সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ওয়াইনবার্গের মন্তব্য ও কিছু কথা

“যে বিশ্ব একেবারে বিশৃঙ্খল, বিধিবিহীন, তেমন একটি বিশ্বকে কোন মুর্খের সৃষ্ট বলে ধরে নেয়া যেতে পারে” - উক্তিটি নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ ষ্টিফেন ওয়াইনবার্গ-এর। মানুষে মানুষে নির্দয় হানাহানী, দুর্বলের উপর শক্তিমানের যুলুম অবিচার ও শোষণ নিপীড়ন, ধনী দরিদ্রের বেদনাদায়ক ব্যবধান, কল্যাণ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকামীদের অসহায়ত্ব, মাযলুমের উপর যালিমের অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ব ও সীমাহীন যুলুম -  ইত্যাদি দর্শন করে হয়তো তিনি এ উক্তিটি করেছেন। শুধু ওয়াইনবার্গ নয় মনুষ্যজগতে এমনি ধরনের অরাজকতা দেখে এ জাতীয় ধারণা পোষণ করেন এ পৃথিবীর বহু মানুষ।
তাদের প্রত্যাশা বা দাবী - এখানে এ বিশ্বে কোনও গড বা অতি শক্তিধর কেউ থাকলে পৃথিবীব্যাপী এমন হানাহানী ও অবিচার চলতে পারতো না, কোথাও অন্যায় অবিচার হওয়ামাত্র সেই গড মাটিতে নেমে এসে অন্যায়কারীকে সাথে সাথে পাথর বানিয়ে ফেলতেন কিংবা নিদেনপক্ষে অন্যায়কারীর হাত পা অবশ হয়ে যেতো .... ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিশ্বব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উদয় হওয়া ভাল লক্ষণ। কারোর কারোর জন্য হেদায়াতের প্রাক নিশানী। এটি ঐ মুসলিমের চেয়ে ভাল যে পৈত্রিক সুত্রে মুসলিম কিন্তু সে জানেনা বা জানার চেষ্ঠাও করেনা যে আল্লাহ তাকে কেন সৃষ্টি করলেন। যাক সে কথা। একজন মিশনারী জাতীর সদস্য হিসেবে আমি মনে করি সত্যটা এইসকল অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য তুলে ধরা দরকার।

সমগ্র কুরআন কারিম জুড়েই এসব প্রশ্নাবলীর জওয়াব বিদ্যমান। দিশা রয়েছে স্রষ্টা প্রেরিত নাবী রাসুলদের জীবনেও। যেমন কুরআন কারিমে বলা হয়েছে:

“আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালঙ্ঘন ও নাফরমানীর কারণে সাথে সাথে পাকড়াও করতেন তাহলে ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী কোন জীবেরই অস্তিত্ব থাকতো না, কিন্তু তিনি সবাইকে একটা নির্দিষ্ট সময় পযন্ত অবকাশ দেন। অতঃপর যখন সেই সময়টি এসে যায় তখন তা থেকে এক মুহূর্তও আগ পিছ হয় না” (সুরা আন নাহল ৬১)

“আল্লাহ যদি মানবকুলের সাথে খারাপ ব্যবহার করার ব্যাপারে অতটাই তাড়াহুড়া করতেন যতটা দুনিয়ার ভালো চাওয়ার ব্যাপারে তারা তাড়াহুড়া করে থাকে, তাহলে তাদের কাজ করার অবকাশ কবেই খতম করে দেয়া হতো (কিন্তু আমার নিয়ম এটা নয়) তাই যারা আমার সাথে সাক্ষাৎ করার আশা পোষণ করে না তাদেরকে আমি তাদের অবাধ্যতার মধ্যে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দেই।” (সুরা ইউনুস ১১)

‘এরা তোমার কাছে দাবী করছে আযাব দ্রুত আনার জন্য। এটার জন্য যদি একটি সময় পূর্বাহ্নেই নির্ধারিত না থাকতো তাহলে তাদের ওপর আযাব এসেই যেতো এবং নিশ্চিতভাবেই (ঠিক সময় মতো) তা অকস্মাৎ এমন অবস্থায় এসে যাবেই যখন তারা জানতেও পারবে না। (সুরা আল আনকাবুত ৫৩)

“তারা আযাবের জন্য তাড়াহুড়ো করছে অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন না। কিন্তু তোমার রবের কাছের একটি দিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান হয়।” (সুরা আল হাজ ৪৭)

“...... একটি নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হবে একথা যদি তোমার রব পূর্বেই ঘোষণা (লিপিবদ্ধ) না করতেন তাহলে তাদের বিবাদের চূড়ান্ত ফায়সালাতো সাথে সাথেই করে দেয়া হতো।” (সুরা আশ শুরা ১৪)

অর্থাৎ যারা যুলুম অবিচার এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধে অপরাধী  তাদেরকে যদি দুনিয়াতেই আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয় এবং শুধু সঠিক পথ অনুসরণকারীদের বাঁচিয়ে রাখা হয় তাহলে কে ন্যায় ও সত্যের অনুসারী আর কে অন্যায় ও অসত্যের অনুসারী তা সুস্পষ্ট হয়ে যায় বটে। কিন্তু এ বিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা এই চূড়ান্ত ফায়সালা কিয়ামত পযন্ত সময়ের জন্য মূলতবী করে রেখেছেন। কারণ, পৃথিবীতে এ ফয়সালা করে দেয়ার পর মানব জাতির পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যেতো। যে পরীক্ষার কথাটি আল্লাহ তার নাবী রাসুলদের মাধ্যমে বার বার মানবজাতীকে অবহিত করতে চেয়েছন। যেমন কুরআন কারিমে এসেছে:
“তিনিই সেই সত্তা যিনি জন্ম এবং মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, কার র্কম ভাল “  (সুরা আল মুলক ২)
“ এ আকাশ ও পৃথিবী এবং এর মধ্যে যা কিছুই আছে এগুলো আমি খেলাচ্ছলে তৈরী করিনি। যদি আমি কোন খেলনা তৈরী করতে চাইতাম এবং এমনি ধরনের কিছু আমাকে করতে হতো তাহলে নিজেরই কাছ থেকে করে নিতাম” (সুরা আল আম্বিয়া ১৬-১৭)

অর্থাৎ আল্লাহ বলেন যে, যদি আমি খেলা করতেই চাইতাম তাহলে খেলনা বানিয়ে নিজেই খেলতাম। এ অবস্থায় একটি অনুভুতিশীল, সচেতন ও দায়িত্বশীল প্রাণী সৃষ্টি এবং তার মধ্যে সত্য মিথ্যার এ দ্বন্ধ ও টানা হেচড়ার অবতারণা করে নিছক নিজের আনন্দ ও কৌতুক করার জন্য এবং অন্যকে অর্নথক কষ্ট দেবার মতো যুলুম কখনোই করা হতোনা। তিনি এখানে বান্দাদরেকে পরস্পরের মধ্যে লড়াই করিয়ে অট্রহাসি হাসার জন্যে এ দুনিয়া সৃজিত করেননি।

আরও কিছু কথা:
স্রষ্টার প্রতি দোষ আরোপের পুবে ষ্টিফেন ওয়াইনবার্গ যদি স্রষ্টার বিধানাবলীকে অধ্যয়ন করতেন তাহলে কতইনা ভালো হতো! তার সামনে প্রোজ্জল ছিল আল খুলাফা আর রাশিদীন। তিনি দেখতে পেতেন, ন্যায় ও ইনসাফের যে শাসনব্যবস্থার তামান্না তিনি করছেন, অপুব এক কিরণ প্রভায় তা-ই জ্বল জ্বল করছে সেখানে। তিনি তখন এই সাক্ষ্য প্রদানে বাধ্য হতেন যে, স্রষ্টার বিধানে মানুষ কদাপি মানুষের প্রভু হবার সুযোগ পায়না বরং মানুষের রচিত আইন বিধানই মানুষকে মানুষের প্রভু করে তোলে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)