হাসান আল বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ)

হাসান আল বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ)
জন্ম এবং শৈশবকাল: হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) এর পুবপুরুষ ইরাকের অধিবাসী ছিলেন। পিতার নাম পিরোয। বার হিজরীতে ইরাক বিজিত হলে পিরোয বন্দী হয়ে মাদীনায় আসেন ও ইসলাম গ্রহন করেন এবং পরবর্তীতে উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহার দাসী খাইরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২১ হিজরীতে এ দম্পতিরই ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহন করেন হাসান। ভুমিষ্ট হবার পর হাসানকে উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি বললেন: শিশুটি দেখতে বেশ সুন্দর হয়েছে, তোমরা এর নাম রেখো হাসান।
এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের ৯ বছর (মতান্তরে ১০) পরের ঘটনা। যৌবনে পদার্পন করার পর হাসান ইরাকের বাসরায় গমন করেন এবং অত:পর জীবনের বাকী অংশ সেখানেই কাটান, একারনে লোকমুখে তিনি হাসান আল বাসরীরুপে পরিচিত হন।
মায়ের সুবাদে হাসান আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে শৈশব কাটানোর সৌভাগ্য অর্জন করেন। কখনো মাকে কাছে না পেলে শিশু হাসান কান্না জুড়ে দিতেন তখন উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাকে কোলে তুলে নিতেন ও আদর সোহাগ দিয়ে কান্না থামাতেন।
 
শিক্ষা দীক্ষা: সমগ্র আরব উপদ্বীপ ও শাম (বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং ইরাক) তখন হেরার জ্যোতিতে দীপ্তময়। মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা ও চরিত্র সুষমার সুঘ্রানে গোটা আরব বিমোহিত। ইসলামী উম্মাহর এমনি এক গৌরবময় কাল পরিক্রমার ক্ষণে বেড়ে উঠেন হাসান। হাসান আল বাসরীর আরও সৌভাগ্য ছিল যে, প্রায় ১৩০ জনের মতো বয়োবৃদ্ধ সাহাবীর সান্নিধ্য তিনি লাভ করেন এবং তাদের নিকট থেকে দ্বীনি ইলম হাসিলের সৌভাগ্য অর্জন করেন। বিশেষ করে খুলাফা আর রাশিদীনের চতুর্থ খলীফা আলী ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবন ও কর্মকে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখে ধন্য হন হাসান।

যুলুম অত্যাচারের বিরোধিতা: সীরাতের মুল গ্রন্থাবলী পাঠ করলে দেখা যায় হাসান আল বাসরীর যৌবনের সোনালী অধ্যায় কেটেছে যুদ্ধের ময়দানে। সশস্ত্র জিহাদ থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে মৃত্যু পযন্ত তিনি যুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিজেকে সোচ্চার রাখেন। এমনকি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের মতো কঠোর প্রকৃতির লোকের সমালোচনা করতেও তিনি কুন্ঠিত হননি। শেষ পযন্ত হাজ্জাজের বিরাগভাজন হয়ে মৃত্যু পযন্ত তিনি আত্বগোপন করে থাকেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার আপোষহীনতার বহু ঘটনা ও তথ্য ইতিহাসে উল্লেখিত হয়েছে। একদিনের ঘটনা:
ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিকের সময়ে উমার ইবনু হুবায়রা খুরাসান ও ইরাকের ওয়ালী নিযুক্ত হন। তিনি ইরাকে এসে হাসান আল বাসরী, মুহাম্মাদ ইবনু সীরিন এবং ইমাম শা’বীকে ডেকে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করার ভংগিতে তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: ইয়াযিদ আল্লাহর খলীফা। আল্লাহ তাকে বান্দাদের উপর তার প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন। আল্লাহ তার নিকট থেকে নিজের আনুগত্য এবং আমাদের (আমীরদের) ইয়াযিদের আদেশ নিষেধের বাস্তবায়নের অংগীকার গ্রহন করেছেন। আপনাদের জানা আছে যে, তিনি আমাকে ওয়ালী নিয়োগ করেছেন এবং আমার নিকট বিভিন্ন আদেশ নিষেধ পাঠান। আমি তা কাযকর করে থাকি। এ অবস্থায় এব্যাপারে আপনাদের মতামত কি? ইবনু সীরিন (রাহিমাহুল্লাহ) ও শা’বী (রাহিমাহুল্লাহ) তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য অনেকটা পরোক্ষভাবে জওয়াব দিলেন। হাসান আল বাসরী একেবারেই চুপচাপ ছিলেন। অবশেষে ইবনু হুবায়রা তার মতামত জানতে চাইলেন। হাসান জওয়াব দিলেন এভাবে: “ওহে ইবন হুবায়রা, ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিকের ব্যাপারে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন, আল্লাহর ব্যাপারে ইয়াযিদকে ভয় করবেননা। আল্লাহ আপনাকে ইয়াযিদের হাত থেকে বাচাতে পারেন কিন্তু সে আপনাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাচাতে পারবেনা। সে সময় খুবই নিকটে যখন আল্লাহ আপনার নিকট এমন মালাক (মালাকুল মাওত) পাঠাবেন যে আপনাকে রাষ্ট্রিয় পদ থেকে নামিয়ে, প্রাসাদের প্রশস্ততা থেকে বের করে কবরের সংকীর্ণতার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। সে সময় কেবল আপনার কর্ম ছাড়া আর কেউ আপনাকে উদ্ধার করতে পারবেনা। হে ইবন হুবায়রা, আল্লাহ তার দ্বীন ও তার বান্দাদের সাহায্যের জন্য বাদশাহ এবং বাদশাহী বানিয়েছেন। একারনে আল্লাহর দেয়া বাদশাহীর বদৌলতে আপনারা আল্লাহর দ্বীন এবং তার বান্দাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসবেননা। আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা উচিত নয়। সুতরাং ইয়াযিদ যা লিখেছেন তা আল্লাহর কিতাবের সাথে মিলান। যদি সামঞ্জস্যপুর্ন হয় তাহলে পালন করুন। আর যদি আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হয়, পালন করবেননা। কারন ইয়াযিদের চেয়ে আল্লাহ এবং ইয়াযিদের চিঠির চেয়ে আল্লাহর কিতাব আপনার নিকট অগ্রগণ্য”।
হাসান আল বাসরীর এ বক্তব্য শুনে ইবন হুবায়রা হাসানের কাধে টোকা মেরে বললেন: কা’বার প্রভুর শপথ, এই শায়খ আমাকে সত্য কথা বলেছেন। তারপর ইবনু হুবায়রা অঝোরে কাদতে থাকেন।
 
হাসান আল বাসরীর কতক জ্ঞানগর্ভ কথা:
হাসান আল বাসরীর বেশীরভাগ কথা ও আলোচনা ছিল জ্ঞান ও উপদেশমুলক। বিশুদ্ধ আরবী ও হৃদয় স্পর্শ করা অলংকারপুর্ণ ভাষায় তিনি মানুষকে উপদেশ দিতেন। তার গভীর তাৎপযমন্ডিত বাণীসমুহ থেকে খানিক নীচে উপস্থাপন করা হল:
-    আল্লাহ যে বান্দার কল্যাণ চান তাকে পরিবার পরিজনের বন্ধন ও ভালবাসার মধ্যে জড়িত করেননা।
-    জ্ঞানী ব্যক্তির জিহবা তার অন্তরের পিছনে থাকে। যখন সে কিছু বলতে চায় প্রথমে অন্তরের সাথে পরামর্শ করে। যদি সে কথায় কোন উপকার থাকে তাহলে বলে, অন্যথায় থেমে যায়। আর মুর্খ ব্যক্তির অন্তর থাকে তার জিহবার একেবারে আগায়। জিহবায় যা আসে তা-ই সে বক বক করে বলে যায়, অন্তরের সাথে যোগাযোগের পুবেই।
-    প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া হচ্ছে বাহন। যদি তোমরা তার পিঠে আরোহী হয়ে যাও, সে তোমাদেরকে বহন করবে। আর যদি দুনিয়া তোমাদের পিঠে আরোহী হয় তাহলে সে তোমাদেরকে ধ্বংস করে ছাড়বে।
-    আমি এমন কাউকেই দেখিনি যে দুনিয়া চেয়েছে এবং আখিরাত পেয়েছে। কিন্তু এমন বহু নযির আমি দেখেছি, যে আখিরাত চেয়েছে অত:পর দুনিয়া আখিরাত দু’টুই পেয়েছে।
-    পৃথিবীকে এমন এক সেতু মনে করো যার উপর দিয়ে তুমি ওপারে পৌছবে। যদি সহিহ সালামাতে ওপারে পৌছতে পার তাহলেতো বেচে গেলে। সুতরাং এ সেতুর উপর এমন কিছু নির্মাণ করোনা যার কারনে তুমি ওপারে পৌছতে অক্ষম হও।
-    নি:স্ব ও নিপেড়িতদের সাথে বন্ধুত্ব রাখো, কেননা কিয়ামাতের দিন বলা হবে, তোমাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করেছিল তাদেরকে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর।

তথ্য সুত্র:
১) তাবেঈদের জীবন কথা – ড: মুহা: আবদুল মাবুদ (মাসিক পৃথিবী)
২) www.islamweb.net

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

আপনার ব্লগ অনেক শিক্ষনীয়। জাযাকুমুল্লাহ্ খায়ের।

-

"প্রচার কর আমার পক্ষ হতে, যদি একটি কথাও (জানা) থাকে।" -আল হাদীস

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)