চলতি সপ্তাহের ০৩-০৩-২০১৭ ইং তারিখে অনূদিত মসজিদে নববীর খুতবা।

# খতিব: শায়েখ আব্দুর রাহমান আস-সুদাইস।
# বিষয়: মদিনা মানাওয়ারার ফযীলত ও বৈশিষ্ট্য।

 বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পেরেছে যে, আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর অসীম ক্ষমতা ও হিকমাতের প্রমাণ হলো তিনি কোন বিশেষ মিশনকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে তার জন্য একজন মহান ব্যাক্তি ও একটি ভাল স্থান নির্বাচন করেন। এমনই একটি মিশনের নাম হলো বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রচার-প্রসার। আর এই জন্যই তিনি নির্বাচিত করেছেন “মদিনা” মানাওয়ারাকে, যেটাকে “তাঈবা” বা “ত্বাবা” বা “ইয়াসরিব”ও বলা হয়। কুরআন-সুন্নাহ এর বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত অনেক।

আসুন! খুতবার আলোকে কিছু বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত আত্মস্থ করি।

এক: “মদিনা” হলো “মক্কা”র পর পৃথিবীতে সর্বোত্তম স্থান, যেখান থেকে ইসলামের বাণী বিশ্বে প্রচার-প্রসার লাভ করে এবং এখানেই ইসলামের পরিপূর্ণতা পায়। মহান আল্লাহর বিধানগুলো এখানেই বাস্তবায়ন করা হয় এবং এটিই মুসলমানদের জন্য প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র। এখানে আসলে মানুষ এমন এক প্রশান্তি অনুভব করে যা অন্যত্রে বিরল। মুসলমানদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির যাবতীয় বিষয় এই ভূখণ্ডের সাথে মিশে আছে।

দুই: মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল কে ইসলামের চিরন্তন সত্য বাণী প্রচার প্রসারে এখানেই প্রেরণ করেছিলেন এবং এখানেই অবতীর্ণ হতো মহান আল্লাহর ঐশী বাণী। তাই এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ভারসাম্য পূর্ণ ও মধ্যপথাবলম্বী দূর্গ ও কেন্দ্রে পরিণত হলো।

মহান আল্লাহ বলেন : “আর এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপথাবলম্বী  জাতি হিসেবে বানিয়েছি…”। (সূরা বাকারা, আয়াত:১৪৩)।

তিন: এটা হলো রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামদের হিজরতের ভূমি। কোন মু’মিন নৈকট্য লাভ ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় ভালবেসে এই ভূখণ্ডে ভ্রমণ করলে মহান আল্লাহ তাঁকে সওয়াব দান করবেন।

চার: কিয়ামাতের পূর্বে মু’মিনের ঈমান এখানেই ফিরে আসবে।
রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন : “নিশ্চয় ঈমান মদিনার দিকে ফিরে আসবে যেভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে”। (বুখারি ও মুসলিম)।

পাঁচ: সূরা হাশরের ৯ নাম্বার আয়াতকে সামনে রেখে ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন যে, মদিনা শরীফ হলো মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও হিজরতের কেন্দ্রবিন্দু।

ছয়: এটা হলো সেই ভূখণ্ড যেখানে হিজরতের জন্য রাসূল (সা.) আদিষ্ট হয়েছেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন : যে আমাকে স্বপ্নে দেখানো হলো আমি খেজুরময় কোন একটা জায়গায় হিজরত করছি, মনে করেছিলাম সেটা “ইয়ামামা” অথবা “হাজর” হবে কিন্তু পরে দেখলাম সেটা মদিনা। (বুখারি ও মুসলিম)।

সাত: মদিনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মসজিদে নববী। যেটি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। যেমনটি মহান আল্লাহ সূরা তাওবার ১০৮ নাম্বার আয়াতে উল্লেখ করেছেন।

আট: এখানে রয়েছে বিশ্বের এমন তিনটি মসজিদের একটি, যেখানে ভ্রমণের জন্য শরীয়তে বৈধতা রয়েছে। অন্য কোন মসজিদকে কেন্দ্র করে ভ্রমণের অনুমোদন ইসলামে নেই।

নয়: এখানে এক রাকাত নামাজ পড়লে বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুসারে এক হাজার রাকাতের সমপরিমাণ সাওয়াব পাওয়া যায়।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন : এ মসজিদে একটি নামায মসজিদে হারাম ব্যতিত অন্যান্য মসজিদে হাজার নামায পড়ার চেয়ে উত্তম। (বুখারি ও মুসলিম)।

দশ: “রিয়াজুল জান্নাহ” : রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন : আমার মিম্বার ও ঘরের মধ্যে “রিয়াজুল জান্নাহ” বা জান্নাতের একটি টুকরো আছে। আর আমার মিম্বার হলো আমার হাউজের উপর। (বুখারি ও মুসলিম)।

এগারো: মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) এটাকে “হারাম” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং এখানে কোন প্রকারের কাটাকাটি-মারামারি ইত্যাদি বৈধ নয়।

বার: এই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সাথে কেউ ধোঁকাবাজি করলে অথবা ভয়প্রদর্শন করলে অথবা বিদা’তে লিপ্ত হলে অথবা কোন বিদাতিকে আশ্রয় দিলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিশাপসহ এর সর্বোচ্চ শাস্তির ঘোষণা রয়েছে।

তের: রাসূল (সা.) মদিনাকে ভালবেসে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। সাথে সাথে এ মদিনাতেই শুয়ে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন মহানবী হযরাত মুহাম্মাদ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামগণ। এখানে রয়েছে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত মিম্বার ও মিহরাব, যা তাঁর প্রতি ভালবাসার প্রমাণ হিসেবে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

চৌদ্দ: রাসূল (সা.) কোথাও ভ্রমণে গেলে অথবা কোন কাজে বাইরে গেলে ফিরে আসা মাত্র মদিনার এ অলি-গলি ও ঘর-বাড়ির দৃশ্য দেখে মনে আনন্দ অনুভব করতেন।

পনের: এখানে রয়েছে এমন ঐতিহাসিক এক পাহাড় যেটাকে রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম ভালবাসতেন এবং ঐ পাহাড়ও তাঁদের কে ভালবাসতো সেটা হলো উহুদ পাহাড়।

ষোলো: রাসূল (সা.) মদিনার জন্য এবং তার অদিবাসিদের জন্য বরকতের দোয়া করেছেন।

সতেরো: মদিনা হলো সে ভূখণ্ড যেখানে জিবরাঈল- মিকাঈলসহ অসংখ্য ফেরেশ্তাগণের পদচারণা হয়েছে। তাঁরা এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশী বাণী বা রাহমত নিয়ে আসতেন।

মদিনায় অবস্থানরত ব্যক্তিবর্গ বা যিয়ারতে আসা অতিথিগণকে সম্বোধন করে কিছু আদাব তুলে ধরা হলো।

এক: মদিনা শরীফ আসলে নম্র ও ভদ্র ভাবে চলা। খাবার ইত্যাদি নিয়ে বেশি ব্যস্ত না থাকা। বাইরে বেশি সময় নষ্ট না করে মসজিদে ইবাদতের মাধ্যমে সময় ব্যয় করা এবং কতৃপক্ষকে তাদের কাজে সহায়তা করা।

 
দুই: এখানে আসলে বেশি বেশি করে রাসূল (সা.) এর সুন্নতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
মহান আল্লাহ বলেন : “হে নবী আপনি বলুন : তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তা হলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদের কে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপ সমূহ মুছে দিবেন”। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৯)।

তিন: মদিনায় আসার পূর্বে যিয়ারতের নিয়মনীতি ও রাসূল (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামদের উপর সালাম দেওয়ার পদ্ধতি ভাল করে শিখে নেওয়া।

চার: রাসূল (সা.) এর সুন্নতের বাইরে কোন কিছু না করা এবং আওয়াজ ছোট রাখা অন্যথায় জীবনের সব আমল আল্লাহ নষ্ট করে দিবেন।

পাঁচ: ছবি না তোলা এবং মানুষের ভীড় থেকে দূরে থাকা। মসজিদে বিভিন্ন পদে কর্মরত নিরাপত্তা কর্মীদের সহযোগিতা করা।

ছয় : বিশেষ করে মহিলাগণ পর্দা সহকারে আসা এবং পুরুষদের সাথে মিলামিশা কম করা। সর্বদা পবিত্র অবস্থায় থাকা ইত্যাদি….।

মহান আল্লাহ এই পবিত্র ভূখণ্ডকে বারবার যিয়ারত করার তাওফিক দান করুন এবং এর আদব ও নিয়মনীতি গুলো মেনে চলার তাওফিক দান করুন।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None