পীর ধরা প্রসংগ

প্রতি বছর অগ্রহায়ন মাসে আমাদের গ্রামে একটি ওয়াজ মাহফিল হতো। বক্তা দুরবর্তী অন্য একটি জেলা থেকে আসতেন। আমাদের এলাকায় তার অনেক মুরীদও ছিলো। একবার তিনি আমাদের বাড়ীতে রাত্রিযাপন করলেন। সকালবেলা ১০/১২ জন মহিলা এলো মৌলভী সাহেবের কাছে বাইয়াত নিতে। মৌলভী সাহেব তার লম্বা পাগড়ীটি খুলে দিলেন, মহিলারা পর্দার আড়ালে বসে তার পাগড়ী ধরলো এবং বাইয়াত করে মুরীদ হলো। আমি তখন ছোট। কাজটি ভালো কি মন্দ কিছুই বুঝিনা, তাই ভয়ে ভয়ে আমার এক বোনকে সুধালাম: এমন কেন করা হচ্ছে? সে আমাকে যা বোঝাল তার মর্ম এই: এ পীরের পাগড়ী ধরার উছিলায়, হতে পারে হাশর দিবসে তারা পুলছিরাত পার হয়ে যাবে।

এমন প্রথা আজো বাংলাদেশের কোথাও আছে কিনা জানিনা। হয়তো নেই। তবে মুরীদ হয়ে গেলে (কোনও পীরের নিকট) তেমন ভয়ের কোন কারন নেই – এহেন ধারণা কতক মানুষের মনে আজো প্রবল। মুরীদের চরিত্র ও কর্ম যা-ই হোকনা কেন।   

আমরা যতদুর জানি – হাশর দিবসে যে জিনিসটি মানুষকে মুক্তি দেবে বা ধ্বংস করবে তা হচ্ছে বান্দার আপন কর্ম। সেদিন কেউ কারো কোন উপকারে আসবেনা, কেউ কাউকে রক্ষা করতে পারবেনা যদি বান্দার আপন আমলনামা খারাপ হয়। কুরআন কারিমে একথা আল্লাহ তায়ালা বার বার বলেছেন। হাদিসের ভান্ডারেও এর বহু দলিল বিদ্যমান।

সুরা আশ-শুআরার “এবং নিজের নিকটতম আত্নীয় পরিজনদের সাবধান করো” (২১৪) এ আয়াত যখন নাযিল হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার আগে নিজের দাদার সন্তানদের ডাকলেন এবং তাদের একেক জনকে সম্বোধন করে বললেনঃ 

"হে বনী আবদুল মুত্তালিব, হে আব্বাস, হে আল্লাহর রাসূলের ফুফী সফীয়াহ, হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা, তোমরা জাহান্নামের আযাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার চিন্তা করো। আমি আল্লাহর আযাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবো না। তবে হাঁ আমার ধন-সম্পত্তি থেকে তোমরা যা চাও চাইতে পারো।" 

তারপর তিনি অতি প্রত্যুষে সাফা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেনঃ  (হায়, সকালের বিপদ!) হে কুরাইশের লোকেরা! হে বনী কা'ব ইবনে লুআই, হে বনী মুররা, হে কুসাইর সন্তান সন্ততিরা, হে বনী আবদে মানাফ, হে বনী আব্দে শামস, হে বনী হাশেম, হে বনী আবদুল মুত্তালিব, এভাবে কুরাইশদের প্রত্যেকটি গোত্র ও পরিবারের নাম ধরে তিনি আওয়াজ দেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ আওয়াজ শুনে লোকেরা যার যার ঘর থেকে বের হয়ে এলো। তখন তিনি বললেনঃ "হে লোকেরা, যদি আমি বলি, এ পাহাড়ের পেছনে একটি বিশাল সেনাবাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য ওৎ পেতে আছে। তাহলে কি তোমরা আমার কথা সত্য বলে মেনে নেবে৷ সবাই বললো, হ্যাঁ, আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তুমি কখনো মিথ্যা বলনি। তিনি বললেন, বেশ, তাহলে আমি আল্লাহর কঠিন আযাব আসার আগে তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। তাঁর পাকড়াও থেকে নিজেদের বাঁচাবার চিন্তা করো। আল্লাহর মোকাবিলায় আমি তোমাদের কোন কাজে লাগতে পারবোনা। ........." এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অনেকগুলো হাদীস বুখারী, মুসলিম, মুসনাদ আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ, তাফসীর ইবনু জারীরে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা, এবং আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত হয়েছে। 

আরও বর্নিত রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন তার কন্যা ফাতিমাকে লক্ষ্য করে বল্লেন: 

“হে মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমা, তুমি নিজের কর্মের দ্বারা নিজেকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর। কারণ আমি তোমার কোনো ক্ষতির বা উপকারের ক্ষমতা রাখিনা। (সহীহ ইবনে হিব্বান ২/৪১২, সহীহ মুসলিম ১/১৯২)

এ হচ্ছে তার উক্তি যিনি কিয়ামাত দিবসে নিজ উম্মাতের জন্যে শাফায়াত করার অধিকার লাভ করবেন এবং আমরা এও জানি যে, কিয়ামাতের দিন মানুষ অন্যান্য নাবী রাসুলদের কাছেও শাফায়াতের আবেদন ও আকুতি নিয়ে ছুটে যাবে কিন্তু সবাই অপারগতা প্রকাশ করবেন, বলবেন: তোমরা শেষ নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যাও। 

এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ অর্থাৎ দুনিয়ার পীরগন সেদিন কিভাবে নাজাতের ব্যবস্থা করবেন?

বি: দ্র: এখানে কেবলমাত্র ঐসকল ভন্ড পীরদের প্রসংগ নিয়েই আলোচনা করেছি, যাদের কারনে আজ ভাল ও নেকদীল পীরদের সুনাম ক্ষুন্ন হতে চলেছে। 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

গুরু ও পীরেরা নেতৃত্ব, বাইয়াত, খেলাফত ইত্যাদির গুরুত্ব বয়ান করবার দ্বারা কৌশলে নিজেদের প্রতি মানুষকে অনুগত হতে প্ররোচিত করে এবং তারপর সেই অন্ধ আনুগত্যকে ব্যবহার করে মানুষকে নিজেদের ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনায় দীক্ষিত করে ও ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত করে। যেকোন একজন নেতা থাকতে হবে একথা প্রমাণের দলীল হিসেবে "আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর ও উলীল আমরের" এ আয়াতটি প্রচার করতে করতে মুখে ফেনা তুলে দেয়। এছাড়া হাদীসে প্রতি জামানায় এক জন করে মোজাদ্দেদ আগমনের বার্তাটি জোরেশোরে প্রচার করে। অথচ বর্তমান জামানায় প্রত্যেক পীরই নিজেকে জামানার মোজাদ্দেদ দাবি করছে, যা অসম্ভব ও হাস্যকর। অথচ কারো সুন্নত মানার বালাই নেই— না আকীদা-বিশ্বাসে, না বেশভূষাতে। ভক্তরা কদম মোবারকে শ্রদ্ধা জানায়, অথচ কদম মোবারক দেখাই যায় না। কোন কোন গুরু নিজেকে রসূলের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেন, অথচ গোঁফ দিয়ে মুখ ঢাকা। মূলত: নিজে ধর্মের উপর কায়েম থাকলে এবং মানুষকে ধর্মের পথে চালিত করবার নিয়ত থাকলে এসব ধানাই ফানাইয়ের দরকারই পড়ে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের পক্ষে আনুগত্য হাসিলের প্রয়োজন তখনই হয়, যখন ধর্মের বাইরে অন্য কিছু (এমনকি ধর্মের বিরোধী কিছু) চাপিয়ে দেবার ধান্ধা থাকে। যেমন- যেই পিতামাতা সন্তানকে ধার্মিক বানাতে চান, তার জন্য পিতামাতার আনুগত্যের ফযীলত আলাদাভাবে বয়ান করবার প্রয়োজনই পড়ে না। কিন্তু যেসব পিতামাতা ধর্মের বাইরে কোন দুনিয়াবি লক্ষ্য হাসিল করতে চান, তাদেরই প্রয়োজন হয় পিতামাতার আনুগত্যের দোহাই দিয়ে সন্তানকে নিজের আজ্ঞাবহ করবার।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু কিছু পীর ও গুরু বাইয়াত ও মারেফাতের নামে শুধু কুফরী ও শেরকী আকীদায় জনগণকে দীক্ষিত করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং প্রাচীনকালের ভয়ঙ্কর যাদুবিদ্যাকে চর্চা ও দীক্ষাদান করা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতা চর্চার আড়ালে। এ কাজে বর্তমানে সবার শীর্ষে আছেন একজন ধ্যানী গুরু, যিনি আত্মশুদ্ধি ও সৃষ্টির সেবার বাণী শুনিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করেন, কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে মানুষকে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করে ছাড়েন। কথিত অন্তর্গুরুকে জীবনের গাইড রূপ পেতে গিয়ে মানুষ বুঝে বা না বুঝে শয়তান জিনের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। মানুষের ঘরে ঘরে কুফরী যাদুবিদ্যা ও পারস্পরিক অনিষ্ট সাধনের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)