কোরআনের সাথে পথ চলা

কোরআনের
সাথে পথ চলা

-  উম্মু  নুসাইবা  

 

এখন থেকে প্রায় এক যুগ আগের কথা।
আমি তখন আমার স্বামীর সাথে হজ্জ্ব সফরে। একদিন সালাত আদায়ের পর মাসজিদ-উন-নাওয়ায়ীতে
বসে আছি। কিছুক্ষণ পর দীর্ঘদেহী শীর্ণকায়া এক তরুণী আমার পাশে এসে বসলো; তারপর কোরআন
খুলে তিলওয়াত করতে আরম্ভ করলো। 

গাঢ় কাল বর্ণের উজ্জ্বল চেহারার তরুণীটির তিলওয়াত শুনে
আমি যেন মুগ্ধ হয়ে গেলাম। না, তার তিলওয়াতের মাধুর্য্যে নয়, বরং তার আচরণে। আমি অবাক
দৃষ্টিতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকে দেখছিলাম। কারণ, আমার মনে হচ্ছিল যে, সে কোরআন পাঠ
করছে না, সে যেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা’র সাথে কথা বলছে। সে হাসছিল, কাঁদছিল, আবার কখনও
বা বিস্মিত কিংবা চিন্তিত হচ্ছিল। অর্থাৎ, সে কোরআন পড়ে সবই বুঝতে পারছিল। 

লজ্জিত আমি
নিজের আয়নায় নিজেকে দেখলাম। কোরআন থেকে তখন আমি লক্ষ-যোজন দূরে। কোরআন বুঝতে পারা তো
দূরের কথা, ভাল করে পড়তেও পারি না। নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জন করার পরও
আল্লাহপ্রদত্ত সবচাইতে মূল্যবান জ্ঞান সম্পর্কে আমি যে কত অজ্ঞ তা খুব সাধারণ এক মুসলিম
তরুণী যেন আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

আমি ভেবে দেখলাম, নিজ মাতৃভাষায় দক্ষতা
অর্জনের জন্য আমি কঠিন কষ্ট করেছি। সেইসাথে, ইংরেজীর মতো বিদেশী ভাষা রপ্ত করতেও জীবনপাত
করেছি। সময় ও অর্থ খরচ করে শখের বশে অল্পব্স্তির ফরাসী ভাষাও শিখেছি। কিন্তু হায়! বিশ্বজাহানের
প্রতিপালক আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আগত যে হেদায়েতের বাণী, তা বোঝার জন্য কোনপ্রকার
চেষ্টাই কোনদিন করিনি। ঐ মূহুর্তেই আল্লাহ’র কাছে নিজ ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা
করে সংকল্প করলাম আমাকে যে করেই হোক আরবী ভাষা শিখতে হবে। দু’রাকাত নামাজ পড়ে আমার
মহান রবকে বললাম, “হে আমার রব! তোমার এই গুনাহগার বান্দাকে তুমি ঐ তরুণীটির মতো কোরআন
বোঝার ও ভালবাসার ক্ষমতা দাও।”

এরপর, হজ্জ্ব থেকে এসে আমি খুঁজতে
লাগলাম কোথায় আরবী ভাষা শেখা যায়। তখন আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের
জন্য আরবী ভাষা শেখার খুব বেশী সুযোগ ছিল না। আর, ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষারও এত
প্রচার-প্রসার ছিল না। তবে, পরিচিত একজনের মাধ্যমে জানতে পারলাম ডা: আমিনুর রহমান নামে
পেশায় ডাক্তার এক ভদ্রলোক নাকি আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের আরবী ভাষা
শেখান। এরপর আমার জীবনের প্রথম আরবী ভাষার শিক্ষকের কাছে আমি প্রচন্ড উৎসাহ আর উদ্দীপনা
নিয়ে আরবী গ্রামার শিখতে আরম্ভ করলাম। 

কিন্তু, আল্লাহতায়ালা’র ইচ্ছা ভিন্ন ছিল। আর
তাই, প্রায় দু’বছর পর হঠাৎ করেই আমিনুর রহমান স্যার ইন্তেকাল করে তার মহান রবের সান্নিধ্যে
চলে গেলেন। কোরআনের জন্য স্যার যে ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছেন তার বিনিময়ে আল্লাহ তাকে পরকালে
অবশ্যই সম্মানিতদের অর্ন্তভূক্ত করবেন। স্যারের অকাল মৃত্যুতে আমার আরবী ভাষা শিক্ষা
অনেকটাই যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়লো। আমি কি করবো, কোথায় শিখবো, তার কোন কুলকিনারা করতে
পারছিলাম না। এটা ছিল ২০০৫ এর প্রথম দিকের কথা।

এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৬ সালের শেষের
দিকে দ্বীনি এক বোনের পরামর্শে উত্তরায় দার-উল-ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগে “লুগাতুল
আরারীয়্যাহ্” নামে একটি কোর্সে ভর্তি হলাম। যদিও আমি শ্রদ্ধেয় আমিনুর রহমান স্যারের
কাছে আরবী গ্রামারের কঠিন কঠিন বিষয়গুলো (নাহু ও সরফ) খুব ভাল করে আয়ত্ব করেছিলাম,
কিন্তু আমি এটা খুব ভাল করেই বুঝতে পারছিলাম যে, শুধুমাত্র ব্যকরণগত জ্ঞান কোন ভাষা
বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, আমি লক্ষ করছিলাম যে প্রায় আড়াই বছর আরবী গ্রামারের খুঁটিনাটি
বিষয় শেখার পরও আমি কোরআন বুঝতে পারছি না। আর, এ বিষয়টি আমাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছিল। 

আসলে
একটু দ্বিধাদ্বন্দ নিয়েই দার-উল-ইহসানে ক্লাস শুরু করেছিলাম। কারণ, আমি অনেক দেরীতে
ক্লাসে যোগ দিয়েছিলাম। কোর্স ততদিনে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আর, আমার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসের দূরত্বও অনেক ছিল। মতিঝিল থেকে গাড়িতে যেতেই প্রায় দেড় ঘন্টা লাগতো। যাই
হোক, প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকেই দেখলাম শিক্ষক (আমাদের শ্রদ্ধেয় মাহমুদ স্যার) সম্পূর্ণ
আরবী ভাষায় কথা বলছেন, ইন্ট্রাকশনও দিচ্ছেন আরবী ভাষায়, আর বইও পুরো আরবী ভাষায়। 

বইয়ের
মধ্যে এক বর্ণ বাংলা বা ইংরেজী লেখা নেই। শুধু তাই না, আরবী লেখায় জের, যবর, পেশও নেই।
আমার তো ভয়ে নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। ক্লাস করছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম আমি
হয়তো এখানে কন্টিনিউ করতে পারবো না। কিন্তু, কিছুদিন ক্লাস করার পরই আমি বুঝলাম যে,
আল্লাহতায়ালা তাঁর স্বীয় রহমতের মাধ্যমে আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। আর, কোরআন বুঝতে
হলে আমাকে সত্যিকার অর্থে এই রকম একটি কোর্সের সাথেই যুক্ত থাকতে হবে।

আমি
আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, আরবী গ্রামারের যে কঠিন কঠিন নিয়মগুলো আমি এতদিন অনেক কষ্ট
করে রপ্ত করেছি, এখানকার শিক্ষার্থীরা সেগুলো বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে নিজের অজান্তেই
সাবলীল ভাবে শিখছে। আর, সেইসাথে, নিয়মগুলোকে কোথায় কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটাও শিখে
যাচ্ছে। যেমন: আমি গ্রামার শিখতে গিয়ে “মুদাফ-মুদাফ
ইলাইহি”, “জার-মাজরুর” , “ই’য়র-ব”
কিংবা “বাব”-এর জটিল নিয়মকানুন শিখেছিলাম। কিন্তু, এর ব্যবহার কোথায় কিভাবে করতে হয়
সেটা কিছুতেই বুঝতে পারতাম না। বাক্যের গঠন নিয়েও খুব সমস্যা হত। কিন্তু, এখানে ক্লাস
করতে করতে অল্পকিছুদিনের মধ্যেই আমার কাছে সবকিছু একেবারে পরিস্কার হয়ে গেল। 

আমি সেইসময়
বুঝতে পেরেছিলাম যে, ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়েই গ্রামার রপ্ত করতে হয়। 

গ্রামার শিখে ভাষা
শেখা যায় না। আর, এ প্রচেষ্টা করা ভুল ও অবৈজ্ঞানিক। কারণ, বাস্তবজীবনে আমরা গ্রামারের
মাধ্যমে কোন ভাষা শিখি না। যেমন: বাংলা ভাষা আমরা ছোট্টবেলা থেকে শুনতে শুনতে, কিংবা
বলতে বলতে ও পড়তে পড়তে শিখেছি, গ্রামার দিয়ে শিখিনি। একই ভাবে, ইংলিশ মিডিয়ামের একটি
বাচ্চা যখন ৩/৪ বছর বয়সে স্কুল শুরু করে, তখন তাকে প্রথমে ইংরেজী গ্রামার শেখানো হয়
না। সে একই শব্দ বা বাক্য বারে বারে শুনতে শুনতে একসময় নিজে থেকেই এর অর্থ বুঝতে শুরু
করে এবং এর ভেতরকার অর্ন্তনিহিত গ্রামারগুলোও তার নিজের অজান্তেই রপ্ত হয়ে যায়। আবার,
একজন অশিক্ষিত মানুষও বাংলা গ্রামার এর পদ, সমাস, কারক কিংবা বিভক্তির মতো জটিল নিয়মকানুন
না জেনেই শুদ্ধ গ্রামার দিয়ে কথা বলতে পারে। কেউ যখন বলে, “আমি যাই, তুমি যাও, সে
যায়।” কিংবা, “এটি আমার কলম।” কিংবা, “আমি বাংলাদেশী, বাংলা আমার মাতৃভাষা।”
এই বাক্যগুলোর প্রতিটির মধ্যে গ্রামারের নিয়ম আছে। কিন্তু, ভাষা শেখার আগে এই নিয়ম
শেখানো হলে তা আসলে অত্যন্ত জটিল ও দূর্বোধ্য হয়ে যায়।

 

“আল-আরাবিয়্যাতু
লিন-নাশিয়্যিন” বইটির প্রথম খন্ড শেষ হতে না হতেই আমার কাছে বিভিন্ন ধরণের সহজ বাক্যগঠন,
বাক্যে নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার, আরবী ভাষায় ছোট ছোট ডায়লগ বলতে পারা, কাল, বচন, লিঙ্গ
ও সংখ্যার ধারণা, শূণ্যস্থান পূরণ, দ্রুত পড়তে পারা, এলোমেলো শব্দ সাজিয়ে অর্থবোধক
বাক্য তৈরী করা, এমনকি শ্রুতলিপি লেখার বিষয়গুলোও খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল।

 শুধু তাই নয়,
আমি এই বইটি শেষ করার পর লক্ষ্য করলাম যে, আরবী ভাষায় আমার শব্দসম্ভার অনেক গুণে বৃদ্ধি
পেয়েছে। এর আগে আমি আমাদের চারপাশের অল্পকিছু জিনিসের আরবী নাম শিখেছিলাম। কিন্তু,
এই শব্দগুলো কখনই ব্যবহার করতে পারতাম না। কিন্তু, প্রথম বইটি শেষ করার পর আমি দেখলাম
যে, আমি শুধু অসংখ্য শব্দই শিখিনি বরং সেইসাথে, ভাষায় এর ব্যবহারের নিয়মকানুনও শিখে
ফেলেছি।

 

এরপর,
“আল-আরাবিয়্যাতু লিন-নাশিয়্যিন” বইটির দ্বিতীয় খন্ডটি যেন আমার ভেতরকার আত্মবিশ্বাস
আরও বাড়িয়ে তুললো। আমি দ্রুত এবং খুব দক্ষতার সাথে জটিল থেকে জটিলতর বাক্যগঠন শিখতে
লাগলাম, শিখতে লাগলাম হারাকাহ ছাড়া কিভাবে সাবলীল ভাবে আরবী পড়া যায়, নিজে নিজেই ছোট
ছোট গল্পের আকারে টেক্সস্ট লেখা যায়, আর সেই সাথে নিজের অজান্তে শব্দসম্ভার বৃদ্ধি করা যায়। এখানে,
বলে রাখা ভাল যে, কোন ভাষা বুঝতে হলে যে কারও জন্য সেই ভাষার শব্দসম্ভার বৃদ্ধি করা
এবং সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দ ব্যবহারের যোগ্যতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরী।

 

আমি
ক্রমশ: বুঝতে পারলাম যে, অনেক গবেষণার মাধ্যমে এই বই-এর টেক্সট এবং অনুশীলনীগুলো এমন
ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যেন খুব সহজে ও দ্রুততার সাথে অনারবরা (যাদের আরবী ভাষা সম্পর্কে
কোনপ্রকার জ্ঞান নেই) আরবী ভাষা আয়ত্ব করতে পারে এবং তাদের নিজের অজান্তেই ধাপে ধাপে
আরবী গ্রামারের জটিল নিয়ম-কানুনগুলোও রপ্ত করতে পারে; আর, সেগুলোকে বাস্তবজীবনে ব্যবহার
করার যোগ্যতাও অর্জন করে। আর, যারা এ বইগুলো পড়াবেন তাদেরকেও এমন ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া
হয়েছে যেন, শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীদের অহেতুক গ্রামার সংক্রান্ত জটিল নিয়মকানুনের
ভারে ভারাক্রান্ত না করে তাদের জন্য যখন যেখানে যতুটুকু দরকার তখন ঠিক ততটুকুই শেখাতে
পারেন। 

এ পর্যায়ে গিয়ে আমি আবিস্কার করলাম যে, আমি কোরআন পড়তে গিয়ে একটা দুটো ছোট ছোট
বাক্য বা সহজ আয়াতগুলো একটু একটু করে বুঝতে পারছি। আমার মনে হল যেন, কোরআন তার বন্ধ
দরজাকে একটু একটু করে আমার জন্য খুলে দিচ্ছে। 

মনে আছে, তখন আমি বাসায় আমার স্বামী ও
সন্তানদের সাথে আরবী ডায়লগ সাবলীল ভাবে প্রাকটিস করতাম। ফলে, আমার সাথে আমার পরিবারও
একটু একটু করে আরবী ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগলো।

 

এর
পরের ইতিহাস আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বাস্তবতার কারণে দার-উল-ইহসানের ক্লাস আমাকে
বন্ধ করে দিতে হল। এক সেমিস্টার শেষ করে আর কন্টিনিউ করতে পারলাম না। তিন মাসের সন্তান
বাসায় রেখে এত দূরে এত লম্বা সময়ের জন্য ক্লাস করা এক পর্যায়ে আমার জন্য অসম্ভব হয়ে
গেল। পরে শুনেছিলাম, আমার সহপাঠীদের মধ্যে অনেক বোনই এই কোর্স শেষ করে আরবী তাফসীর
ও হাদিস বোঝার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, মাশাআল্লাহ্।

যাই
হোক, কোরআন বোঝার অদম্য আগ্রহ আমাকে দমিয়ে রাখতে পারলো না। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে খুঁজতে
লাগলাম আমার বাসার আশেপাশে কোথাও কোন কোর্স করা যায় কিনা। সত্যিকথা বলতে, এরপর আমি
বেশকিছু আরবী কোর্সের সন্ধান পেয়েছিলাম; আর এদের মধ্যে কয়েকটিতে যোগও দিয়েছিলাম। কিন্তু,
গিয়ে দেখেছি এদের প্রায় সবাই গ্রামার দিয়েই ভাষা শেখানোর চেষ্টা করছেন। কিংবা, কোরআনের
কিছু আয়াত বা শব্দাবলীর তালিকা করে সেগুলো শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে দাবী করছেন যে, এর
মাধ্যমেই তারা একসময় কোরআন বুঝতে পারবে। যেমন, হুয়া, হা-জা, উলাইকা, জালিকা, মান, ফি,
সামাওয়াত, আরদ্, আ’বুদু, কাফিরুন, মুশরিকুন…এ ধরণের আরও বহু শব্দ কোরআনে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলোর
অর্থ শিখে কেউ যদি দাবী করে যে, যেহেতু সে কোরআনে ব্যবহৃত শব্দাবলীর প্রায় ৮০ ভাগ শিখে
ফেলেছে, তাই সে অচিরেই কোরআন বুঝতে পারবে, তবে তা অবাস্তব। একটা উদাহারণ দিলেই বিষয়টা
পরিস্কার হয়ে যাবে। যেমন: বাংলায় আমি যদি “মাথা”
দিয়ে তিনটি বাক্য বলি,

 

১.
আমার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে।

২.
লোকটি গ্রামের মাথা।

৩.
ছেলেটির মাথা মোটা।

 

এখানে,
একটা শব্দ তিন জায়গায় সম্পূর্ন তিনটি ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করছে। প্রথম বাক্যে “মাথা”
বলতে আক্ষরিক অর্থে মাথাকেই বোঝানো হচ্ছে। দ্বিতীয় বাক্যে “মাথা” বলতে নেতৃস্থানীয়
ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে। আর, তৃতীয় বাক্যে “মাথা” বলতে বুদ্ধিমত্তাকে বোঝানো হচ্ছে।
এরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়।

 

আরবী
ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যেমন: “খাইর” শব্দের শাব্দিক অর্থ কল্যাণ। কিন্তু,
আল্লাহতায়ালা যখন বলেন, “ইয়াদ’য়ুনা ইলাল খাইর”– তখন এখানে “খাইর” শব্দের অর্থ দ্বীন-ইসলাম বোঝায়। কারণ, দ্বীন-ইসলামই
মানবজাতির জন্য সর্ববৃহৎ কল্যাণ। আবার, “নূর” শব্দের শাব্দিক অর্থ আলো। কিন্তু, আল্লাহতায়ালা
যখন বলেন, “লিতুখরিজান্ না-সা মিনাজ ‍জুলুমাতি ইলান নূর”– তখন এখানে “নূর” শব্দ দিয়ে দ্বীন-ইসলাম
বা হেদায়েতের পথকে বোঝানো হয়। এছাড়া, কোরআনে ব্যবহৃত আরবী’র সাহিত্য মান সর্বোচ্চ পর্যায়ের,
যাকে বলা হয় ক্ল্যাসিক্যাল এ্যারাবিক। ইংরেজীতে যেমন: শেক্সপিয়ার কিংবা, বাংলায় রবীন্দ্রনাথ।
কোরআনের মধ্যকার প্রতিটির শব্দের অর্ন্তনিহিত গভীর অর্থ আছে। যা আরবী ভাষার জ্ঞান,
ভাষায় শব্দের বিভিন্ন রকমের ব্যবহার, ভাষার অলংকার সংক্রান্ত জ্ঞান, আরবী ভাষার একান্ত
কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে বোঝা সম্ভব নয়।

 

পরবর্তীতে, দার-উল-ইহসানে পুণরায়
কোর্স আরম্ভ করার জন্য আমাকে সুদীর্ঘ সাতটি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এর মধ্যে আল্লাহ’র
দরবারে দোয়া করতাম যেন তিনি আমার জন্য কোন একটা সুব্যবস্থা করে দেন। আর, মাঝে মাঝে
শ্রদ্ধেয় মাহমুদ স্যারকে ফোন করে ধানমন্ডি বা এর কাছাকাছি কোন জায়গায় কোর্স আরম্ভ করার
অনুরোধ করতাম। কারণ, আমার ক্ষুদ্রজীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে,
দার-উল-ইহসান এর কোর্সটি বাংলাদেশে আরবী ভাষা শিক্ষার জন্য সবচাইতে কার্যকরী ও বৈজ্ঞানিক।
সেইসাথে, এখানকার শিক্ষকদের দক্ষতা, তাদের ভাষাগত জ্ঞানের গভীরতা এবং সর্বোপরি, শিক্ষাদানে
তাদের আন্তরিকতা অতুলনীয়। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর এই গুনাহগার বান্দার দোয়ার হাত ফিরিয়ে
দেননি। আল্লাহ’র ইচ্ছায় শেষপর্যন্ত দার-উল-ইহসান ২০১৩ সালে ধানমন্ডির ৯/এ-তে তাদের
“লুগাতুল আরাবীয়্যাহ” কোর্সটি আরম্ভ করে। এর কিছুদিনের মধ্যেই মাহমুদ স্যার তার অক্লান্ত
পরিশ্রমের মাধ্যমে সবার কাছে কোর্সটি আরও সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য পুরো কোর্সটিকে
নয়টি লেভেলে ভাগ করেন। যেহেতু আমি ইতিপূবেই আমি “আল-আরাবিয়্যাতু লিন-নাশিয়্যিন” বইটির
প্রথম দুটো খন্ড শেষ করেছিলাম, তাই মাহমুদ স্যারের নির্দেশে আমি ৭ম লেভেলে যোগ দিলাম।

৭ম লেভেলটি ছিল “বালাগাহ” বা আরবী
ভাষার অলংকার শাস্ত্রের উপর। “বালাগাহ” বা “সাহিত্যের অলঙ্করণ” একটি অত্যন্ত জটিল এবং
উচ্চ পর্যায়ের সাহিত্যের বিষয়। কিন্তু, মাত্র একটি সেমিস্টারের মাধ্যমে স্যার আমাদের
এর প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলো অত্যন্ত সহজ ভাবে শিখিয়েছেন। 

কোরআনের বিভিন্ন নির্বাচিত
আয়াতের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, “বালাগাহ” সম্পর্কিত জ্ঞান কোরআন বোঝার জন্য কত প্রয়োজনীয়।
যেমন: কোরআন সম্পর্কে একটা প্রশ্ন প্রায়ই করা হয় যে, আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন আয়াতে কেন
“আমি” না বলে “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন? যেমন: “ওয়া লাক্বদ খালাক্বনাস্ সামাওয়াতি
ও ওয়ালআরদ্”– এই আয়াতের শাব্দিক অর্থ করলে দাঁড়ায়,
“এবং নিশ্চয়ই আমরা আসমান ও জমীন সৃষ্টি করেছি।” তাহলে প্রশ্ন আসে, আল্লাহ্’র সাথে কি
কোন অংশীদার আছে? (নাউজুবিল্লাহ) কিন্তু, “বালাগাহ” সম্পর্কিত জ্ঞান থাকলে যে কেউ বুঝবে
যে, আসলে এটা একটা ভাষার প্রকাশ ভঙ্গী, যা আক্ষরিক অর্থ প্রকাশ করে না। সব ভাষাতেই
যখন সর্বোচ্চ পর্যায় বা অথরিটি থেকে কোন নির্দেশ বা বার্তা জনসাধারণের জন্য আসে তখন
সেখানে সম্মান বা কর্তৃত্ব বোঝাতে “আমি” না বলে “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

৮ম লেভেলে আমরা হাদিসের অর্থ করতে
শিখলাম। প্রথমে ছোট ছোট হাদিস দিয়ে স্যার শুরু করলেন। একসময় আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে,
আমরা ক্লাসের প্রায় সকলেই সেই হাদিসগুলোর অল্পবিস্তর মর্ম উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছি।
এরপর, যখন স্যার বড় বড় হাদিস শুরু করলেন, তখন মনে মনে আমি বেশ আতঙ্কিতই হয়েছিলাম। কিন্তু,
আল্লাহ’র ইচ্ছায় ও স্যারের সঠিক নির্দেশনায় আমরা এ পর্যায়টিও খুব ভাল ভাবে পার করলাম।
এ পর্যায়টি পার করার পর, আমার বড় বড় আরবী টেক্সক্ট সম্পর্কিত ভয় ভেঙ্গে গেল। দেখলাম
একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে ও চেষ্টা করলে যে কোন টেক্সক্ট থেকে অনেক অর্থই বোঝা যায়। যদিও
শব্দসম্ভার জনিত দূর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অভিধানের সহায়তা প্রয়োজন হয়।

আমরা জন্য সবচাইতে আনন্দদায়ক ছিল
৯ম লেভেল। কারণ, এই পর্যায়টির জন্যই আমি সুদীর্ঘ বারটি বছর অপেক্ষা করেছি। এ পর্যায়ে
স্যার আমাদের টেক্সক্ট বুক হিসাবে মওলানা আবু তাহের মিসবাহ রচিত “আত-ত্বরীক্বি ইলাল
কুরআন” বা “এসো কোরআন শিখি” – বইটির প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড নির্বাচিত করলেন। এই বইদুটোতে লেখক কোরআনের
বেশ সহজ কিছু আয়াত নির্বাচিত করে সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন, যেন যারা
কোরআন সবেমাত্র বুঝতে শুরু করেছে তাদের জন্য বিষয়টি সহজ হয়। মাহমুদ স্যার গ্রামার সংক্রান্ত
জটিলতার দিকে না গিয়ে অর্থের দিকে জোর দিলেন, যেন আমরা সরাসরি কোরআন পড়ে কোন অনুবাদের
সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে অর্থ বুঝতে পারি। এ লক্ষ্যে আমরা যে কোন আয়াতের প্রথমে প্রতিটির
শব্দের অর্থ করতাম। তারপর, পুরো আয়াতের অর্থ সুন্দর করে নিজের ভাষায় সাজিয়ে লেখার চেষ্টা
করতাম। কিছুদিনের মধ্যেই যে কোন আয়াতের অর্থ বের করা আমার কাছে অত্যন্ত সহজ হয়ে গেল।
আর, কোন অনুবাদের সাহায্য না আমি কোরআন বুঝতে আরম্ভ করলাম। এভাবেই, কোরআনের রহস্যেঘেরা
অপার সৌন্দর্য যেন আমার কাছে ধীরে ধীরে উম্মোচিত হতে থাকলো।

বস্তত: কোরআন ও আরবী ভাষা সম্পর্কে
আমাদের সমাজে অমূলক কিন্তু প্রচলিত বেশকিছু ধারণা প্রতিষ্ঠিত আছে। যেমন: মাদ্রাসায়
পড়াশোনা না করলে আরবী শেখা সম্ভব না। কিংবা, আরবী ভাষা খুব কঠিন একটি ভাষা। এটি সাধারণ
শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের পক্ষে আয়ত্ব করা সম্ভব না, ইত্যাদি। কিন্তু, আমরা কি বুকে
হাত দিয়ে বলতে পারবো যে, মাতৃভাষা সহ দুনিয়াবী অন্যান্য ভাষা শেখার জন্য আমরা জীবনে
যত কষ্ট করেছি, কোরআনের ভাষা শেখার জন্য তার দশ ভাগের এক ভাগ কষ্টও আমরা কখনও করেছি?
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা মুসলিমরা আজ অক্সফোর্ড, এম.আই.টি, কলম্বিয়া কিংবা হারভার্ড
এর মত নামী-দামী ইউনিভার্সিটিতে পড়ার লক্ষ্যে TOFEL, SAT, GRE – তে সর্বোচ্চ স্কোর-এর তোলার সাধনা করি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
অষ্ট্রেলিয়া কিংবা কানাডায় ইমিগ্রেশন এর জন্য জানপ্রাণ দিয়ে ইংরেজী শিখি। জাপান কিংবা
চায়নাতে ভাল চাকরীর আশায় জাপানীজ কিংবা চাইনিজ ভাষাও শিখি। বন্ধু মহলে স্ট্যাটাস বাড়ানোর
জন্য ফ্যাশন করে ফ্রেঞ্চ কিংবা জার্মান ভাষাও শিখি। এমনকি নিয়মিত হিন্দি সিরিয়াল দেখে
হিন্দি ভাষাও অবলীলায় রপ্ত করে ফেলি। কিন্তু, কেন যেন আরবী ভাষাটাই কখনও আয়ত্ব করতে
পারি না !

আর, পারি না বলেই, কোরআনের সাথে আমাদের
লক্ষ-যোজন দূরত্ব তৈরী হয়। আর, এর ভাষা হয়ে যায় হায়রোগ্লিফিক্স-এর সমগোত্রীয় কোন জিনিস।
শুধু তাই নয়, আমাদের মহান রব পথপ্রদর্শক হিসাবে যে কোরআন আমাদের জন্য নাযিল করেছেন,
সে কোরআন হয়ে যায় আমাদের কাছে শুধু পাঁচওয়াক্ত সালাতে না বুঝে মন্ত্রের মত পড়া, তাবিজ-কবজ
বা ঝাঁড়ফুঁকের জন্য ব্যবহার করা, এর কারুকার্য শোভিত আয়াত দেয়ালে ডেকোরেশন পিস হিসাবে
ঝুলিয়ে রাখা, কিংবা, মৃতব্যক্তির পাশে সুর করে পড়া, অথবা, অধিক সওয়াবের আশায় রমজান
মাসে একবার খতম দেয়ার জিনিস।

সবশেষে, আমি শুধু কোরআনের একটা আয়াত
দিয়ে শেষ করতে চাই, যে আয়াতটি আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন সুরা ক্বমার-এ আমাদের মত চিন্তাশূণ্য
সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বারে বারে বলেছেনঃ

“আমি এই কোরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য
সহজ করে দিয়েছি।

অতএব, কোন চিন্তাশীল ব্যক্তি আছে
কি?”

 

আমাদের মহান রব তাঁর নাযিলকৃত কোরআনের
দিকে আমাদের সকলকে আকুল ভাবে আহবান করছেন। তাঁর ডাকে সাড়া দেবার জন্য আপনাদের মধ্যে
কেউ আছে কি??

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

সালাম

এক  আপুর  অনুরোধে  উনার  লেখা   এখানে পোস্ট  করছি ।  যদিও  লেখাটি   বেশ  বড়  ,   কিন্ত্ত   অবশ্যই  পড়বেন  । অনেক  কিছুই   শেখার  আছে  উনার  অভিজ্ঞতা  থেকে ।

অনেক কিছুই শেখার আছে উনার
অভিজ্ঞতা থেকে

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)