জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দে মাতার দিন...হৈ-হল্লা আর বিজয়ের হর্ষধ্বনি...শংকা ছিল তবু...

সূর্য পুব আকাশে উঁকি দেয়ার আগেই উচ্ছ্বাসের উত্তাপটা টের পাওয়া গিয়েছিল।
হিম-লাল রোদ্রের সাথে শিক্ষার্থীদের ভিড় পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। আন্দোলনরত
শিক্ষার্থীদের একটা দল শরতের ধোঁয়া উঠা সকালে জড়ো হয় ক্যাম্পাসের
মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্যের সামনে। সবার মুখে বিজয়ের হাসি... কোলাকোলি করছেন
কেউ কেউ... কেউ আবার চোখে রুমাল দিয়ে আবেগটা পানি হয়ে প্রিয় ক্যাম্পাসে ঝরে
পড়ার আগেই নিজেকে সামলে নিচ্ছেন।

‘আজ মনে হচ্ছে জগন্নাথ যেন সত্যিই একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।
দীর্ঘ আন্দোলন, জেল জুলুম, নিপীড়ন আর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের
মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেলাম। সত্যিই ভাল লাগছে’ কথাগুলো
বলছিলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী বায়েজিদ
হোসেন। জবির চলমান আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ছিল অপরিসীম।
শিক্ষার্থীরা নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ক্যাম্পাস জুড়ে ভিন্নরকম প্রচারণা
চালায়, যা সবার নজর কাড়ে।

উল্লেখ্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৭/৪ (নিজস্ব আয় থেকে ব্যয়
নির্বাহের নীতি সম্বলিত ধারা) ধারা বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা
করতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে
ঘোষণা দেন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক আইন হবে। জবির ২৭/৪ ধারা সংশোধন করার
কথা বলেন তিনি। শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণাকে সতর্ক দৃষ্টিতে
স্বাগত জানায়। তারা এ ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায়। তবু এ ঘোষণাটাই যেন
অনেক কিছু । জন্মলগ্ন থেকে চির বৈষম্যের শিকার এ বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন
এতদিনে রাষ্ট্রকর্তাদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। জবির শিক্ষার্থীরা জানান,
দিতে পেরেছে মেধার দৌড়ে, বিচক্ষণতার দৌড়ে আমরাও আছি আর কয়টা পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। চলমান আন্দোলনের মাধ্যমে তারা প্রমাণ
করেছে ফুল ফুটানো, আগুন জ্বালানো সবই আমরা পারি। প্রশাসন ব্যর্থ হতে পারে
কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী কণ্ঠ কখনো স্তব্ধ হতে পারে না।

তাদের এ আনন্দ বিলম্বে হলেও নিজেদের স্বীকৃতির আনন্দ, তাদের এ আনন্দ
শিক্ষাকে বিজয়ী করার আনন্দ, তাদের এ আনন্দ নিজের অধিকার আদায়ে দুর্বার
আন্দোলনের অনন্য উদাহরণ স্থাপনের আনন্দ। গত রবিবার সকাল এগারোটায়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি আনন্দ র্যালি বের হয়। এতে নেতৃত্ব
দেন ভিসি প্রফেসর মেসবাহউদ্দীন আহমেদ। র্যালিতে অন্যদের মধ্যে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. শওকত জাহাঙ্গীর, প্রক্টর অশোক
কুমার সাহা, সকল অনুষদের ডিন, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান অংশ নেন। আনন্দ
র্যালিটি পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বিজ্ঞান চত্বরে এসে শেষ হয়।

অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আলাদা ব্যানারে ক্যাম্পাসে আনন্দ
র্যালি করেন। এ সময় কেঁদে ফেলেন অনেক শিক্ষার্থী। তারা একে অপরের গায়ে রং
ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো
ক্যাম্পাস। জবির বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথক পৃথকভাবে আনন্দ
র্যালি বের করে। টানা দশ দিন বন্ধের পর রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় খুললে
শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে এসব আনন্দ র্যালি বের করে।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়ে
বলেন, আমরা আশা করি আগামী সংসদ অধিবেশনে তা বাস্তবায়ন করা হবে। তারা বলেন,
আমরা আন্দোলন করেছি ২৭/৪ ধারা বাতিলের জন্য, সংশোধনের জন্য নয়, তাই আমরা
২৭/৪ ধারার পূর্ণ বাতিল চাই।

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে কি না অনেকের এমন শংকা
শিক্ষার্থীদের বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাসকে থামাতে পারেনি। তাদের যেন
আনন্দ-উল্লাস পেয়ে বসেছিল। আকাশের নীল রংটা বদ্ধ দুপুরে জবি ক্যাম্পাসের
মাটিতে নেমে এসেছিল সে দিন। লালের বর্ণচ্ছটা, নীল তার মাধুরী দিয়ে ঢেকে
দেয়। দুয়ারে কড়া নাড়া হেমন্তের বিকালে শিক্ষার্থীরা ফিরে যায় ক্যাম্পাস
ছেড়ে, রেখে যায় বিজয়ের পদচিহ্ন। সাহসীদের পায়ের এ ছাপ রয়ে যাবে, পৃথিবী
যতদিন রবে, যত দিন অধিকারের জন্য তরঙ্গের মত দোলিত হবে মানুষ ততদিন
উচ্চারিত হবেন তারা। তারা এ যুগের ছাত্র আন্দোলনের আইকন, জগন্নাথের গর্বিত
ইতিহাস। তাদের আন্দোলনের জন্যইতো আজ হাসছে জগন্নাথ, স্বস্তির নি:শ্বাস
ফেলছে দেশের সবকটি শিক্ষাঙ্গন। কর্পোরেট বাণিজ্যের যুগেও শিক্ষার এ
জয়...বহু দিন, বহু যুগে উচ্চারিত হবে নিশ্চয়...।

উল্লেখ্য ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ২০০৫ সালে বিশেষ আইনের
মাধ্যমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। তবে এর আইনের ২৭ (৪) ধারায়
বলা হয়- পাঁচ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ভার তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে।
ওই আইন সংশোধনের দাবিতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
টানা চারদিন আন্দোলনের পর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগেভাগে
পূজার ছুটি দিয়ে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়। তারপরও আন্দোলন চালিয়ে যায়
শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারও
করা হয়।

সব সমস্যা সমাধান হয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর । এখন অপেক্ষার পালা কবে হবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন...

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)

ছাত্র জীবনে কোন আন্দোলনের বিজয়ের আনন্দ ভোলার মত নয়; সারাজীবন মানুষ মনে রাখে তা।

কিন্তু আজকাল ছাত্র আন্দোলনের নামে যা চলছে তার অধিকাংশই লজ্জাকর একজন আদর্শ ছাত্রের জন্য।

আমাদের ছাত্রদেরকে সঠিক গাইড করার মত মানুষের খুবই অভাব।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)