অসুন্দরে সুন্দর তালাশ

বংশ পরিচিতিঃ- আগ্রা-অযোদ্ধা যুক্তপ্রদেশের মুজাফ্ফার নগর জেলার অন্তর্গত প্রসিদ্ধ শহর থানাভবনে ফারুকী বংশের চারটি গোত্রের লোক বসবাস করতো। তম্মধ্যে খতীব গোত্রই ছিল অন্যতম। থানাভবনে সুলতান শিহাবুদ্দীন ফররুখ-শাহ কাবুলী ছিলেন হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)এর ঊর্ধ্বতন পুরুষ। থানাভবনে এই বংশে বিশিষ্ট বুযুর্গ এ অলীয়ে কামেলগণ জম্মগ্রহন করেন। সুতরাং হযরত থানবীর পিতৃকুল হলো ফারুকী। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী, শায়খ জালালুদ্দীন থানেশ্বরী, শায়খ ফরীদুদ্দীন গঙ্গেশ্বর প্রমুখ খ্যাতনামা বুযুর্গগণ এই বংশেই জম্মগ্রহন করেছেন। এই হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) এর নাম কে না জানে? ধর্ম প্রান মুসলমানের মনের অনেকটা জুড়ে আছেন হযরত আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)।


জম্ম বৃত্তান্তঃ- হিজরী ১২৮০ সনের ৫ই রবিউসসানী বুধবার ছোবহে ছাদিকের সময় হাকীমুল উম্মত জম্মগ্রহন করেন। হযরত আশরাফ আলী থানবীর মাতা ছিল হযরত আলী (রাযিঃ) এর বংশধর। মাতৃকুল অনুযায়ী তার নাম রাখা হইল ‘‘আশরাফ আলী।’’ আর থানাভবনের অধিবাসি বলিয়া তাহাকে থানবী বলিয়া অভিহিত করা হয়।


চিরবিদায়ঃ- এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৯ শে জুলাই ১৯৪৩ ইং সোমবার দিবাগত রাত্রে এশার নামাজের পর ইহধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়ষ হয়েছিলো বিরাশি বছর তিনমাস এগার দিন। তার ইন্তেকালের দুইদিন পূর্বে পাজ্ঞাবের এক মসজিদের ইমাম(সৈয়দ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরির শাগরিদ) স্বপ্নে দেখেন, আকাশপ্রান্তে ধীরে ধীরে লিখা হচ্ছে
 
قد كسر جنآح آلأسلآم .
অর্থ্যাৎ(ইসলামের বাহু ভাঙিয়া গেছে।


বিশেষ গুণাবলীঃ- এই মহান ব্যক্তির মহৎ মহৎ অনেক গুণ ছিল। তার সবগুণের মধ্যে একটি গুণ এই ছিল যে, তিনি সব সময় অসুন্দর বস্তু থেকে তালাশ করে সুন্দর অর্থ বের করতেন। মূল্যহীন বস্তুকে মূল্যবান করে দেখতেন। মানুষের খারাবীকে সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন।


মূল আলোচনাঃ- হযরত আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) এর লিখিত মুসলমানের হাসি নামক বইতে একটি ঘটনা লিখেন যে, হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রঃ)  কোন একদিন বাজারের মধ্যো দিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখতে পেলেন, চৌরাস্তার মোড়ে অনেক লোকের ভীড়। তাদেরকে সরিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখলেন, এক ব্যক্তিকে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। তিনি আশপাশের লোকদের কাছে জানতে চাইলেন, কি অপরাধে এই ব্যক্তির এই শাস্তি হলো? উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একলোক বললো, এই লোক জাতীগত ভাবে চোর এবং চুরিই তার পেশা।


প্রথমবারঃ- লোকটি আরও বললো, এই লোক চুরির কারণে প্রথমবার ধরা পড়লে তাকে চুরি ছেড়ে দিতে বলা হয়। সে চুরি ছাড়বে বলেছে কিন্তু ছাড়তে পারেনি। কিছুদিন না যেতেই আবার চুরি করে, ফলে তার একচোখ উপড়ে ফেলা হয়।


দ্বিতীয়বারঃ- দ্বিতীয়বার সে আবার চুরি করে এবং আবার ধরা পড়লে, তাকে আবারও চুরি ছাড়তে বলা হয়। সে ছাড়বে বলে, কিন্তু ছাড়তে পারেনি। কিছুদিন যেতেই আবার চুরি করে, ফলে তার একহাতের কব্জি কেটে ফেলা হয়।


তৃতীয়বারঃ- তৃতীয়বার সে আবারও চুরি করে ধরা পড়লে, শেষবারের মত চুরি ছাড়বে বলে, কিন্তু সে ছাড়তে পারেনি। তারপরও সে আবার চুরি করে, ফলে এবার তাকে শূলে চড়িয়ে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। একথা শুনে জুনাইদ বোগদাদী (রহঃ) বললেন: ভাইয়েরা আমার! আমাকে সামান্য জায়গা করে দিন। আমি লোকটিকে দেখবো। লোকেরা সরে গিয়ে জায়গা করে দিলো। জুনাইদ বোগদাদী (রহঃ) ভেতরে গিয়ে একেবারে চোরের পায়ের কাছে গিয়ে দেখে শুলে চড়ানোর কারনে চোরের দু-পা হযরতের মুখের বরাবর ঝুলে আছে। তিনি চোরের দু'পায়ে জড়িয়ে ধরে কয়েকবার চুমো খেলেন। জমায়েত লোকেরা সবাই অবাক হল। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো কি ব্যাপার, এত মর্যাদাবান ও এত বড় আলেমের কি হলো যে, তিনি চোরের পায়ে চুমা খেলেন। আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) লিখেছেন: জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) বললেন আমি কোন চোরের পায়ে চুমো খাইনি। লোকেরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো এবং কাছে এসে জানতে চাইলো: হে আমাদের সম্মানিত হুজুর, আপনি এত মর্যাদাবান, কত বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন, আপনি আজ কি করলেন? আমরা তো দেখলাম আপনি নিকৃষ্ট একজন চোরের পায়ে চুমো খেলেন? যে কারনে তাকে আজ শুলে চড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হল। কেন আপনি এমন করলেন?


অসুন্দরে সুন্দর মানেঃ- জুনাইদ বোগদাদী (রঃ) বললেন আপনারা যদিও দেখেছন যে, আমি চোরের পায়ে চুমো খেয়েছি, প্রকৃতপক্ষে আমি কোন চোরের পায়ে চুমো খাইনি; বরং আমি চুমো খেয়েছি এক মহৎপ্রাণ ব্যক্তির পায়ে। যে একবার চুরির কারণে একচোখ হারিয়েছেন। দ্বিতীয়বার চুরির কারণে এক হাত হারিয়েছেন। এবং শেষবার চুরির কারণে মূল্যবান জীবনটাই হারিয়েছেন। তবুও সে চুরিকর্ম ছাড়তে পারেনি। সে তার সিদ্ধান্তে অটল, অবিচল থেকে জীবন দিয়েছেন। আমি তার এই অটলতাকে চুমো খেয়েছি, অবিচলতাকে চুমো খেয়েছি। তার কাছে জীবনের চেয়ে তার কর্মই বড় ছিল। সে জীবন দিয়েছে, কিন্তু তার কর্ম থেকে একচুল পরিমাণও সরে আসেনি।


উপদেশঃ- আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন: ভাইয়েরা আমার, আমরা শুধু তার খারাপ দিকটাই দেখেছি যে, সে চোর। কিন্তু তার ভাল দিকটা দেখতে পাইনি। সে কতটা অটলতা ও অবিচলতার সাথে এই কর্ম পালন করেছেন। এবং এই কর্মের জন্য তার মূল্যবান জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন। তা আমরা একবারও ভাবিনি। আমরাও যদি এরূপ ভাবে আল্লাহর দেয়া বিধানের উপর এমনভাবে অটল, অবিচল থাকতে পারতাম? তো আল্লাহ আমাদের সব গুনাহ অবশ্যই মাফ করে দিতেন। এই বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন।


আমাদের অবস্থাঃ- বর্তমানে আমাদের অবস্থা হল, আমরা অসুন্দরকে সুন্দর হিসেবে ভাবতেই পারিনা। ভালোকে খারাপ করে দেখি। আসলে ভালোকে ভালো ভাবা, আর অসুন্দর থেকে সুন্দরের প্রকাশ, বড়ই কঠিন। এ গুণ সবার মাঝে থাকাটা কঠিন। তবে আল্লাহ তা’য়ালা যাকে এগুণে গুণান্বিত করেন একমাত্র সে-ই তা পায়। সে-ই তা করতে পারে। অন্য কেউ তা পায় না। আমাদের সবাইকে পরম দয়ালু আল্লাহ তা’য়ালা- হযরত আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) ও হযরত জুনাইদ বোগদাদী (রহঃ) এই ব্যক্তির মত আরও মহীয়সী ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে পড়ে তাদের মত -এমহৎ গুণের অধিকারী করুন। আমরা যেন আজ থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই সব অসুন্দর থেকে সুন্দর তালাশ করার।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে তৌফিক দিন।

আমিন।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)