ইসলামের পঞ্চম খলিফা

উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ):
বংশ পরিচয়: উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন ইতিহাসে বহুল আলোচিত ও নিন্দিত মারওয়ানের দৌহিত্র (Grandson)। তবে উমারের মাতুল বংশ এ পৃথিবীর সবোত্তম মানুষদের একজন উমার উবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সম্পর্কিত। সে সম্পর্কের শুরুর কাহিনীটা বোধকরি এখানে বলে নিলে ভাল হবে।
উমার উবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ইসলামী জাহানের দ্বিতীয় খালিফা। প্রতিদিনের অভ্যাসমত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রাতের আধারে প্রজাদের অবস্থাদি দর্শনে বেরিয়েছেন। হঠাৎ এক কুড়েঘর থেকে শুনলেন নিম্পরুপ কথোপকথন:
এক মা তার কন্যাকে বলছে: এখন কেউ কোথাও নেই, দুধে কিছু পানি মিশিয়ে নাও মা।
কন্যা উত্তর দিচ্ছে: এ আপনি কি বলছেন আম্মা! আমাদের খালিফা দুধে পানি মিশাতে নিষেধ করেছেন আপনি কি তা শোনেননি?
মা উত্তর দিচ্ছে: উমারের লোকেরাতো এখন নেই।
কন্যা বলছে: উমারের লোকেরা নেই বটে, কিন্তু আল্লাহতো আছেন। তিনি কি দেখছেননা? আমি কখোনোই দুধে পানি মিশাবোনা।
উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কথোপকথন শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন, তবে তখনই কাউকে কিছু বললেননা।
পরদিন সকালে সমুদয় ঘটনা পরিবারের সকলকে খুলে বললেন এবং স্বীয় পুত্র আসেম এর সাথে এ কন্যার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন আর বললেন:  ওহে আসেম ! হয়তোবা এ মেয়ের গর্ভেই এমন এক মনীষী জন্মগ্রহন করবেন যার জন্মে সমগ্র আরব গৌরববোধ করবে, যিনি আরবের মান মযাদা বৃদ্ধি করবেন এবং গোটা আরবের নেতৃত্ব দেবেন।
বাস্তবিকই তা-ই ঘটেছিল। আসেমের এ স্ত্রী উমার ইবনু আবদিল আযিযের মা’কে গর্ভে ধারণ করেন।

জন্মের সময়কাল ও শিক্ষাদীক্ষা: উমার ইবনু আবদিল আযিয ৬৩ হিজরীতে আল মাদিনা আল মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহন করেন। তখন উমারের দাদা মারওয়ান বংশের শাসনকাল। তার জন্মের কিছুকাল পর (কিংবা আগে) পিতা আবদুল আযিয মিসরের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। উল্লেখ্য যে, আমীর মুয়াউইয়া (রা:) বংশের শাসনের পরিসমাপ্তির পর মারওয়ান বংশের শাসন শুরু হয়।
উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) এর মা ছিলেন ঐ কন্যার সন্তান যার কাহিনী আমি ইতিপুবে উল্লেখ করেছি। সুতরাং এমন নানী এবং মা যার শিক্ষয়ত্রী তার শিক্ষা দীক্ষা কেমন হবে তা সহজে অনুমেয়। তদুপরি তিনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহন করেন যখন মাদিনা ছিলো ইসলামী জ্ঞান ও জ্ঞানীদের কেন্দ্রভুমি। তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ট আলিম, ফকীহ এবং মুহাদ্দিসগন ছিলেন উমার ইবনু আবদিল আযিয এর শিক্ষক। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও বোধকরি উমারের প্রকৃতির মধ্যে দ্বীন ও জ্ঞান চর্চার প্রতি দারুন আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। একারনেই দেখা যায়, তার কৈশোর এবং যৌবন কেটেছে আলিম ও ফকীহদের মাজলিসে।

মাদিনার গভর্নররুপে উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ):
উমারের বয়স যখন ২৫ তখন আল ওয়ালিদ ইবনু আবদিল মালিক ইবনু মারওয়ান (শাসনকাল ৭০৫ - ৭১৫ খৃ:) উমার ইবনু আবদিল আযিযকে মাদিনার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। তখন ৮৬ (মতান্তরে ৮৭) হিজরী। কিন্তু তিনি এ দায়িত্ব বুঝে নিতে বিলম্ব করতে লাগলেন। আল ওয়ালিদ এ খবর শুনে এর কারন জানতে চাইলেন। উমার জওয়াব দিলেন: “আমাদের পুববর্তী শাসকগন অন্যায় অবিচার করে আমদানী বৃদ্ধি করেছে আমি তা পারবোনা”।
উমার তার স্বীয় গুন বৈশিষ্ট ও সৎ চরিত্রের কারনে তার খান্দানের সকলের নিকট প্রিয় ছিলেন। আল ওয়ালিদও তাকে পছন্দ করতেন। ওয়ালিদ বললেন: ঠিক আছে, আপনি ন্যায় ও ইনসাফের পথ অবলম্বন করবেন, এতে যদি আপনি এক দিরহামও কেন্দ্রে পাঠাতে না পারেন আমার আপত্তি নেই।
এ জওয়াব পেয়ে উমার মাদিনার দায়িত্বভার গ্রহন করেন। তিনি প্রায় ছয় বছর মাদিনা (তখন মাক্কা এবং তায়েফও মাদিনা গভর্নরের অধীনে ছিলো) শাসন করেন। এসময় এ এলাকা একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী জনপদে পরিনত হয়। কিন্তু মাদিনাবাসীর এ সুখ বেশীদিন স্থায়ী হয়নি।
মাদিনার দায়িত্ব থেকে অপসারন:
ইরাকে বিশৃংখলা দেখা দিলে তথাকার শাসক হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ আল ওয়ালীদকে লিখে যে, ইরাকের বিচ্ছিন্নতাবাদীগন ইরাক থেকে পালিয়ে গিয়ে মাদিনা এবং তায়েফ আশ্রয় নিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে দিলে গোটা সাম্রাজ্যের স্থিতি ও সংহতি হুমকীর মুখে পড়বে। সুতরাং মাদিনার শাসকের পরিবর্তন প্রয়োজন যে কিনা আমাদের নির্দেশমতো চলবে। ওয়ালিদের নিকট উমারের চাইতে রাজ সিংহাসন অধিকতর প্রিয় ছিল। তিনি হাজ্জাজের অনুগত ও প্রিয়ভাজন একজনকে মাদিনায় নিয়োগ দেন এবং উমারকে দিমাশকে ডেকে পাঠান।
কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, অপসারন করার পুবেই উমার পদত্যাগের সিন্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারন কেন্দ্রীয় এমন অনেক ফরমান বলবৎ বা জারী করার নির্দেশ উমারের কাছে পাঠানো হতো যা করা উমারের মতো আল্লাহভীরু লোকের পক্ষে সম্ভব ছিলোনা।      

খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহন:
আল ওয়ালিদ ইবনু আবিদল মালিক ইবনু মারওয়ানের ইনতেকালের পর  সুলাইমান ইবনু আবদিল মালিক ইবনু মারওয়ান খিলাফাতের মসনদে বসেন (শাসনকাল ৭১৪ খৃ: - ৭১৭ খৃ:)। তিনি ছিলেন বানু উমাইয়াদের সপ্তম খালিফা। শত দোষ থাকলেও সুলাইমানের চরিত্রে একটি ভাল দিক ছিল এ যে, তিনি উমার ইবনু আবদিল আযিযকে অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন এবং রাজ্য পরিচালনায় সব সময় উমারের পরামর্শ নিতেন। বলা বাহুল্য, সুলাইমানের সকল জনকল্যান ও সংস্কারমুলক কাজ উমারের প্রচেষ্ঠায় ও পরামর্শে সম্পন্ন হয়।   
যেভাবে উমারের মনোনয়ন সম্পন্ন হয়:
এটি হিজরী ৯৯ সনের কথা। সুলাইমান মারাত্বকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নিজে যখন বুঝতে পারলেন যে তার অন্তিম সময় সন্নিকটে তখন পরবর্তী খালিফা নিবাচনের চিন্তা তাকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু কাকে খালিফা হিসেবে ঘোষনা দেবেন? যে সন্তানকে তিনি তার পরবর্তী খালিফা হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন সে বেচে নেই। এখন যারা আছে তারা সকলেই ছোট। অগ্যতা সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি রেজা ইবনু হায়ওয়াকে (যিনি সুলাইমানের ঘনিষ্ট বন্ধু এবং উপদেষ্টা ছিলেন) বললেন: আমার ছেলেদের মধ্যে বড়টিকে খিলাফাতের পোষাক পরিয়ে আমার সামনে হাজির করুন। তা-ই করা হল। দেখা গেল, পোষাকের ভার সে বইতে পারছেনা, মাটিতে টেনে চলছে। সুলাইমান আবার বললেন: তার কাধে তরবারী ঝুলিয়ে আমার সামনে আনুন। দেখা গেল তরবারীটি সে বহন করতে পারছেনা। তখন হতাশ হয়ে সুলাইমান নীচের চরণটি উচ্চারণ করলেন:
ইন্না ইবনি ছবিয়ুন ছিগার
কাদ আফলাহা মান লাহু কিবার
(হায়, আমার সন্তান ছোট, সেই ব্যক্তিই সফলকাম যার বড় সন্তান রয়েছে)
উমার ইবনু আবদিল আযিয পাশেই বসা ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাত সুরা আল আ’লার এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
কাদ আফলাহা মান তাযাক্কা, ওয়া যাকারাসমা রাব্বিহি ফা সাল্লা (সাফল্য লাভ করেছে সে, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে, তার প্রতিপালককে স্মরণ করেছে এবং সালাত কায়েম করেছে)।
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে: সুলাইমানের বড় পুত্র আইয়ুব জীবিত ছিল। সুলাইমান যখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী, রেজা ইবনু হায়ওয়া তাকে দেখতে যান। সুলাইমান কিছু একটা লিখছিলেন। রেজা জিজ্ঞেস করলেন: আমিরুল মুমীনিন! কি করছেন? সুলাইমান বললেন: আমি আমার পুত্র আইয়ুবকে খালিফা হিসেবে মনোয়ন দিচ্ছি। রেজা সুলাইমানের কাছ ঘেষে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন যাতে সুলাইমান তার প্রতি মনোযোগী হন। সুলাইমান লিখা বন্ধ করে রেজার দিকে চাইলেন। রেজা এবার বললেন: আমিরুল মুমীনিন! পরবর্তী খালিফা আপনি এমন একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে বানিয়ে যান যার কারনে কবরেও আপনি নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে থাকতে পারবেন।
সুলাইমান বললেন: তাহলে খালিফা নিবাচনের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি?
রেজা বললেন: সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিকতো আপনি। তবে আপনি কারোর নাম বলুন, আমি আমার মতামত দেই।
সুলাইমান বললেন: উমার ইবনু আবদিল আযিযের ব্যাপারে আপনার মত কি?
রেজা বললেন: তিনি একজন জ্ঞানী ও ভালো মুসলিম।   
সুলাইমান বললেন: আল্লাহর কসম। সে এমনই। কিন্তু আমি যদি আবদুল মালিকের সন্তানদেরকে উপেক্ষা করে উমারকে খালিফা করে যাই তাহলে তারা তাকে খিলাফাতে আসীন হতেই দেবেনা। একটু ভেবে আবার বললেন: উপায় একটা আছে। আমি উমারের পরে ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিকের নাম মনোনীত করে যাচ্ছি।

মনোনয়নের সংবাদ শুনে উমার ইবনু আবদিল আযিযের প্রতিক্রিয়া:
খিলাফাতের গুরুভার ও আল্লাহর নিকট জওয়াবদীহিতা সম্পর্কে উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) সচেতন ছিলেন, একারনে তিনি রেজা ইবনু হায়ওয়াকে কসম দিয়ে বলেছিলেন, সুলাইমান যদি তাকে খালিফা করতে চান তাহলে যেন রেজা তাকে বিরত রাখেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিলো অন্যরুপ।তিনি চাইছিলেন, দুনিয়াবাসীকে আবারো ইসলামী শাসনের বাস্তবরুপ প্রত্যক্ষ করাবেন।   

মনোনয়নের খবর শুনে উমার জনগনকে মাসজিদে সমবেত হবার নির্দেশ দেন। অত:পর সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
“ওহে জনমন্ডলী! আল্লাহর কসম, আমার মন প্রকাশ্যে বা গোপনে কখনো খালিফা হবার তামান্না পোষন করেনি। যে জিনিস আমি সব সময় অপছন্দ করেছি, এখন তা-ই আমার কাধে চাপানো হয়েছে।
হে জনমন্ডলী, আমার ইচ্ছা, মতামত এবং মুসলিম মিল্লাতের সাথে পরামর্শ ছাড়াই আমার উপর খিলাফাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ কারনে আমার বাইয়াতের যে বেড়ী আপনাদের গলায় পরানো হয়েছে তা আমি নিজেই খুলে নিলাম, এক্ষনে আপনারা যাকে খুশী খালীফা নিবাচিত করুন”।
ভাষণ শেষ হলে জনতা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল: আমরা আপনাকেই চাই। আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করুন।

দুনিয়া আবার ইসলামী শাসন অবলোকন করলো:
বালক উমার ইবনু আবদিল আযিযকে যখন তার নানা উমার ইবনুল খাত্তাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জীবন কাহিনী শুনানো হতো তখন তিনি বলতেন: “বড় হয়ে আমি নানার মতো হবো”।
অবাক ব্যাপার, খিলাফাতের দায়িত্ব গ্রহনের পর তিনি ঠিক তেমনটাই হয়ে যান,  আল্লাহ তার বাল্যবয়সের তামান্নাকে পুরন করেন।
মাত্র ত্রিশ মাসে তিনি তার গোটা সাম্রাজ্যের প্রতিটি শাখা প্রশাখা থেকে রাজতন্ত্রের ষাট বছরের পুঞ্জিভুত সকল আবর্জনা ও যুলুমের আখড়াগুলো পরিস্কার করে ফেলেন। ন্যায় ও ইনসাফের সুয আবারও উদিত হয় এবং তা প্রায় অর্ধ পৃথিবীকে আবারও আলোতে আলোতে ভরে দেয়।
শাসনভার গ্রহন করার সাথে সাথেই তিনি যে পদক্ষেপগুলো নেন তা ইতিহাসে বিরল। তুলনা করলে কেবলমাত্র আল খুলাফা আর রাশিদিনের সাথেই করা যায়:
তাকে পাহারা দেয়ার জন্য দেহরক্ষী বাহিনী এগিয়ে এলে তিনি বললেন: সরে যাও আমার কোন দেহরক্ষীর প্রয়োজন নেই। আমি সাধারন মুসলিমদের একজন।
তার জন্য রাষ্ট্রিয় বাহন আনা হলে তিনি তার নিজের খচ্চর আনিয়ে তাতে আরোহন করলেন আর খাদেমকে বললেন: এই বাহন ও পশুগুলো শামের বাজারে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ রাষ্ট্রীয় বাইতুলমালে জমা দাও।  
বানু উমাইয়ার শাসকগন অন্যায়ভাবে যেসব প্রজাদের অর্থ সম্পদ ও ভু-সম্পত্তি দখল করেছিলো তিনি তা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করেন। সবপ্রথম তিনি তার স্ত্রী ফাতিমা বিনতু আবদিল মালিককে বলেন: “যদি তুমি আমার সংগ চাও তাহলে তোমার যাবতীয় অর্থ সম্পদ ও অলংকারাদি মুসলিমদের বাইতুলমালে জমা দাও। কারন এসব কিছু তাদের। আমি, তুমি ও এসকল সম্পদ একই গৃহে থাকতে পারেনা”।
তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! আমি হারাম পন্থায় কাউকে কিছু দেবোনা, আবার কারোর বৈধ অধিকারে বাধাও দেবোনা।
রাজপরিবারের সমুদয় সদস্যকে একত্র করে তিনি বলেন: হে মারওয়ানের বংশধরগন: সম্মান, মযাদা এবং রাষ্ট্রিয় ক্ষমতার বিরাট একটি অংশ আপনারা লাভ করেছেন। আমার ধারণা মুসলিম উম্মাহর মোট সম্পদের অর্ধেক বা দুই তৃতীয়াংশ রয়েছে আপনাদের অধিকারে। আল্লাহর কসম! তাদের না এসব কিছু দেয়ার অধিকার ছিলো, আর না ছিলো আমাদের নেয়ার। এখন আমি সকল ভু-সম্পত্তি তাদের প্রকৃত মালিককে ফেরত দিচ্ছি, আর সে কাজ আমি আমার নিজের থেকে ও আমার পরিবার থেকে শুরু করছি। এসব দেখে তার খাদেম মুযাহিম বললো: আপনার সন্তানদের জীবিকার কি ব্যবস্থা হবে? উমারের দু’গন্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। বললেন: তাদেরকে আমি আল্লাহর যিম্মায় ছেড়ে দিচ্ছি”।
এভাবে তিনি তার গোটা সালতানাতের শাসন, বিচার ও নিবাহী ব্যবস্থাকে “খিলাফাত আলা মিনহাজ আন নব্যুয়াত” (নব্যুয়াতের পদ্ধতিতে খিলাফাত বা নাবীর অনুসৃত পদ্ধতিতে খিলাফাত) এ রুপান্তর ঘটান। আল খুলাফা আর রাশিদীন এর চুতর্থ খলীফা আলী ইবনু আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর ইনতেকালের পর বাইতুল মালকে   খলীফাদের ব্যক্তিগত কোষাগাররুপে বিবেচনা করা হতো। এ কোষাগারের সিংহভাগ অর্থ সম্পদ ব্যয় হতো খলীফা ও তার পরিবার পরিজনদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও আয়েশী জীবন যাপনের নিমিত্ত। উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) এ ব্যবস্থাকে উল্টে দেন। তিনি বাইতুল মালকে জনগনের জন্য, জনগনের সম্পদে রুপান্তর করেন। যালিম ও প্রজা নিপীড়ক কর্মকর্তা, কমর্চারীদেরকে তিনি অপসারণ করেন এবং তদস্থলে আল্লাহভীরু ও ন্যায়পরায়ণ লোকদেরকে নিয়োগ করেন।
ঐতিহাসিকগন লিখেছেন: প্রশাসনের সবত্র সৎ ও কল্যানমুখী নেতৃত্বের ফলে কৃষি ও চাষাবাদে প্রাণ ফিরে আসে। যমিনের উবরা শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সবত্র সমৃদ্ধির বাতাস বইতে থাকে। সুলাইমানের আমলে যাকাত নেবার জন্য যেখানে মানুষের লাইন পড়ে যেত উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে যাকাত নেবার মতো লোক খুজে পাওয়া ছিল দুস্কর।
শাসকদের ন্যায় পরায়ণতা, নি:স্বার্থ সেবা ও চরিত্র মাধুযে মুগ্ধ হয়ে মাযলুমেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহন করতে থাকে। ইবনু সা’দ বর্ণনা করেছেন: ‘উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে কেবলমাত্র খুরাসানের ওয়ালীর হাতেই ইসলাম গ্রহন করে চার হাজার যিম্মী’।

উমার ইবনু আবদিল আযিযের শাহাদাত:
একবার উমার তার মামা সালিম ইবনু আবদিল্লাহ (যিনি তার মায়ের চাচাত ভাই ছিলেন) কে লিখলেন: “আমার জন্য আপনি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে লিখে পাঠান যাতে আমি তা অনুসরন করতে পারি”।
সালিম লিখলেন: আপনি তা অনুসরন করতে পারবেন না। উমার জানতে চাইলেন: কেন আমি তা অনুসরন করতে পারবোনা?
জওয়াবে সালিম লিখলেন: “যদি আপনি তা অনুসরন করতে পারেন তাহলে উমার ইবনুল খাত্তাবের চাইতেও উত্তম মানুষে পরিণত হবেন কারন উমার তার কাজে অসংখ্য সহযোগী পেয়েছিলেন কিন্তু আপনি তা পাবেননা”।
“উমার ইবনুল খাত্তাব তার কাজে অসংখ্য সহযোগী পেয়েছিলেন কিন্তু আপনি তা পাবেননা” – কথাটি অবাস্তব ছিলোনা। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর সময়কাল ও পরিবেশ পরিস্থিতি ছিলো ইসলামী রাষ্টের অনুকুলে। কিন্তু উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়কাল ছিলো এর বিপরীত।  
মাত্র আড়াই বছরের মতো খিলাফাতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন উমার ইবনু আবদিল আযিয। জীবনের এ অধ্যায়টিতে, প্রতিটি দিন ও রাত তার কেটেছে বিক্ষুব্ধ ঝড় ঝঞ্চার মধ্যে। সবলের নিকট থেকে দুবলের ও যালিমের নিকট থেকে মাযলুমের অধিকার আদায় করতে গিয়ে তিনি নিজেকে বিপদের মুখে ফেলেন। তার বংশের লোকেরাই ছিলো তার উপর বেশী ক্ষিপ্ত। কারন তিনি তাদের মুখের গ্রাস (প্রকৃতপক্ষে যা ছিলো জনগনের জমি জিরাত) কেড়ে নিয়েছিলেন। সম্মুখে আনুগত্যের ভান করলেও তারা অপেক্ষায় ছিলো সময় ও সুযোগের। যেমন ক্ষুধার্ত নেকড়ে হরিণ শিকারের জন্য ওৎ পেতে থাকে। এটা সবজনবিদিত যে, রাষ্ট্রের আপামর জনতার নিকট উমার ছিলেন ত্রাণকর্তা ও চোখের মণি। তাছাড়া সেটা ছিলো প্রথম কাতারের তাবেঈদের যুগ। তারা সকলেই ছিলেন উমারের একান্ত শুভাকাংখী। বিশেষ করে হাসান আল বাসরীর (রাহিমাহুল্লাহ) মতো উচুমানের তাবেঈগন ছিলেন তার অন্তরংগ বন্ধু ও সাথী। কিন্তু কারোর ঘরের একান্ত নিভৃতে যদি বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে থাকে তাহলে বাইরের মানুষের পক্ষে সেটা শনাক্ত করা অনেক সময় সম্ভব না-ও হতে পারে।
উমারের বিশ্বস্ত খাদিম মুযাহিম ইনতিকাল করলে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। সে মুযাহিমের মতো ছিলোনা। উমারের শত্রুরা এ সুযোগকে কাজে লাগায়। ঐতিহাসিকগন লিখেছেন: ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিকের (যে উমারের চাচাত ভাই ছিল) মনে এ ভয় বাসা বাধে যে, উমারের দৃষ্টিভংগী যেরুপ দেখা যাচ্ছে, হয়তোবা উমার সুলাইমানের অসিয়াতনামা বাতিল করে অন্য কাউকে খলীফা নিযুক্ত করবে।
ইবনু কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন: ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিক উমারের নতুন সেই খাদিমকে এক হাজার দিনার ঘুষ দিয়ে হাত করে।এ খাদিমই তার নখের নীচে বিষ লুকিয়ে রাখে এবং উমারের খাবার পানিতে তা মিশিয়ে দেয়।
উমার অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকগন বিষে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। উমারকে যখন বিষ প্রয়োগের বিষয়টি জানানো হল তখন তিনি বললেন: আমি সেদিনই জানতে পেরেছি যেদিন আমি বিষ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। উমার সে খাদিমের উপর প্রতিশোধ নেয়া দুরে থাক তার বিচারেরও কোন নির্দেশ দিলেননা। তিনি একান্তে তাকে কাছে ডাকলেন এবং সুধালেন: তুমি এরুপ কেন করলে? সে বললো: আমাকে এক হাজার দিনার দিয়ে এরুপ করতে বাধ্য করা হয়েছে। উমার তার নিকট থেকে এক হাজার দিনার উদ্ধার করে তা তৎক্ষণাতই বাইতুল মালে জমা করার নির্দেশ দিলেন আর খাদিমটিকে বললেন: তুমি এখনই পালিয়ে যাও কারন আমার পরিবারের লোকেরা তোমার উপর প্রতিশোধ নিতে পারে।
ঈসায়ী রোম সম্রাট তার উপর এ বিষ প্রয়োগের খবর শুনে সাথে সাথেই তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে পাঠালেন, কিন্তু উমার কোনভাবেই চিকিৎসা নিতে রাজি হলেননা। বস্তুত: তিনি জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। দিনটি ছিলো ১০১ হিজরীর জুমা রাত্র। উমারের বয়স তখন ৪০ বছর। সিরিয়ার হিমস –এ তখন অবস্থান করছিলেন তিনি।
প্রায় বিশ দিন কষ্টভোগ করার পর ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিসর ও হিজাজবাসীকে কাদিয়ে এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহন করেন ইসলামের এই মহান খাদিম। যে আত্বীয় স্বজনদেরকে তিনি কোমর ধরে ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচাতে চাইছিলেন, সে আত্বীয় স্বজনেরাই তার কোমরখানি চিরদিনের জন্যে ভেংগে দেয়।
মাত্র আড়াই বছরের মতো ক্ষমতায় ছিলেন উমার। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, উমার ব্যর্থ ছিলেন – এ ধরনের একটি উক্তিও ইতিহাসের কোথাও খুজে পাওয়া যায়না। বরং ইতিহাস তাকে আখ্যায়িত করেছে ইসলামের পঞ্চম খলিফা হিসেবে আর বলেছে:  
“এভাবে, উমার ইবনু আবদিল আযিযের মাধ্যমে দুনিয়াজোড়া মানুষের কাছে আবারো এ প্রমাণ দীপ্ত হয়ে উঠে যে, আসলে মানবতার কল্যাণ, মুক্তি এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে”।

গ্রন্থ ঋণ :
১) ওমর ইবনু আবদিল আযিয – রশিদ আখতার নদভী
২) তাবেঈদের জীবন কথা – ড: মুহা: আবদুল মাবুদ (মাসিক পৃথিবী)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

অসাধারণ লেখা, তবে আরেকটু ছোট আকারে পোস্ট করার পরামর্শ দিচ্ছি। বড় লেখা দেখে অনেকেই পড়া থেকে বিরত থাকতে পারে।

-

"প্রচার কর আমার পক্ষ হতে, যদি একটি কথাও (জানা) থাকে।" -আল হাদীস

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)