জ্ঞানের দিকে পুরো মনোযোগ দিতে হবে ও সব বাধা দূর করতে হবে :

sl

 

প্রথম ও দ্বিতীয় পোস্ট  এখানে :   আদব  ( জ্ঞান চর্চাকারীর আদবকায়দা )

মূল : শেখ  আবু আবদুল্লাহ  মুহাম্মদ  সাঈদ রাসলিন , সৌদি আরব
http://bishorgo.com/user/362/post/1077#comment-3596

 

-  ৩  -
জ্ঞানের দিকে পুরো মনোযোগ দিতে হবে ও সব বাধা দূর করতে হবে :

 

 


ইবনে  আল  কাইয়াম رضي الله عنهم    বলেন :  তুমি কী পাচ্ছো  তা নির্ভর করে অভ্যাস ত্যাগ  ও অন্য কিছুর  সাথে  একাত্ম  হওয়ার উপর  ।

 

 


কিছু  নিয়ম চালু   আছে  যাতে  মানুষ  অভ্যস্থ  হয়ে গিয়েছে ও  এসব রীতিকে  শরীয়াহর  স্তরে বসিয়েছে  , বরং কিছু ক্ষেত্রে    এসব  রীতিকে  শরীয়াহ  থেকে  বেশী সম্মান  দেয়া হয় ।  যারা  এসব মানতে  চান  না , তাদেরকে  কঠোরভাবে  তিরস্কার  করা  হয়  ;  এমনো  হয়  এদেরকে  কাফির ,  বেদাত  সৃষ্টিকারী   বা  পথভ্রষ্ট  বলা  হয়  ।   প্রচলিত   এসব   নিয়মের  জন্য  এরা  রাসুল   ﷺ   এর   নিয়মকে   মেরে  ফেলে  ও  নিজেদের   নিয়মকে  রাসুল ﷺ   এর  অংশীদার  বানায়  ।

এদের  কাছে    সেটাই  ভাল  যা তাদের   নিয়ম মেনে  চলে  ও  তাই  খারাপ  যা  এসবের  বিরোধী ।  এসব  অভ্যাস  ও রীতিকে  আদমের  সন্তানদের  বিভিন্ন  দল  গ্রহণ  করেছে  যেমন  রাজা , নেতা  , বিচারক  ,
সুফি  ,  বিভিন্ন  কর্তৃপক্ষ  ও  সাধারণ  মানুষ ।

একদম  ছোট  থাকতেই   একজনকে  এসব  শেখানো  হয়  ;  বৃদ্ধরা  এসব শিখেই  বড়  হয়েছে  - এসব  রীতিকে  সুন্নাহ  হিসাবে  পালন  করা  হয়  ।  বরং   যারা এসব  পালন  করে  , তারা  এসব  অভ্যাসকে   সুন্নতের  থেকেও   বেশী  গুরুত্ব  দেয়  ।
যে  এসব প্রচলিত  অভ্যাস  দিয়ে  নিয়ন্ত্রিত  হয় ,   সে  আসলে  খুবই  হতভাগ্য  -  এর শেষ  ঘটে  কুরআন  ও  সুন্নাহ  ত্যাগ  করার  মধ্য  দিয়ে ।

 


এদের  কাছে    সেটাই  ভাল  যা তাদের  রীতি  অনুসারে  চলে  ও  তাই  খারাপ  যা  এসবের  বিরোধী ।   এসব  অভ্যাস  ও রীতিকে  আদমের  সন্তানদের  বিভিন্ন  দল  গ্রহণ  করেছে  যেমন  রাজা , নেতা  ,
বিচারক  , সুফি  ,  বিভিন্ন  কর্তৃপক্ষ  ও  সাধারণ  মানুষ ।

 

 


আল্লাহর  পথে  যাওয়ার  সময় শরীয়াহ  বিরোধী বাহ্যিক  ও  আত্মিক  নানা  বাধা  মনের ক্ষতি  করে  । 
এসব    তিনটি  বাধা  হলো :  শিরক  ,  বেদাত  ও  পাপ । শিরকের    বাধা দূর  করার  জন্য  তাওহীদকে  অবলম্বন  করতে  হবে  ।  বেদাতের   বাধা   দূর  করতে   সুন্নাহ  মেনে  চলতে  হবে ;  প্রকৃত  তওবার  মধ্য  দিয়ে  পাপের  বাধা  সরাতে  হবে ।

  আল্লাহ  ও  পরকালের  পথে  দাস  যাত্রা  শুরু  না  করা  পর্যন্ত  এসব    বাধা  তার  কাছে  স্পষ্ট  হয়  না ।  বাধাগুলি   লক্ষ্য    করার  পরে    একজন  বুঝতে  পারে  কিভাবে  এসব  তাকে  ক্ষতিগ্রস্থ  করেছিল  । আল্লাহর   পথে  রওনা  না হলে  একজন  ওভাবেই  থেকে  যাবে  ,  এসব  বাধার  গোপন  প্রভাব  বুঝতে  পারবে  না । 
এই  তিনটি  বাধা  থেকে  দূরে  যাওয়ার  জন্য  যে   শক্তি    দরকার ,   তার  জন্য  উচ্চতর  লক্ষ্য  ঠিক  করতে  হবে ।    তা  না হলে  এসবের  সাথে  সম্পর্ক   শেষ  করা  সম্ভব  না ।    মন  এমন  কিছু  ছাড়তে  চায়  না  , যা  সে  পছন্দ  করে ।  ব্যতিক্রম  হলো   যা  ত্যাগ  করা  হচ্ছে  তার বদলে  আরো  বেশী  পছন্দের  ও  গূরুত্বপূর্ণ  কিছু  যদি   পাওয়া  যায়  ।  যা  সে চায়  তার  সাথে  সম্পর্ক  যত  জোরালো  হবে  ,  অন্য  কিছুর  সাথে  সম্পর্ক  তত  দূর্বল  হবে  ।

 

 

 


ইবনে  আল  কাইয়াম  رضي الله عنهم     বলেন  ,  লক্ষ্যে  যেতে  হলে দরকার   বাজে  অভ্যাসগুলি  বাদ দেয়া  ;  অন্যান্য  কিছুর  সাথে  সম্পর্ক   ছিন্ন  করা  ও  অন্য  বাধাগুলি  পার হওয়া ।  এসব  নির্ভর    করবে  বৃহত্তর  লক্ষ্যের  সাথে  আপনার  সম্পর্ক  কতটুকু  শক্তিশালী  তার উপর ।  লক্ষ্যের  প্রতি  আপনার ইচ্ছা  যত  প্রবল  হবে , সেটার  জন্য  কোন  কিছু  ত্যাগ  করা  তত সহজ হবে ।  আপনার  মনে   হবে  আপনি  যা  চান তা  যেন  পেয়ে  গিয়েছেন । 
লক্ষ্যস্থলে  যাওয়াটা  মনে হবে  অল্প কিছুদিনের  ব্যপার  ,  ত্যাগ  যা  করতে  হবে  তা খুবই সামান্য  ।
 বদঅভ্যাসগুলি  হলো  মরিচীকার  মতো  যেমনটি  আল  ইমাম  আহমদ  رضي الله عنهم  বলেন :  যদি  কেউ   মৃত্যুর  কথা  ভাবে  ,  তবে  এই  দুনিয়ার  সবকিছুই    গূরুত্বহীন   হয়ে  পড়ে  ।   –

 যে  জ্ঞানের   চর্চাকারী ,  তার  আকাংখা  থাকবে   মৃত্যুর  পরের  জীবন  ও  আল্লাহর  জন্য  ।  সেজন্য  এই  লক্ষ্যস্থলের   জন্য  প্রবল   একাত্মতা   তার মনে  থাকতে  হবে ।  এই   দুনিয়ার  ভোগ –বিলাস  ও  চাকচিক্য  থেকে  দূরে  থাকার  মতো ব্যস্ততার জন্য  জ্ঞান চর্চা  যথেষ্ট  আর   বাকী  দিন  যা    আছে   তা খুবই  অল্প ।

 

 

 

 

আল  আশহাত   আবু  আর- রাবি   বর্ণনা  করেন  :  সুহবাহ  তাকে বলেন – তুমি  তোমার  ব্যবসার  সাথে  জড়িত  ছিলে  ও  তুমি  হয়েছো  ধনী  ও  সফল  ।  আমি  হাদীসের  সাথে  ছিলাম  ও  হয়েছি   গরীব । 

সুফিয়ান   বিন  উয়াইনাহ  বলেন ,    সুববাহ  বলেছেন  :  যে  হাদীস  নিয়ে  পড়াশোনা  করবে  , সে গরীব   হবে ।  আমি  এতটাই  গরীব  হয়ে পড়ি  যে  আমার  মায়ের  একটি  পট    সাত  দিনারে  বিক্রি  করি ।

আয  যুবায়ের  বিন  আবু  বকর   বলেন :   আমাকে নিয়ে আমার  ভাতিজি  বলে ,  আমাদের   পরিবারে   চাচা  তার  স্ত্রীর  সাথে  সবচেয়ে  ভাল  ব্যবহার  করেন  ।  চাচা   দ্বিতীয়  স্ত্রী  গ্রহণ  করেন  নি  বা  দাসী  কেনেন  নি ।

 

 

 

 

আমি   বললাম :    আমার  স্ত্রী  বলেন  , এসব   বই  থেকে  তিন  সতীন  তার  জন্য  কম যন্ত্রণাদায়ক হতো ।
আবু  তাহান  বলেন :  সুহবাহ  তার নিজের  অবস্থার  বর্ণনা করেছেন    ও যারা হাদীসের  ছাত্র তাদেরকে  উপদেশ  দিয়েছেন  ।  যারা হাদীস চর্চা  করে  তাদের  সময়  এর  পিছনেই  চলে  যায়  ; তাই তারা  নিজের   ও  পরিবারের জন্য  আয় করতে  পারে  না ।  ফলে  তারা   অন্যের  উপর   বোঝা  হয়ে  যায়  -  এটা  সহীহ  হাদীসে  যা আদেশ করা হয়েছে   তার  বিরোধী ।

 

 

 

সুহবাহের   কথা  থেকে  এই মানে করা ঠিক হবে না যে  , বেশী  অর্থ  রোজগার  করতে না পারায়   তিনি    দু:খ পেতেন  ।  তিনি ছিলেন  মহৎ ও  নির্লোভ  চরিত্রের  অধিকারী  - এতটাই  তিনি  নির্লোভ  ছিলেন  যে  একবার  আল – মাহদী  তাকে   ত্রিশ  হাজার দিরহাম  উপহার  দিলে   সুহহাব  সাথেসাথে  তা  গরীবদের  মধ্যে বিলিয়ে  দেন ।  তার  কথা  থেকে  এটাও   মনে  করা  ঠিক  হবে  না  যে ,   তিনি  মানুষকে  হাদীস  চর্চা  থেকে  বিরত থাকতে  বলতেন । বরং  তিনি হাদীস  চর্চার  পাশাপাশি  জীবিকা  অর্জনের   জন্য  ছাত্রদের  উৎসাহ  দিতেন ।

 

 

সুফিয়ান  বিন    উয়াহনাহ   বলেন  :  এসব  কালির   পাত্র  যে  মানুষের  ঘরে  ঢুকে ,  তার  স্ত্রী  ও  সন্তানদের  জন্য  জীবন কঠিন  হয়ে যায় ।   আত -  তাহহান  বলেন  :  কালির  পাত্র  বলতে  এখানে  হাদীসের  চর্চাকারীরা   যে  কালি  তাদের সাথে  রাখেন যেন    যখন যা  হাদীস  তারা  শুনতে  পান , তা লিখে রাখতে পারেন   সেটা বোঝানো হয়েছে ।

  সুফিয়ান   বুঝিয়েছেন  হাদীসের  ছাত্রদের  বেশীরভাগই   লেখা  নিয়ে  এত  ব্যস্ত  থাকেন  যে  পরিবারের  জন্য  আয়  করতে  পারেন  না  ।  ফলে  তাদের  স্ত্রী    ও  সন্তানরা  অভাবের  মধ্যে  থাকে  ।   কালির  পাত্র   নিয়ে  ব্যস্ত  থাকার জন্যই    এদের  এই কঠিন  অবস্থা । 


ইবনে জামাহ বলেন  :  ছাত্ররা  জ্ঞানের  পথে  তাদের তারুণ্য  ও  সময়কে  যতটুকু  সম্ভব   কাজে  লাগাবে  ।    কালকের  জন্য   আজকের  পড়া  ফেলে  রাখতে   তারা  যেন  প্ররোচিত  না  হয়  ।    প্রতিটি   ঘন্টা   যা  তাদের  জীবন  থেকে  চলে  যাচ্ছে   তা  খুবই  মূল্যবান  ও    তা  আর  ফিরে  পাওয়া  যাবে  না  ।  জ্ঞান   অর্জনের  পথে  যে  সব  বাধা  আছে    ও  যা   তার  মনোযোগ  নষ্ট  করে ,  সে  সবের   সাথে   সম্পর্ক  সাধ্যমতো  শেষ করতে  হবে  ।   এর  বদলে  তার   শক্তি    ও  সামর্থ্যকে    জ্ঞান  অর্জনের পথে   কাজে  লাগাতে হবে  ।

এজন্যই   যারা  সালাফ  তারা  পরিবার  ও  দেশ  থেকে  দূরে   চলে  যেতে পছন্দ  করতেন । কেননা ,  যদি  একজনের   চিন্তা - ভাবনা  অনেক  কিছুকে  ঘিরে  হয়  ,  তাহলে  সে   জ্ঞানকে  আবিষ্কার  করতে  পারবে না -  আল্লাহ  মানুষের  মনে   দুইটি  অন্তর  দেন  নি  ।  [  অনুবাদকের  ব্যাখ্যা :    একটি  মন  জ্ঞান চর্চা  করবে , অন্যটি  সংসার চিন্তায়  ব্যস্ত  থাকবে , এমনটি সম্ভব  না  ] ।


আল  খাতীব  আল বাগদাদী  رضي الله عنهم  বলেন :   জ্ঞান  তখনই   একজনের  হয়  যখন সে  তার কারখানা বন্ধ করে , বাগান  ধ্বংস  করে  ,  বন্ধুদের  ত্যাগ  করে  ও  পরিবারের  সব সদস্য  মারা  গিয়েছে  বলে  তাকে  আর  কারো জানাযায়  যেতে হয়  না ।    হয়তো একটু বেশী  বলা  হয়ে  গিয়েছে    - এখানে মূল  কথা  হলো  জ্ঞানের জন্য  একজন  তার  সব চিন্তা  ও মনোযোগকে  কাজে লাগাবে  ।

অন্যকিছুর  সাথে  সম্পর্ক  ত্যাগ  করা মানে  তার  উপর যারা নির্ভর করে  , তাদের  প্রতি দায়িত্বে  অবহেলা করা   বা  আয়  না  করে  অন্যের  করুণার  উপর  নির্ভর   করা  - যারা  হয়তো  সাহায্য করবে  বা  করবে  না  -  তা  নয় । 
আশ শাফেয়ী  رضي الله عنهم  বলেন :  যার বাসায়    খাবার নেই ,  তার  সাথে  পরামর্শ  করবে  না  ; কেননা  সে  যুক্তিহীন  মানুষ ।  জ্ঞানের  পথে   মনোযোগ  নষ্ট  করে  এমন  বিষয়ের  সাথে সম্পর্ক  না  রাখার মানে   যা  করার  দরকার  নেই , তাতে  সে নিজেকে ব্যস্ত  রাখবে  না ।    আয়  করা  ও  মন  এবং   শক্তিকে জ্ঞান চর্চায়   ব্যবহারে   ভারসাম্য   রাখতে  হবে ।   আবু   ইউসুফ   আল  কাজী  বলেন :   জ্ঞান   তোমাকে   তার  এতটুকুও    দেবে  না  যতক্ষণ  না  তুমি  তাকে  তোমার  পুরোপুরি   দিচ্ছ  ।

আল্লাহর  রাসূল  ﷺ      বলেছেন :  সেরা  দিনার  হলো   সেটি  যা  একজন  তার পরিবারের  জন্য  ,  আল্লাহর পথে    পশু  ও  সাথীদের  পিছনে   খরচ  করে ( বর্ণনায়  সাওবান ) ।
হাদীস  বর্ণনাকারী   আবু  কিলাবাহ  বলেন :   রাসূল ﷺ      পরিবারের  কথা  আগে বলেছেন ।  তার  চেয়ে  বড়  পুরষ্কার  আর  কে পাবে  যে তার  সন্তানদের  জন্য  খরচ করে  ও তাদেরকে সুরক্ষা  দেয় ?  

রাসূল  صلى الله عليه وسلم  বলেন :  আল্লাহর  পথে   তুমি যা খরচ  করো  যেমন  দাস মুক্তি , গরীবকে  দান  করা   ও  পরিবারের  ভরণপোষণ  ,    এসবের  মধ্যে   সবচেয়ে  বড়  পুরষ্কার  পাবে  যা  তুমি  পরিবারের  জন্য  খরচ করলে  (   বর্ণনায়  আবু  হুরায়রা عنهم رضي الله  ) ।

খায়তামাহ  বলেন  ,  আমরা  একদিন  আবদুল্লাহ  বিন  উমরের  সাথে ছিলাম  ।  তার  কোষাগারের   কর্মচারী  সেখানে  আসলে   তিনি জানতে  চান  -   দাসদের  খাবার  দিয়েছ ?  না উত্তর  শুনে তিনি  বললেন , যাও , ওদের খেতে  দাও ।  রাসূল  صلى الله عليه وسلم  বলেছেন :   পাপের জন্য  এটাই যথেষ্ট  যে  একজন  তার  অধীনে  যারা আছে  তাদেরকে    সময়মতো  খেতে   দেয় নি  ( সহীহ  মুসলিম )।
সুফিয়ান  আস  সাওরীর  কাছে  কেউ   জ্ঞান  অর্জনের  জন্য  আসলে  তিনি   তাকে  প্রশ্ন  করতেন  :  তোমার   কি  কোন  রোজগার আছে ?  যদি নিজের  খরচ  চালানোর মতো ক্ষমতা    তার  থাকতো , তবেই  তিনি  তাকে অনুমতি   দিতেন  তার কাছে  শিক্ষা  গ্রহণের  ।  তা না হলে   বলতেন , যাও  , আগে  কিছু রোজগার  করো  ।

 

এই আলোকে  আমরা  সালাফদের  কথা  এভাবে  ব্যাখ্যা  করবো যে , তারা বেঁচে  থাকার  জন্য  কমপক্ষে  যতটুকু  দরকার  ঠিক  সেটাই  নিজের  ও পরিবারের  জন্য  চাইতেন  ।  ঘন্টার পর ঘন্টা  ধরে  দুনিয়াদারির  অনর্থক    কাজে   তারা ব্যস্ত   হতেন  না  ও   সব প্রলোভন  থেকে  মুক্ত  থাকতেন  ।  সালাফরা  জ্ঞানকে  এতই  ভালবাসতেন  যে সেটা  তাদের   দুনিয়ার  জীবনকে  গভীরভাবে   প্রভাবিত  করেছিল ।     এ নিয়ে আবু  হুরায়রা رضي الله عنهم    বলেন   , তোমরা  বলো  আমি রাসূল صلى الله عليه وسلم  এর
কাছ  থেকে  শোনা  কথা অনেক বেশী বর্ণনা  করেছি ।   তোমরা জানতে চাও    কেন   মুহাজির  ও  আনসাররা  আমার  মতো  এত  বেশী  হাদীস  বর্ণনা  করে  নি ?
আমার মুহাজির  ভাইয়েরা  বাজারে  তাদের  ব্যবসা  নিয়ে ব্যস্ত  থাকতো  আর  আমি  রাসুল صلى الله عليه وسلم  এর     কাছে    থাকতাম  ;  আর   তারা যা  মুখস্ত  করতো  না  , আমি  তা মুখস্ত  করতাম  ।   এ  সময়  যা   খেতে  পেতাম   তাতেই  আমি খুশী  থাকতাম ।

আমার  আনসার  ভাইয়েরা  তাদের  সম্পদ  নিয়ে  ব্যস্ত  থাকতো  আর  আমি  আস – শুফফার  এক গরীব  মানুষ   সেই  হাদীস মুখস্ত  করতাম  যা   তারা  ভুলে  যেত ।   রাসুল صلى الله عليه وسلم     বলেছিলেন ,  “ আমার কথা  শেষ  না হওয়া পর্যন্ত  যে  তার কাপড়  গুটিয়ে  নেবে  না  , সে তাই  মনে  রাখতে পারবে  যা  আমি বলেছি ।  ”    তাই  রাসুল صلى الله عليه وسلم  এর  কথা শেষ  না  হওয়া পর্যন্ত     আমি  চাদর  মেলে  বসে   থাকতাম  ।  যখন  তিনি  কথা  শেষ  করতেন  , তখন   চাদর  গুটিয়ে  বুকে  ধরতাম  ।   তাই  আমি  রাসুল صلى الله عليه وسلم  এর   বলা কথা  ভুলি  নি  (  বর্ণনায়  ইমাম  বুখারী ও  ইমাম  মুসলিম ) ।
ক্ষুধা লাগলেও   খেতে না গিয়ে  রাসুল صلى الله عليه وسلم  এর  সাথে  আমি  থাকতাম ।  ঐ  সময়ে  আমি  ভাজা রুটি  খেতাম  না  বা  রঙীন  কাপড়  পরতাম  না ।  কোন  নারী – পুরুষ  আমাকে  খাবার  বেড়ে  খাওয়ায়  নি  ; আমি  পেটে  পাথর  বেধে  রাখতাম   আর  কাউকে  কুরআনের  কোন আয়াত  শুনাতে বলতাম যদিও  তা আমার জানা থাকতো  ( বুখারী ) ।

ইমাম  বুখারী  তার  বইয়ের সহীহ  জ্ঞান  অধ্যায়ে   আবু  হুরায়রার ঘটনার বর্ণনা  দিয়েছেন  ।  “  লোকে  বলে  আবু  হুরায়রা  খুব  বেশী   হাদীস বলে  ।  আল্লাহর  বইতে  যদি   এই  দুইটি আয়াত  না  থাকতো , তবে  আমি একটি হাদীসও  বর্ণনা  করতাম  না : 

 মানুষের জন্য  যা  আমি  কিতাবে  বর্ণনা করি ,  তারপর  যারা  আমার  নাযিল  করা  সুস্পষ্ট   নিদর্শন ও পরিষ্কার  পথনির্দেশ  গোপন করে ,  এরাই  হচ্ছে  সেই  লোক  যাদের    আল্লাহ  অভিশাপ   দেন  ,  অভিশাপ  দেয়  অন্যান্য  অভিশাপকারীগণও   ।

তবে  যারা  ফিরে  আসবে  ও  নিজেদের শুধরে  নেবে  ,  খোলাখুলিভাবে   তারা  ( সে সব সত্য )  কথা প্রকাশ  করবে  (  যা  এতদিন  আহলে কিতাবরা  গোপন  করে  এসেছিল )  ,  তারা   হবে  সেই লোক  যাদের  উপর  আমি  দয়া  দেখাবো  , আমি পরম  ক্ষমাকারী , দয়ালু    (  সুরা  বাকারা  ১৫৯ – ১৬০ ) ।
অবশ্যই   আমাদের  মুহাজির  ভাইয়েরা ব্যবসা  ও  আনসার ভাইয়েরা   তাদের সম্পদ  নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন  আর  আবু  হুরায়রা   রাসুল صلى الله عليه وسلم  এর  সাথেসাথে   থাকতেন ।   অন্যরা  যাতে অংশ নিতো  না  , তিনি  তাতে  যোগ  দিতেন  ও অন্যরা  যা মুখস্ত  করতো  না ,  তিনি  তা মুখস্ত  করতেন ।


আল  হাফিয   ইবনে  হাজার  رضي الله عنهم    বলেন  ,  তিনি   ( বুখারী )   তার বইয়ের   এই  অধ্যায়ে   আবু  হুরায়রা  ছাড়া    আর  কারো  কথা বলেন   নি ।  এর   কারণ  আবু  হুরায়রা  সাহাবীদের  মধ্যে   সবচেয়ে  বেশী  হাদীস  মুখস্ত করেছেন  । 
আশ  শাফেয়ী  رضي الله عنهم  বলেন  :   আবু  হুরায়রা   رضي الله عنهم    তার সময়কালে  সবচেয়ে  বেশী  বর্ণনা    মুখস্ত  করেছেন ।    আবু  হুরায়রার   জানাযায়  দাড়িয়ে  ইবনে  উমর    رضي الله عنهم      আল্লাহর   করুণা   প্রার্থনা  করেন  এই  বলে  যে   তিনি  রাসূল  صلى الله عليه وسلم  এর
 কথা মুসলমানদের  জন্য  মুখস্ত  করেছিলেন ।
আন  নাওয়ায়ী   বলেন  :   তিনি  রাসূল  صلى الله عليه وسلم  এর  সাথে  সবসময়     থাকতেন  ;   নিজের  জন্য যে জীবিকার ব্যবস্থা    হতো , তিনি তাতেই  সন্ত্তষ্ট   হতেন  ;  টাকা   জমানোর  দিকে তার কোন   আকর্ষণ  ছিল  না  ( সহীহ  মুসলিম )  ।

  রাসূল    صلى الله عليه وسلم       একবার    আবু হুরায়রাকে  বলেছিলেন , তুমি   কি  আমার কাছে  গণীমতের  মাল  নিয়ে  জানতে  চাইবে  না যা  অন্য  সাহাবীরা  জানতে চেয়েছে ?    আবু  হুরায়রার   জবাব  ছিল  ,  আমি আপনার  কাছে  তাই জানতে  চাই  যা আল্লাহ  আপনাকে    জানিয়েছেন  (  বর্ণনায়  ইবনে  কাসির  ) ।
আবু  হুরায়রা  যদিও   হজরত  মুহাম্মদ   صلى الله عليه وسلم   এর
সাথে  বেশীদিন  থাকার  সুযোগ পান  নি   ,  সাহাবীদের  মধ্যে   তিনিই   বেশীরভাগ  হাদীস  মুখস্ত  করে  নেন  ।  মনে  করা  হয়    ত্রিশ  বছর  বয়সে তিনি  ইসলাম কবুল করেন ।    এরপর  থেকে   তিনি  রাসূল  صلى الله عليه وسلم  মারা  যাওয়ার  আগে  পর্যন্ত  তাঁর সাথে সবসময়  থাকতেন ।  তাই   মাত্র  তিন বছর  রাসূল  صلى الله عليه وسلم  এর  সাথে   থাকার  সুযোগ  পাওয়ার পরেও    তিনি সবচেয়ে    হাদীস  মুখস্ত  ও বর্ণনা  করেন ।
এটা  সম্ভব   হয়েছিল  কেননা    জ্ঞানের  ব্যপারে    তিনি  ছিলেন  খুবই  আন্তরিক  ;  এ  বিষয়ে  দুনিয়ার  সব  বাঁধা  তিনি   দূর  করেছিলেন  ও  মনকে   অন্য  সব  কিছু  থেকে  মুক্ত   রেখেছিলেন ।   জ্ঞানের  পথে  যা বাধা  দেয়  , তা থেকে   ছাত্রদের দূরে  থাকতে  হবে  ; কেননা  কারো  মনোযোগ যদি   এদিক – সেদিক  ছড়িয়ে    যায়  ,  তবে সে  জ্ঞানকে পাবে না ।

সালাফরা   সবকিছু  থেকে   জ্ঞানকে বেশী  গূরুত্ব   দিতেন  ।  যেমন   আল  ইমাম   আহমদ   رضي الله عنهم চল্লিশের  পরে  বিয়ে  করেন ।
আবু  বকর  আল  আম্বারীকে   এক   দাসী  দেয়া   হয়েছিল  ।  সে  যখন  একবার   আম্বারীর  কাছে   যায়  ,  তখন  তিনি   একটি  বিষয়ে  রায়  কী   হবে   তা নিয়ে  ভাবছিলেন  ।   দাসীকে  ঘরে  ঢুকতে  দেখে   তিনি বললেন  ,   একে  ফেরত পাঠাও  ।  দাসী  জানতে  চাইলো  তার  অপরাধ  কী  ?   তিনি  বললেন  ,  তোমার  জন্য  আমার  মনোযোগ  নষ্ট  হয়েছে  ।   জ্ঞানের  চেয়ে   তুমি  আমার  কাছে মূল্যবান  না  ।
আশ  শাফেয়ী   رضي الله عنهم    বলেন ,  কেউ  ধনী  ও  মর্যাদাবান  থাকার  সময়  জ্ঞানের   খোঁজ  করলে  সে  সফল  হবে  না । বরং  যারা  বিনীতভাবে  কম মর্যাদার  স্থানে থেকে   জ্ঞানীদের  সেবা  দেয় , তারা  সফল  হবে । 

মালিক   বিন  আনাস  رضي الله عنهم    বলেন  ,  কেউ জ্ঞানের  খোঁজ  পাবে  না  যতক্ষণ  না  সে অভাবের  মুখোমুখি    হয়  ও  জ্ঞানকে  সবকিছুর  উপর  গূরুত্ব  দেয় ।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

মাশাআল্লাহ্! পোষ্ট করতে পেরেছেন শেষ পর্যন্ত। ভাল লাগলো অনুবাদ বইটি থেকে পোষ্ট পেয়ে।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)