বার্ডেন অফ প্রুফ। পর্ব বার

বার্ডেন অফ প্রুফ। পর্ব 12

অতীতের আসমানী কিতাবগুলোর মত এ গ্রন্থও যাতে বিকৃতির শিকার না হয়ে পড়ে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার গৃহীত ব্যবস্থাবলী তাক লাগিয়ে দেয়ার মত। কুরআন নাযিলের পর থেকে অদ্যাপি পযন্ত ইসলাম ও ইসলামী উম্মাহর বিরুদ্ধে দিন রাত চতুর্মুখী প্রচারণা, কুরআনকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে দেয়ার বিশ্বব্যাপী অপতৎপরতা ও অপচেষ্ঠা সত্বেও এ কুরআন রয়েছে অবিকৃত। এ এমন এক মোজেযা যার তুলনা মেলা ভার, বর্ননার অতীত।
যে কুরআন আল্লাহ তায়ালা আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পুবে নাযিল করেছিলেন সেই একই কুরআন আমাদের মাঝে রয়েছে বর্তমান। একটি যের, যবরের হের ফের কিংবা নোকতার পরিবর্তনও তাতে ঘটেনি। সুরা আল হিজর এর 9 নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: “আর এ বাণী, একে তো আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক”৷ আল্লাহর এ ঘোষণা কুরআনের যথাযথ গ্রন্থাবদ্ধকরন সম্পর্কে সংশয়বাদীদের যাবতীয় সন্দেহের সংশয়ের সমস্ত ভিত্তিকে উপড়ে ফেলে।
সা'দ ইবন আবি ওয়াককাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রমুখ থেকে বর্ণিত। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুলে যাবার ভয়ে কুরআনের শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে থাকতেন৷ জিব্রীল আলাইহি সালাম অহী শুনিয়ে শেষ করার আগেই ভুলে যাবার আশংকায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোড়ার দিক থেকে আবার পড়তে শুরু করতেন৷ এ কারণে আল্লাহ তাঁকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন: “আমি তোমাকে পড়িয়ে দেবো, তারপর তুমি আর ভুলবে না” (সুরা আল আ’লা 6)৷(বুখারী, মুসলিম)
কুরআনের এ আয়াত একথা প্রমাণ করে যে, কুরআন যেমন মু'জিযা হিসেবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল করা হয়েছিল ঠিক তেমনি মুজিযা হিসেবেই তার প্রতিটি শব্দ তাঁর স্মৃতিতে সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল৷ এর কোন একটি শব্দ তিনি ভুলে যাবেন অথবা একটি শব্দের জায়গায় তাঁর সমার্থ অন্য একটি শব্দ তাঁর মুবারক কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হবে, এ ধরনের সকল সম্ভাবনার সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল৷
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অশেষ করুণাময় ও মেহেরবান এবং ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর অসীম জ্ঞান এবং অনুগ্রহ ও ন্যায় বিচারের কাছ থেকে এটা আশা করা যেতে পারে না যে, মানুষ তার দ্বীনের কথা জানতে পারবে না অথচ সে দ্বীনের বিপরীত পথে চলার অপরাধে তিনি তাকে পাকড়াও করবেন। এটা কখনোই হতে পারেনা যে, মানুষ জানবেনা কোন পথে তার মুক্তি নিহিত অথচ সে পথে না চলার দরুন তাকে ধরে তিনি শাস্তি দেবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজে তা উল্লেখও করেছেন যে, পথ দেখানোর ব্যবস্থা না করে তিনি কাউকে শাস্তি দেবেননা। যেমন এসেছে সুরা আল ইসরা এর 15 নং আয়াতে: “এবং রাসুল না পাঠিয়ে আমি কাউকে শাস্তি দেইনা”। আরও এসেছে সুরা আর রা’দ এর 7 নং আয়াতে: “এবং প্রতিটি কাওমের জন্য রয়েছে থপ্রদর্শক”।

আল্লাহ মানবজাতীর উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, এ কুরআন হচ্ছে তাদের জন্য দুনিয়ায় জীবন চলার পথে গাইড, জীবন বিধান এবং তিনি এও বলেছেন যে, এ বিধানের অনুসরন করে যারা চলবে আখিরাতে তাদের কোন ভয়, দুশ্চিন্তা বা বিপদের কারন নেই। যারা এ গাইডের বিপরীত পথে চলবে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। (দ্রষ্টব্য: সুরা আল বাকারা 2, ৩৮)আরও দ্রষ্টব্য: সুরা আল মায়িদা 44, 47। সুতরাং ন্যায়নীতি এবং যুক্তি এই দাবী করে যে এ গাইডটি কিয়ামাত পযন্ত অবিকৃত থাকা জরুরী নতুবা আল্লাহর শাস্তি দানের কোন অধিকার নেই। গাইড বা জীবন বিধান বিকৃত হয়ে যাবে আর আল্লাহ সে বিকৃত গাইডকেই অনুসরন করতে বলবেন – এটা বিবেকসম্মত নয় বরং তা যুলম। আর সৃষ্টজীবের উপর যুলম করা থেকে তিনি অতিশয় পবিত্র।
আল্লাহ এও বলেছেন যে, এ কিতাবের পর আর কোন কিতাব নেই, আর কোন নাবী নেই দ্রষ্টব্য: সুরা আল আহযাব 40) সুতরাং অবশ্যই এ গ্রন্থ ঐ অবস্থা থেকে পবিত্র থাকা অতীব জরুরী যে অবস্থা ঘটেছে এর পুর্বেকার আসমানী কিতাবগুলোর বেলায়।

পরীক্ষার ধরন প্রকৃতি।

এ পর্যন্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম যে, ন্যায় ও ইনসাফের মানদন্ডে যাতে একটি পরীক্ষাকর্ম সমাধা হতে পারে তার সকল ব্যবস্থা আমাদের স্রষ্টা করেছেন এবং সেজন্যে যা কিছু প্রয়োজন তার সবই তিনি আমাদেরকে সরবরাহ করেছেন।
কিন্তু পরীক্ষার ধরণ প্রকৃতি তথা কিভাবে, কখন, কোন কোন পথ পদ্ধতি অবলম্বন করে স্রষ্টা পরীক্ষা নিয়ে থাকেন তা আমরা অবগত হতে পারিনি।
নীচে কুরআন, হাদীস এবং ইতিহাস থেকে তারই কিছু দৃষ্টান্ত ও প্রমাণপঞ্জী উপস্থাপিত হচ্ছে:

আল কুরআনুল কারীমে আল্লাহ মানবজাতীকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, মনুষ্যজগতে জন্ম এবং মৃত্যুর এই যে চিরন্তন রুপ তোমরা দেখছো এটি কোন ভাবুক স্রষ্টার কোন বিশেষ খেয়াল বা কল্পনাজাত খেলা নয়। বরং একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।

সুরা আল মুলক - এ সে উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন:
"তিনিই মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, এটা দেখার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কার কর্ম ভাল৷  আর তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীলও"৷ (সুরা আল মুলক ২)

তিনি আরও বলেন:
"যদি আমি কোনো খেলনা তৈরি করতে চাইতাম এবং এমনি ধরনের কিছু আমাকে করতে হতো তাহলে নিজেরই কাছ থেকে করে নিতাম"৷ (সুরা আল আম্বিয়া 17)
অর্থাৎ "যদি আমি খেলা করতেই চাইতাম তাহলে খেলনা বানিয়ে নিজেই খেলতাম৷ এ অবস্থায় একটি অনুভূতিশীল, সচেতন ও দায়িত্বশীল প্রাণী সৃষ্টি এবং তার মধ্যে সত্য-মিথ্যার এ দ্বন্দ্ব ও টানাহেঁচড়ার অবতারণা করে নিছক নিজের আনন্দ ও কৌতুক করার জন্য, অন্যকে অনর্থক কষ্ট দেবার মতো জুলুম কখনোই করা হতো না৷ তোমাদের মহান প্রভু আল্লাহ এ দুনিয়াটাকে রোমান সম্রাটদের রংগভূমি (Coliseum) রূপে তৈরী করেননি৷ এখানে বান্দাদেরকে পরস্পরের মধ্যে লড়াই করিয়ে তাদের শরীরের গোশত ছিড়ে উৎক্ষিপ্ত করিয়ে আনন্দে অট্রহাসি হাসার জন্য এ বিশ্ব সৃজিত হয়নি৷ (তাফহীমুল কুরআন। সুরা আল আম্বিয়া ২ আয়াতের ব্যাখ্যা)

সুরা হুদ এ বলা হয়েছে:
"তিনিই আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, যখন এর আগে তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল,  যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করে দেখে নেয়া যায় যে, তোমাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে৷ এখন যদি হে মুহাম্মদ! তুমি বলো, হে লোকেরা, মরার পর তোমাদের পুনরুজ্জীবিত করা হবে, তাহলে অস্বীকারকারীরা সংগে সংগেই বলে উঠবে৷ এতো সুস্পষ্ট যাদু৷ (সুরা হুদ 7)
অর্থাৎ: " মহান আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী এজন্য সৃষ্টি করেছেন যে,  মূলত তোমাদের (মানুষ) সৃষ্টি করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল৷ আর তোমাদের তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের ওপর নৈতিক দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেবার জন্য৷ তোমাদেরকে খিলাফতের ইখতিয়ার দান করে তিনি দেখতে চান তোমাদের মধ্য থেকে কে সেই ইখতিয়ার এবং নৈতিক দায়িত্ব কিভাবে ব্যবহার ও পালন করে? এ সৃষ্টি কর্মের গভীরে যদি এ উদ্দেশ্য নিহিত না থাকতো, যদি ইখতিয়ার সোপর্দ করা সত্বেও কোন পরীক্ষা, হিসেব-নিকেশ, জবাবদিহি ও শাস্তি-পুরষ্কারের প্রশ্ন না থাকতো এবং নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল হওয়া সত্বেও যদি মানুষকে কোন পরিণাম ফল ভোগ না করে এমনি এমনিই মরে যেতে হতো, তাহলে এ সমস্ত সৃষ্টিকর্ম পুরোপুরি একটি অর্থহীন খেলা-তামাশা বলে বিবেচিত হতো এবং প্রকৃতির এ সমগ্র কারখানাটিরই একটি বাজে কাজ ছাড়া আর কোন মর্যাদাই থাকতো না৷ (তাফহীমুল কুরআন। সুরা হুদ ৭ আয়াতের ব্যাখ্যা)

চলবে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)