জননী উপাখ্যান


: হ্যালো মা ।
: হ্যালো (খুবই ক্ষীনসুরে)
: মা কেমন আছেন ?
: ভা . .লো . . . তুই. .. !
এটাই ছিলো মায়ের শেষ কথা ।

যমুনাশ্বরী নদীর তীরবর্তী ছড়ান গ্রাম । প্রকৃতি যেখানে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে ।চারিদিকে শরতের শ্বেত শুভ্র কাশফুলগুলো যখন দখিনা হাওয়ায় মাথা নিচু করে তখন যে টিনের বাড়িটি স্পষ্ট দেখা যায় ঐ বাড়ির ছেলে মাহমুদ । ও আচ্ছা ঐতো দেখা যাচ্ছে আনমনা হয়ে নদীর স্বচ্ছ জলে কাশফুলের ছবি দেখতেছে আর কি যেন ভাবতেছে ।
হ্যাঁ আপনি ঠিকই চিনেছেন । কোঁকড়ানো চুলের মায়াবী এই ছেলেটাই মাহমুদ । পার্শ্ববর্তী স্কুলের অষ্টম শ্রেনীর সবচেয়ে ভালো ছাত্র ।
: বাবা মাহমুদ , কৈ গেলি ।
: একটুও ভাবান্তর হলো না মাহমুদের , যেন অনাদিকাল থেকে এখান বসে আছে কারো ডাকে ধ্যান ভাঙ্গবে না বলে দৃঢ় পণ করে ।
: আচ্ছা ঠিক আছে বাবা তোকে নিয়ে নানা বাড়িতে ঘুরতে নিয়ে যাব তবু আয় লক্ষী ছেলে আমার ।
: তড়াত্‍ করে লাফ দিয়ে উঠে দৌড়ে গিয়ে মার বুকে মাথা লুকালো মাহমুদ । এই মা আর নদীর সাথে তার একান্ত আপনার সম্পর্ক ।

হুকায় টান দিয়ে স্থির হয়ে বসে আছে আজগর আলী । মাথাটা ঝিম ঝিম করতেছে । দিন দুনিয়াতে থেকেই এই মুহুর্তে তিনি অন্য জগতে বিচরন করছেন । দুনিয়ার সাথে অবশ্য কবে তার সম্পর্ক ছিল তা মনে করতে পারেন না । হ্যালুসিনেসনে থাকতেই তার ভাল লাগে । স্বপ্নের জগতে সবকিছুই নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়া যায় । তবে ভাগ্যক্রমে রহিমার মতো একটা বৌও পেয়েছেন অন্য কোন মেয়ে হলে সংসারে লাথি মেরে চলে যেত । অল্প কিছু জমি থাকলেও তার কোন ধার ধারেনা আজগর আলী তার কেবল তিন বেলা খাওয়া চাই আর হুকায় টান দেওয়ার মতো গাঁজা কিনতে কিছু টাকা হলেই চলে । প্রথম প্রথম রহিমা টাকা দিতে না চাইলে দু চারটে থাপ্পর খেত কিছুক্ষন কান্নাকাটি করে টাকা দিয়ে দিত । এখন আর কিছু বলে না । আজগর আলী টাকা নিয়ে গাঁজার এ আসর থেকে ও আসরে এভাবে ৬-৭ দিন পর পর বাড়ি ফেরে । নতুন বৌ থাকার সময় রহিমার সমস্যা হলেও এখন হয় না । জমি জিরাত আবাদ দেখাশুনা করে বাড়িতে বসে কাঁথা সেলাই করে এভাবেই তার দিনও কেটে যায় । একজন মারেফতি গান গান শুরু করেছে সেদিকে তাকিয়ে হুকায় এক লম্বা টান দেয় আজগর টানতেই থাকে চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেলেও টান ছাড়ে না মনে হচ্ছে আজ এক টানেই হুকার সব ধোয়া বের করবে আজগর । অনেকক্ষন পর কপালের রগগুলো ফুলে উঠার পর টান ছেড়ে আয়েশে চোখ বন্ধ করে আজগর ।

:মা আমি তোমাকে নিয়ে কেন নানাবাড়ি আসলাম জান ?
: তোর স্কুল পুজার বন্ধ তাই !
: উঁহু হয়নি । আমি চাচ্ছিলাম তুমি একা একা বাড়িতে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছ তাই তোমাকে একটু বিশ্রাম দিতে । আমার কথা তো শুননা কিছু করতেও দাওনা সব একাই করো তাই এই বুদ্ধি । খিলখিল করে হাসতে থাকে মাহমুদ
: খুব বেশী চালাক হয়ে গেছ না ? দাঁড়াও পাজি ! আবেগে চোখ ছলছল করতেছে রহিমার । এই ছেলেটাই তার সব তার জীবন তার আশা তার ভরসা তার সুখ দুঃখ ।
ছোটকালেই বাবাকে হারিয়ে ভাই ভাবিদের সংসারে মা সহ করুণার প্রার্থী হয়ে ছিল তাই স্বামীর সংসার নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল রহিমার । সে আশা তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসার মরুভুমিকে আরো তৃষ্নার্তই করেছে । এখন তার সব চাওয়া পাওয়া এই ছেলেটাকে ঘিরে । ছেলেটাও হয়েছে একদম লক্ষী সারাদিন গল্প গুজব একা একা খেলাধুলো আদরে বায়নায় বাড়িটাকে মাথায় তুলে রাখে আর রাতে ঘুমিয়ে গেলে কুপি জ্বালিয়ে রহিমা বেগম অপলক তাকিয়ে থাকে মাহমুদের দিকে কী মায়াবী সারল্যেভরা মুখ ! চোখ যেন সরতেই চায় না ।

: মা কেমন আছ ?
: ভালো বাবা তুই কেমন আছিছ ?
: হ্যা ভালো আছি মা ।
: তুই কবে আসতেছিছ ?
মাহমুদ জানে মা তীর্থের কাকের মতো পথ পানে চেয়ে আছে তাই এই প্রশ্নে বেশ বিব্রত হয় সে , মা যে কি একটু বুঝতেও চেষ্টা করে না ছেলে এখন চাকরী করে সবসময় ছুটিও মেলেনা তাছাড়া তারও তো সংসার স্ত্রী কন্যা আছে তাদেরকেও তো সময় দিতে হয়ে । এই তো ৩ মাসও হলোনা বাড়ি থেকে ঘুরে আসার অথচ এখনই অস্থির হয়ে গেছেন ।
: বাবা কথা বলছিছ না যে ?
: না মা কিছু না ।
: নারে তোকে আসতে হবে না এম্নিতেই বললাম বুড়ো মন তো কথন কি মাথায় আসে ঠিক নাই রেশমি আর বৌ কেমন আছে ?
: হ্যাঁ মা ভালো আছে । কালকে তো নানী বাড়ি যাবে বলে জেদ ধরেছে নিয়ে যেতেই হবে কি আর করা । তোমার নাতনি যে জেদী হয়েছে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবে না মা ।
: তা রেশমীকে একদিন নিয়ে আয় না বাবা ।
: না মা গ্রামে গেলে ওর আবার অসুখ করতে পারে ।তাছাড়া সামনে ওর পরীক্ষা ।
: মার একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।
: তোমাকে কত বলি শহরে আসো না তুমি আসবে না । আমি তো বুঝি শহরের শব্দ বাড়িতে বন্দী হয়ে থাকতে হবে এসব তোমার অজুহাত ঐ বুড়োটা বিশ বাইশ দিন পর হঠাত্‍ বাড়ি এসে কি খাবে না খাবে এই তোমার চিন্তা ! আমি তো তোমার কেউ না ।
: চুপ করে থাকে রহিমা মনে মনে ভাবে বাবা তুই আমার সব হলেও ঐ বুড়োটাকে যে কোনমতেই ফেলতে পারিনা , কি জানি এক মায়ায় জড়ানো দুনিয়ার এই বাঁধনগুলো ।

রহিমা বেগমের এখন কোন কাজ নেই । সারাদিন শুধু নদীর কিনারে যেখানে মাহমুদ বসে নদীর জলে কাশফুলের প্রতিবিম্ব দেখত সেখানে বসে দুর পথের দিকে তাকিয়ে থাকে । তাকে ছেড়ে যে মাহমুদ থাকতে পারবে না তা জানত রহিমা । একদিন একদিন করে কয়েকমাস কেটে গেলে জলে ঝাপসা হয়ে যেত চোখ তারপর হয়ত একদিনের জন্য আসত মাহমুদ তবে তার ছোটবেলার মাহমুদ না ।
এখন সে গল্প বলত না মায়ের বুকে মুখ লুকোত না । তার পাশে বসে রহিমা গল্প করতে শুরু করলে একটু পরেই দেখত মাহমুদ ঘুমিয়ে গেছে ! জমে থাকা কথাগুলো ভ্রমণক্লান্ত মাহমুদের খাটের পাশে জল হয়ে ঝরে পড়ত ।

কয়েকদিন থেকেই মাঝে মাঝে বুকটা চাপ দিত রহিমার । আজ হঠাত্‍ অজ্ঞান হয়ে পড়লে রহিমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় । জ্ঞান ফিরলে চারিদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে মাহমুদের নামে কি যেন বলেন । একজন মাহমুদকে কল দিয়ে রহিমার হাতে মোবাইল ধরিয়ে দেয় ।
: হ্যালো মা ।
: হ্যালো (খুবই ক্ষীনসুরে)
: মা কেমন আছেন ?
: ভা . .লো . . . তুই . . .. !
এরপর কান পেতে ছিল মাহমুদ জানতো মা কি বলবে তারপরও শুনতে চাইতেছিল . . .
কিন্তু এটাই ছিল পৃথিবীকে সব উজাড় করে দিয়েও শুষ্ক হৃদয় নিয়ে ওপারে চলে যাওয়া রহিমা বেগমের গল্প . . এক সার্বজনীন জননীর উপাখ্যান ।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (3টি রেটিং)

পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কষ্ট আছে, তবে মায়ের বুকে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলোর সাথে তুলনা করলে বাকী সব ম্লান হয়ে যায়....

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (3টি রেটিং)