দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৪

দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৪
৪-(ক)বিরোধীদের গালি না দেয়া। (খ)দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমাত অবলম্বন করা:

আল কুরআনুল কারিম আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান জানানোর যে পদ্ধতি ও বিধিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে তার আরও একটি হচ্ছে এই যে, বিরোধীদের গালি দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অনুরুপভাবে এমন তর্ক থেকেও দুরে থাকতে হবে যা প্রতিপক্ষকে কাছে টানার বদলে দুরে সরিয়ে দেয়। বলা আবশ্যক, তর্কযুদ্ধে সাময়িক জয়লাভ করা যায় বটে কিন্তু এতে প্রতিপক্ষের মনোজগতে দীর্ঘদিনের লালিত আদর্শ ও বিশ্বাসের কোন পরিবর্তন ঘটানো যায়না। আল্লাহ বলেন: আল্লাহকে বাদ দিয়ে যারা অন্যদেরকে ডাকে তাদেরকে গালি দিয়োনা, যদি এটা কর তাহলে তারা মূর্খতা ও শত্রুতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহকেও গালি দেবে। (সুরা আল আনআম 108)
ফিরআউনের আল্লাহদ্রোহিতা সর্বজনবিদিত। অপরাধ ও অবাধ্যতার চরম সীমায় পৌছে গিয়েছিল সে, কিন্তু তথাপিও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসা এবং হারুন আলাইহিমাস সালামকে ফিরআউনের নিকট পাঠাবার প্রাক্কালে বললেন: "তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে" (সুরা ত্বহা ৪৪)
সুরা আল আনআমের 66 আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশনা দিচ্ছেন এভাবে:
"তোমার জাতি সেটি অস্বীকার করেছে৷ অথচ সেটি সত্য, এদেরকে বলে দাও, আমাকে তোমাদের ওপর উকিল নিযুক্ত করা হয়নি৷"
অর্থাৎ তোমরা যা দেখতে পাচ্ছো না তা জোর করে তোমাদের দেখিয়ে দেয়া এবং যা বুঝতে পারছো না তা জোর করে তোমাদের বুঝিয়ে দেয়া আমার কাজ নয়৷ আর তোমরা না দেখলে ও না বুঝলে তোমাদের ওপর আযাব নাযিল করাও আমার কাজ নয় আমার কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যাকে সুস্পষ্ট করে তোমাদের সামনে তুলে ধরা৷ এখন যদি তোমরা তা মেনে নিতে প্রস্তুত না হও তাহলে যে খারাপ পরিণতির ভয় তোমাদের দেখিয়ে আসছি তা যথা সময়ে তোমাদের সামনে এসে যাবে৷
সুরা আন নাহলের 125 আয়াতে বলা হচ্ছে:
"মানুষকে আল্লাহর পথে ডাক হিকমাত, প্রজ্ঞা এবং আকর্শণীয় উপদেশ সহকারে"

উপরোক্ত নির্দেশনাগুলো থেকে আমরা যে নীতিমালাগুলো পাই তার কতক হচ্ছে:
১- দায়ীর কাজ শুধুমাত্র আহবান জানানো। দ্বীনের পথে আনার জন্য জোরজবরদস্তি করা তার কাজ নয়। তার দায়ীত্ব সুচারুরুপে পালনের পরও যদি কেউ দ্বীনের পথে না আসে তাহলে তাকে জওয়াবদিহী করতে হবেনা। অনেক নাবীকে শহীদ করে দেয়া হয়েছে কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে ব্যর্থ বলেননি। রাসুলুল্লাহর (সা:) দৌহিত্র হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী খিলাফত পুনুরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্বক চেষ্ঠা করেও সফল হননি (সর্বশেষে শাহাদাতের নজরানা পেশ করেছেন) কিন্তু তথাপিও আল্লাহর মাহকামায় তিনি ব্যর্থ নন।

২- আপনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিনা একথা আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞেস করবেননা। আপনাকে জিজ্ঞেস করা হবে আল্লাহর খলীফা হিসেবে পৃথিবীতে আপনি দায়ীত্ব পালন করেছেন কিনা।। দেখা হবে আপনার নিয়াত ও প্রচেষ্ঠা।। ব্যাপারটি বুঝার জন্য একটি উদাহরন পেশ করা যেতে পারে: এক ব্যাক্তি তার প্রতিপক্ষ শত্রুকে হত্যা করার জন্য শাবল নিয়ে দৌড় দিলে প্রতিবেশীরা তাকে ধরে ফেলে এবং আটকে রাখে। পরে একটি হত্যা মামলা হয়। মামলার রায়ে তাকে ৬ বছর জেল দেয়া হয়। যেহেতু আইনের ভাষায় পদক্ষেপটি ছিল: attempts to commit murder or manslaughter
অন্যদিকে, একই বছর চারতলার ছাদ থেকে অসাবধানতাবশত: এক শ্রমিকের হাত ফসকে দু'টু ইট পড়ে নীচে বসা এক ব্যাক্তি নিহত হয়। পুলিশ এটির একটি হত্যা মামলা করে। বিচারে আসামীকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। কারন যে ব্যক্তি মারা গেছে তার আত্মীয়স্বজনেরা আরজি পেশ করে যে, এ লোক ইচ্ছা করে ইট ফেলেনি, মানুষ হত্যা করার মত লোক সে নয়।
হাশর দিবসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও তার বান্দাদের পুরস্কার ও শাস্তি নির্ধারণ করবেন বান্দাদের নিয়াত ও প্রচেষ্ঠার নিরিখে। কাজের সফলতা বিফলতার ভিত্তিতে নয়।   

3- এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা যা মানুষের মনোজগতে সুদুর প্রসারী প্রভাব ফেলে কিন্তু তার পুর্ব প্রতিষ্ঠিত ধারণাতে সরাসরি আঘাত করেনা অথচ চিন্তার উদ্রেক করে।
4- এমন সুভেচ্ছামূলক কথা যাতে শ্রোতার মন নরম হয়ে যায়।
5-    যাকে আহবান করা হচ্ছে তার মান ইযযতের সংরক্ষণ করা। আরবীতে একটা কথা আছে:
"যদি আপনি চান যে আপনাকে সম্মান দেখানো হোক তাহলে আপনারও উচিত হবে অন্যকে সম্মান দেখানো"
:إذا أردت أن تُحترم مشاعرك فأحترم مشاعر الآخرين
কুরআনও ঘোষণা করে: "হে ইমানদারগন এদিকে শোন এভাবে বলোনা বরং বলো: অনুগ্রহ করে আমাদের দিকে একটু নজর দেবেন কি (আল বাকারা 104)

৮- যাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে তাকে শুধুমাত্র যুক্তি প্রমাণের সাহায্যে তৃপ্ত করে দিয়ে ক্ষান্ত হলে চলবে না বরং তার আবেগ - অনুভূতির প্রতিও আবেদন জানাতে হবে ৷ দুষ্কৃতি ও ভ্রষ্টতাকে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে বাতিল করলে হবে না বরং সেগুলোর অশুভ পরিণতির ভয় দেখাতে হবে ৷ ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ ও সৎকাজে আত্মনিয়োগ শুধু যে ন্যায়সংগত ও মহৎ গুণ, তা যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করেই ক্ষান্ত হলে চলবেনা বরং সেগুলোর প্রতি আকর্ষণও সৃষ্টি করতে হবে ৷

৯- উপদেশ এমনভাবে দিতে হবে যাতে আন্তরিকতা ও মংগলাখাংকা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ৷ যাকে উপদেশ দান করা হচ্ছে সে যেন একথা মনে না করে যে, উপদেশদাতা তাকে তাচ্ছিল্য করছে এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির স্বাদ নিচ্ছে ৷ বরং সে অনুভব করবে উপদেশদাতার মনে তার সংশোধনের প্রবল আকাংখা রয়েছে এবং আসলে সে তার ভাল চায় ৷

চলবে

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)

শিক্ষনীয় পোষ্ট!!  ভাল লেগেছে!! চালিয়ে যান!!

ধন্যবাদ

''সাদামেঘ''

আপনাকেও ধন্যবাদ।
বৃষ্টি বর্ষাও হে সাদামেঘ. . . .
ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করো পৃথিবীকে

"(ক)বিরোধীদের গালি না দেয়া। (খ)দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমাত অবলম্বন করা"

দ্বীনী দাওয়াতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু'টি পয়েন্ট।

জাযাকাল্লাহ্ খায়ের এই সিরিজের জন্য।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)