বাস্তবতায় জীবনের মানে কঠিন!!

শাহ জালাল উদ্দীন খাঁন খুব শখিন লোক! স্বল্পভাষী! সব সময় ঠান্ডা  মেজাজ নিয়ে থাকেন! যেন পৃথিবীতে তার কোন শত্রু নেই! পরিচিত ছোট বড় সবার সাথেই সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় কথা বলেন! অতিরিক্ত আড্ডা বা অতিরিক্ত লোক পছন্দ করেন না! নিরব নিরব থাকতে পছন্দ করেন! সবসময়ের জন্য তিনি সাদাসিদে জীবন-যাপন করেন! তবে একটু বাজে নেশাও আছে সেটা হলো সিগারেট পান করা! আর এজন্য দুই দুইবার টি ভি রোগে আক্রান্তও হয়েছিলেন! আর উন্নত চিকিৎসায় এখন সুস্থ আছেন! সংসারের কোন ভেজালে তিনি নেই! বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে দোকান ভাড়া বিদেশ থেকে ছেলের টাকা সহ সবকিছুর হিসাব নিকাস করেন মিসেস জালাল উদ্দীন! বাজার করানো থেকে বাকি সব কাজই লোক দিয়ে করিয়ে নেন মিসেস জালাল উদ্দীন! ছেলে-মেয়ের পড়া-শুনার সব খবরা-খবর রাখেনও তিনি! মোট কথা সকল কিছুর হর্তা-কর্তা তিনিই! লেন দেন সহ সবকিছুর!

শাহ জালাল উদ্দীনের ছেলে মেয়ে তিনজন! বড় মেয়ে এরপর দুই ছেলে! মেয়ের বিয়ে হয়েও এক মেয়ে হওয়াতে আর স্বামী প্রবাসী হওয়াতে বাবার বাড়িতেই থাকতেন মেয়ে! কিছুদিন আগে মেয়ের স্বামী দেশে এসে বাবার বাড়ির কাছেই আলাদা বাসা নিয়ে চলে যান! আর বড় ছেলে ইতালিতে থাকেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে! ছোট ছেলে এম এ পাস করে লন্ডনে যাবেন পড়ার-শুনার ভিসায়! সবকিছু ঠিক করা আছে! পরীক্ষা শেষ করেই যাওয়ার কথা! মিসেস জালাল খাঁন তিনি অত্যন্ত স্বজন প্রিয়! স্বজন প্রীতি ছাড়াও মানুষের জন্য তিনি নিজে না খেয়ে থেকেও মানুষের প্রয়োজন পূরন করেন! কেউ যদি এসে কিছু চায় নিজের কাছে না থাকলেও অন্যের কাছ থেক ধার করে এনে দেবেন! এমন কি কেউ যদি তার পরিধানের কাপড়কেও সুন্দর বলেন তবে তিনি তা দিয়ে দেন! মোট কথা কারো উপকারের জন্য নিজে উজার হয়ে যান! এমন কি আত্মীয় স্বজনের কেউ বিদেশে যাবে তার জন্য নিজের বাড়ি বিক্রি করে  টাকা ধার দিয়েছেন! এমন কি সুদে এনে হলেও মানুষের উপকার করবেন আর নিজে সে সুদের বোঝা টেনে যাবেন! যা তার সন্তানেরা পছন্দ করেন না! যদিও মিসেস জালাল উদ্দীন ছেলে মেয়েদের মানুষ করতে অনেক কষ্ট করেছেন! কারন উনাদের বাড়ি ছিল দোকান ছিল কিন্তু ক্যাশ টাকা ছিলনা তাই মানুষের কাছ থেকে ধার করে এনে মেয়ে ছেলেদের পড়াশুনা শেষ করিয়েছেন! জালাল উদ্দীনের পরিবারের কারো থেকে কোনই সহযোগীতা পাননি ঘুনাক্ষরেও! বরং তারা এসে উল্টা পাল্টা ব্যবহার করতেন! এমন কি মহিলা হয়ে তিনি কেন সংসারের মাতব্বরী করেন সেজন্য ভাসুরেরা তাকে মারতেনও! আর তখন থেকেই মিসেস জালাল উদ্দীন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এখানের বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যাবেন! মা অনেক কষ্ট করেছেন ছেলেমেয়েদেরকে মানুষের মত মানুষ করতে! আর এজন্যই মাকে কোন কাজে নিষেধ করেন না ছেলে মেয়েরা! মা যা করেন তাতেই চুপ থাকেন তারা!

কিন্তু মিসেস জালাল উদ্দীন তার নিজের মত মতো চলতে চলতে এক সময় অনেক ঋনের মধ্যে পড়ে যান! তিন তিনটা বাড়ি ছিলো একটি বাড়ি পানির দামে বিক্রি করে জামাইকে ক্যানাডা পাঠান উদ্দেশ্য মেয়েকে যে পরিমাণ সম্পদ দিতো পরবর্তীতে, তা আগেই দিয়ে দেন যাতে মেয়ে সুখে থাকে! ভাইয়েরা কিছুই বলেনা! পরের আরেকটা বাড়ি বিক্রি করে বড় ছেলেকে ইতালি পাঠান! এরপর অতিরিক্ত পরোপকারিতার জন্য প্রায় ত্রিশ লাখ টাকার ঋনের মাঝে পড়ে যান!

মানুষের ঋনের কারনে ঘরে এসে এটা-সেটা বলে যেতে থাকেন! কোন উপায়ান্তর না দেখে শেষে তিন নম্বর বাড়িটাও বিক্রি করে চলে যান শহর ছেড়ে গ্রামে! মেঘনার ওপারে বাপের বাড়ি সম্পদ পান অনেক! আর বাড়ি বিক্রির বাকি টাকা থেকে ও অনেক জায়গায় জমি কিনেন! বড়ছেলে ইতালি যাবার দুই বছর পর্যন্ত মায়ের নামেই টাকা পাঠায়! কিন্তু ছোট ভাইটি যখনই বলে দিলো বড়ভাইকে সব ঘটনা তখন থেকে বড় ভাই আর মায়ের কাছে নির্ধারিত সংসার খরচ ছাড়া বাড়তি কোন টাকাই পাঠায় না! শেষের বাড়িটা বিক্রির সময় বড়ছেলেকে জানায়নি! আর এর কিছুদিন পরই বড় ছেলে দেশে আসে! এসে যখন জানতে পারে বাপের দিনের সম্পত্তির শেষাংশও বিক্রি করে ফেলেছে তখন সে মনে খুব কষ্ট পায়!
ভাড়াবাড়িতে থাকা যেন তার জন্য খুব কষ্টকর তাই সে চার মাসের ছুটিতে আসলেও দেড়মাস পরে চলে যান আবার ইতালীতে আর যতদিন দেশে ছিলেন ততদিন বড়বোনেরা বাসায় ছিলেন। মায়ের সাথে ভাড়াবাড়িতে উঠেন নি। বাড়ি বিক্রি হয়েছে শুনে বড় ছেলে মনে যে কষ্ট পেয়েছে তাতে করে দেশে থাকা তার জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়ে তাই সময়ের আগেই চলে যান। দাদার দিনের সম্পত্তি উত্তরসূত্রে বাবা ও বাবার উত্তরসূত্রে তারা প্রাপ্ত হয় সেই বাড়ি মা মানুষের উপকার করতে গিয়ে বিক্রি করে দেন, রাস্তায় বের হলেই মানুষে আ'ড়চোখে তাকায়, কেউ কেউ বলতে থাকে বাপের দিনের ভিটা বিক্রি করে এখন ভাড়াটিয়া সেই লজ্জায় বড়ছেলে প্রবাসী হয় আবারো।

আর জালাল উদ্দীন খাঁন পিতৃভিটা বিক্রি করে যখন অচেনা অজপাড়া গ্রামের দিকে চলে যায় তখন থেকেই রোগে-শোকে বর্তমানে বিছানায় শায়িত। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুণছেন আগে কয়েকবার টি ভি রোগ হলেও অনেক অর্থ খরচ করে চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়েছিলেন কিন্তু এবার তিনি আর সুস্থ হচ্ছেন না ওষধ যেন এবার তাকে সুস্থের পরিবর্তে অসুস্থই বেশী করছে। ছোট ছেলে নিজেদের বাড়ির পাশেই সারাদিন আড্ডা দেন, সেখানেই সময় কাটান, রাতে এসে শুধু ভাড়া বাড়িতে ঘুমান এভাবে করলেই কি ছোট ছেলেটার দায়িত্ব পালন হবে বাবা-মায়ের প্রতি?

একমাত্র মেয়ে সে ও মায়ের কর্মের কারনে মায়ের সাথে কথা বলেন না এমন কি মা-বাবাকে দেখতেও যান নি অনেকদিন। মেয়েটা থেকে যান বাপের ভিটার কাছেই একটি ভাড়া বাড়িতে। মায়ের বেশী বেশী পরোপকারিতাই তাদেরকে শেষ আশ্রয় ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। মেয়েটা তাই মনে করে মায়ের সাথে কথা বলেনা প্রায় দেড় বছর। বাড়িতে গেলে শুধু বাবাকে এক নজর দেখেই চলে আসেন। আর যাবার সময় হাতে করে নিয়ে যান কিছু ফলফ্রুট। মেয়ে কি মনে করে বাবাকে মাসে একবার কিছু ফল নিয়ে গিয়ে এক নজর দেখলেই তার দায়িত্ব পালন হয়ে যায়? বড় ছেলে মনে কষ্ট পেয়েছে বলে মায়ের কাছে থাকলোই না এটা কি সে ঠিক করেছে? অসুস্থ বাবাকে একটু দেখভালোও করলো না হতে পারে সে আবার ছুটিতে এসে বাবাকে নাও পেতে পারে। আর মা যা করেছে তাতে যদিও বাহ্যিকতায় আমরা ভুল করছে বলবো কিন্তু বাস্তবে সে কি করেছে সে নিজেও বুঝতে পারছে।

এই তিন তিনজন সন্তানের ব্যবহারে কি প্রকাশিত হয়না তারা মা-বাবার চেয়ে সম্পত্তির আকাঙ্খি বেশী? তবে এই মা বাবার শেষ আশ্রয়স্থল কোথায়? তারা কি এই বৃদ্ধ বয়ষে হাজারও ভুলের পরে সন্তানের থেকে সু-ব্যবহার পেতে পারেনা? এই অর্থে আমি বলবো অর্থ অনর্থের মূল আর সম্পত্তি সম্পর্ক নষ্টের মূল। যাদের সম্পদ নাই তারাই হয়তো ভালো আছেন। আমাদের সমাজে এরকম হাজারো পরিবার আছে যারা অনাদর-অবহেলায়দিনাতিপাত করছেন সন্তান থাকতেও তাদেরকে ছেড়ে থাকছেন।

মানুষের জীবন বাস্তবতায় বড়ই কঠিন। সমাজের শৌখিন মানুষ গুলো সময়ের বিবর্তনে কতটা মূল্যহীন হয়ে পড়ে তা এই বাস্তব লেখাটা না পড়লে বুঝা যাবেনা। কে জানে কতদিন তিনি বিছানায় শায়িত থাকবেন? আর কতদিনই বা তাদের মা সন্তানদের অবহেলায় কাটাবেন? সময় কখনো কখনো আপন সন্তানকে ও মায়ের বুক থেকে টেনে নিয়ে দুরে রেখে আসে। আর দুগ্ধদানকারী মাকেও সম্পদ আর সম্পত্তির কারনে শত্রু শত্রু মনে করে। আসলে পৃথিবীতে মানুষের চরিত্রের মত বৈচিত্র চরিত্রের আর কোন প্রাণী আছে কিনা আমার জানা নেই। শুধুমাত্র মানুষই যেন উৎকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্ট চরিত্রের রুপ ধারণ করে ক্ষনে ক্ষনে। বাস্তবতায় এদের পরিবর্তন কোন যুগে হবে কিনা জানিনা নাকি উত্তরসুরীর মত একেরপর এক পরিণতি গ্রহণ করেই চলতে থাকবে পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষের জীবন পরিণতি? আর অনন্তকালেই বা কি হবে নিজের হাতে কামাই করা কর্মের আসল পরিণতি?

পৃথিবীতে যার যত আছে তার তত লাগে। আর যার সম্পদ বলতে কিছুই নেই সে দিন এনে দিনে খাওয়াকেও শাহী খাবার মনে করে। আর যার ঘরে আরো বেশী আছে তাদের তো আল্লাহর শুকরিয়া দমে দমে নেয়া উচিৎ। মানুষ সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও ভুলে গেছে আজ/কাল। এখন শুধু তালাশ করছে সবাই, শুধু ধান্দায় আছে কাকে কিভাবে মেরে খাবে। এমন সময় পৃথিবীতের জীবনে গত হয়েছে মানুষ মানুষের জন্য জীবন দিতেও কুন্ঠাবোধ করতো না। আর এখন এমন সময় উপনিত হয়েছি আমরা উপকার তো দুরের কথা, অপেক্ষা আর সুযোগের সন্ধানে থাকে কাকে কিকরে মাথায় বারি মেরে নিজে চলা যায়। আল্লাহ হেদায়াত নসীব করুন সবাইকে যেন আমাদের হাতের কামাই গুলো জান্নাতে যাওয়ার পাথেয় হয়।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (3টি রেটিং)

গল্পের পটভূমি বেশ, তবে সাহিত্যমান আরো ভালো হতে পারতো। বিশেষ করে গল্পে প্রাকৃতিক বর্ণনা, চরিত্রের বর্ণনাতেও আরেকটু মিষ্টি লেপন ইত্যাদি।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু! সুন্দর পরামর্শের জন্য জাযাকুমুল্লাহ। দিক-নির্দেশনা ভালো পেলে ভালো লিখতে পারবো ইনশা-আল্লাহ!

-

▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬
                         স্বপ্নের বাঁধন                      
▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (3টি রেটিং)