশী বেশী রোযা রাখায় অভ্যস্ত ছিলেন)। তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, (এই
সফরের সময়) চাইলে রোযা রাখো, চাইলে রোযা ভাংগো (এটা তোমার খুশী)।(ইমাম মালেক,
বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি এবং নাসাঈ)

৮।মোহাম্মদ ইবনে কাব বলেন, রামাদান
মাসে আনাস ইবনে মালেকর কাছৈ আমি এলাম, তখন উনি সফরে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি
নিচ্ছিলেন, তাঁর সওয়ারীকে রওয়ানা হওয়ার প্রয়োজনীয় সাজ দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছিলো
এবং তিনি নিজে সফরের পোশাকও পরে নিয়েছিলেন, এ সময়ে তিনি খাবার আনতে বললেন এবং
খাবার দিলে তিনি খেয়ে নিলেন, তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটাই কি রসূল (সঃ)-র
সুন্নত? তিনি বললেন, হাঁ তার পার সওয়ারীতে চড়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। (তিরমিযী)

৯।আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন, আমরা রমযান মাসে অত্যন্ত কঠিন গরমের দিনে সফরে বেরুলাম । এমনকি গরমের চোটে
আমাদের কেউ কেউ মাথা হাত রেখে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করছিলো । আর সে সময় একমাত্র
রসূল (সঃ) ব্যতীত এবং ইবনু রওয়াহ ব্যতীত আর কেউ রোযা ছিলো না ।(বোখারী, মুসলিম ও
আবু দাউদ)

১০।ওবায়েদ ইবনি যোবায়র বলেন, রসূলুল্লাহ
(সঃ)-র সাহাবী আবু বসরাতুল গিফারী (রাঃ) এর সাথে রমাদান মাসে ফুসতাত থেকে এক জাহজে
করে রওয়ানা হলাম । জাহাজ ছাড়ার পর তাকে নাশতা দেয়া হলে তিনি বললেন, কছে এসো । আমি
বললাম, আপনি কি আবাসিক এলাকা দেখতে পাচ্ছেন না? তিনি বললেন তুমি কি রসূলুল্লাহ
(সঃ)-র সুন্নত পরিত্যাগ করতে চাচ্ছ? এ কথার পর তিনিও খেলেন আমিও খেলাম । (আবু
দাউদ)

১১।মাসসূর আল কালাবী থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন, দাহিয়া ইবনে খালীফা কালবী(রাঃ) দামেশকের এক গ্রাম থেকে এতটা দূরত্বের সফরে
রওয়ানা হলেন যতটা ফুসতাত থেকে আকাবা পর্য়ন্ত ছিলো এবং এই দূরত্ব ছিলো তিন মাইল ।
তারপর তিনি রোযা ভাংলেন এবং আর ও অনেক মানুষ রোযা ভেংগে ফেললো, আবার কিছু সংখ্যক
ব্যক্তি রোযা ভাংতে পছন্দ করলো না । তারপর নিজের বসতিতে ফরে এসে তিনি বললেন,
আল্লাহর কসম আজ
আমি এমন কিছু দেখেছি যা দেখবো বলো আশা করিনি । একদল লোক রসূল (সঃ) এবং তাঁর সাহাবাদের
সুন্নত থেকে সর দাঁড়ালো । আয় আল্লাহ, আমার জান কবয করে আপনার কাছে আমাকে নিয়ে যান

এ হাদীসগুলো সামগ্রিক ভাবে একথারই ইংগীত
বহন করে যে সফরের মধ্যে রোযা ভাংগার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তা গএহন করাই শ্রেয় ।
এগুর মধ্যে কষ্ট হলে ভাংতে হবে, নচে

নয় এমন কোনো শর্ত আরোপিত হয়নি ।

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ
هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى
وَالْفُرْقَانِ
فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن
كَانَ
مَرِيضاً أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
يُرِيدُ
اللّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلاَ يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
وَلِتُكْمِلُواْ
الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ اللّهَ عَلَى مَا
هَدَاكُمْ
وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

রামাদান মাস, যার মধ্যে বিশ্বমানবের জন্য
পথ প্রদর্শক এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন ও (হক ও বাতিলের) প্রভেদকারী কুর
আন অবতীর্ণ করা
হয়েছে, অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন সিয়াম পালন করে এবং যে
ব্যক্তি অসুস্থ বা মুসাফির তার জন্যে অপর কোন দিন হতে গণনা করবে; তোমাদের পক্ষে যা
সহজ আল্লাহ তাই চান ও তোমাদের পক্ষে যা কষ্টকর তা তিনি চান না এবং যেন তোমরা
নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করে নিতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন, তজ্জন্যে
তোমরা আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা কর এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর
(সূরা
বাকারা:২/১৮৫)

আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্যে উত্তম মনে করতে, যদি এর উপকারীতা জানতে

এমতাবস্থায় সিয়ামের মধ্যেই কল্যাণ
একথা বলে আল্লাহ তায়ালা বুঝাতে চাইছেন যে মানুষের
সিয়াম পালন করার মাধ্যেই ইচ্ছা শক্তির ট্রেনিং হয়ে যাক, তারা একটু কষ্ট
সহিষ্ঞুতার শক্তি অর্জন করুক এবং আরামে আল্লাহর হুকুম পালন করার চাইতে একটু কষ্টকর
কাজ করে তাঁর হুকুম পালন করাকে প্রাধান্য দিক । এসব কিছু ইসলামী যেন্দগীর জন্যে
প্রয়োজনীয় ট্রেনিং হিসেবে মনে করা যেতে পারে, যেমন আমরা স্বাস্থ্য-রক্ষার ক্ষেত্রে
সিয়ামের বিশেষ ভূমিকা দেখতে চাই, অবশ্য এটা সেই ব্যক্তির জন্যে যে প্রকৃতপক্ষে
কোনো রোগে আক্রান্ত হয়নি । এমনিতে সিয়াম পালন করলে কিছু কষ্ট তো হবেই সেটা কোনো ব্যাপার
নয় এবং তাকে কোনো রোগ ব্যাধি মনে করা ঠিক হবে না ।

 এখানে রাখতে হবে তাদের থেকে রেয়ায়েত (সুযোগ)
তুলে নেয়া হবে যারা মোসাফের নয়, মুকীম এবং অসুস্থ নয় সুস্থ শরীরের অধিকারী । তবে
অত্যন্ত বৃদ্ধদের জন্যে মেসকীন খাওয়ানোর এই রেয়ায়েত কিন্তি বাকি রয়ে গেলো, যারা সিয়াম
পালন করতে গিয়ে ভীষণ কষ্ট পায় এবং কাযা করার শক্তিও রাখে না বা কাযা করতে পারবে
বলে আশা করা যায় না ।

এই বিষয়ে ইমাম মালেক একটি হাদীস
বর্ণনা করেছেন যাতে বলা হয়েছে তাঁর কাছে হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) সম্পর্কে একটি
খবর পৌঁছেছে যে, তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সিয়াম পালন করতে অক্ষম হয়ে
গিয়েছিলেন, য়ার কারণে তিনি ফিদিয়া দিতেন ।

আর একটি হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে
আব্বাস (রাঃ) বলেন, এই আয়াতটি নাযিল হলো এবং পরবর্তীতে এই আয়াতের কার্য়কারিতাকে
বাতিল বলে ঘোষণা করা হলো । কিন্তু থুরথুরে বুড়ো মানুষদের জন্যে সমভাবেই তা বহাল
রয়ে গেলো । বৃদ্ধ ব্যক্তি পুরুষ বা নারী চাইলে সিয়াম ভাংবেন এবং প্রতি সিয়ামের
পরিবর্তে একজন করে মেসকীনকে খাইয়ে দেবেন ।(তাফসীর ফি যিলালিল কোর
আন)

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي
فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
فَلْيَسْتَجِيبُواْ
لِي وَلْيُؤْمِنُواْ بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ

“এবং
যখন আমার বান্দাগণ আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন তাদের কে বলে দাওঃ
নিশ্চয় আমি সন্নিকটবর্তী; কোন আহ্বানকারী যখনই আমাকে আহ্বান করে তখনই তার আহ্বানে
সাড়া দিয়ে থাকি; সুতরাং তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমাকে বিশ্বাস করে, তা
হলেই তারা সঠিক পথে চলতে পারবে” ।( সূরা বাকারাঃ২/১৮৬)

ইসলামের
প্রাথমিক যুগে রামাদান মাসের রাতসমূহের প্রথমাংশে পানাহার ও স্ত্রীগমনের অনুমতি
ছিল; কিন্তু শুয়ে পড়ার পর এসব নিষিদ্ধ ছিল । কতিপয় লোকের পক্ষ হতে এর অন্যথা হয়ে
যায় । তারা শয়নের পর স্ত্রীগমন করে বসে । তারপর তারা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট
নিজেদের ত্রুটি স্বীকার করে এবং তজ্জন্য ভীষণ অনুতপ্ত হয় । তারা রাসূলুল্লাহ
(সঃ)-এর নিকট তওবা সম্পর্কেও জানতে চায় । এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাজিল হয় । এতে
তাদের তওবা কবুল হওয়ার কথা জানিয়ে দেওয়া হয় এবং মহান আল্লাহর আদেশ পালনে যত্মবান
থাকার তাগিদ করা হয় । সেই সঙ্গে আগের হুকুম রহিত করে ভবিষ্যতের জন্য রামাদানে
সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্য়ন্ত রাতভর পানাহার ইত্যাদি হালাল করে দেওয়া হয় ।(তাফসীরে
জালালাইন)

 

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَآئِكُمْ
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ عَلِمَ
اللّهُ
أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ
وَعَفَا
عَنكُمْ فَالآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُواْ مَا كَتَبَ اللّهُ
لَكُمْ
وَكُلُواْ وَاشْرَبُواْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ
الأَبْيَضُ
مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّواْ
الصِّيَامَ
إِلَى الَّليْلِ وَلاَ تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ
عَاكِفُونَ
فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُودُ اللّهِ فَلاَ تَقْرَبُوهَا
كَذَلِكَ
يُبَيِّنُ اللّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

“সিয়ামের
রজনীতে আপন স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে; তারা তোমাদের
জন্যে আবরণ এবং তোমরা তাদের জন্যে আবরণ, তোমরা যে আত্ম প্রতারণা করছিলে, আল্লাহ তা
পরিজ্ঞাত আছেন, এ জন্যে তিনি তোমাদের ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের (অব্যাহতি দিয়েছেন);
অতএব এক্ষণে তোমরা (সিয়ামের রাত্রেও) তাদের সাথে সহবাস কর এবং আল্লাহ তোমাদরে
জন্যে যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং সকালে কালো সুতা হতে সাদা সুতা
প্রকাশিত হওয়া পর্য়ন্ত তোমরা খাও পান কর; অতঃপর রাত্রি সমাগম পর্য়ন্ত তোমরা সিয়াম
পূর্ণ কর; তোমরা মসজিদে ই’তেকাফ করবার সময় তাদের (স্ত্রীদের) সাথে মিলন করো না;
এটাই আল্লাহর সীমা, অতএব তোমরা তার নিকটেও যাবে না; এভাবে আল্লাহ মানবমন্ডলীর
জন্যে তাঁর নির্দেশন বর্ণনা করেন, যেন তারা আল্লাহ ভীরু হয় । ( সূরা বাকারাঃ২/১৮৭)

“সিয়ামের
রজনীতে আপন স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে; তারা তোমাদের
জন্যে আবরণ এবং তোমরা তাদের জন্যে আবরণ”

বর্তমান
বিধানের ন্যায় ইসলামের প্রথম দিকে এরূপ অনুমতি ছিল না ।প্রথম দিকে সিয়ামরত অবস্থায়
দিনের মতো রাতের বেলায়ও স্ত্রীদের থেকে পৃথক অবস্থানের নির্দেশ ছিল । মূলত ইসলামি
শরিয়ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হায়াতের ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাতে কোনো কোনো
ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে, প্রথম দিকে সহজ ও কোমল বিধান দেওয়া হয়েছে, পরে ধীরে ধীরে
তা কঠোর ও শক্ত করা হয়েছে । যেমন-মদ খাওয়া প্রথমে শুধু অপছন্দনীয় হওয়ার কথা বলা
হয়েছে এবং অগ্রসর হতে হতে অবশেষে তো সরাসরি হারাম ও চিরনিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে । আবার
কোন কোন ক্ষেত্রে এর বিপরীত কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে, যা প্রথম দিকে শক্ত ও কঠিন
বিধান দিয়ে ধীরে ধীরে তাতে সহজতা ও ছাড় সংযোজিত হয়েছে । যেমন- এ সিয়ামের ব্যাপরটি
। প্রথম দিকে রাতেও স্ত্রীসহবাস হারাম ছিল, পরে তার অনুমতি দেওয়া হয়েছে ।(তাফসীরে
জালালাইন)

“সকালে
কালো সুতা হতে সাদা সুতা প্রকাশিত হওয়া পর্য়ন্ত তোমরা খাও পান কর; অতঃপর রাত্রি
সমাগম পর্য়ন্ত তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর”

আর
যেমন করে স্ত্রী সংসর্গকে আল্লাহ তায়ালা সিয়ামের রাত্রিতে হালাল করে দিলেন তেমনি
সারা রাত ভর খাওয়া-দাওয়া ও পান করাকেও হলাল বলে ঘোষণা করলেন । এরশাদ হলো, ‘আর খাও
এবং পান করো ততোক্ষণ যতক্ষণ তোমাদের কাছে সোবহে সাদিকের ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন কালো
সূত্রব
রেখার মধ্যে থেকে
প্রথম প্রভাতের
সূত্রব রেখা প্রকাশিত না হয়

“তোমরা
মসজিদে ই’তেকাফ করবার সময় তাদের (স্ত্রীদের) সাথে মিলন করো না; এটাই আল্লাহর সীমা,
অতএব তোমরা তার নিকটেও যাবে না”

এতেকাফ-এর
আভিধানিক অর্থ হলো- নিজেকে কোনো কিছুতে নিরত রাখা বা লাগিয়ে রাখা । শরিয়তের
পরিভাষায় মসজিদে অবস্থান করে নিজেকে ইবাদতের জন্য আবদ্ধ করে নেওয়া । সব সময়ের জন্য
মসজিদে থাকা, শোয়া, পানাহার করা, শয়ন ও জাগরণ, পান ও ভোজন সব মসজিদ থেকে সম্পাদন
করা এবং শরিয়ত সমর্থিত বা প্রাকৃতিক জরুরি প্রয়োজন ব্যতিরেকে মসজিদের বাইরে বের না
হওয়া এতেকাফকারীর অপরিহার্য় কর্তব্য । মানবিক [প্রাকৃতিক] প্রয়োজন ও জুমার ফরজ
আদায়ের প্রয়োজন ব্যতীত বের না হওয়া তার জন্য ওয়াজিব [জাসসাস] । তার এতেকাফের
সময়সীমা সর্বাধিক কত হতে পারে তা নির্ণীত নয় । তবে সর্বনিম্ন সময় ইমাম শাফেয়ী
(রঃ)-এর মতে এক মুহূর্ত [অর্থা
স্বল্পক্ষণ] ও
হতে পারে । কিন্তু ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালেক (রঃ)-এর মতে অন্তত একদিন একরাত [
অর্থাপূর্ণ একদিন] হতে
হবে ।
(তাফসীরে জালালাইন)

এতেকাফ
অর্থ একান্তভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় মাসজিদে অবস্থান । এ সময়ে প্রাকৃতিক
প্রয়োজন ও খানাপিনার প্রয়োজন ছাড়া বাড়ীতে প্রবেশ কার নিষিদ্ধ ।

রামাদান
মাসের শেষের দিনগুলোতে মসজিদে এতেকাফে বসা মোস্তহাব । রসূলুল্লাহ (সঃ) রামাদানের
শেষ দশ দিনে এতেকাফে বসতেন বলে এই সময়ে মসজিদে এতেকাফ করা সুন্নত । এ সময়টি
একান্তভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্যেই নির্দিষ্ট, আর এ কালণেই এ সময়ে স্ত্রীর
সাথে মেলামেশা নিষিদ্ধ । যাতে করে পরিপূর্ণ ভাবে কিছু থেকে গুটিয়ে নিয়ে এসে এবং
সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে একান্তভাবে আল্লাহর কাছে নিজেকে পেশ করা হয় । তাই আল্লাহ
তায়ালা বলছেন, ‘তাদের (স্ত্রীদের) সাথে মেলামেশা করো না যখন তোমরা মাসজিদে এতেকাফে
বসে থাকো’।
(তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন)

“এভাবে
আল্লাহ মানবমন্ডলীর জন্যে তাঁর নির্দেশন বর্ণনা করেন, যেন তারা আল্লাহ ভীরু হয়”

এই
নির্দেশ পালনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতির পরিচয় পাওয়া যায় এবং সে নিষিদ্ধ
কাজগুলো পরহেপ করে চলতে পারে যা আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার কাছৈ চাইছেন, আর এই
জন্যে তিনি অতি স্পষ্টভাবে তাঁর আয়াতগুলোতে বর্ণনা করেছেন যাতে করে তাঁর উদ্দেশ্য
বুঝে সে নির্দেশগুলো সঠিকভাবে পালন করতে পারে । এইই হচ্ছে সেই মহান লক্ষ্য যাতে
ঈমানদাররা উপনীত হতে পারে এহেন অনুগত মোমেনরাই সকল অবস্থায় আল্লাহর সম্বোধনের
পাত্র ।
(তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন)

এখানে যেভাবে তিনি সিয়াম ও তার
সীমা-পরিধি, সময় ইত্যাদি এবং এতেকাফ ও আনুষঙ্গিক বিধিমালা বিশদরূপে বর্ণনা করে
দিলেন, তদ্রূপ মানুষের সাফল্য ও কল্যাণের লক্ষ্যে প্রদত্ত তার অন্যান্য
নীতি-বিধানও বিশদভাবেই বর্ণনা দিতে থাকেন । মর্ম হলো, তিনি যেভাবে এখানে তাঁর আদেশ
ও নিষেধের পরিষ্কার বর্ণনা দিলেন, অনুরূপভাবে তাঁর দীন ও শরিয়তের অন্যান্য
যুক্তিপ্রমাণ ও নিদর্শন সমূহও স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন ।(তাফসীরে কাবীর)

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

চলুক। অসাধারণ হচ্ছে।

-

আমার প্রিয় একটি ওয়েবসাইট: www.islam.net.bd

আমার প্রিয় একটি ওয়েবসাইট: www.islam.net.bd

াআপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সুন্দর একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানার জন্য ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)