আদব ( জ্ঞান চর্চাকারীর আদবকায়দা )

সালাম ,

   

আদব (জ্ঞান চর্চাকারীর আদব-কায়দা)//১

 

আরবী : শেখ আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মাদ সাঈদ রাসলান, সৌদি আরব।

 ইংরেজী
অনুবাদ:  আবু   সাবাইয়া।

 ইংরেজী
থেকে অনুবাদ: জাবীন হামিদ, বাংলাদেশ।

 

  "আমি ত্রিশ বছর ধরে আদব শিখেছি আর জ্ঞান চর্চায় সময় দিয়েছি বিশ বছর।"–আবদুল্লাহ বিন আল মুবারক।

--------------------------------------------------------------------------------


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

 

 

অবশ্যই সব প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে মাফ চাই। আমাদের আত্মার অকল্যাণ ও কাজের ভুল থেকে আল্লাহর আশ্রয় আমরা প্রার্থনা করি। আল্লাহ্ যাকে পথ দেখান, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর আল্লাহ্ যাকে হেদায়াত করেন না, কেউ তাকে পথ দেখাতে পারে না।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ্ ছাড়া কেউ উপাসনার যোগ্য নয়, আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ صلى الله عليه وسلم আল্লাহর দাস ও রাসূল।

"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থ ভাবে ভয় করো ও আত্মসমর্পণকারী না হয়ে কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১০২)।

 

 

 

"হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু’জন থেকে অনেক নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর আল্লাহকে ভয় কর; যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার (ও পাওনা) দাবী কর এবং সতর্ক থাক আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন।" (সূরা আন্-নিসা:  :১)।

হে মুমিনগণ ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন। এবং তোমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। ( সূরা আল – আহযাব; ৩৩: ৭০-৭১ )।

 

 

 

নিশ্চয়ই সব কথার মধ্যে আল্লাহর কথাই সবচেয়ে সত্য ও রাসূল صلى الله عليه وسلم সবচেয়ে সুন্দরভাবে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।

সবচেয়ে খারাপ কাজ হলো বিদআত ও সব বিদআত পথভ্রষ্ট; আর সব পথভ্রষ্টতা নিয়ে যায় দোযখের আগুনের দিকে।   জ্ঞান হলো মনের ইবাদত, জীবনের রহস্য ও শক্তির উৎস।

 

যিনি জ্ঞান অনুসন্ধান করছেন তার জন্য এটা অবশ্য কর্তব্য যে, জ্ঞান বিষয়ক যে সব আদবকায়দা আছে, তা তিনি জেনে নেবেন ও এই আদব শিখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। তা না হলে তিনি যাবেন একদিকে, জ্ঞান যাবে অন্যদিকে যেমনটি বলা হয়ে থাকে – জ্ঞান যায় পূর্বে, সে যায় পশ্চিমে - পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যে কতই না দূরত্ব।

একজনকে বুঝতে হবে এসব আদব অন্য সব আচরণের মত না। যে ইচ্ছা হলো তা করলাম, ইচ্ছা না হলে এই আদব শিখলাম না। এসব আদব একই স্তরের না বরং কিছু কিছু আদব শেখা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক – তা সে যেখানেই থাকুক না কেন বা ছাত্র - অছাত্র যেই হোক না কেন।

 

 

 

শরীয়াহ সম্পর্কে জানার লক্ষ্য হলো নিখুঁত ও স্পষ্টভাবে মনোভাব প্রকাশ করতে শেখা। নিজের মনোভাব স্পষ্ট ও নিখুঁত প্রকাশের লক্ষ্য হলো আল্লাহকে সবার থেকে আলাদা করা। ও শুধু তাঁরই ইবাদত করা। তাই জ্ঞানের সন্ধান করার উদ্দেশ্য হলো। আল্লাহ যিনি সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত তাঁকে আর সবার থেকে আলাদা করা। ও একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করা - এটি তখনই ভালভাবে একজন বুঝতে পারে যখন সে জ্ঞানের প্রতি সুবিচার করে - তা সে ছাত্র বা শিক্ষক যেই হোক না কেন।

যে জ্ঞানের সন্ধান করছে তার থেকে আদব তাই আলাদা নয়, কেননা এই আদব কায়দার অন্তর্ভুক্ত হলো ধর্মের মূলনীতি। ধর্মীয় আদর্শের সাথে মতবিরোধে যাওয়ার বিলাসিতা একজন করতে পারে না বা এটাকে গুরুত্ব না দেয়ার কোন উপায় নেই।

জ্ঞান চর্চাকারীর জন্য আদব শেখা তাই সবসময়ই বাধ্যতামূলক ও আল্লাহ হলেন সাহায্যের উৎস ও তাঁর উপরেই আমরা ভরসা রাখি।

ছাত্রদের জন্য যে সব আদব কায়দা জানা বাধ্যতামূলক সেসব হলো:

 

 

 

-১-

জ্ঞানের সন্ধান করার সময় আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিয়্যত করতে হবে:

আবু হামিদ আল গাযযালী (রঃ) বলেন: নিয়্যত, ইরাদা ও ক্বাসদ - এগুলি আলাদা পরিভাষা হলেও এদের মানে এক। এগুলি মনের অবস্থা বর্ণনা করে। মন দু’টি জিনিষের উৎস - জ্ঞান ও কাজ।

 

 

 

প্রথমে আসে জ্ঞান, কেননা এটা হলো স্তম্ভ ও শর্ত। এরপর কাজ তার অনুসরণ করে, কেননা কাজ হলো জ্ঞানের শাখা। জ্ঞান, ইচ্ছা ও সামর্থ্য - এগুলি ছাড়া কোন কাজ হয় না। তার মানে, সেই বিষয়ে জানতে হবে, সেটা করার ইচ্ছা মনে থাকতে হবে।

মানুষ এমন ভাবে সৃষ্ট হয়েছে, যাতে সে মাঝেমাঝে এমন কাজ করে, যা তার মন চায়, আবার এমন কাজও সে করে, যার সাথে মনের ইচ্ছার সংঘর্ষ হয়। এই অবস্থায় সে তাই করবে, যা তার জন্য ভাল; যা ক্ষতিকর সেটা থেকে সে দূরে থাকবে। এজন্য তার জানা থাকতে হবে, কী তার জন্য কল্যাণকর, আর কী তার ক্ষতি করবে।

 

যে আগুন দেখতে পাচ্ছে না, সে আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। তাই আল্লাহ হেদায়েত ও জ্ঞান সৃষ্টি করেছেন, এগুলি পাওয়ার উপায় ঠিক করে দিয়েছেন - সেগুলি হলো আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ইন্দ্রিয় সমূহ। কোন কিছু করার জন্য একজনের মনে কোন লক্ষ্য থাকবে যা তাকে উদ্দীপিত করবে।

কারো মনে কোন লক্ষ্য থাকলে তা তাকে কোন কাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সে তখন লক্ষ্য পূরণের জন্য তার শক্তি ও সামর্থ্যকে কাজে লাগায়। অর্থাৎ কোন কাজ করে। আল্লাহ এমন কোন কাজ গ্রহণ করেন না, যা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়নি।

রাসূল صلى الله عليه وسلم নিয়্যতের গুরুত্ব সম্পর্কে ও যা একজনের কাজকে নষ্ট করে ফেলতে পারে, তা থেকে নিয়্যত শুদ্ধ রাখার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বলেছেন। রাসূল صلى الله عليه وسلم যা বলেছেন তার মানে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হিজরত করেছে, সে আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কার পাবে। আর যে দুনিয়ার সম্পদ বা কোন নারীর জন্য হিজরত করে, তবে সেই হিজরতের জন্য পরকালে কোন পুরষ্কার থাকবে না। শরীয়াহতে এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য ছাড়া কোন ইবাদত করা হলে তা আল্লাহ গ্রহণ করেন না।

খলিফা উমর رضي الله عنهم           একদিন মিম্বারে দাড়িয়ে বলেন: রাসূল صلى الله عليه وسلم বলেছেন: অবশ্যই কাজের ফলাফল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল; একজন মানুষ তাই পাবে। যা সে নিয়্যত করে।

 

তাই যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল صلى الله عليه وسلم এর জন্য হিজরত করে, তার হিজরত এদেরই জন্য আর যে হিজরত করে দুনিয়াতে কোন লাভের জন্য বা কোন নারীকে বিয়ের জন্য, তার হিজরত সেজন্যই ( বর্ণনায় ইমাম বুখারী, সূত্র আলকামাহ বিন ওয়াকাস আল লায়থি)।

আন – নওয়াবি (রহঃ) বলেন: এই হাদিসের গুরুত্ব সম্পর্কে মুসলমানরা একমত – এর সূত্র নির্ভরযোগ্য ও এই এক হাদিসের মধ্যে অনেক কল্যাণ আছে। আশ – শাফেয়ী ও অন্যান্যরা বলেন: ইসলামের চার ভাগের এক ভাগ আছে এই একটি হাদিসে। আবদুর রাহমান বিন মাহদী ও অন্যান্যরা বলেন: যে বই লিখে তার জন্য এটা অপরিহার্য যে সে এই হাদিস দিয়ে বইটি শুরু করবে – এটা ছাত্রদেরকে শুদ্ধভাবে আবারও নিয়্যত করার কথা মনে করাবে। আল – বুখারী (রঃ)ও আরো অনেকে তাদের বইয়ের শুরুতে এই হাদিসের উল্লেখ করতেন। বুখারী (রঃ) তার বইয়ের সাত জায়গায় এই হাদিসের উল্লেখ করেন।

বেশীরভাগ ইসলামিক চিন্তাবিদ, ভাষাবিদ ও আইনবিদ মনে করেন যে ‘ অবশ্যই ’ শব্দটি এটাই নিশ্চিত করে যা বলা হয়েছে ও অন্যকিছুকে প্রত্যাখ্যান করে – এর মানে নিয়্যতের উপর কাজ নির্ভরশীল ও নিয়্যত সঠিক না হলে সে কাজের ফলাফল শূন্য।

কুরআন ও হাদিসে এর অনেক প্রমাণ আছে।

যেমন সূরা ক্বাহফে আল্লাহ বলেন,

বলুন: আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ; আমার প্রতি ওহী নাযিল হয় যে, তোমাদের মাবুদ হলেন এক। তাই যে তার মাবুদের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন ভাল কাজ করে। এবং তার মাবুদের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। ( ১৮: ১১০ )।

তাদেরকে এছাড়া কোন আদেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে ( সূরা বায়্যিনা: ৯৮:৫ )।

এক লোক রাসূল صلى الله عليه وسلم এর কাছে জানতে চাইলো: কেউ যদি পুরষ্কার ও সম্মানের আশায় যুদ্ধ করে, তবে সে কী পাবে? রাসূল صلى الله عليه وسلم       উত্তর দিলেন, কিছু না। লোকটি তিনবার প্রশ্ন করলো, রাসূল صلى الله عليه وسلم তিনবার একই উত্তর দিলেন। তারপর বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন কাজ গ্রহণ করেন না যদি সেটা আন্তরিকতার সাথে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা না হয় ( হাদিস বর্ণনায় আবু উমামাহ )।

 

 

 

রাসূল صلى الله عليه وسلم জানান, আল্লাহ বলেছেন: আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ - আমার কোন অংশীদারের দরকার নেই। তাই কেউ যদি কোন কাজ করে যাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেছে, তবে আমি তার থেকে মুক্ত ও যাকে সে আমার অংশীদার বানিয়েছে, তার জন্য ওকে ছেড়ে দেব ( বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা )। তাই যে কোন কাজে আল্লাহর জন্য নিয়ত করা জরুরী।

 

 

 

ইবনে আল কাইয়্যুম বলেন: ঠিক যেমনটি উনি একমাত্র উপাস্য কোন অংশীদার ছাড়া, এটি অপরিহার্য যে উপাসনা হবে শুধু তাঁরই জন্য। তাই যেভাবে উনি উপাস্য হিসাবে একক, ইবাদতের জন্যও সবার থেকে তাঁকে আলাদা করতে হবে। সৎ কাজ হচ্ছে তাই যা রিয়া বা লোক দেখানো না ও সুন্নতপন্থী।

সুলায়মান বিন আবদুল্লাহ رضي الله عنهم      বলেন: কোন কাজ গ্রহণ হওয়ার জন্য দুইটি স্তম্ভের দরকার - তা সঠিক হতে হবে ও আন্তরিকতার সাথে করতে হবে। সৎ কাজ হচ্ছে তাই যা কুরআন ও সুন্নাহর সাথে মানানসই যেমনটি কুরআনে আদেশ দেয়া হয়েছে: সে যেন ভাল কাজ করে ( সূরা কাহফ; ১৮: ১১০ )।

 

 

 

আন্তরিক কাজ সেটাই যা গোপন ও প্রকাশ্য শিরক থেকে মুক্ত যেমনটি আল্লাহ বলেন: এবং তার মাবুদের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে ( সূরা কাহফ; ১৮: ১১০)।

যে জ্ঞানের সন্ধান করছে, সে তার নিয়্যতকে শুদ্ধ করবে - “ আর জ্ঞানের সন্ধানের সময় সঠিক নিয়্যত হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ও সেজন্য কাজ করা, তাঁর শরীয়তকে জীবন দান বা শরীয়াহ আইনের প্রচলন ঘটানো, নিজের মনকে আলোকিত ও আত্মিক জগতকে সুন্দর করা, কিয়ামতের দিনে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা ও আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য যে মহা-পুরষ্কারের আয়োজন রেখেছেন, সেটা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করা।

 

 

 

সুফিয়ান আস সাওরী (রহঃ) বলেন, নিয়্যত সংশোধনের মতো কঠিন চেষ্টা অন্য কোন কাজে আমাকে কখনো করতে হয় নি। এই দুনিয়ায় কোন কিছু পাওয়ার লোভে অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ কোন পদ লাভ, সম্মান ও টাকা – পয়সা বৃদ্ধি বা আশেপাশের মানুষের চোখে জ্ঞানী ও মহান ব্যক্তির মর্যাদা লাভ, জ্ঞানী – গুণী - সম্মানিত ব্যক্তিদের আসরে যাওয়ার সুযোগ অর্জন ইত্যাদির জন্য একজন জ্ঞান চর্চা করবে না। তাহলে তা হবে খারাপের সাথে ভালোর বদল।

আবু ইউসুফ رضي الله عنهم(রহঃ)বলেন, হে মানুষ, তোমরা তোমাদের জ্ঞান দিয়ে আল্লাহকে খুজো। জ্ঞানের সন্ধানে আমি বিনীত না হয়ে কোথাও কখনো বসি নি আর সে জায়গা থেকে সবার চেয়ে বেশী জ্ঞান অর্জন করেই আমি উঠেছি। সবার থেকে আমি সেরা তা দেখানোর আশায় কখনো কোথাও বসি নি - নিজে থেকে তা প্রকাশ পেয়ে গেলে তা আলাদা কথা।

জ্ঞান হলো ইবাদতের কাজ ও আল্লাহর কাছে যাওয়ার একটি উপায়। তাই এই ইবাদতে আপনার নিয়্যত যদি খাঁটি হয়, তবে তা গ্রহণ করা হবে, বিশুদ্ধ করা হবে ও কল্যাণকর হবে। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছুর ইচ্ছা থাকে, তবে তা নষ্ট ও অপচয় হবে - আপনি তার কল্যাণ হারাবেন। এমন হতে পারে যে কেউ মহৎ উদ্দেশ্য ছাড়া কোন কাজ করলো আর তার লক্ষ্য পূরণ হলো না। ফলে তার সব পরিশ্রম ও চেষ্টা বৃথা গেল।

 

 

 

উপরে যা বলা হয়েছে তার সার- সংক্ষেপ একটি হাদিসে বলা হয়েছে। কিয়ামতের দিন তিনজনকে প্রথমে আগুনে ফেলে দেয়া হবে। এরা হলো আলেম, মুজাহিদ ও দাতা। আল্লাহ জ্ঞানী বা আলেমকে প্রশ্ন করবেন: তুমি দুনিয়ায় কী করেছ? সে বলবে: আমি আপনার জন্য জ্ঞান অর্জন করেছিলাম ও আপনার সন্তুষ্টির জন্য সেই জ্ঞান দান করেছি। তখন তাকে বলা হবে, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি জ্ঞান অর্জন করেছো যেন তোমাকে জ্ঞানী বলা হয়। তুমি যা চেয়েছিলে তা দুনিয়াতে পেয়ে গিয়েছ। তখন আদেশ করা হবে সেই জ্ঞানীকে দোযখে ফেলে দেয়ার জন্য।

 

 

 

 

দানকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ প্রশ্ন করবেন: তুমি দুনিয়ায় কী করেছো? সে বলবে: আমি আপনার জন্য হালাল ভাবে সম্পদ অর্জন করেছিলাম ও আপনার পথে তা দান করেছি।

তখন তাকে বলা হবে, “ তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি সম্পদ দান করেছো যেন তোমাকে দানশীল বলা হয়। তুমি যা চেয়েছিলে তা দুনিয়াতে পেয়ে গিয়েছ ”। তখন আদেশ করা হবে সেই দানশীল ব্যক্তিকে দোযখে ফেলে দেয়ার জন্য।

মুজাহিদকে প্রশ্ন করা হবে: তুমি দুনিয়ায় কী করেছিলে? সে বলবে: আমি আপনার জন্য মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করেছিলাম। তাকে বলা হবে, “ তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি এজন্য লড়াই করেছো যেন তোমাকে বীর যোদ্ধা বলা হয় ও তাই হয়েছে। তুমি দুনিয়াতেই তোমার পুরষ্কার পেয়ে গিয়েছ ”। এরপর তাকে দোযখে ফেলে দেয়ার আদেশ হবে।

 

 

আল – নওয়ারী رضي الله عنهم (রঃ) বলেন: লোক দেখানো কাজ করা মানা, ও তা করলে যে কঠিন শাস্তি পেতে হব, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এই হাদিস তার একটি প্রমাণ। কোন কাজের জন্য সঠিক নিয়্যত থাকার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: তাদেরকে এছাড়া কোন আদেশ দেয়া হয় নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে ( সূরা বায়্যিনাহ; ৯৮: ৫ )।

 

 

 

এটা আরো বোঝায় যে জিহাদ, জ্ঞান চর্চা, দান - এসবের মর্যাদা ও প্রতিদান সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এসব করবে। এই হাদিসের আলোকে বলা যায় - একজন ছাত্র জ্ঞান চর্চায় তার নিয়্যত শুদ্ধ করবে - এটা নিয়ে কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। সে জ্ঞানের খোঁজ করবে আর কাউকে না বরং আল্লাহর জন্য; তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ও পুরষ্কার আল্লাহর কাছ থেকেই আশা করবে।

 

 

 

আল্লাহর রাসূল হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে এজন্য জ্ঞান চর্চা করে যেন জ্ঞানীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে, যারা জানে না তাদের থেকে নিজেকে সেরা প্রমাণ করতে পারে বা মানুষ যেন তাকে সম্মানের চোখে দেখে, তবে সে দোযখে যাবে ( আল - আলবানী এই হাদিসকে সহীহ বলেছেন )।

 

 

- ২ -

 

 

 

শরীয়াহ বিরোধী সবকিছু থেকে মন ও আচরণকে শুদ্ধ করতে হবে:

জ্ঞান অর্জনের পথে যে ছাত্র, সে নিজেকে শুদ্ধ রাখবে সব বিদআত থেকে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাহ, জীবনের সব ক্ষেত্রে সে প্রয়োগ করবে ও উযু বজায় রেখে সাধ্যমত দেহ ও পোশাক পবিত্র রাখবে।

 

 

 

আবদুল মালিক আল মায়মুনি বলেন: ইমাম আহমেদ বিন হাম্বল (রঃ)এর চেয়ে আর কাউকে আমি এত পরিষ্কার কাপড় পরতে, গোঁফ ছাটাতে মনোযোগী, চুল – দাড়ি পরিপাটি রাখা ও ধবধবে সাদা – পাক কাপড় পরতে দেখি নি ( বর্ণনায় ইবনে আবু হাতিম )।

আহমেদ বিন হাম্বল رضي الله عنهم (রঃ) এর সব কাজ ছিল সুন্নাহ অনুসারে যেমনটি তিনি বলেন: আমি কখনোই এমন কোন হাদিস লিখিনি যা আমি নিজে আমল করিনি। একবার আমি জানতে পারলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন ( গা থেকে দুষিত রক্ত বের করে দেয়া ) ও এক দিনার মজুরী দিয়েছিলেন। সেজন্য আমিও শিঙ্গা লাগাই ও যে এটা করে তাকে এক দিনার দেই।

 

 

পরিষ্কার কাপড় পরা নিয়ে কেউ যেন ভুল ধারণা না রাখে ও এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘ বাদহাদা ’ আসে ঈমান থেকে। ইবনে আল আতহীর (রঃ) বলেন: বাদহাদা হলো সাদাসিধা ভাবে মানুষের সামনে হাজির হওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন, পোশাকের মধ্য দিয়ে একজন বিনয় প্রকাশ করবে - অহংকার নয়।

 

 

আবু আবদুল্লাহ আল বুসিনজী বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বলেছেন - বাদহাদা আসে ঈমান থেকে, সেটা হলো সেই বিনয় যা একজন তার পোশাকের মধ্য দিয়ে প্রদর্শন করেন। এটা হলো নম্রতা যা দামী, চটকদার কাপড় পরা থেকে মুক্ত থাকতে পারলে প্রকাশ পায়।

 

 

 

আল খাতীব رضي الله عنهم বলেন: শিক্ষার্থী অবশ্যই হাসি- তামাশা, অর্থহীন ও নীচু শ্রেণীর কথাবার্তা যেমন অপরিপক্ক কথা, অট্টহাসি, ফিকফিক করে হাসা ও অতিরিক্ত কৌতুক থেকে দূরে থাকবে। মাঝেমাঝে অল্প হাসার অনুমতি তার আছে – সেটা এমন হবে যেন জ্ঞানের সন্ধানে যে আছে, তার আদবের সীমা না ছাড়ায়।

 

 

 

 

সবসময় কেউ যদি জ্ঞানের ছাত্রের উপযুক্ত না এমন সব কথা বলে ও অপরিপক্ক ও ছেলেমানুষী আচরণ, বেশী বেশী হাসি – তামাশা করে, তবে তা তার প্রতি অন্যের শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেবে ও সেটা তার ব্যক্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর।

মালেক رضي الله عنهم (রঃ) বলেন: ছাত্ররা স্থিরতা, বিনয় ও প্রশান্তভাবের অধিকারী হবে ও তার আগে যে আলিমগণ চলে গেছেন, তাদের সে অনুসরণ করবে। সাইয়্যিদ বিন আমীর বলেন, আমরা হিসাম – আদ – দাসতাওয়াই এর সাথে ছিলাম। আমাদের মধ্যে একজন জোরে হেসে উঠলে হিসাম বললেন: তুমি হাসছো যখন তুমি হাদীস নিয়ে পড়ছো? ( বর্ণনায় মুহাম্মদ বিন আল হুসাইন )।

 

 

 

একজন ছাত্র হিসামের সামনে হেসে উঠলে তিনি বলেন: হে তরুণ; তুমি জ্ঞানের সন্ধান করছো আর হাসছো? ছেলেটি উত্তর দিল: আল্লাহই কি আমাদের কাঁদান ও হাসান না? হিসাম বললেন, তাহলে তুমি কাঁদো (তরুণটি সূরা নাজমের ৪৩ নং আয়াতের উদ্ধুতি দিয়েছিল; বর্ণনায় আবদুর রহমান বিন মাহদী। )

 

 

 

বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন করার জন্য সব মুসলমানের উচিত সুন্নাহ মেনে চলা যেমন দেহ পাক্ রাখা, পরিষ্কার কাপড় পরা, মানুষের সামনে যথাযথ ভাবে হাজির হওয়া। বিশেষত যারা ছাত্র, তাদের জন্য এসব পালন করা অবশ্য কর্তব্য কেননা তারা তাদের জ্ঞান দিয়ে ভাল কাজের প্রতি উৎসাহিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার মধ্যে অণু পরিমাণ কিবর আছে, সে বেহেশতে যাবে না ( বর্ণনায় মুসলিম; সূত্র আবদুল্লাহ বিন মাসউদ )।

একজন এটা শুনে বললো, অনেকে এটা পছন্দ করে যে তার কাপড় – জুতা দেখতে সুন্দর হোক। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর ও তিনি সুন্দরকে ভালবাসেন। কিবর হলো সত্যকে অস্বীকার করা ও মানুষকে তুচ্ছ করা ( সহীহ মুসলিম )।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর সুগন্ধী ভালবাসতেন ও নিয়মিত সুগন্ধী ব্যবহার করতেন। আবু মুসা বিন আনাস বিন মালিকের পিতা জানান রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে সুককাহ ছিল ও তিনি তা ব্যবহার করতেন।

আল আলবানি বলেন: সুককাহ হলো কালো মৃগনাভি; সময়ের সাথে সাথে এর সুগন্ধ বাড়ে। এর আরেকটি মানে হতে পারে মৃগনাভি রাখার পাত্র, এটাই মনে হয় সঠিক ( বর্ণনায় দাউদ, মুসলিম)।

http://www.nirmanmagazine.com/index.php/2011-06-18-11-28%20%20-54/238-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%AC-%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%9A%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%AC-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A6%E0%A6%BE

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

সালাম

নির্মাণ  ম্যাগাজিনে   সম্পাদিত  হয়ে  লেখা  প্রকাশের  পর ইনশাআল্লাহ

পরবর্তী পর্বগুলি  পোস্ট  করবো  এখানে ।  তাই  মন্তব্যে  যে পোস্টগুলি দিয়েছিলাম , তা  মুছে  দিচ্ছি ।

মাশাআল্লাহ্। গুরুত্বপূর্ণ পোষ্ট। কিন্তু মন্তব্যের ঘরে মূল পোষ্টের লেখা না দিয়ে মূল পোষ্টে দিলে ভালো হতো।

এছাড়া আপনি তিনটি পোষ্ট দিতে পারতেন।

তাছাড়া ছোট পোষ্ট হলে পাঠকও বেশী পাওয়া যায়। অর্থাৎ বেশী মানুষ আপনার লেখাটি পড়ার সুযোগ পেল।

sl

 

 

যেহেতু  একটি বই  পোস্ট করবো , তাই  ভাবলাম  এক জায়গায়  দিলে পড়তে সুবিধা হবে ।  আলাদা আলাদা  করে প্রতিটি  পরিচ্ছেদ  পোস্ট করলে  হয়তো  কারো  পুরো লেখা খুঁজে পেতে  কষ্ট হবে ।

salam alaykum. I agree with fajl that it would be better to post separately. People may not go thru the comments to read all those.

after u finished all the posts, u can rather upload to a pdf and link it for everyone to download.

JazakiAllahu khayr for the useful posts.

বইটি কার অনুবাদ করা? পুরোটাই কি দিয়েছেন? না আরো বাকী আছে?

তবে যাই বলেন, ছোট ছোট পোষ্ট দিলে অন্ততঃ ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা বেশী। প্রতিটি পোষ্টে আপনি পূর্ব ও পরবর্তী পোষ্টগুলোর লিংক সংযোজন করে দিতে পারেন।

sl

 

বইটি  আমি  অনুবাদ করেছি ।    অনুবাদ  নিয়ে কোন পরামর্শ থাকলে  জানাবেন ।

 

মোট  দশটি পরিচ্ছেদ ।    ইনশাআল্লাহ  , আলাদা আলাদাভাবে  লিংকসহ  দেয়ার  চেষ্টা করবো ।

 

ভালো লাগল ।

-

নিরপেক্ষতা মানে যদি এই হয় যে তা সত্যের পক্ষেও নয় মিথ্যের পক্ষেও নয় বরং নিরপেক্ষ তবে আমি নিরপেক্ষ নই , সত্যের পক্ষে ।

sl

 

 

 ধন্যবাদ ।

 

 

সালাম

 

নির্মাণ  ম্যাগাজিনে   সম্পাদিত  হয়ে  লেখা  প্রকাশের  পর ইনশাআল্লাহ পরবর্তী পর্বগুলি  পোস্ট  করবো  এখানে ।  তাই  মন্তব্যে  যে পোস্টগুলি দিয়েছিলাম , তা  মুছে  দিচ্ছি ।

http://www.nirmanmagazine.com/index.php/2011-06-18-11-28%20%20-54/238-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%AC-%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%9A%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%AC-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A6%E0%A6%BE

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)