আদব (জ্ঞান চর্চাকারীর আদব-কায়দা)//২

 

 

সালাম

 

শরীয়াহ বিরোধী সবকিছু থেকে মন ও আচরণকে শুদ্ধ করতে হবে:

রাসূল ﷺ দূর্গন্ধ অপছন্দ করতেন ও তা থেকে ফিরে যেতেন। যেমন আবু সাঈদ আল খুদরী رضي الله عنهم বলেন, যখন খায়বার জয় করা হলো তখন আমরা কয়েকজন সাহাবী ক্ষুধার্ত ছিলাম। তাই রসুন গাছের কাছে গিয়ে প্রচুর রসুন খাই যতক্ষণ না মন সন্তুষ্ট হয়। এরপর মসজিদে যাই। রাসূল ﷺ গন্ধ পেয়ে বললেন: যে এরকম বাজে গন্ধযুক্ত কিছু খায়, সে মসজিদে আসবে না।

সবাই বলা শুরু করলো, রসুন হারাম হয়ে গিয়েছে।। রাসূল ﷺ এটা জানতে পেরে বললেন: হে মানুষ; আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা আমি হারাম করতে পারি না। তবে রসুনের গন্ধ আমি অপছন্দ করি ( বর্ণনায় মুসলিম )।

রাসূল ﷺ বলেন, যে রসুন, পেয়াজ ও পেয়াজের তরকারী খায়, সে ( ওসব খেয়ে ) মসজিদে আসবে না। কেননা, মানুষের মতো ফিরিশতারাও এসব গন্ধে কষ্ট পায় ( বর্ণনায় জাবির رضي الله عنهم )। রাসূল ﷺ বলেছিলেন, মুসলমানরা চল্লিশ দিনের বেশী গোঁফ না ছেটে, নখ, চুল, বগলের লোম না কেটে থাকবে না। আনাস বিন মালিক رضي الله عنهم বলেন, রাসূল ﷺ গোঁফ ছাটার জন্য ও নখ ও বগলের লোম কাটা ও যে চুল দেখা যায় না তা কাটতে ৪০ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন।

আন – নাওয়ায়ী (রহঃ)বলেন: এর মানে ৪০ দিনের বেশী না কেটে এসব রাখা যাবে না; আবার এর মানে এই না ৪০ দিন পর্যন্ত রাখতেই হবে ( সহীহ মুসলিম )।

রাসুল ﷺ আরো উৎসাহ দিয়েছেন মিসওয়াক ব্যবহার করতে। তিনি বলেছেন, যদি আমি এই ভয় না পেতাম যে উম্মাতের জন্য এটা খুব কঠিন হবে, তাহলে প্রত্যেক সালাতের আগে মিসওয়াক ব্যবহার করতে আদেশ দিতাম ( বর্ণনায় আবু হুরায়রা رضي الله عنهم, বুখারী ও মুসলিম)। তাই এসব পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে ছাত্ররা সতর্ক থাকবে।

রাসুল ﷺ এর সুন্নাহ মেনে এসব পালন করতে হবে ও দৃঢ়ভাবে একে ধরে রাখতে হবে। যারা জ্ঞানের ছাত্র, তাদেরকেই বেশী করে এসব ব্যপারে দৃষ্টি রাখতে হবে; কেননা তারা রাসুল ﷺ এর ওয়ারিস। এটাই স্বাভাবিক যে তারাই রাসুল ﷺ কে বেশী মেনে চলবে ও তাঁর দেখানো আদর্শে পথ চলবে।

অন্তরের পবিত্রতার জন্য জ্ঞানের ছাত্ররা অবশ্যই নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করবে অপছন্দীয় ও নিন্দনীয় স্বভাব থেকে। যেহেতু জ্ঞান হলো মনের ইবাদত, গোপন প্রার্থনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। বাহ্যিক অঙ্গগুলির উপাসনা গ্রহণযোগ্য হয় না, যদি তা বাহ্যিক অপবিত্রতা থেকে মুক্ত না হয়। আত্মিক উপাসনাও তেমনি কবুল হয় না যতক্ষণ না একজন নিজেকে পবিত্র করছে অপবিত্র আচরণ ও স্বভাব থেকে।

আল্লাহ বলেন: অবশ্যই মুশরিকরা অপবিত্র ( সূরা তওবা; ৯: ২৮ )। এই আয়াত দেখায় যে পবিত্রতা শুধু বাইরের দিকেই সীমিত না যা ইন্দ্রিয়গুলি দিয়ে অনূভব করা যায়; যেহেতু অবিশ্বাসীরা গোসল করে পরিষ্কার কাপড় পরে বাইরের দিক পবিত্র রাখতে পারে কিন্তু তার আত্মিক দিক নোংরা ও অপবিত্র। অন্যভাবে বলা যায়, তার অন্তর নাপাকীতে ভরা।

নাজাশাহ ( অপবিত্রতা ) একটি পরিভাষা যা ব্যবহৃত হয় যা থেকে দূরে থাকতে হবে ও যেটা থেকে ফিরে আসতে হবে। মনের নাপাকী সবচেয়ে গূরুত্বপূর্ণ অপবিত্রতা যা থেকে একজন দূরে থাকতে চাইবে। কারন এখন যদিও এটা শুধুই অপবিত্রতা, পরে স্বাভাবিকভাবেই এর এমন বিকাশ হবে যা একজনকে ধ্বংস করবে।

একবার জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসুল ﷺ এর সাথে দেখা করার কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আসতে দেরী করলেন। ফলে রাসুল ﷺ বিচলিত হলেন। পরে জিবরাইল আলাইহিস সালাম অভিযোগ করে বললেন, আমরা এমন ঘরে ঢুকি না যেখানে ছবি বা কুকুর আছে ( সহীহ বুখারী; বর্ণনায় ইবনে উমর رضي الله عنهم )।

আবু হামিদ আল গাযযালী رضي الله عنهم বলেন: মনও হলো বাসা। এই বাসা হলো ফিরিশতাদের যেখানে তারা নেমে আসে ও বাস করে। নিন্দনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেমন রাগ, লোভ, মিথ্যা বলা, হিংসা, উদ্ধত ভাব, আত্মপ্রশংসা ইত্যাদি হলো ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মতো। তাই কিভাবে ফেরেশতা এমন জায়গায় ঢুকবে? ইবনে জামাহ رضي الله عنه বলেন: জ্ঞানের পথের ছাত্র তার মনকে নৈতিক ত্রুটি, প্রতারণা, হিংসা ও খারাপ স্বভাব থেকে মুক্ত রাখবে যাতে সে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তা মনে রাখতে পারে, কোন বিষয়ের বিস্তারিত অর্থ ও জ্ঞানের গোপন সম্পদ আবিষ্কার করতে পারে।

অনেকে যেমনটি বলেন - জ্ঞান হলো গোপন ইবাদত, মনের উপাসনা ও আল্লাহকে কাছে পাবার আত্মিক উপায়। নোংরা ও নাপাকী থেকে মুক্ত না হলে বাহ্যিক ইন্দ্রিয়সমূহের ইবাদত কবুল হয় না; তেমনি মনের ইবাদত জ্ঞান অর্জন করা সহজ হবে না যদি সে নীচু, ঘৃণ্য স্বভাব ও আচরণ থেকে মুক্ত না হয়।

যদি তুমি তোমার মনকে জ্ঞানের জন্য পরিষ্কার রাখো, এর কল্যাণ স্পষ্ট বোঝা যাবে - ঠিক যেমন এক টুকরো জমি চাষের পর ফলনশীল হয়। হাদীসে বলা হয়েছে: অবশ্যই দেহের মধ্যে এক টুকরা মাংস আছে। যদি সেটা ভাল থাকে, তবে বাকী শরীর ভাল থাকবে। যদি এটা নষ্ট হয়, তবে বাকী দেহ নষ্ট হবে। অবশ্যই এটা হলো মন বা অন্তর ( ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম ও ইবনে হিববানের বর্ণিত একটি বড় হাদীসের অংশ এটি )।

কোন আলোর জন্য এমন মনের ভিতরে ঢোকা নিষেধ, যেখানে সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ যা ঘৃণা করেন তা থাকে। ইবনে আল কাইয়্যুম رضي الله عنهم বলেন: পাপ এই দুনিয়ায় দেহ - মনে কুৎসিত, নিন্দনীয় ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে; আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না এসবের প্রভাব পরকালে কী হবে। যার উপর এই প্রভাব পড়ে, সে জ্ঞান অর্জন করতে পারে না; কেননা জ্ঞান হলো এমন এক আলো যা আল্লাহ মনের ভিতরে রেখে দেন ও পাপ তা বের করে দেয়।

যখন আশ – শাফেয়ী (রঃ) পড়ে শোনাবার জন্য ইমাম মালেক (রঃ) এর সামনে বসেন, তখন শাফেয়ীর বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, বোঝা ও উপলব্ধি করার ক্ষমতা দেখে ইমাম (রঃ) অভিভূত হোন। তিনি বলেন: আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার মনের ভিতরে আল্লাহ আলো দিয়েছেন। তাই পাপের অন্ধকার দিয়ে এই আলো মন থেকে বের করে দিও না।ইমাম শাফীয়ি (রঃ) বলেন, আমি ওয়াকির কাছে মনে রাখার ব্যপারে আমার দূর্বলতা নিয়ে অভিযোগ করলাম। তিনি উপদেশ দেন পাপ ত্যাগ করতে ও বলেন: জেনে রাখো -
জ্ঞান হলো রহমত ও আল্লাহর রহমত পাপীদের কাছে পৌঁছায় না ( বর্ণনায় ইবনে আল জাওরী رضي الله عنهم (রহঃ)।

আবু আবদুল্লাহ বিন আল জালা বলেন: আমি এক খ্রিষ্টান বালকের দিকে তাকিয়ে ছিলাম যার চেহারা ছিল খুব সুন্দর। আবু আবদুল্লাহ আল কলযী আমাকে বললেন: তোমার কী হয়েছে? আমি বললাম: চাচা, আপনি কি এই সুন্দর চেহারা দেখছেন না? এত সুন্দর মুখ কিভাবে আগুনে শাস্তি পাবে? তিনি আমার বুকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, তোমার এই কাজের পরিণাম একদিন তুমি পাবেই।

এই ঘটনার চল্লিশ বছর পর শাস্তিটা পেলাম – আমি কুরআন ভুলে গেলাম।

আবু আল আদিয়ান বলেন: আমি আমার শিক্ষক আবু বকর আদ দাককারের সাথে ছিলাম। সেখানে এমন একটা কিছু ঘটলো যা ঠিক ছিল না – আমি তা তাকিয়ে দেখলাম। তিনি এটা খেয়াল করে বললেন: বৎস, এই তাকানোর পরিণাম তুমি ভোগ করবে, যদিও তা অনেক পরে হয়। বিশ বছর পার হয়ে গেল অপেক্ষায় – খারাপ কিছু ঘটলো না। এক রাতে আমি এ নিয়ে চিন্তা করে ঘুমাতে গেলাম। জেগে উঠে বুঝলাম আমি পুরো কুরআন ভুলে গিয়েছি।

আবু হামিদ رضي الله عنهم বলেন, যদি তুমি বলতে চাও - কিন্তু আমি তো এমন অনেক ছাত্র দেখেছি যাদের আদব ভাল না কিন্তু তারা যথেষ্ট জ্ঞানী - এই দুইয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। এই ছাত্র প্রকৃত, দরকারী জ্ঞান যা তাকে পরকালে কল্যাণ ও সুখ এনে দেবে - তার থেকে অনেক দূরে রয়েছে। জ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ থেকে তার কাছে এটা স্পষ্ট যে পাপ হলো প্রাণঘাতি ও ধ্বংসাত্মক বিষ। তুমি কি এমন কাউকে কখনো দেখেছ যে প্রাণঘাতি বিষের স্পর্শে আসতে চাচ্ছে? এটা জেনেও যে তা বিষ? তুমি যা দেখেছো তা হলো তারা বানিয়ে বানিয়ে কথা বলছে যা তাদের মন অস্বীকার করছে; আর একে কোন ভাবেই জ্ঞান বলে না।

ইবনে মাসউদ رضي الله عنهم বলেন: জ্ঞান কোন ধারাবাহিক বর্ণনা না, বরং এটা আলো যা মনের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অনেকে বলেন - জ্ঞান হলো ভয় যেমনটি আল্লাহ বলেন: অবশ্যই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, তারাই তাঁকে ভয় করে ( সূরা ফাতির; ৩৫: ২৮ )।

কেউ কেউ এ নিয়ে বলেন: আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য জ্ঞানের সন্ধান করেছিলাম। আর জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য হতে চায় নি। তাই জ্ঞান আমাদের থেকে চলে গেল ও তার আসল পরিচয় আমাদের কাছে প্রকাশ করলো না।

তাই তুমি যদি বলো, আমি একদল জ্ঞানী ও বিচারকদের দেখেছি যারা খুবই মেধাবী ও জ্ঞানীদের মধ্যে যাদেরকে সবচেয়ে সফল বিবেচনা করা হয় কিন্তু নিন্দনীয় আচরণ থেকে তারা মুক্ত নয়; তবে আমরা বলবো: যদি তুমি প্রকৃত জ্ঞান কী তা বুঝতে পারো ও পরকাল সম্পর্কে জানতে পারো, তাহলে তোমার কাছে এটা স্পষ্ট হবে যে তাদের মনকে যা আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা কোন কল্যাণকর জ্ঞান নয়। বরং সেটাই প্রকৃত কল্যাণকর জ্ঞান যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য,মহিমান্বিত আল্লাহর জন্য আমল করা হয়।

মনের পবিত্রতা ও দেহের অঙ্গের শরীয়াহ আইনের প্রতি সমর্পণকে ঘিরে এসব কিছু আবর্তিত হয়। তাই শিক্ষার্থীকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে আত্মিক ও বাহ্যিক দুই অবস্থার দিকেই যা হবে সুন্নাতপন্থী; যাতে আল্লাহ তার জন্য জ্ঞানের আলো ও সম্পদ উন্মুক্ত করে দেন। এসব হলো আল্লাহর অকৃপণ দান যা তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দেন ও আল্লাহ হলেন অফুরন্ত দানের মালিক।

 

 

http://www.nirmanmagazine.com/index.php/2012-07-01-00-00-00/248-আদব-জ্ঞান-চর্চাকারীর-আদব-কায়দা

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

ধন্যবাদ পোস্টের জন্য। ধীরে ধীরে বাকী পর্বগুলোও আশা করছি।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)