বার্ডেন অফ প্রুফ। পর্ব তিন

বার্ডেন অফ প্রুফ । পর্ব তিন

১- কোন Un-seen বস্তুকে না দেখা বা দেখার জন্য এ বিশ্বের স্রষ্টা সকল মানুষকে (তারা স্রষ্টার বাধ্য হোক কিংবা অবাধ্য) একই কর্মক্ষমতা বিশিষ্ট বায়োলজিক্যাল চক্ষু প্রদান করেছেন। (প্রসংগত বলা আবশ্যক, আমরা এখানে অন্তরের চক্ষু নিয়ে আলোচনা করছিনা)। তিনি একজন মু'মিনের ঔরশে জন্মগ্রহণকারী শিশুকে যে হাত, পা, চোখ, কান, নাক, মুখ, শরীর, স্বাস্থ্য ও মেধা দান করেন, কাফিরের ঔরশে জন্মগ্রহনকারী শিশুকেও অনুরুপ দান করেন। তিলমাত্রও পার্থক্য করেননা। মু'মিন ব্যক্তির ঘরে যেমন সুন্দর চেহারার মানব মানবী জন্মলাভ করে তদ্রুপ কাফিরের ঘরেও। সৃষ্টিজগতকে ভোগ ব্যবহারের জন্য তিনি একজন মু'মিন ব্যক্তির সন্তানকে যেরুপ শক্তি সামর্থ্য ও যোগ্যতা, দক্ষতা দান করেন কাফিরের সন্তানকেও ঠিক তদ্রুপ দান করেন। ইমানগ্রহণকারী লোকদের ভুমিতে তিনি যেধরণের মাটি, পানি, বৃষ্টি, বাতাস, গাছপালা ও খনিজ সম্পদ দান করেন কুফর অবলম্বনকারী মানুষগুলোকেও ঠিক তদ্রুপ দেন, কোনরুপ পক্ষপাতিত্ব করেননা।    

২- স্রষ্টার অবাধ্য হলে কিংবা সীমালংঘন করলেও তিনি সাথে সাথেই তার বান্দাকে পাকড়াও করেননা। আমাদের চোখের সামনে তার হাজারো প্রমাণ বিদ্যমান। তিনি নিজেও স্পষ্ট করে তা ব্যক্ত করেছেন:

"আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘন ও নাফরমানীর কারনে সাথে সাথে পাকড়াও করতেন তাহলে ভুপৃষ্টে বসবাসকারী কোন জীবেরই অস্তিত্ব থাকতোনা, কিন্তু তিনি সবাইকে একটা নির্দিষ্ট সময় পযন্ত অবকাশ দেন। অত:পর যখন সেই সময়টি এসে যায় তখন তা থেকে এক মুহুর্তও আগ পিছ হয়না" (সুরা আননাহল ৬১)

"তারা আযাবের জন্য তাড়াহুড়ো করছে অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভংগ করবেন না৷ কিন্তু তোমার রবের কাছের একটি দিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান হয়৷" (সুরা আল হাজ 47)

"আল্লাহ যদি  লোকদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার ব্যাপারে অতটাই তাড়াহুড়া করতেন যতটা দুনিয়ার ভালো চাওয়ার ব্যাপারে তারা তাড়াহুড়া করে থাকে, তাহলে তাদের কাজ করার অবকাশ কবেই খতম করে দেয়া হতো (কিন্তু আমার নিয়ম এটা নয়) তাই যারা আমার সাথে সাক্ষাৎ করার আশা পোষণ করে না তাদেরকে আমি তাদের অবাধ্যতার মধ্যে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দেই৷"  (সুরা ইউনুস ১১)

নীচে ইতিহাস থেকেও কিছু প্রমাণ তুলে ধরা হচ্ছে:
 
আল্লাহর নাবী ইলিয়াস আলাইহিস সালাম যখন বাল দেবতার পুজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে মানুষকে আহবান জানাতে শুরু করেন তখন সামারিয়ার ইসরাইলী রাজা আখিআব তার মুশরিক স্ত্রীর প্ররোচনায় ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে হ্ত্যা করার পরিকল্পনা আটে। ফলে ইলিয়াস আলাইহিস সালাম সিনাই উপদ্বীপের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন (১ রাজাবলী, ১৭ অধ্যায়, ১-১০ শ্লোক এবং তাফহীমুল কুরআন সুরা আল বাকারা ৬১ আয়াতের তাফসীর)।
এতে আখিআব এর স্বেচ্ছাচারিতা আরও বেড়ে যায় এবং বলতে থাকে যে, এখানে রব বলতে কিছু নেই আর তিনি কোন নাবীও পাঠাননা।
 
ইয়াহইয়াহ আলাইহিস সালাম যখন ইয়াহুদী শাসক হিরোডিয়াসের যুলুম, অত্যাচার ও ব্যাভিচারের প্রতিবাদ জানালেন তখন তাকে প্রথমে কারারুদ্ধ করা হয় অত:পর হিরোডিয়াস তার প্রেমিকার নির্দেশানুসারে ইয়াহইয়াহ আলাইহিস সালাম এর শিরচ্ছেদ করে এবং কর্তিত মস্তক একটি থালায় করে প্রেমিকাকে উপহার দেয়। (মার্ক, ৬ অধ্যায়, ১৭-২৯ শ্লোক এবং তাফহীমুল কুরআন – সুরা আল বাকারা ৬১ আয়াতের তাফসীর)
আল্লাহর নাবীকে হত্যা করার পরও যখন হিরোডিয়াসকে আল্লাহ সাথে সাথে পাকড়াও করলেননা তখন তার উদ্বত্য আরও বেড়ে গেল এবং দর্পভরে সবাইকে বলতে লাগলো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, রব, পরকাল, হিসাব নিকাশ এসব কুসংস্কার ‌ছাড়া আর কিছু নয়।

এক আল্লাহর উপর ইমান আনার অপরাধে ফিরআউন তার মহলের প্রধান দাররক্ষীর স্ত্রীকে কারারুদ্ব করে। ইবনু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) তার তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেন: "মহলের প্রধান দাররক্ষীর স্ত্রী একদা ফিরআউনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ চিরুণীটি তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে যায়। তখন বেখেয়াল তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে: কাফিররা ধ্বংস হোক। ফিরআউন কন্যা কথাটি শুনে অবাক হয়ে তাকে সুধাল: তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে মান? উত্তরে তিনি বললেন: হ্যা, আমার, তোমার এবং অন্যান্য সকলের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ। ফিরআউন কন্যা এতে ক্রোধান্বিত হয়ে দাররক্ষীর স্ত্রীকে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত করে এবং পিতাকে খবর বলে দেয়। ফিরআউন মহিলাটিকে তৎক্ষনাত তলব করে জিজ্ঞেস করলো: তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে মান? মহিলা নির্ভীক স্বরে জওয়াব দিলেন: হ্যা, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হচ্ছেন আল্লাহ। আমি তারই ইবাদাত করি। জওয়াব শুনে ফিরআউন ক্রদ্ধ হয়ে নির্দেশ দিল: একে চিৎ করে শুইয়ে তার হাতে পায়ে পেড়েক মার অত:পর সাপ ছেড়ে দাও এবং এ অবস্থাতেই তাকে রাখ যতক্ষণ না আমাকে সে মাবুদ বলে স্বীকার করে। দিন কয়েক যাবার পর ফিরআউন তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করল: এখনো কি তোমার চিন্তার কোন পরিবর্তন হয়নি? মহিলাটি পুবের ন্যায়ই তেজোদী্প্ত কন্ঠে ঘোষণা করলেন: তোমার, আমার এবং সকলের রব হচ্ছেন আল্লাহ। ফিরআউন বলল: আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখনই তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করছি। মহিলা জওয়াব দিলেন: তোমার যা ইচ্ছা তাই কর। ছেলেকে আনা হল এবং মায়ের সামনেই তাকে হ্ত্যা করা হল। ছেলেটির রুহ বের হবার প্রাক্কালে তার মাকে উদ্দেশ্য করে সে বললো: মা তুমি তোমার ইমানের উপর দৃঢ় থাক এবং সন্তোষ্ট হও, কারন তুমিই হকের পথে আছ। আল্লাহ তোমার জন্য অতি বড়ো পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন"। (তাফসীর ইবনু কাসির, পৃ:৫৭৯-৫৮০)

তাফসীরসমুহে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফিরআউন ইমান আনয়নকারী ঐ মহিলার চোখের সামনে তার সকল সন্তানকে একের পর এক হত্যা করে। সবশেষে মহিলাটিকেও হত্যা করা হয়। এত বড় পাপ কর্মের পরও যখন ফিরআউনের কিছুই হলনা তখন তার উদ্বত্য, অহংকার দ্বিগুন বেড়ে গেল।

শুধুমাত্র আল্লাহর উপর ইমান আনার অপরাধে ফিরআউন তার স্ত্রী আছিয়া (আলাইহাস সালাম) কে কষ্টের পর কষ্ট, নিযাতনের পর নিযাতন করে শহীদ করে দেয়। তাফসীর সমুহে বর্ণিত হয়েছে: "ফিরআউন তার লোকজনকে বললো: সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোজ করে নিয়ে
আস। তাকে চিৎ করে শুইয়ে দাও এবং জিজ্ঞেস কর: তুমি কি তোমার এ আকিদা হতে বিরত হতে রাজী? যদি বিরত হয় তাহলে ভাল কথা। সে আমার স্ত্রী। তাকে মযাদা সহকারে আমার নিকট ফিরিয়ে আনবে। আর যদি বিরত না হয় তাহলে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে। আছিয়া (আলাইহাস সালাম) এর হাত পা বেধে তাকে চিৎ করে শোয়ানো হল, ফিরআউনকে রব স্বীকার করানোর হাজারো চেষ্ঠা করা হল কিন্তু তিনি তার ইমান থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্যুত হলেননা। লোকেরা পাথর এনে তার উপর নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলো, এসময় আছিয়া (আলাইহাস সালাম) আকাশের দিকে চাইলেন, এবং বললেন: হে আমার রব, আমার জন্য তোমার নিকট জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দাও। আমাকে ফিরআউন ও তার কর্ম থেকে রক্ষা কর এবং যালিম কাওমের হাত থেকে বাচাও (আত তাহরীম১১)। আল্লাহ আছিয়া (আলাইহাস সালাম) এর দোয়া কবুল করলেন, জান্নাত তাকে দেখানো হল। ঐ সময়েই তার রুহ বেরিয়ে যায় (তাফসীর ইবনু কাসির ৫৭৮-৫৮০) (তাফসীর আল জালালাইন, আরবী পৃ: ৫৬১)

যাদু প্রদর্শনী করতে গিয়ে অদৃশ্য এক শক্তির অস্তিত্ব যখন যাদুকররা অনুভব করল, তাদের সামনে যখন এ সত্য দীবালোকের মত উদ্ভাসিত হয়ে উঠল যে, মুসা (আ:) কোন যাদুকর নন বরং আল্লাহর প্রেরিত নাবী তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল। এ অবস্থা দর্শনে ফিরআউন রাগে, আক্রোশে ফেটে পড়লো, বললো: "আমার অনুমতি দেবার আগেই তোমরা তার প্রতি ইমান আনলে? নিশ্চয়ই এটা কোন গোপন চক্রান্ত ছিল। তোমরা এ রাজধানীতে বসে এ চক্রান্ত এটেছো এর মালিকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে। বেশ এখন এর পরিণাম তোমরা জানতে পারবে। তোমাদের হাত, পা আমি কেটে ফেলব বিপরীত দিক থেকে অত:পর তোমাদের সবাইকে শুলে চড়িয়ে হত্যা করবো" (সুরা আল আরাফ ১২৩-১২৪)।
ফিরআউন তাই করল। যাদুকরদের হাত পা কেটে অত:পর তাদেরকে হত্যা করা হল। বহাল তবিয়তে এত কিছু সমাপ্ত করার পরও যখন কোন শাস্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর এলোনা। তখন সে তার পারিষদকে লক্ষ্য করে বললো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, মুসা যে রবের কথা বলে আসলেই তার কোন অস্তিত্ব নেই। যদি থাকতো তাহলে সে এ নওমুসলিম যাদুকরদেরকে রক্ষা করতোনা? কিংবা আমাকে পাকড়াও করা হতোনা?

৩- পরীক্ষার্থী যাতে ভেবেচিন্তে স্বাধীনভাবে সকল প্রশ্নাবলীর উত্তর প্রদান করতে পারে সেজন্যে একটা নির্দিষ্ট কাল বা সময়ের (Period of Time) প্রয়োজন হয়। আমরা দেখি যে, আমাদের মহান রব তা সকলকে প্রদান করছেন। যেমন কুরআনে এসেছে:

"এরা তোমার কাছে দাবী করছে আযাব দ্রুত আনার জন্য৷ এটার জন্য যদি একটি সময় পুর্বাহ্নেই নির্ধারিত না থাকতো তাহলে তাদের ওপর আযাব এসেই যেতো এবং নিশ্চিতভাবেই (ঠিক সময় মতো) তা অকস্মাৎ এমন অবস্থায় এসে যাবেই যখন তারা জানতেও পারবে না৷ (সুরা আল আনকাবুত 53)  
অর্থাৎ বারবার চ্যালেঞ্জের কণ্ঠে দাবী জানাচ্ছে, যদি তুমি রাসূল হয়ে থাকো এবং আমরাই যদি  সত্যের প্রতি মিথ্যা আরোপ করে থাকি, তাহলে তুমি যে আযাবের ভয় আমাদের দেখিয়ে থাকো তা নিয়ে আসছো না কেন?

"একটি নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হবে একথা যদি তোমার রব পূর্বেই ঘোষণা (লিপিবদ্ধ) না করতেন তাহলে তাদের বিবাদের চুড়ান্ত ফায়সালাতো সাথে সাথেই করে দেয়া হতো৷ (সুরা আশ শুরা 14)

অর্থাৎ যারা গোমরাহী উদ্ভাবন করার এবং জেনে বুঝে তা অনুসরণ করার অপরাধে অপরাধী ছিল তাদেরকে যদি দুনিয়াতেই আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয় এবং শুধু সঠিক পথ অনুসরণকারীদের বাঁচিয়ে রাখা হয় তাহলে  কে ন্যায় ও সত্যের অনুসারী আর কে বাতিলের অনুসারী তা সুস্পষ্ট হয়ে যায় বটে৷ কিন্তু আল্লাহ এই চূড়ান্ত ফায়সালা কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য মূলতবী করে রেখেছেন৷ কারণ, পৃথিবীতে এ ফয়সালা করে দেয়ার পর মানব জাতির পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যেতো৷

চলবে ।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.3 (3টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.3 (3টি রেটিং)